চিন্তাশীল

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

প্রথম দৃশ্য

চিন্তাশীল নরহরি চিন্তায় নিমগ্ন। ভাত শুকাইতেছে। মা মাছি তাড়াইতেছেন

মা । অত ভেবো না , মাথার ব্যামো হবে বাছা!

নরহরি । আচ্ছা মা , ‘ বাছা ' শব্দের ধাতু কী বলো দেখি ।

মা । কী জানি বাপু!

নরহরি । ‘ বৎ স ' । আজ তুমি বলছ ‘ বাছা ' — দু-হাজার বৎ সর আগে বলত ‘ বৎ স ' — এই কথাটা একবার ভালো করে ভেবে দেখো দেখি মা! কথাটা বড়ো সামান্য নয় । এ কথা যতই ভাববে ততই ভাবনার শেষ হবে না ।

পুনরায় চিন্তায় মগ্ন

মা । যে ভাবনা শেষ হয় না এমন ভাবনার দরকার কী বাপ! ভাবনা তো তোর চিরকাল থাকবে , ভাত যে শুকোয় । লক্ষী আমার , একবার ওঠ্‌ ।

নরহরি । ( চমকিয়া) কী বললে মা ? লক্ষ্মী ? কী আশ্চর্য! এক কালে লক্ষ্মী বলতে দেবী-বিশেষকে বোঝাত । পরে লক্ষ্মীর গুণ অনুসারে সুশীলা স্ত্রীলোককে লক্ষ্মী বলত , কালক্রমে দেখো পুরুষের প্রতিও লক্ষ্মী শব্দের প্রয়োগ হচ্ছে! একবার ভেবে দেখো মা , আস্তে আস্তে ভাষার কেমন পরিবর্তন হয়! ভাবলে আশ্চর্য হতে হবে ।

ভাবনায় দ্বিতীয় ডুব

মা । আমার আর কি কোনো ভাবনা নেই নরু ? আচ্ছা , তুই তো এত ভাবিস , তুইই বল্‌ দেখি উপস্থিত কাজ উপস্থিত ভাবনা ছেড়ে কি এই-সব বাজে ভাবনা নিয়ে থাকা ভালো ? সকল ভাবনারই তো সময় আছে ।

নরহরি । এ কথাটা বড়ো গুরুতর মা! আমি হঠাৎ এর উত্তর দিতে পারব না । এটা কিছুদিন ভাবতে হবে , ভেবে পরে বলব।

মা । আমি যে কথাই বলি তোর ভাবনা তাতে কেবল বেড়েই ওঠে , কিছুতেই আর কমে না । কাজ নেই বাপু , আমি আর-কাউকে পাঠিয়ে দিই ।

[ প্রস্থান

মাসিমা

মাসিমা । ছি নরু , তুই কি পাগল হলি ? ছেঁড়া চাদর , একমুখ দাড়ি — সমুখে ভাত নিয়ে ভাবনা! সুবলের মা তোকে দেখে হেসেই কুরুক্ষেত্র!

নরহরি । কুরুক্ষেত্র! আমাদের আর্যগৌরবের শ্মাশানক্ষেত্র! মনে পড়লে কি শরীর লোমাঞ্চিত হয় না! অন্তঃকরণ অধীর হয়ে ওঠে না! আহা , কত কথা মনে পড়ে! কত ভাবনাই জেগে ওঠে! বলো কী মাসি! হেসেই কুরুক্ষেত্র! তার চেয়ে বলো-না কেন কেঁদেই কুরুক্ষেত্র!

অশ্রুনিপাত

মাসিমা । ওমা , এ যে কাঁদতে বসল! আমাদের কথা শুনলেই এর শোক উপস্থিত হয় । কাজ নেই বাপু!

[ প্রস্থান

দিদিমা

দিদিমা । ও নরু , সূর্য যে অস্ত যায়!

নরহরি । ছি দিদিমা , সূর্য অস্ত যায় না । পৃথিবীই উলটে যায় । রোসো , আমি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি । ( চারি দিকে চাহিয়া) একটা গোল জিনিস কোথাও নেই ?

দিদিমা । এই তোমার মাথা আছে — মুণ্ডু আছে ।

নরহরি । কিন্তু মাথা যে বদ্ধ , মাথা যে ঘোরে না ।

দিদিমা । তোমারই ঘোরে না , তোমার রকম দেখে পাড়াসুদ্ধ লোকের মাথা ঘুরছে! নাও , আর তোমায় বোঝাতে হবে না , এ দিকে ভাত জুড়িয়ে গেল , মাছি ভন্‌ ভন্‌ করছে ।

নরহরি । ছি দিদিমা , এটা যে তুমি উলটো কথা বললে! মাছি তো ভন্‌ ভন্‌ করে না । মাছির ডানা থেকেই এইরকম শব্দ হয় । রোসো , আমি তোমাকে প্রমাণ করে দিচ্ছি —

দিদিমা । কাজ নেই তোমার প্রমাণ করে ।

[ প্রস্থান

দ্বিতীয় দৃশ্য

নরহরি চিন্তামগ্ন। ভাবনা ভাঙাইবার উদ্দেশে নরহরির

শিশু ভাগিনেয়কে কোলে করিয়া মাতার প্রবেশ

মা । ( শিশুর প্রতি) জাদু , তোমার মামাকে দণ্ডবৎ করো ।

নরহরি । ছি মা , ওকে ভুল শিখিয়ো না । একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে , ব্যাকরণ-অনুসারে দণ্ডবৎ করা হতেই পারে না — দণ্ডবৎ হওয়া বলে । কেন বুঝতে পেরেছ মা ? কেননা দণ্ডবৎ মানে-

মা । না বাবা , আমাকে পরে বুঝিয়ে দিলেই হবে । তোমার ভাগ্‌নেকে এখন একটু আদর করো ।

নরহরি । আদর করব ? আচ্ছা , এসো আদর করি । ( শিশুকে কোলে লইয়া) কী করে আদর আরম্ভ করি ? রোসো , একটু ভাবি ।

চিন্তামগ্ন

মা । আদর করবি , তাতেও ভাবতে হবে নরু ?

নরহরি । ভাবতে হবে না মা ? বল কী! ছেলেবেলাকার আদরের উপরে ছেলের সমস্ত ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তা কি জান ? ছেলেবেলাকার এক-একটা সামান্য ঘটনার ছায়া বৃহৎ আকার ধরে আমাদের সমস্ত যৌবনকালকে , আমাদের সমস্ত জীবনকে আচ্ছন্ন করে রাখে এটা যখন ভেবে দেখা যায় — তখন কি ছেলেকে আদর করা একটা সামান্য কাজ বলে মনে করা যায় ? এইটে একবার ভেবে দেখো দেখি মা!

মা । থাক্‌ বাবা , সে কথা আর-একটু পরে ভাবব , এখন তোমার ভাগ্‌নেটির সঙ্গে দুটো কথা কও দেখি ।

নরহরি । ওদের সঙ্গে এমন কথা কওয়া উচিত যাতে ওদের আমোদ এবং শিক্ষা দুই হয় । আচ্ছা , হরিদাস , তোমার নামের সমাস কী বলো দেখি ।

হরিদাস । আমি চমা কাব ।

মা । দেখো দেখি বাছা , ওকে এ-সব কথা জিগেস কর কেন ? ও কী জানে!

নরহরি । না , ওকে এই বেলা থেকে এইরকম করে অল্পে অল্পে মুখস্থ করিয়ে দেব ।

মা । ( ছেলে তুলিয়া লইয়া) না বাবা , কাজ নেই তোমার আদর করে ।

নরহরি মাথায় হাত দিয়া পুনশ্চ চিন্তায় মগ্ন

(কাতর হইয়া ) বাবা , আমায় কাশী পাঠিয়ে দে , আমি কাশীবাসী হব ।

নরহরি । তা যাও-না মা! তোমার ইচ্ছে হয়েছে , আমি বাধা দেব না ।

মা । ( স্বগত) নরু আমার সকল কথাতেই ভেবে অস্থির হয়ে পড়ে , এটাতে বড়ো বেশি ভাবতে হল না । ( প্রকাশ্যে) তা হলে তো আমাকে মাসে মাসে কিছু টাকার বন্দোবস্ত করে দিতে হবে ।

নরহরি । সত্যি নাকি ? তা হলে আমাকে আর কিছুদিন ধরে ভাবতে হবে । একথা নিতান্ত সহজ নয় । আমি এক হপ্তা ভেবে পরে বলব ।

মা । ( ব্যস্ত হইয়া) না বাবা , তোমার আর ভাবতে হবে না — আমার কাশী গিয়ে কাজ নেই ।