গোপাল ভাঁড়
[কাহিনী রচনা করিতে ইতিহাস অপেক্ষা কল্পনার সাহায্য বেশী লওয়া হইয়াছে]
এ প্রোডাকসন্সের নিবেদন
গোপাল ভাঁড়
চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: অজিত দত্ত
সংলাপ: বিজন ভট্টাচার্য্য
|
সহকারীগণ: পরিচালনায়: ভবানী সরকার
রূপসজ্জায়: সুরেশ রায়, সন্তোষ নাথ |
[ইষ্টার্ণ টকিজ ষ্টুডিওতে আর-সি-এ শব্দযন্ত্রে গৃহীত ও হাউস্টন্ মেসিনে পরিস্ফুটিত ]
নাম-ভূমিকায়: হরিধন মুখোপাধ্যায় (এ্যাঃ)
অন্যান্য চরিত্রে:—অপর্ণা দেবী, শান্তা দেবী, কেতকী, মেনকা, অনুশীলা, লক্ষ্মী, শিশির মিত্র, তুলসী চক্রবর্ত্তী, সত্য চৌধুরী, প্রীতি মজুমদার, সমীর মজুমদার, কেনারাম, রবীন (এ্যাঃ), ভবাণী, কমল এবং আরো অনেকে।
একমাত্র-পরিবেশক: রিসেণ্ট ফিল্মস্, ৬, ম্যাডান ষ্ট্রীট, কলিকাতা—৩.
(কাহিনী)
এটা গোপাল ভাঁড়ের পরিচয় পত্র নয়। কারণ তার পরিচয় সে নিজেই বহন করছে।
গোপাল ভাঁড়-এর কাহিনী কতটা ঐতিহাসিক বা কতটা কাল্পনিক, আজ এ প্রশ্ন ওঠে না। রসরাজ, রসিক-চূড়ামণি, খোশ-গল্প, উপস্থিত-বুদ্ধি ও বাক্চাতুরীতে অদ্বিতীয়। ভাঁড়ের রাজা গোপাল ভাঁড় ছিলেন নদীয়াধিপতি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার উজ্জ্বলতম রত্ন বিশেষ। গোপাল ভাঁড়ের কাহিনী প্রথম লোকের মুখে মুখে ও পরে ছাপার অক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়ে দেশে ও দশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সেই বিক্ষিপ্ত কাহিনীর ছিন্ন-সূত্রগুলিই এই নাটকের উপাদান। রস-রসিক গোপাল ভাঁড়ের জীবন-নাটকের পরিণতি এই সব মাল-মশলা থেকে।
সে সময় বাঙলা দেশে চোর-ডাকাত ও বর্গীর হাঙ্গামা বড়ই প্রবল। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পাইক ভজহরি সদরে ফিরছিল খাজনা আদায় করে। এমন সময় ডাকাতে তাকে তাড়া করে। প্রাণভয়ে পালিয়ে ভজহরি এসে আশ্রয় নেয় গোপালের বাড়ীতে। উপস্থিত-বুদ্ধি ও বাকচাতুর্য্যে গোপাল ডাকাতদের হাত থেকে তার আশ্রিতকে রক্ষা করে। খাজনার টাকাগুলিও রক্ষা পায়। কৃষ্ণচন্দ্র সে বৃত্তান্ত শুনে গোপালের ওপর মহাখুশী। তাকে নিজ বয়স্য পদে নিয়োগ করে গুণীর সমাদর করেন।
গোপালের সংসারের অবস্থা ক্রমশঃ ভাল হতে থাকে। রাজ-অনুগ্রহে তার সম্মান ও আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভের পথ সুগম হয়। কিন্তু গোপাল-ঘরণী আন্নাকালী এতেও যেন সুখী নয়। সে আব্দার ধরে তার দোতালা বাড়ী চাই। চতুর-চূড়ামণি গোপালের কৌশলও ব্যর্থ হবার নয়। মহারাজকে সে-দাবী মেটাতে হয়।
এদিকে কৃষ্ণচন্দ্রের সভার আর দুজন সভাসদ, শাক্ত রামপ্রসাদ ও বৈষ্ণব আজু গোঁসাই—এদের মধ্যে একটা রেশারেশি ভাব চিরকাল বিদ্যমান। পরস্পর পরস্পরকে বাকযুদ্ধে পরাজিত করবার প্রচেষ্টা চলত সর্ব্বদা। খেলার ছলেই মহারাজ উভয়ের এই দ্বন্দ্ব উপভোগ করতেন। কিন্তু সভার আর সকলে সাধক রামপ্রসাদকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা তার অপরূপ গানের টিপ্পনী করার জন্য আজু গোঁসাই-এর প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ল। অবশ্য অন্তর থেকে দুজনেই দুজনকে শ্রদ্ধা করতো।
গান থেকে যে বিতর্কের সূত্রপাত, সেই তর্কযুদ্ধে শান্ত স্বভাব কবি রামপ্রসাদ হেরে গেলেন। তাঁর পরাজয়ের গ্লানি গোপালকে উত্তেজিত করে তুললো। নিরীহ মানুষটি অপদস্থ হওয়ায় তার চিত্ত বিক্ষুব্ধ হ’ল। গোপাল দাঁড়িয়ে উঠে পাল্টা গানে অতি তীব্র ভাবে গোঁসাইকে আক্রমণ করল। মহারাজ এই দৃশ্যটি উপভোগ করলেন। নিছক রঙ্গ-কৌতুকের মধ্যে এই ঘটনাটী ঘটে গেলেও গোপালের উদারতা ও রসিকতায় মহারাজ ও আর সবাই মুগ্ধ হলেন।
এমনি ভাবে আমোদ, আহ্লাদ ও রসকৌতুকের মধ্য দিয়ে গোপালের দিন গুলি বেশ সুখে কাটছিল। হঠাৎ একদিন গোপালের স্ত্রী আব্দার ধরে বসলো
মেয়ে-জামাইকে আনবার জন্যে। দিন নেই, রাত নেই,—সময় নেই, অসময় নেই আন্নাকালী গোপালকে উত্যক্ত করে তোলে। গোপাল বিপদ গোনে—উপায় খোঁজে। উপস্থিত বুদ্ধির দ্বারা সে আন্নাকালীকে এমনি জব্দ করলে যে আন্নাকালী আর পালাতে পথ পান না। এখানেও গোপালের জয় হয়।
ইতিমধ্যে একদিন খবর এলো নবাব সাহেব মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে এগারো লক্ষ টাকা রাজস্ব দাবী করে বসেছেন, অনাদায়ে তাকে বন্দী করা হবে তাও জানিয়েছেন। কিন্তু বর্গীর উৎপাতে প্রজারা তখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। রাজস্ব আদায়ের অভাবে রাজকোষ শূন্য। অতএব মহারাজ বন্দী হলেন। গোপাল কিন্তু ছাড়বার পাত্র নয়—সে মহারাজকে ছলে-বলে, নয় নিছক কৌশলে মুক্ত করবেই—তবেই তো তার নামের সার্থকতা।
গোপাল নবাব সাহেবের কাছে আর্জি পেশ করতে গিয়ে, কথায় কথায় রাজী হয়ে ফিরে এলো যে সে বর্গী দমন করবে। সেই সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতিও নিয়ে এলো যে এই বর্গী দমন করতে পারলেই মহারাজ সসম্মানে মুক্তি পাবেন এবং বকেয়া সমস্ত খাজনাও মকুব করে দেবেন।
খেয়ালের বশে গোপাল তো বুক ঠুকে বীরত্ব দেখিয়ে চলে এলো—কিন্তু এখন উপায়? নিরীহ, ভীতু গোপাল জীবনে যে কোনদিন অস্ত্র কাকে বলে তাই জানে না, কেমন করে সে এই দুর্দ্ধষ্য বর্গীদের সঙ্গে লড়াই করবে, আর তেমন অস্ত্র শস্ত্রই বা সে কোথায় পাবে? তাহলে উপায়?
কত নতুন নতুন ঘটনার সাহায্যে বুদ্ধির যুদ্ধে ও কৌশলে গোপাল ভাঁড় প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে নিজের অসাধারণত্ব প্রমাণ করেছে, আলোচ্য জীবনী-চিত্রে তারই পরিচয় পরিস্ফুট।
সঙ্গীতাংশ
(১)
মায়ের এমনি বিচার বটে
যে জন দিবানিশি দুর্গা বলে
তার কপালে বিপদ ঘটে।
হুজুরেতে আর্জ্জী দিয়ে মা
দাঁড়িয়ে আছি করপুটে
কবে আদালতে শুনানী হবে মা
নিস্তার পাব এ সঙ্কটে।
সওয়াল জবাব করব কি মা
বুদ্ধি আমার নেইকো ঘটে
ওমা ভরসা কেবল শিববাক্যে
ঐক্য বেদাগমে রটে।
প্রসাদ বলে শমন ভয়ে মা
ইচ্ছে হয় পালাই ছুটে
যেন অন্তিমকালে দুর্গা বলে
প্রাণ ত্যেজি জাহ্নবীর তটে।
—রামপ্রসাদী।
(২)
মধু যামিনী গো তুমি যেওনা চ’লে
প্রিয় নাহি এলে;
(হায়) চাঁদ যদি ডুবে যায়
যাবে গো আশা,
বিরহে কাঁদিবে বুকে ভালবাসা
প্রেমের গোপন বাণী হবে না বলা
নিশি প্রভাত হ’লে।
(হায়) দিবসে যে বিরহ বুকে জেগে রয়
রাতের ছোঁয়ায় সে যে হয় মধুময়,
আঁখি পাতে রচে প্রেম, কত না স্বপন,
বুকে আশা দোলে॥
—চারু মুখার্জ্জি।
(৩)
এ সংসার ধোকার টাটি
ওভাই আনন্দ বাজারে লুটি,
এ সংসার ধোঁকার টাটি।
রমনী বচনে সুধা
সুধা নয় সে বিষের বাটি,
আগে ইচ্ছে সুখে পান করে সে
বিষের জ্বালায় ছটফটি,
আনন্দে রামপ্রসাদ বলে—
আধ পুরুষের আধ মেয়েটী
তোমার যা ইচ্ছে হয় তাই কর মা
তুমি তো পাষাণের বেটী
—রামপ্রসাদী।
(৪)
এ সংসার রসের কুটি
(আমি) খাই দাই আর মজা লুটি
এ সংসার রসের কুটি।
রমনীরে বিষ ভেবেছ
তাতেও তো দেখিনা ত্রুটি,
তুমি ইচ্ছে সুখে ফেলে পাশা
(অমন) কাঁচিয়ে দেছ পাকা ঘুঁটি॥
—আজু গোঁসাই।
(৫)
রাই জাগো রাই জাগো বলে
ডাকে শুক সারী,
গোপাল গোবিন্দ জাগো
জাগো রে মুরারী॥
রাতের আঁধার নাশি
প্রভাত দাঁড়াল আসি,
মুছে ফেল ঘুম ঘোর
জাগো পুরনারী॥
—চারু মুখার্জ্জি।
(৬)
মনরে আমার এই মিনতি
তুমি পড়া পাখী হও করি স্তুতি,
মনরে আমার এই মিনতি।
যা পড়াই তাই পড় মন
প’ড়লে শুনলে দুধি ভাতি,
জান না কি ডাকের কথা
না পড়িলে ঠেঙ্গার গুতি।
তাই কালী কালী কালী বল মন
কালী পদে রাখ প্রীতি॥
—রামপ্রসাদী।
(৭)
হয়োনা মন পড়া পাখী
(ওরে) বন্দী হ’লে হয়না সুখী
হয়োনা মন পড়াপাখী।
পাখী হ’লে তত্ত্ব ভূলে
দিন যাবে পিঞ্জরে থাকি,
(তুমি) মুখে বলবে পরের বুলি
পরম তত্ত্বের জানিবে কি
না জানে পরমতত্ত্ব, কাঁঠালের আমসত্ত্ব,
মেয়ে হ’য়ে বেণু কি চরায় রে;
তা যদি হইত যশোদা যাইত
গোপালে কি পাঠায় রে।
—আজু গোসাই।
(৮)
বন্দি আমি প্রথমতঃ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রে
যাহার কৃপায় পুচ্ছ নাচায় গোঁসাই ঠাকুর রঙ্গে।
তারপরে বন্দনা করি প্রসাদ সেনের চরণে
একরতি যার কৃপা লাভে গোপাল কবি বাখানে।
তারপরে বন্দিলাম আমি কবি রায় গুনাকরে
(যাঁর) মধুর কথার মন্ত্রবলে বোবা কালা গান করে।
তারপরে বন্দনা করি ঐ ভক্ত বিটেল ব্রাহ্মণে
যার নত্ত্ব সত্ত্ব জ্ঞান নেই, তবু তত্ত্ব কথা কয় গানে।
বর্ণচোরা গোঁসাই তুমি, পরমতত্ত্বের কি জান
তত্ত্ব কথায় আমসত্ব ওলো বিষ্ণু মন্ত্রের জাত মার।
প্রসাদের গায়ে মদের গন্ধ তোমার অঙ্গে চন্দনের,
(অথচ) তোমার দুর্গন্ধে লোক স’রে গেলো পাইনে থই এ বৃত্তান্তের।
কৃষ্ণচন্দ্রের অশেষ দয়া তাই খাচ্ছ সুখে দুধকলা
ছত্রছায়া সরে গেলে খাবে শুধু কাঁচকলা॥—বিজন ভট্টাচার্য্য।
(৯)
(গিরি) এবার আমার উমা এলে
আর উমা পাঠাব না।
বলে ব’লবে লোকে মন্দ
কারও কথা শুনব না।
যদি এসে মৃত্যুঞ্জয়
উমা এবার কথা কয়
এবার মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া
জামাই বলে মানব না।
দ্বিজ রামপ্রসাদ কয়
এ দুঃখ কি প্রাণে সয়
শিব শ্মশানে মশানে ফেরে
ভবের ভাবনা ভাবে না।
—রামপ্রসাদী।
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।