বিষয়বস্তুতে চলুন

চিরকুমার সভা (প্রচার পুস্তিকা, ১৯৩২)

উইকিসংকলন থেকে

অজ্ঞাত লেখক
চিরকুমার সভা


চিরকুমার সভা

১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৯ সাল

এক আনা



শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চিরকুমার সভা

(গল্পাংশ)

 চিরকুমার সভার উদ্দেশ্য কি তা তার নামেই কতকটা প্রকাশ। সভ্যরা বিবাহ করবেন না—দেশের কাজে, দশের সেবায় জীবন উৎসর্গ করবেন এই তাঁদের জীবনের লক্ষ্য।

 সভার নাম যতই লম্বা-চওড়া হোক না কেন—সভ্য সংখ্যা মাত্র তিনটি—পূর্ণ, শ্রীশ, বিপিন। সভার সভাপতি হচ্ছেন—চন্দ্র বাবু—তিনি কলেজের অধ্যাপক। দিবারাত্রি দেশোদ্ধারের বড়-বড় কল্পনা তাঁর মাথায় খেলছে। সংসারের সাধারণ খুটি নাটি তাঁর মগজে প্রবেশ করে না। ঘরে একমাত্র কুমারী ভাগ্নী নির্ম্মলা ছাড়া আর কেউ নেই। সেই চন্দ্রবাবুকে দেখে শোনে।

 এদিকে অতনুর দৃষ্টি পড়্‌ল সভাটার দিকে। তিনি তাঁর অমোঘ শর নিক্ষেপ করলেন পূর্ণকে। পূর্ণ লুকিয়ে-লুকিয়ে নির্ম্মলাকে দেখে কিন্তু তার মনের কথা মনেই চেপে রাখে, সঙ্কোচে কারুর কাছেই কিছু প্রকাশ করতে পারে না—বেচারী বড় লাজুক কিনা, তাই—

  অক্ষয় ছিলেন আগে চিরকুমার সভার সভাপতি। কিন্তু তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ কোরে বিয়ে করেছেন। অক্ষয়ের তিন শ্যালী। শৈলবালা হচ্ছেন বিধবা, নৃপবালা ও নীরবালা অবিবাহিতা। অক্ষয় শিমলে পাহাড়ে বড় চাকরী করেন। আফিস শীতের সময় কলকাতায় এসেছে বলে অন্যত্র না থেকে ধনী শ্বশুরালয়ে বাস করছেন। অক্ষয়ের শ্বশুর গত, তাই তাঁর শ্বাশুড়ী উপযুক্ত জামাইকে তাঁদের অভিভাবক বলে মনে করেন। অক্ষয়ের শ্বশুরের এক খুড়ো রসিকচন্দ্রও সেখানে থাকেন। রসিকচন্দ্র বৃদ্ধ হোলেও অবিবাহিত।

 শৈল, রসিক ও অক্ষয় পরামর্শ কোরে চিরকুমার সভাটীকে তাঁদের বাইরের ঘরে টেনে নিয়ে এল। শৈল পুরুষবেশে চিরকুমার সভার সভ্যও হোলো। তারপরে কি ঘটনাচক্রের ভেতর দিয়ে শ্রীশ, বিপিন ও পূর্ণর কি হোলো ছবি দেখলেই বুঝতে পারবেন।


জীবনী

 তিনকড়ি চক্রবত্তী—ইনি এই ছবিতে অক্ষয়ের ভুমিকায় অবতীর্ণ। বাংলা দেশে ছবি তোলার প্রায় প্রথম যুগ থেকেই ইনি কোনো না কোনো কোম্পানীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছেন। তিনকড়িবাবু করুণ এবং হাস্যরস এই দুই ভূমিকাতেই অদ্বিতীয়। বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের ইনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা।

 চিরকুমার সভা ছবি যখন তোলা হচ্ছিল তখন এঁর অতি বৃদ্ধ পিতা মরণাপন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। পিতা নিরাময় হোতে না হোতে তাঁর দুই পুত্র রোগে আক্রান্ত হন এবং একমাসের মধ্যেই তাঁরা মারা যান। উপযুক্ত পুত্রদ্বয়ের মৃত্যুশোক হৃদয়ে বহন কোরে যে ধৈর্যের সঙ্গে তিনি হাসির অভিনয় করেছিলেন তা যে কোনো দেশের আর্টিষ্টের শিক্ষনীয়।


 অমর মল্লিক—ইনি চিত্র জগতে অতি অল্প দিন প্রবেশ করলেও প্রথম প্রচেষ্টাতেই দর্শকদের কাছে নিজের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করেছেন। নির্ব্বাক এবং সবাক দু-রকম ছবিতেই ইনি বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছেন। নানা রকম চরিত্র অভিনয় করবার এঁর বিশেষ দক্ষতা আছে। অমর বাবু ইউরোপের অনেক স্থানের রঙ্গভূমি এবং সেখানকার বড় বড় নামজাদা অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের অভিনয় দেখে এসেছেন। ইনি এই ছবিতে চন্দ্রবাবুর ভূমিকা অভিনয় করেছেন।


 মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য—মনোরঞ্জন বাবু বাংলা দেশের রঙ্গমঞ্চের একজন উঁচুদরের অভিনেতা। নিউ থিয়েটার্সের অন্যতম নিবেদন শরৎচন্দ্রের ‘দেনাপাওনা’ ছবিতে ইনি শিরোমণির ভূমিকা অভিনয় করেছেন। মনোরঞ্জন বাবু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভাল ছাত্র ছিলেন কিন্তু নানা কারণে এঁকে লেখাপড়া পরিত্যাগ করতে হয়। ইনি বহুদিন শিশিরকুমার ভাদুড়ী পরিচালিত থিয়েটারে অভিনয় করেছেন এবং সেই সম্প্রদায়ের সঙ্গে মার্কিন দেশেও অভিনয় করতে গিয়েছিলেন। এই ছবিতে ইনি রসিক দাদার ভূমিকায় অবতীর্ণ।


 দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়—দুর্গাদাস বাবু একজন চিত্রকর। আট স্কুল থেকে বেরিয়ে তিনি আর্ট থিয়েটারে চিত্রকর রূপেই প্রবেশ করেছিলেন। পরে নিজের অভিনয় গুণে কর্ত্তৃপক্ষকে চমৎকৃত কোরে সেখানকার একজন প্রধান অভিনেতা হন। চিত্রজগতেও এর খ্যাতি অল্প নয়। বাংলা দেশে ইনিই সর্ব্বপ্রধান জনপ্রিয় চিত্রাভিনেতা। ইনি সুদর্শন
তিনকড়ি চক্রবর্ত্তী
এবং এঁর কণ্ঠস্বর সবাক চিত্রের আদর্শ স্বরূপ। এই ছবিতে ইনি পূর্ণর ভূমিকা অভিনয় করেছেন।



মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য্য

 ইন্দুভূষণ মুখোপাধ্যায়—রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে ইন্দু বাবুর বাল্যাবস্থাতেই পরিচয় হয়। আর্ট থিয়েটার স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই ইনি সাধারণ রঙ্গমঞ্চে যোগদান করেন এবং সুখ্যাতির সঙ্গে অভিনয় করেন। ইন্দুবাবু প্রিয়দর্শন অভিনেতা। চিত্রজগতে এই তাঁর প্রথম প্রবেশ। এই ছবিতে ইনি শ্রীশের ভূমিকায় অবতীর্ণ।


 ফণি বর্ম্মণ—চিত্রজগতে ফণিবাবুর নাম অপরিচিত নয়। ইনি অনেকগুলি নির্ব্বাক চিত্রে নানা ভূমিকায় কৃতিত্বের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। সবাক চিত্রে এই তাঁর প্রথম অভিনয়। এই ছবিতে ইনি বিপিনের ভূমিকা অভিনয় করেছেন।


অমর মল্লিক

নিভাননী

 নিভাননী—শৈশবেই রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে এঁর পরিচয় হয়। সাধারণ রঙ্গমঞ্চে ইনি নানা ভূমিকা অভিনয় কোরে যশস্বিনী হয়েছেন। নিউ থিয়েটার্সের প্রথম নিবেদন শরৎচন্দ্রের
দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তিনকড়ি চক্রবর্ত্তী
‘দেনা পাওনা’য় ইনি নায়িকা ষোড়শীর ভূমিকা অভিনয় কোরে খ্যাতি লাভ করেছেন। এই ছবিতে ইনি শৈলবালার ভূমিকা অভিনয় করেছেন।


 অনুপমা—ইনি এই ছবিতে নৃপবালার ভূমিকায় অবতীর্ণা। ম্যাডান কোম্পানী কৃত ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবিতে ইনি সাগর-বৌয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণা হয়েছিলেন।


 সুনীতি—চিত্রজগতে এই এঁর প্রথম আগমন। ইনি সুগায়িকা। এই ছবিতে সুনীতি নীরবালার ভূমিকা অভিনয় করেছেন।



অনুপমা

সুনীতি

 চানী দত্ত—রঙ্গজগতে ইনি হাস্যরসের অভিনেতারূপে বিখ্যাত। চিত্রজগতেও ইনি নবাগত নন। “চাষার মেয়ে”, “অভিষেক” প্রভৃতি চিত্রে ইনি বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। এই ছবিতে ইনি মৃত্যুঞ্জয় গাঙ্গুলীর ভূমিকা অভিনয় করেছেন।


 ধীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়—রঙ্গজগতে ইনিও একজন পরিচিত অভিনেতা। চিত্র ক্ষেত্রে এই এঁর প্রথম অবতরণ। এই ছবিতে ইনি দারুকেশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ।


 হিঙ্গনবালা—ইনি রঙ্গ জগতের একজন পুরাতন অভিনেত্রী। এই ছবিতে ইনি অক্ষয়ের শ্বাশুড়ীর ভূমিকায় অবতীর্ণা।


গান

(১)

না বলে যায় পাছে সে।
আঁখি মাের ঘুম না জানে।
কাছে তার রই তবুও
কথা যে রয় পরাণে।
যে-পথিক পথের তুলে
এলাে মাের প্রাণের কূলে।
পাছে তার ভুল ভেঙে যায়।
চ’লে যায় কোন্ উজানে
আঁখি তাই ঘুম না জানে।
এলাে যেই এলো আমার আগল টুটে
খােলা দ্বার দিয়ে আবার যাবে ছুটে
খেয়ালের হাওয়া লেগে যে ক্ষেপা ওঠে জেগে
সেকি আর সেই অবেলায় মিনতির বাধা মানে?
আঁখি মাের ঘুম না জানে।


(২)

না না গাে না
কোরাে না ভাবনা
যদি বা নিশি যায় যাবে না যাবে না।
যখনি চলে যাই
আসিব ব’লে যাই
আলাে-ছায়ার পথে করি আনাগােনা।
ক্ষণিক আড়ালে
বারেক দাঁড়ালে
মরি ভয়ে ভয়ে পাবো কি পাবো না।


(৩)

জয় যাত্রায় যাও গো,
ওঠো ওঠো জয়রথে তব।
মোরা জয়মালা গেঁথে
আশা চেয়ে বসে রবো।
আঁচল বিছায়ে রাখি’
পথ-ধূলা দিবো ঢাকি
ফিরে এলে হে বিজয়ী হৃদয়ে বরিয়া লবো।
আনিও হাসির রেখা সজল আঁখির কোণে—
নব বসন্ত শোভা এনো এ শূন্য বনে।
সোনার প্রদীপ আলো, আঁধার ঘরের
আলো
পরাও রাতের ভালে চাঁদের তিলক নব।


(৪)

ওগো তোরা কে যাবি পারে?
আমি তরী নিয়ে ব’সে আছি নদী-কিনারে।
ওপারেতে উপবনে কত খেলা কত জনে
এপারেতে ধূ ধূ মরু বারি বিনা রে।
এই বেলা বেলা আছে আয় কে যাবি?
মিছে কেন কাটে কাল কত কি ভাবি!
সূর্য্য পাটে যাবে নেমে সুবাতাস যাবে থেমে
খেয়া বন্ধ হ’য়ে যাবে সন্ধ্যা-আঁধারে।


(৫)

যেতে দাও গেলো যারা
তুমি যেও না যেও না
আমার বাদলের গান হয়নি সারা।
কুটীরে কুটীরে বন্ধ দ্বার
নিভৃত রজনী অন্ধকার,
বনের অঞ্চল কাঁপে চঞ্চল
অধীর সমীর তন্দ্রাহারা।


(৬)

চলেছে ছুটিয়া পলাতকা হিয়া
বেগে বহে শিরা ধমণী,
হায় হায় হায় ধরিবারে তায়
পিছে পিছে ধায় রমণী!
বায়ু-বেগভরে উড়ে অঞ্চল
লটপট বেণী ছলে চঞ্চল,
এ কী রে রঙ্গ, আকুল অঙ্গ
ছুটে কুরঙ্গ-গমনী।


(৭)

ও আমার ধ্যানেরি ধন
তোমায় হৃদয়ে দোলায় যে হাসি রোদন।
আসে সবন্ত ফোটে বকুল,
কুঞ্জে পূর্ণিমা চাঁদ হেসে আকুল,
তারা তোমার খুজে না পায়
প্রাণের মাঝে আছ গোপন স্বপন।
আঁখিরে ফাঁকি দাও এ কী ধারা
অশ্রুজলে তারে করো সারা
গন্ধ আসে কেন দেখিনে মালা
পায়ের ধ্বনি শুনি, পথ নিরালা
বেলা যে যায়, পথ যে শুকায়
অনাথ হ’য়ে আছে আমার ভুবন।


(৮)

জ্বলেনি আলো অন্ধকারে
দাওনা সাড়া কি তাই বারে বারে?
তোমার বাঁশি আমার বাজে বুকে
কঠিন দুঃখে, গভীর সুখে,
যে জানেনা পথ, কাঁদাও তারে!
চেয়ে রই রাতের আকাশ পানে,
মন যে কী চায় তা মনই জানে।
আশা জাগে কেন অকারণে
আমার মনে ক্ষণে ক্ষণে
ব্যথার টানে তোমায় আন্‌ব দ্বারে।


PRINTED BY
KAMALA KANTA DALAL AT THE KANTIK PRESS
44, KAILAS BOSE ST., CALCUTTA

এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।