গুরুবাক্য

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

অচ্যুত অপূর্ব উমেশ কার্তিক ও খগেন্দ্র

অচ্যুত । গুরুদেব এখনো এলেন না , উপায় কী!

কার্তিক । আমি তো বিষম মুশকিলে পড়েছি । আমার নাম কার্তিক , আমার ছোটো শালার নাম কীর্তি । আমার স্ত্রী তার ভাইকে কীর্তি বলে ডাকতে পারে কি না এটা স্থির করে না দিলে স্ত্রীর সঙ্গে একত্র বাস করাই দায় হয়েছে । তার উপর আবার গয়লা বেটার নাম কীর্তিবাস! এখন গুরুদেবকে জিজ্ঞাসা করতে হবে , আমার স্ত্রী যদি কীর্তিবাস গোয়ালাকে বাসুদেব বলে ডাকে তা হলে বৈধ হয় কি না । বাড়িতে কার্তিকপূজার সময় স্ত্রী কার্তিককে নাত্তিক বলে ; নাম খারাপ করার দরুন ঠাকুরের কিংবা তাঁর মা'র কোনো অসন্তোষ ঘটে কি না এও জিজ্ঞাস্য ।

অপূর্ব । আমারও একটা ভাবনা পড়েছে । সেবার শ্রীক্ষেত্রে গিয়ে জগন্নাথকে কুল দিয়ে এসেছিলুম , এখন , এই গরমির দিনে কুলটুকু বাদ দিয়ে যদি তার ঝোলটুকু খাই তাতে অপরাধ হয় কি না ।

অচ্যুত । আমি সেদিন গুরুদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেম যে , শাস্ত্রমতে ভোক্তা শ্রেষ্ঠ না ভোজ্য শ্রেষ্ঠ , অন্ন শ্রেষ্ঠ না অন্নপায়ী শ্রেষ্ঠ ? তিনি এমনি এক গভীর উত্তর দিলেন যে , তখন যদিচ আমরা সকলেই জলের মতো বুঝে গেলুম কিন্তু এখন আমাদের কারো একটি কথাও মনে পড়ছে না ।

উমেশ । আমার যতদূর মনে হচ্ছে , বোধ হয় তিনি বলেছিলেন অন্নও শ্রেষ্ঠ নয় , অন্নপায়ীও শ্রেষ্ঠ নয় , কিন্তু আর-একটা কী শ্রেষ্ঠ , সেইটে যে কী মনে পড়ছে না ।

অপূর্ব । না না , তিনি বলেছিলেন অন্নও শ্রেষ্ঠ , অন্নপায়ীও শ্রেষ্ঠ । কিন্তু অন্নই বা কেন শ্রেষ্ঠ আর অন্নপায়ীই বা কেন শ্রেষ্ঠ তখন বুঝেছিলুম , এখন কোনোমতেই ভেবে পাচ্ছি নে ।

খগেন্দ্র । অন্ন এবং অন্নপায়ীর মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ , সহজবুদ্ধিতে পূর্বে সেটা একরকম ঠাউরেছিলুম , কিন্তু গুরুদেবের কথা শুনে বুঝলুম যে , পূর্বে কিছুই বুঝি নি এবং তিনি যা বললেন তাও কিছুই বুঝলুম না ।

অচ্যুত । যা হোক , সেও একটা লাভ ।

বদনচন্দ্রের ছুটিয়া প্রবেশ

বদন । ( হাঁপাতে হাঁপাতে) গুরু কোথায় ? আমাদের শিরোমণিমশায় কোথায় ? বলো-না হে কোথায় গেলেন তিনি!

অচ্যুত প্রভৃতি । কেন কেন ?

বদন । হঠাৎ কাল রাত্রে আমার মনে একটা প্রশ্ন উদয় হল , সে অবধি আহার নিদ্রা প্রায় ছেড়েছি ।

কার্তিক । তাই তো! বিষয়টা কী বলো তো ।

বদন । কী জান ? কাল মশারি ঝাড়তে ঝাড়তে হঠাৎ মনে একটা তর্ক এল যে , এত দেশ থাকতে জটায়ু কেন রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে মারা পড়ল ? জটায়ু যে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে ম'ল তার অর্থ কী , তার কারণ কী , এবং তার তাৎপর্যই বা কী ? এর মধ্যে যদি কোনো রূপক থাকে তবে তাই বা কী ? যদি কোনো অর্থ না থাকে তাই বা কেন ?

কার্তিক । বিষয়টা শক্ত বটে । শিরোমণিমশায় আসুন ।

খগেন্দ্র । ( ভয়ে ভয়ে ) ঠিক বলতে পারি নে , কিন্তু আমার বোধ হয় জটায়ুর মৃত্যুর একমাত্র কারণ , যুদ্ধের সময় রাবণ তাকে এমন অস্ত্র মেরেছিলেন যে সেটা সাংঘাতিক হয়ে উঠল ।

বদন । আরে রাম , ও কি একটা উত্তর হল! ও তো সকলেই জানে ।

কার্ত্তিক । ওতো আমিও বলতে পারতুম ।

অপূর্ব । ও রকম উত্তরে কি মন সন্তুষ্ট হয় ?

বদন চিন্তাম্বিত । খগেন্দ্র অপ্রতিভ

অচ্যুত । ( শশব্যস্ত) ঐ-যে গুরু আসছেন ।

উমেশ । ঐ-যে শিরোমণিমশায় ।

বদন । ( সহসা চিন্তাভঙ্গে চকিত হইয়া) অ্যাঁ , গুরুদেব আসছেন! বাঁচলুম , আমার অর্ধেক সংশয় এখনি দূর হয়ে গেল ।

শিরোমণি মহাশয়ের প্রবেশ

সকলের ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম

শিরোমণি । স্বস্তি স্বস্তি!

বদন । গুরুদেব , কাল মশারি ঝাড়তে ঝাড়তে মনে একটা প্রশ্ন উদয় হয়েছে. ।

শিরোমণি । প্রকাশ করে বলো ।

বদন । বিহগরাজ জটায়ু রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে কেন নিহত হলেন ? ( অঙ্গুলিনির্দেশপূর্বক) আমাদের খগেন্দ্রবাবু (খগেন্দ্র অত্যন্ত লজ্জিত ও কুন্ঠিত) বলছিলেন অস্ত্রাঘাতই তার কারণ ।

শিরোমণি । বটে! হাঃ হাঃ হাঃ , আধুনিক নব্যতন্ত্র কালেজের ছেলের মতোই উত্তর হয়েছে । শাস্ত্রচর্চা ছেড়ে বিজ্ঞান পড়ার ফলই এই । প্রশ্ন হল , জটায়ুর মৃত্যু হল কেন , উত্তর হল অস্ত্রাঘাতে । এ কেমন হল জান ? কাশীধামে বৃষ্টি হল আর খড়দহে পঙ্গপালে ধান খেলে । হা হা হাঃ ।

অপূর্ব । ঠিক তাই বটে । আজকাল এইরকমই হয়েছে , বুঝেছেন শিরোমণিমশায় ?

শিরোমণি । আচ্ছা বাপু খগেন্দ্র , তুমি তো অনেকগুলো পাস দিয়েছ , তুমিই বলো তো , অস্ত্রাঘাতেই বা জটায়ূর মৃত্যু হল কেন , রক্তপিত্ত রোগেই বা না মরে কেন ? রাবণের সঙ্গেই বা যুদ্ধ হয় কেন , ভস্মলোচনের সঙ্গেই বা না হল কেন ? অত কথায় কাজ কী , জটায়ুই বা মরে কেন , রাবণ ম'লেই বা ক্ষতি কী ছিল ?

বদন পূর্বাপেক্ষা চিন্তাম্বিত

অচ্যুত ও অপূর্ব । ( গভীর চিন্তার সহিত) তাই তো , এত দেশ থাকতে জটায়ুই বা মরে কেন!

উমেশ । কী হে খগেন্দ্র , একটা জবাব দাও-না । তোমাদের রস্কো-সাহেব কী লেখেন ?

কার্তিক । তোমাদের টিণ্ডালই বা কী বলেন — রাবণের সঙ্গেই বা যুদ্ধ হয় কেন ?

অচ্যুত । রক্তপিত্তে না ম'রে অস্ত্রাঘাতে মরবার জন্যেই বা তার এত মাথাব্যথা কেন ? হক্‌সলি সাহেব কী মীমাংসা করেন শুনি।

খগেন্দ্র । ( আধমরা হইয়া) গুরুদেব , আমি মূঢ়মতি , না বুঝে একটা কথা বলে ফেলেছি । মাপ করুন । শ্রীমুখের উত্তরের জন্যে উৎসুক হয়ে আছি ।

শিরোমণি । তোমরা বলছ রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে জটায়ু ম'ল কেন — এক কথায় এর উত্তর দিই কী করে!

সকলে । তা তো বটেই । তা তো বটেই ।

শিরোমণি । প্রথমে দেখতে হবে ‘ রাবণের ' ই সঙ্গে যুদ্ধ হয় কেন , তার পরে দেখতে হবে রাবণের সঙ্গে ‘ যুদ্ধ ' ই বা হয় কেন , তার পরে দেখতে হবে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে ‘ জটায়ু ' ই বা মরে কেন , সব শেষে দেখতে হবে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে জটায়ু ‘ মরে ' ই বা কেন ?

বদন হাল ছাড়িয়া দিয়া চিন্তাসাগরে নিমজ্জমান

অচ্যুত । ( খগেন্দ্রকে ঠেলিয়া ) শুনছ খগেনবাবু ?

অপূর্ব । কী খগেনবাবু , মুখে যে কথাটি নেই ?

কার্তিক । খগেন্দ্র-সাহেব , তোমার কেমিস্ট্রি গেল কোথায় হে ?

খগেন্দ্র রক্তমুখচ্ছবি

শিরোমণি । তবে একে একে উত্তর দিই । প্রথম প্রশ্নের উত্তর , নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে ।

বদন । ( দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া ) আঃ , বাঁচলুম । এ ছাড়া আর কোনো উত্তর হতেই পারে না ।

শিরোমণি । যদি বল ‘ নিয়তিকে কে বাধা দিতে পারে ' এ কথার অর্থ কী , তবে সরল করে বুঝিয়ে দিই । নিয়তত্বই হচ্ছে নিয়তির গুণ এবং নিয়তের গুণই হচ্ছে নিয়তি । তা যদি হয় তবে নিয়তকালবর্তী যে নিয়তি তাকে পুনশ্চ নিয়ত নিয়ন্ত্রিত করতে পারে এমন দ্বিতীয় নিয়তির সম্ভাবনা কুতঃ ? কারণ কিনা , নিত্য যাহা তাহাই নিয়ত এবং তাহাই নিয়ন্তা , অতএব রাবণের সঙ্গেই যে জটায়ুর যুদ্ধ হবে এ আর বিচিত্র কী!

সকলে । এ আর বিচিত্র কী!

বদন । অহো , এ আর বিচিত্র কী!

শিরোমণি । এক্ষণে দ্বিতীয় প্রশ্ন-

বদন । কিন্তু আর নয় , প্রথমটা আগে ভালো করে জীর্ণ করি ।

অচ্যুত । কিন্তু কী চমৎকার উত্তর!

অপূর্ব । কী সরল মীমাংসা!

কার্তিক । কী পরিষ্কার ভাব!

উমেশ । কী গভীর শাস্ত্রজ্ঞান!

বদন । ( শিরোমণির মুখের দিকে অনেকক্ষণ চাহিয়া ) গুরুদেব , আপনার অবর্তমানে আমাদের কী দশা হবে!

সকলের বাষ্পবিসর্জন