গৌড়রাজমালা/হিন্দুস্থানে তুরূষ্ক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


 তুরূষ্কগণের গৌড়বিজয়-রহস্য বুঝিতে হইলে, তুরূষ্ক-চরিত্র এবং তাহাদিগের উত্তরাপথের অপরাপর অংশের বিজয়-বৃত্তান্ত সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। আরবগণ উত্তরাপথের সিংহদ্বারোদ্‌ঘাটনে সমর্থ হইয়াছিলেন না। যাঁহারা সেই দুরূহ কার্য্য সম্পাদন করিয়াছিলেন, তাঁহারা [সবুক্‌তিগিন, মামুদ, এবং তাঁহাদের অনুচরগণ] তুরূষ্ক-জাতীয়। মধ্য-এসিয়ার মরুময় মালভূমি তুরূষ্কগণের আদি-নিবাস; নিয়ত পালিত পশুপাল লইয়া, গোচারণক্ষেত্রের অনুসন্ধান করাই ইহাদিগের বৃত্তি ছিল। আদিবাস-ভূমির জলবায়ু এবং চির-অভ্যাস মধ্য-এসিয়ার অধিবাসিগণকে কঠোরক্ষম, চঞ্চল এবং অগ্রগমনশীল করিয়া তুলিয়াছিল। চিরচাঞ্চল্য এবং অগ্রগমনশীলতা মধ্য-এসিয়ার অধিবাসিগণের জাতীয় চরিত্রের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। এই জাতীয় চরিত্রের বলে বলীয়ান ইউচিগণ, আদি-নিবাসস্থান হইতে বহির্গত হইয়া, [খৃষ্ট-পূর্ব্ব প্রথম শতাব্দে] কুষাণসাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠত করিয়াছিলেন; হূণগণ খৃষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দে পূর্ব্ব-ইউরোপ এবং দক্ষিণ-এসিয়া ধ্বস্তবিধ্বস্ত করিয়াছিলেন; খৃষ্টীয় নবম হইতে পঞ্চদশ শতাব্দ পর্য্যন্ত তুরূষ্কগণ এবং [তাঁহাদের জ্ঞাতি] মোগলগণ, অবিরলধারে দলে দলে আসিয়া, ক্রমে আরব-সাম্রাজ্য, রোম-সাম্রাজ্য, চীন-সাম্রাজ্য এবং আরও অনেক প্রাচীন রাজ্য এবং প্রাচীন সভ্যতা বিনষ্ট করিয়াছিলেন। কি এসিয়ায়, কি ইউরোপে, সুসভ্য স্থির-নিবাস কৃষিজীবি জনগণ কখনও মরুভূমির কঠোরকর্ম্মী চঞ্চল সন্তানগণের আক্ৰমণবেগের গতিরোধ করিতে পারে নাই। খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দের সূচনা হইতে, যাহাদিগের আক্রমণ-প্ৰবাহ উত্তরাপথে প্রধাবিত হইয়া, ক্রমে হিন্দু-স্বাধীনতা বিলুপ্ত এবং হিন্দু-সভ্যতা ধ্বংস করিতে উদ্যত হইয়াছিল, তাহারা তুরূষ্ক-জাতীয়। মুসলমানধর্ম্মাবলম্বী হইলেও, জাতীয় চরিত্রের প্রেরণাই তাহাদিগকে ভারত-আক্রমণে ব্ৰতী করিয়াছিল; এবং আদি-নিবাসভূমির কঠোর শিক্ষা তাহাদিগকে শস্য-শ্যামলা ভারতমাতার আদরে লালিত পালিত সন্তানগণের পক্ষে দুর্জ্জেয় করিয়া তুলিয়াছিল। উত্তরাপথের একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দের রাজনীতিক অবস্থা—ঐক্যবিধানক্ষম সার্ব্বভৌম-নৃপতির অভাব, এবং অন্তর্দ্ৰোহ, আক্রমণকারিগণের পথের প্রকৃত বাধা অন্তর্হিত করিয়া রাখিয়াছিল।

 গজনীর সুলতান মামুদের মৃত্যুর অনতিকাল পরেই, সেল্‌জুকিয়া-তুরূষ্কগণ, মধ্য-এসিয়া হইতে বিনির্গত হইয়া, মামুদের সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশ কাড়িয়া লইয়া গজনী-রাজ্যের তুরূষ্কগণকে হীনবল এবং তুরূষ্ক-প্রবাহের প্রস্রবণ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। কিন্তু তথাপি তাহারা পঞ্জাবের পূর্ব্বদিকে অগ্রসর হইবার চেষ্টা কখনও পরিত্যাগ করেন নাই। সুলতান মসুদের সময়, আহম্মদ নিয়াল্‌তিগীন্ কর্ত্তৃক বারাণসী-আক্রমণ পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। মসুদের উত্তরাধিকারী সুলতান ইব্রাহিম (১০৪৮-১০৯৯ খৃষ্টাব্দ) সেল্‌জুক-সম্রাট্ মালিক শাহের তনয়ার সহিত স্বীয় তনয়ের বিবাহ দিয়া, রাজ্যের পশ্চিম প্রান্ত সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইয়া, পুনঃ পুনঃ হিন্দুস্থান আক্রমণ করিয়া, অনেকগুলি স্থান এবং দুর্গ হস্তগত করিয়াছিলেন।[১] আলাউদ্দিন মসুদের সময় (১০৯৯–১১১৬ খৃষ্টাব্দ), “তুঘাতিগিন্ হিন্দুস্থানে [বিধর্ম্মিগণের সহিত] ধর্ম্ম-যুদ্ধে প্ৰবৃত্ত হইবার জন্য, গঙ্গা পার হইয়াছিলেন; এবং এমন একস্থান পর্য্যন্ত গিয়াছিলেন, যেখানে সুলতান মামুদ ভিন্ন, আর কেহ কখনও সসৈন্য উপনীত হইতে পারেন নাই।”[২] সুলতান বহরাম শাহ (১১১৮-১১৫৮ খৃষ্টাব্দ), সেল্‌জুক-সুলতান সঞ্জরের প্রসাদে গজনীর সিংহাসন লাভ করিয়াছিলেন, এবং তাঁহার সময়ে ঘোরের অধিপতি আলাউদ্দীন একবার গজনীনগর ভস্মসাৎ করিয়াছিলেন। তিনিও হিন্দুস্থানে ধর্ম্ম-যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন বলিয়া উল্লিখিত আছে।[৩]

 সুলতান মামুদের মৃত্যুর পরে, একাদশ শতাব্দে, পঞ্জাব এবং গৌড় রাজ্যের মধ্যবর্ত্তী ভূভাগের শাসন-ভার যাঁহাদিগের হস্তে ন্যস্ত ছিল, তাঁহাদিগের গজনী-রাজ্যবাসী তুরূষ্কগণের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিবার শক্তি ছিল কিনা সন্দেহ। কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দে এক দিকে গজনীরাজ্য যেমন নিতান্ত শোচনীয় অবস্থায় পতিত হইয়াছিল, অপর দিকে শাকম্ভরীর (আজমীরের) চৌহান-রাজগণ এবং কান্যকুব্জের গাহড়বাল-রাজগণ তেমনি পরাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। এই সময় যদি চৌহান এবং গাহড়বাল মিলিত হইতে পারিতেন, তবে বোধ হয় অনায়াসে উত্তরাপথের সিংহদ্বার শত্রুশূন্য করিতে পারিতেন। কিন্তু, একশত বৎসরের মধ্যে কখনও ইঁহারা সম্মিলিত হইয়া শক্রর সম্মুখীন হইবার অবসর পাইয়াছিলেন না; অবশেষে মুইজুদ্দীন মহম্মদ ঘোরী আসিয়া, একে একে উভয় রাজ্য ধ্বংস করিয়াছিলেন। দুর্ব্বল গজনবী-তুরূষ্কগণও গাহড়বাল এবং চৌহান-রাজগণকে বিশ্রাম দিয়াছিলেন না। বহরাম শাহ সম্ভবত বারাণসী পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন। কুমরদেবীর সারনাথের শিলালিপিতে উক্ত হইয়াছে—গাহড়বাল-রাজ গোবিন্দচন্দ্র (+১১১৪—১১৫৪+ খৃষ্টাব্দ) মহাদেব কর্ত্তৃক “দুষ্ট তুরূষ্ক-সৈন্যের হস্ত হইতে বারাণসী রক্ষা করিবার জন্য” [বারাণসীং……… দুষ্ট-তুরূষ্ক-সুভটাদবিতুং] নিযুক্ত হইয়াছিলেন।[৪] তুরূষ্ক-সৈন্যের হস্ত হইতে গোবিন্দচন্দ্র যে বারণসীর উদ্ধার-সাধন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। কিন্তু বারাণসী রক্ষণ করিয়াই, তাঁহার তৃপ্ত হওয়া উচিত ছিল কি?

 চৌহান-রাজ বীসলদেব, এবং গোবিন্দচন্দ্রের পুত্র গাহড়বাল-রাজ বিজয়চন্দ্রকেও, গজনবী-তুরূষ্কগণের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে হইয়াছিল। ১২২০ সম্বতের [১১৬৪ খৃষ্টাব্দের] দিল্লী-শিবালিক স্তম্ভ-লিপিতে উক্ত হইয়াছে—চৌহান-রাজ বীসলদেব

आर्य्यावर्त्तं यथार्थं पुनरपि कृतवान् म्लेच्छ-चिच्छेदनाभिः।”[৫]

“ম্লেচ্ছ নাশ করিয়া, আর্য্যাবর্ত্তের নাম পুনরায় যথার্থ করিয়াছিলেন।” প্রশস্তিকার হয়ত এখানে চৌহানরাজ্য-অর্থে “আর্য্যাবর্ত্ত” শব্দের ব্যবহার করিয়াছেন। কারণ, বীসলদেব বা অন্য কোন হিন্দু-নরপতি কখনও পঞ্জাব আক্রমণ করিয়াছিলেন, গজনবী সুলতানগণের ইতিহাসে এরূপ আভাস পাওয়া যায় না। ১২২৪ সম্বতের [১১৬৮ খৃষ্টাব্দের] গাহড়বাল-রাজ বিজয়চন্দ্রের [কমৌলীতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে তিনি

भुवन-दलन-हेलाहर्म्य हम्मीर-नारी-
नयनजलद-धारा-धौत-भूलोक-तापः”[৬]

“হেলায় ভুবনদলক্ষম হম্মীরের নারীগণের নয়ন-জলধারা দ্বারা ভূলোকের তাপ-ধৌতকারী” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। “হম্মীর” এ স্থলে আমীর বা গজনবী-সুলতান অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। চৌহান বীসলদেব এবং গাহড়বাল বিজয়চন্দ্রের সময়ের গজনবী-সুলতান খুসরু শাহ, গজনী হইতে তাড়িত হইয়া আসিয়া, লাহোরে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু এরূপ দুরবস্থায় পতিত হইয়াও, তিনি তুরূষ্কের স্বভাবগত অগ্রগমনশীলতা ত্যাগ করিতে পারিয়াছিলেন না; সম্ভবত চৌহান এবং গাহড়বাল, এই উভয় রাজ্যই, একবার একবার আক্রমণ করিয়াছিলেন। তুরূষ্ক-যোদ্ধৃগণ এযাবৎ গাহড়বাল-রাজ্য জয় করিতে অসমর্থ হইলেও, তুরূষ্ক-ঔপনিবেশিকগণ রাজ্যের নানা স্থানে প্রবেশলাভ করিয়াছিল। গাহড়বাল-রাজ চন্দ্রদেবের, মদনচন্দ্রের, গোবিন্দচন্দ্রের এবং বিজয়চন্দ্রের অনেক তাম্রশাসনে “তুরূষ্ক-দণ্ড” নামক রাজকরের উল্লেখ দৃষ্ট হয়। “তুরূষ্ক-দণ্ড” নাম হইতে বুঝিতে পারা যায়,—তুরূষ্ক-প্রজাগণকে এই বিশেষ কর প্রদান করিতে হইত।

 ১১৬৮ কি ১১৬৯ খৃষ্টাব্দে, শেষ গজনবী-সুলতান খুসরু-মালিক, লাহোরের সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন; ১১৭০ খৃষ্টাব্দে গাহড়বাল জয়চ্চন্দ্ৰ কান্যকুব্জের সিংহাসনে আরোহণ করিয়াছিলেন; ১১৭০ হইতে ১১৮২ খৃষ্টাব্দের মধ্যে কোন সময়ে, চৌহান দ্বিতীয় পৃথ্বিরাজ আজমীরের সিংহাসনে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন; এবং ১১৭৩ খৃষ্টাব্দে সুলতান ঘিয়াসুদ্দীন ঘোরী গজনীনগর অধিকার করিয়া, অনুজ মুইজুদ্দীন মহম্মদ ঘোরীকে সুলতান মামুদের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। মহম্মদ-ঘোরী পরাজয়েও পরাঙ্মুখ না হইয়া, কেমন করিয়া একে একে এই সকল প্রতিদ্বন্দীকে বিনাশ করিয়া হিন্দুস্থানে আধিপতা স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহার বর্ণন এখানে নিষ্প্রয়োজন। লাহোরের সুলতান, দিল্লী ও আজমীরের চৌহানরাজ এবং কনোজের গাহড়বালরাজ [সমবেত ভাবে না হউক] স্বতন্ত্র ভাবে আক্রমণকারীর গতিরোধার্থ যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছিলেন। ইঁহাদিগের দমনার্থ মহম্মদ ঘোরীকে পুনঃ পুনঃ গজনী ত্যাগ করিয়া হিন্দুস্থানে আসিতে হইয়াছিল। কিন্তু শশাঙ্ক, ধর্ম্মপাল, দেবপাল এবং মহীপালের গৌড়রাষ্ট্র [একরূপ নির্ব্বিবাদে] মহম্মদঘোরীর একজন দাসানুদাসকে রাজপদে বরণ করিয়াছিল।

  1. Raverty’s “Tabakat-i-Nasiri”, p. 105, note 4.
  2. Ibid., p. 107.
  3. Ibid, p. 110.
  4. Epigraphia Indica, Vol. IX, p. 324.
  5. Indian Antiquary, Vol. XIX, p. 215. মনুসংহিতার (২৷২২ শ্লোকের) ভাষ্যে মেধাতিথি আর্য্যাবর্ত্তের এই রূপ অর্থ লিখিয়াছেন—“आर्य्या वर्त्तन्ते यत्र पुनः पुनरूद्भवम्त्राकस्याकस्यापि न चिरं यत्र म्लेच्छाः स्यातारी भवन्ति।” প্রশস্তিকার এইরূপ অর্থেই এখানে আর্য্যাবর্ত্ত-শব্দের ব্যবহার করিয়াছেন।
  6. Epigraphia Indica, Vol. IV, p. 119.