বিষয়বস্তুতে চলুন

চীন দেশীয় বুলবুল পক্ষীর বিবরণ (১৮৬৩)

উইকিসংকলন থেকে

চীন দেশীয় বুলবুল পক্ষীর বিবরণ অন্য সংস্করণ দেখুন

BENGALI FAMILY LIBRARY.

গার্হস্থ্য বাঙ্গলা পুস্তক সঙ্গ‍্রহ।


চীন দেশীয়

বুলবুল পক্ষীর বিবরণ।

শ্রীযুক্ত মধুসূদন মুখোপাধ্যায়

কর্ত্তৃক

ইংরাজী ভাষাহইতে

অনুবাদিত।

CALCUTTA.

PRINTED AT THE CALCUTTA SCHOOL_BOOK AND VERNACULAR LITERATURE SOCIETY’S PRESS, AND SOLD AT THEIR DEPOSITORY. 12, LALL BAZAR

1863.

BENGALI FAMILY LIBRARY.

গার্হস্থ্য বাঙ্গলা পুস্তক সঙ্গ‍্রহ।


চীন দেশীয়

বুলবুল পক্ষীর বিবরণ।

শ্রীযুক্ত মধুসূদন মুখোপাধ্যায়

কর্ত্তৃক

ইংরাজী ভাষাহইতে

অনুবাদিত।

CALCUTTA.

PRINTED AT THE CALCUTTA SCHOOL_BOOK AND VERNACULAR LITERATURE SOCIETY’S PRESS, AND SOLD AT THEIR DEPOSITORY. 12, LALL BAZAR

1863.

চীন দেশীয়

বুলবুল পক্ষীর বিষয়।


 বোধ করি পাঠকবর্গ সকলেই চীনের লোকদিগকে দেখিয়াছেন, যে দেশহইতে তাহারা আমাদের এ দেশে বাণিজ্য ও ব্যবসায় করিতে আসিয়াছে, তাহার নাম চায়না অথবা চীন দেশ। এই হেতু আমরা তাহাদিগকে চীনে লোক বলি। যে রূপ এতদ্দেশে প্রজাবর্গ হিন্দু, এবং ইংরাজ রাজা, চীন দেশ সেরূপ নয়, তাহাদের রাজা, প্রজা, রাজকর্ম্মচারী প্রভৃতি সকলেই চীনে লোক, বহুকাল হইল সেই দেশে একটি ঘটনা হইয়াছিল, পাছে লোক বিস্মৃত হয়, এ জন্য আদ্যোপান্ত সমুদায় বৃত্তান্তটি বিস্তারিত রূপে লেখা আবশ্যক বুঝিয়া পাঠকবর্গের সুগোচরার্থ লেখনী ধারণ করিলাম।

 চীন দেশীয় মহারাজের বাটীর কথা কি কহিব ভূমণ্ডলের মধ্যে এমত সর্ব্বোৎকৃষ্ট অট্টালিকা নাই। প্রাচীর প্রভৃতি শয়নাগার, ভোজনাগার, অন্দর, সদর, সকলই ভাল ভাল কাঁচদ্বারা নির্ম্মিত। নির্ম্মাণ করিতে অনেক টাকা ব্যয় হইয়াছে বটে, কিন্তু এমনি ভঙ্গুর যে স্পর্শ করিতে লোক সকলের শঙ্কা বোধ হয়, কেহই সাহস করিয়া তাহা স্পর্শ করিতে চাহে না। সেই দেশে অন্য দেশীয়দের ন্যায় মহারাজের পুষ্পোদ্যান আছে, আহা! সে বাগানের শোভার কথা বর্ণনা করা যায় না। তাহা আশ্চর্য্য আশ্চর্য্য পুষ্পবৃক্ষে ভূষিত, তাহাদের মধ্যে যে যে গাছের পুষ্পগুলীন অতিশয় সুন্দর, তাহাদের শাখায় এক একটি রূপার ঘণ্টা লাগান আছে, অল্প বায়ুতে ঠুণ ঠুণ শব্দে বাজে, উহার শব্দ শুনিয়া পথিকেরা এক বার তাহার প্রতি নেত্র পাত না করিয়া কোন মতে যাইতে পারে না। রাজ উদ্যানের সকল বস্তুই সুশৃঙ্খল রূপে স্থাপিত। ঐ বাগান এতাদৃশ দীর্ঘ যে কোথায় তাহার শেষ হইয়াছে, তাহা মালী পর্য্যন্ত জানিত না। উহার সীমা ছাড়াইয়া গেলেই একটা অরণ্য দেখা যায়, তথায় প্রকাণ্ড উচ্চতর বৃক্ষ এবং গভীর সরোবর আছে। ক্রমে ক্রমে নিম্ন মুখ করিয়া ঐ বনটি নীলবর্ণ গভীর সমুদ্রে পড়াতে, বড় বড় জাহাজ সকলকে সেই বৃক্ষশাখা সকলের অধোভাগ দিয়া যাইতে হইত। তাহার মধ্যে একটি বৃক্ষের ডালে এক বুলবুল পক্ষী থাকিত। আহা! তাহার মনোহর সুস্বরের কথা কি কহিব। ধীবরেরা বহু কর্ম্ম থাকিলেও রাত্রিকালে আপনাদিগের জাল বিস্তারিত করিতে গিয়া তাহার ধ্বনি শ্রবণমাত্র চিত্র পুত্তলিকার ন্যায় স্থির হইয়া শুনিত। তাহারা বলিত, আহা মরি কি সুন্দর গীত! কিন্তু দরিদ্র জাতি কি করে, আপনাদিগের কর্ম্মে মনোযোগ না করিলেই নয়, সুতরাং পক্ষীকে ভুলিয়া নিজ নিজ কর্ম্মে মন দিত। পর দিন রাত্রিকালে পক্ষী বৃক্ষশাখাহইতে সেই রূপ মধুর স্বরে গান করিতে আরম্ভ করিলে, ধীবরদিগের কেহ না কেহ তথায় উপস্থিত থাকিয়া অবশ্যই বলিত, মরি মরি এমন সুন্দর স্বর তো আমি কখন শ্রবণ করি নাই। আহা! ইহা যথার্থই মধুর ধ্বনি বটে।

 পৃথিবীর সমস্ত অংশহইতে ভ্রমণকারী লোক সকল মহারাজের রাজধানীতে আগমন করত পক্ষী, রাজভবন এবং উদ্যান প্রভৃতি দেখিয়া বড়ই প্রশংসা করিত বটে, কিন্তু বুলবুলের সুস্বর শ্রবণ করিলে কিছুই তাহাদের ভাল লাগিত না। বরং তাহাই তাহাদের উৎকৃষ্ট বোধ হইত। আর সেই সকল পরিভ্রমণ কারীরা স্বদেশে প্রত্যাগমন করিয়া যাহা যাহা দেখিয়াছে, তাহা বর্ণন করাতে তথাকার বিজ্ঞ লোকেরা তাহা শ্রবণ করিয়া সহর, রাজবাটী, এবং উদ্যান বিষয়ে বহু খণ্ড পুস্তক রচনা করিলেন। সর্ব্বাপেক্ষ। বিখ্যাত ঐ বুলবুলের বিষয়টি তাঁহারা বিস্মৃত হইলেন না। তাঁহাদিগের মধ্যে যাঁহারা কবি ছিলেন, তাঁহারা সুললিত পদ্যচ্ছন্দে ঐ বনস্থিত সরোবরতীরবর্ত্তি বৃক্ষ স্থিত বুলবুলের বর্ণনা করিলেন।

 জগতের সমস্ত অংশেই ঐ সকল পুস্তক প্রেরিত হওয়াতে চায়না দেশের ভূপতির নিকট কয়েকখান পুস্তক যায়। স্বর্ণময় সিংহাসনে উপবিষ্ট হইয়া তিনি মনঃসংযোগ করত ঐ সকল পুস্তক পাঠ করিতে করিতে সহর, রাজবাটী এবং উদ্যানের সুন্দর বর্ণনাতে অতিশয় পুলকিত হইয়া মস্তক নাড়িতে লাগিলেন। রাজা পড়িতে পড়িতে পুস্তকের এক স্থানে দেখেন যে বুলবুল পক্ষীটি সর্ব্বাপেক্ষা মনোহর। ইহাতে ভূপাল আশ্চর্য্য হইয়া বলিতে লাগিলেন, এ কি, আমিতো বুলবুলের বিষয় কিছুই জানি না,আমার অধিকারে কি এমত পক্ষী আছে? রাজ্যমধ্যে বলিলে বরং সম্ভব হইতে পারিত, আমারই বাগানে বাস করে, কিন্তু আমি কখনও তাহার সুস্বর শ্রবণ করি নাই, এ কি চমৎকার! ভাল, ভাল, এমত অদূরবর্ত্তী বিষয় জানিবার নিমিত্ত কি পুস্তক পড়িতে হয়? রাজাধিরাজ মহারাজ এরূপ চিন্তা করিয়া কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না। অতএব উজীরকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। উজীর আপনাকে অতি সম্ভ্রান্ত জ্ঞান করিয়া আপনাহইতে অপকৃষ্ট লোক দিগের কোন কথাতেই পুর্ব্বে উত্তর প্রদান করিতেন না। যদি কেহ সাহস করিয়া কোন কথা জিজ্ঞাসা করিত, তবে তিনি ফূ শব্দ করিয়া তাহা উড়াইয়া দিতেন, সেই ফূর অর্থ কিছুই নয়। মহারাজ ঐ আমীরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বুলবুল নামে যে পক্ষীটি আমার বাগানে আছে, তাহাকে তো সকলেই জানে শুনিতে পাই। পুস্তকে পড়িলাম আমার এই বিস্তারিত রাজ্য মধ্যে ঐ পক্ষীটি সর্ব্বাগ্রগণ্য, তবে তাহার বিষয়ে আমাকে কেহ কখন কোন কথা বলে নাই কেন?

 উজীর এই কথা শুনিয়া প্রত্যুত্তর করিল, মহারাজ! আমিও তাহার কোন কথা শুনি নাই, এ পক্ষী তো রাজসভাতে কেহ কখন আনে নাই, তবে কেমন করিয়া জানিব।

  মহারাজ বলিলেন, আমার অভিলাষ এই, যেন অদ্যই সন্ধ্যাকালে বুলবুল আসিয়া আমার নিকটে সুস্বরে গীত গাইতে থাকে। কি আশ্চর্য্য! জগতের সকল লোকেই জানে যে আমার অধিকারে ঐ পক্ষী আছে, কিন্তু আমি জানি না। উজীর মহাশয় পুনরুক্তি করিয়া কহিলেন, মহারাজ! পূর্ব্বে তাহার নাম আমার নিকটে আপনি উল্লেখ করেন নাই, ভাল, অন্বেষণ করি দেখি, বোধ করি অবশ্যই পাওয়া যাইবে। পরে তাহাকে কোথায় পাওয়া যাইবে। এতদর্থে আমীর মহাশয় রাজবাটীর সমুদয় সিঁড়ী ভাঙ্গিয়া দোতালা, তেতালা, চৌতালা প্রভৃতি উপর নীচে সর্ব্বত্র অন্বেষণ করিয়া বেড়ান, দালান ঘর গলি ঘুঁজি কোথাও আর অন্বেষণ করিতে ত্রুটি করিলেন না, যাহাকে দেখিতে পান, তাহাকেই বুলবুলের কথা জিজ্ঞাসা করেন, সকলেই বলে আমরা বুলবুলের বিষয় তো কিছুই শুনি নাই। এমতে উজীর মহাশয় রাজসদনে পুনরাগমন করিয়া কহিলেন, মহারাজ! এগল্প কথা, পুস্তক লেখকদিগের কল্পনা মাত্র, আপনি কবিদিগের লেখাতে বিশ্বাস করিবেন না। মনে যাহা উদয় হয়, কবিরা তাহাই লেখে, সত্যাসত্যের বড় একটা বিবেচনা করে না।

 মহারাজ এই কথা শুনিয়া প্রত্যুত্তর করিলেন, না না, এমত কথা কোন মতেই সম্ভব হইতে পারেনা, যাপান দেশীয় রাজচক্রবর্ত্তী আমার নিকটে এই পুস্তক পাঠাইয়া দিয়াছেন, আমি তাহাই পাঠ করিয়া বুলবুলের বিষয় জানিলাম, অতএব ইহাতে যে মিথ্যা কথা আছে, এমত কখনই বোধ হয় না। আমি বুলবুলকে দেখিতে চাই। সে অবশ্য অদ্য সন্ধ্যাকালে আসিয়া আমাকে স্বীয় স্বর শ্রবণ করাইবে। সে আমার অধিকারে বাস করাতে গুণের নিমিত্ত আমি তাহার প্রতি প্রসন্ন হইলাম। যদ্যপি সে সন্ধ্যাকালে না আইসে তবে আমি ভোজনান্তে রাজসভাস্থ সকলেরই পৃষ্ঠের চর্ম্ম উঠাইয়া ফেলিব।

 যে আজ্ঞা মহারাজ! এই কথা বলিয়া উজীর পূর্ব্ববৎ পুনরায় উপর নীচে দৌড়াদৌড়ি করিয়া বেড়ান, শাস্তি পাইবার ভয়ে রাজসভাস্থ আর আর লোকেরা তাঁহার সহিত মিলিয়া রাজবাটীর সমুদয় কুঠরী দালান দরদালান বারাণ্ডা প্রভৃতি পথ ঘাট সর্ব্বত্র অন্বেষণ করিতে লাগিল। কি তামাসা! যে বুলবুলের বিষয়ে এত অনুসন্ধান হইতেছে, তাহাকে পৃথিবীর সকল লোকেই জানে। কেবল রাজসভাস্থ জন কতক লোক তাহাকে জানে না। অবশেষে রন্ধনশালার একটি ক্ষুদ্রা বালিকা বলিল, আহা! আমি বুলবুলকে বেশ জানি, সে কেমন সুন্দর সুন্দর গীত গায়। রাজবাটীর বড় বড় লোকদের খাওয়া হইলে পর যে সকল উচ্ছিষ্ট পাতে পড়িয়া থাকে, আমি তাহা আমার রোগিণী মাতার জন্য লইয়া যাইতে হুকুম পাইয়াছি, আমার মা সমুদ্র ধারে থাকেন। খাবারগুলী দিয়া ফিরে আসিতে আসিতে বড় পরিশ্রম হয় চলিতে পারি না, এজন্য আরাম লইতে বনের ভিতরে গিয়া বসি। বসিলেই বুলবুলের গীত শুনিতে পাই। মা আমার মুখে চুম্বন করিলে যেমন চক্ষু দিয়া জল বেরয়। তেমনি ঐ পাখীর গীত শুনিলেও আমার চোখহইতে জল বাহির হয়।

 উজীর মহাশয় ঐ ক্ষুদ্রা বালিকার কথা শ্রবণ করিয়া কহিলেন। শুন গো বালিকে! রাজ আজ্ঞা অনুসারে অদ্য সন্ধ্যাকালে বুলবুলকে রাজ সভায় গান করিতে হইবে। আমরা তাহার অন্বেষণ করিলাম, কিন্তু কোন অনুসন্ধান করিতে পারিলাম না। তুমি যদি পথদর্শক হইয়া আমাদিগকে ঐ বুলবুলকে দেখাইয়া দেও, তবে আমি রাজাকে কহিয়া রন্ধনশালার কম্মটি চিরকালের নিমিত্ত তোমাকে দেওয়াইব, এবং মহারাজের ভোজন সময়ে তুমি সেখানে দাঁড়াইয়া রাজপরিচারিকা হইবে।

 অনন্তর তাহারা সকলে একত্র হইয়া অরণ্য মধ্যবর্তী যে স্থানে বুলবুলের বাস, সেই স্থানেই চলিল, বুলবুলের অন্বেষণ করিবার জন্য রাজসভার প্রায় অর্দ্ধেক লোক যাইতেছেন। যাইতে যাইতে পথিমধ্যে শুনিলেন, একটা গাভী হম্মা শব্দে চীৎকার করিয়া উঠিল। তাহা শুনিয়া রাজসভাস্থ লোকদিগের মধ্যে অল্পবয়স্ক পুরুষ মহাশয়েরা উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, আহা! এবারে আমরা বুলবুল পাইয়াছি। কি আশ্চর্য্য এতাদৃশ ক্ষুদ্র জন্তুর এত বল, অবশ্য ইহার শব্দ পূর্ব্বে কত বার শুনা গিয়াছে। পাকশালার ক্ষুদ্রা বালিকা ঐ কথাতে হাস্য করিয়া কহিল, না না, আমীর সাহেব, আপনারা কি বলেন? ও তো বুলবুল নয়, ও যে গরু ডাকিতেছে, বুলবুলের নিকট পৌঁছিতে এখনও অনেক দূর আছে। আর খানিক দূর যাইয়া তাঁহারা শুনিলেন, সন্নিকটস্থ বীলের ধারে কতকগুলা ভেক কেঁ কোঁ কেঁ কোঁ শব্দ করিয়া ডাকিতেছে। ইহাতে বিস্ময়াপন্ন হইয়া রাজসভার প্রধান উকীল কহিলেন, বাহবা একি জঙ্কাল রব! এখনই আমি তাহার শব্দ শুনিতে পাইলাম, ঠিক যেন ঘণ্টা বাজিতেছে। ক্ষুদ্রা বালিকা বলিল, আবার আপনারা কি বলেন? ও যে বেং ডাকিতেছে। এত উতলা হইবেন না, আর খানিক দূর গেলেই আমরা বুলবুলের সুস্বর শুনিব। কিয়ৎ ক্ষণ পরে তাহারা বুলবুলের বাস স্থানের নিকট পৌছিলে ক্ষুদ্রা বালিকা বলিল, শুন! শুন! বুলবুল কেমন সুন্দর গীত গাইতেছে। বালিকা অঙ্গুলীদ্বারা ইঙ্গিত করিয়া দেখাইল, ঐ যে ডালের উপর পিঙ্গল বর্ণ পাখীটি বসিয়াছে, উহার নাম বুলবুল।

 উজীর বুলবুলকে অতি সামান্য পক্ষীর ন্যায় দেখিয়া কহিতে লাগিলেন। আমি মনোমধ্যে এক বারও এমন বিবেচন। করি না যে বুলবুল এমন সামান্য পক্ষী, ও কি প্রক্ত বুলবুল সম্ভব হইতে পারে? বোধ করি আমাদিগের মধ্যে এত সম্ভ্রান্ত লোক সকলকে দেখিয়া ও একেবারে বিবর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। বালিকা উচ্চৈঃস্বরে কহিল, ও হে বুলবুল পক্ষি, আমাদিগের দয়ালু মহারাজ ইচ্ছা করিয়াছেন, তুমি অদ্য সন্ধ্যাকালে তাঁহার নিকটে যাইয়া আপন সুস্বর শ্রবণ করাইবে। বুলবুল উত্তর করিল, আমি পরমালাদিত হইয়া মহারাজকে সংগীত শ্রবণ করাইব। এই কথা বলিয়া সে সাধ্যানুসারে আপন স্বর শ্রবণ করাইবাতে সকলে তাহা শুনিয়া অতিশয় প্রফুল্ল চিত্ত হইলেন। উজীর কহিলেন, কাঁচের ভিতর ঘণ্টা থাকিলে যেমন শব্দ হইয়া থাকে, আহা মরি! তেমনি শব্দ হইতেছে, দেখ দেখ, উহার ক্ষুদ্র কণ্ঠহইতে কেমন শব্দ বাহির হইতেছে, বোধ করি রাজসভাতে গান করিলে এ অতিশয় প্রশংসা পাইবে। কি আশ্চর্য্য! আমরা পূর্ব্বে কখন এমন সম্বর শ্রবণ করি নাই। মহারাজ ঐ স্থানে আছেন বুলবুল এমন বিবেচনা করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমি কি আর বার রাজসমীপে সংগীত শ্রবণ করাইব?

 উজীর বুলবুলকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, অদ্য সন্ধ্যাকালে রাজবাটীতে প্রধান প্রধান লোকদের সমাগম হইয়া একটি সভা হইবে, সেই সভাতে তোমায় নিমন্ত্রণ করিলাম, তুমি সেখানে উপস্থিত হইয়া আপন মনোহর সুস্বর শ্রবণ করাইয়া মহারাজের মনোমধ্যে আনন্দ প্রদান করিও।

 বুলবুল উত্তর করিল, বনমধ্যে আমি যেমন উত্তম রূপে গীত গাইতে পারি, তেমন আর কোথাও পারি না। তথাপি রাজা স্বয়ং তাহার গীত শ্রবণ করিতে চাহিয়াছিলেন, এজন্য সে ইচ্ছা পূর্ব্বক সন্ধ্যাকালে রাজসভাতে চলিল। এখানে রাজবাটীর সমারোহের পরিসীমা নাই। একে উহার প্রাচীর এবং মেঝ্যা সকল কাঁচদ্বারা নির্ম্মিত, তাহাতে সহস্র সহস্র সোণার ঝাড় পরিদীপ্যমান হইয়া অতিশয় ঝক্ মক্ করিতেছিল। দুর্লভ পুষ্পগুলী পথের স্থানে স্থানে স্থাপন করিয়া তাহাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘণ্টা লাগান ছিল। বায়ু সঞ্চালন এবং লোকদিগের ইতস্ততঃ গমনাগমনদ্বারা ঘণ্টাগুলীন এমন ঠণ ঠুণ করিতেছিল, যে অন্যের কথা দূরে থাকুক কেহ আপনার কথা আপনি শ্রবণ করিতে পারিত না। রাজসভার মধ্যস্থলে মহারাজ স্বয়ং বসিয়াছিলেন। তাঁহারই সম্মুখ ভাগে বুলবুলের নিমিত্ত সোণার পিঞ্জর প্রস্তুত ছিল। প্রধান প্রধান সকল লোকেই সভাতে বর্তমান। পূর্ব্বোক্ত দরিদ্রা বালা রাজপাচিকা উপাধি প্রাপ্ত হইয়া দ্বারে দণ্ডায়মান থাকিতে অনুমতি পাইয়াছিল। উপস্থিত লোকমাত্রেই উত্তমোত্তম বস্ত্র পরিধান করিয়া পাংশুবর্ণ ঐ ক্ষুদ্র পক্ষীর প্রতি একদৃষ্টে নিরীক্ষণ করাতে, রাজা মস্তক লাড়িয়া বুলবুলকে গাইতে আজ্ঞা করিলেন। বুলবুল যথাসাধ্য অতিশয় পরিশ্রম করিয়া মধুর স্বরে গীত গাইতে আরম্ভ করিল। ভূপাল তাহা শ্রবণ করিয়া এমত মুগ্ধ হইলেন, যে তাঁহার চক্ষুহইতে অশ্রুধারা পতন হইতে লাগিল। দেশাধিপতির গণ্ডদেশ বহিয়া অশ্রু পড়িতেছে, বুলবুল তাহা অবলোকন করিবামাত্র আরও উত্তম সূর লাগাইয়া গান গাইতে লাগিল, ইহাতে সকলেরই অন্তঃকরণ একেবারে মুগ্ধ হইয়া উঠিল। পক্ষিরবে মহারাজ বিহ্বল হইয়া আজ্ঞা করিলেন, সোণার পাতে বুলবুলের গলদেশ বাঁধাইয়া দেও। কিন্তু বুলবুল তাহা শুনিয়া রাজাকে সহস্র সহস্র প্রণাম করিয়া কহিল, মহারাজ! আপনি আমার সুস্বর শ্রবণে যে সন্তুষ্ট হইয়াছেন, ইহাই আমার যথেষ্ট পুরস্কার, সোণার পাতে কোন প্রয়োজন নাই। রাজার চক্ষহইতে অশ্রু পতন আমার পক্ষে অমূল্য রত্নস্বরূপ, রাজ অশ্রুর কি বিশেষ গুণ পরমেশ্বর জানেন, ইহাতে আমি কতই পারিতোষিক পাইলাম।

 রাজমহিষী প্রভৃতি যে যে প্রধানা স্ত্রীলোকগণ যবনিকার ভিতরে উপবিষ্টা হইয়া পক্ষীসংগীত শ্রবণ করিতেছিলেন, তাঁহারা সকলেই সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন, রাজবাটীতে এমন মহোৎসব তো কখন দেখা যায় নাই। রাজা বুলবুলকে বলিলেন, আমি রাজবাটীর ভিতরে তোমার নিমিত্ত একটি স্বর্ণ পিঞ্জর নির্মাণ করিয়া দিই। তমি তাহার ভিতরে আসিয়া অবস্থিতি কর। দিনে দুই বার এবং রাত্রিকালে এক বার সে স্থানহইতে প্রস্থান করিয়া বাহিরে যাইতে পারিবে বলিয়া বারো জন ভৃত্য নিযুক্ত করিলেন, যেন তাহারা প্রত্যেকে এক এক গাছি ফিতা লইয়া ঐ পক্ষীর পদদ্বয়ে বন্ধন করত উড়িয়া যাইবার সময়ে তাহার সঙ্গে সঙ্গে যায়। এ রূপ অবস্থায় উড়িতে হইলে পক্ষীরা কি সুখী হইতে পারে? না কখনই হইতে পারে না। অতএব ঐ সকল জাঁক জমক বুলবুলের পক্ষে সুখের কারণ না হইয়া বরং দুঃখের কারণ হইলেও সে তাহা স্বীকার করিল।

 কিয়দ্দিন নগরবাসী লোকদিগের মুখে ঐ আশ্চর্য্য বুলবুল পক্ষীর বিষয় ছাড়া আর কোন কথা নাই। এক দিন মহারাজ সিংহাসনে বসিয়া রাজকার্য্য করিতেছেন, এমন সময়ে ডাকযোগে একটা পুলিন্দা প্রাপ্ত হইলেন, তাহার উপরে বুলবুলের নাম লেখা। রাজা পুলিন্দা পাইয়া বলিতে লাগিলেন, নিশ্চয় বোধ হইতেছে, ইহা ঐ জগৎ বিখ্যাত পক্ষী বিষয়ক কোন মৃতন পুস্তক হইবে, কিন্তু তাহা পুস্তক না হইয়া একটা বাক্স হইল। ভিতরে উত্তম কারিগরী। মহারাজ বাক্স খুলিয়া দেখেন যে স্বাভাবিক বুলবুলের সদৃশ তাহাতে একটি পরম সুন্দর কৃত্রিম বুলবুল আছে। কেবল নীলকান্ত চন্দ্রকান্ত এবং পদ্মরাগ মণিতে খচিত। ঘড়ি যেমন তারদ্বারা ঘোরে, ঐ পাখীতেও তেমনি কয়েকটী তার বান্ধা ছিল, তাহা ফিরাইয়া দিলেই প্রকৃত বুলবুলের যত সুর ও যত রাগ আছে, তাহার একটি মাত্র রাগ এবং একটি মাত্র সুর নির্গত হইত। যত ক্ষণ তারে জোর থাকিত তত ক্ষণ ঐ রূপ হইত। উহা ফুরাইলেই গান এবং সুরেরও শেষ হইত। পরে পক্ষীটি লেজ লাড়িতে আরম্ভকরিলে সোণা এবং রূপা ঝক্ মক্করিত। আর ইহার গলদেশে এক গাছি ফিতা ঝালান ছিল, তাহাতে লেখা আছে এই, চায়না দেশীয় মহারাজের বুলবুলের সহিত তুলনা করিতে হইলে যাপান দেশীয় রাজার বুলবুল অতি সামান্য। উপস্থিত লোকমাত্রই বলিতে লাগিল। আহা! কি শোভা এতো বড় জাঁকাল দেখিতে পাই। যে ব্যক্তি ঐ পক্ষীকে আনয়ন করিয়াছিল, সেই অবধি তাহার উপাধি হাইল, মহারাজের প্রধান বুলবুল বাহক।

 সভাসদ্‌গণ আপনাদের সম্মতি প্রকাশ করিয়া বলিলেন, এক্ষণে জীবিত এবং কৃত্রিম বুলবুল উভয়ে সংমিলিত হইয়া গান করুক, উভয় সুরের সংযোগ শুনিতে অবশ্য মিষ্ট লাগিবে, অতএব তাহাদের উভয়কেই একত্রে গান করিতে আরম্ভ করাণ গেল। কিন্তু কিছুই হইল না। যে যার আপন রীত্যনুসারে গায়। জীবিত বুলবুল ধারাবাহিক রূপে কখন উচ্চৈঃস্বরে কখন বা লঘু স্বরে গান গাইতে লাগিল। কিন্তু কৃত্রিমট। সুরের পরিবর্ত করিতে পারিল না। চুঙ্গির ও তারের যেমন শক্তি তেমনি সুর বাহির হইতে লাগিল। তাহা শুনিয়া প্রধান বাদ্যকর বলিল, আপনারা ইহাতে এ পক্ষীর প্রতি কোন দোষারোপ করিবেন না, পক্ষীটি বেলয়ে গাঁত গায় না, তাহাতেই উভয়ের মানের ঘরে ফাঁক পড়িয়া যায়। এই হেতু পরে ঐ কৃত্রিম পক্ষী একলা গাইতে লাগিল। পূর্ব্বে যেরূপ জীবিত বুলবুল রাজসমীপে গান করিয়া সৌভাগ্য যুক্ত হইয়াছিল। এও সেই রূপ হইল, অধিকন্তু মতির মালা এবং স্বর্ণালঙ্কার পরিলে যেরূপ দেখিতে সুন্দর দেখায়। হীরা, মণি, স্বর্ণাদিতে ইহা ভষিত হওয়াতে জীবিত বুলবুল অপেক্ষা ইহাকে সুন্দর দেখাইতেছিল। তেত্রিশ বার এক সুরে গাইয়াও ঐ কৃত্রিম বুলবুল কোন রূপে ক্লান্ত হইল না। লোক সকল আরও শুনিতে চাহিত। কিন্তু মহারাজ নিষেধ করিয়। কহিলেন, এবারে জীবিত বুলবুলের পালা, অতএব সে 'আসিয়া গান করুক। সে কোথায়? সে যে খোলা জানালা পাইয়া বনমধ্যে উড়িয়া গিয়াছিল কেহ তাহা দেখে নাই।

 মহারাজ বলিলেন, এ আবার কি? ইহা কেমন করিয়া ঘটিয়াছে, ইহাতে রাজসভাস্থ তাবৎ লোকে বুলবুলকে অতিশয় কৃতঘ্ন জন্তু বলিয়া নানা প্রকার নিন্দা করিতে লাগিল। তাহারা বলিল, ও গেল গেলই তাহাতে ক্ষতি কি? উহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পক্ষীটি তো আমাদের নিকটে আছে, অতএব আর বার ঐ কৃত্রিম পক্ষীকে গাওয়াইতে আরম্ভ করাইয়া এক সুর চৌত্রিশ বার শুনিল। তথাপি সেই রাগটি সুকঠিন ছিল বলিয়া এত শুনিয়াও সম্পূর্ণরূপে কেহ তাহা অভ্যাস করিতে পারিল না। প্রধান বাদ্যকর সেই কৃত্রিম বুলবুলের অত্যন্ত প্রশংসা করিয়া কহিল, যে ইহা প্রকৃত বুলবুল অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। হীরা, মণি, জহরাত আছে বলিয়া বাহ্য সৌ ন্দর্য্য নিমিত্ত আমি এমন কথা বলি নাই। কিন্তু তদপেক্ষাও ইহার একটি বিশেষ গুণ আছে, এজন্য ইহা বলিতেছি। সে পুনরায় বলিল, হে প্রজাবৎসল রাজাধিরাজ! আপনি বিবেচনা করিয়া দেখুন, প্রকৃত বুলবুল কোন্ সুরে গাইবে, তাহাতে আপনি নির্ভর করিয়া থাকিতে পারেন না, কিন্তু কৃত্রিম বুলবুল যে সুরে এবং যে রাগে গাইবে, অগ্রেই তাহা প্রকাশিত আছে, অতএব কি গাইবে তাহাতে আপনি নির্ভর করিতে পারেন। কেহ ইচ্ছা করিলে ইহাকে খুলিয়া এক এক অংশ পৃথক্ করত মনুষ্য বুদ্ধিতে যত দূর পর্য্যন্ত কারিগরী হয়, তাহা দেখাইয়া দিতে পারেন। চুঙ্গি সকল কি প্রকারে আছে, ও কিরূপে কার্য্য করিতেছে, একটিহইতে আর একটি কিরূপে উদ্ভব হয়, ইচ্ছা হয় তো এ সকলই দেখান যায়।

 উপস্থিত লোকমাত্রই বলিতে লাগিল, আমরাও এই রূপ বিবেচনা করিতেছিলাম। বাদ্যকরের প্রতি আদেশ হইল, আগামি রবিবারে তুমি সকল লোকের সাক্ষাতে বাক্স খুলিয়া পক্ষীকে সকলেরই নেত্রগোচর করাইবে। মহারাজ স্বয়ং আদেশ করিলেন, সাধারণ লোকে ইহার যেন গানও শুনিতে পায়। রাজ আজ্ঞানুসারে তাহারা। পক্ষীরব শ্রবণ করত অতিশয় পুলকিত হইয়া উঠিল। একত্রে সকলেই বাহবা দিয়া করতালি প্রদান পূর্ব্বক মস্তক নাড়িতে লাগিল, কিন্তু এক দরিদ্র ধীবর পূর্ব্বে জীবিত বুলবুলের গীত শ্রবণ করিয়াছিল, সে তাহাদের কথায় আপন সম্মতি প্রদান না করিয়া কহিল, গানাদি সন্দর বটে, তাহাতে সন্দেহ নাই, এক প্রকার সুস্বর শুনিতে পাইতেছি। তথাপি ইহাতে একটি বিশেষ ত্রুটি আছে, কিন্তু সে কি আমি নীচ লোক তাহা বলিতে পারি না। অনন্তর জীবিত বুলবুল রাজ্যহইতে দূরীকৃত হইল।

 মহারাজ আপনার শয্যার নিকটে একটি রেশমি গদির উপরে ঐ কৃত্রিম বুলবুলটিকে রাখিয়া রাশীকৃত মণি মুক্তা প্রবালাদিদ্বারা তাহার চারি দিক্ ভূষিত করিলেন। তদবধি ঐ পক্ষী রাজগায়ক উপাধি প্রাপ্ত হইয়া দেশ বিখ্যাত হইল। আরও একটি অদ্ভুত উপাধি পাইয়াছিল, কিন্তু তাহা প্রকাশ করিয়া না বলিলে কি জানি পাঠক মহাশয়েরা না বুঝিতে পারেন, এজন্য বিস্তারিত রূপে লিখিতে বাধিত হইলাম। সকল লোকের হৃদয়মণ্ডল বাম পার্শ্বে থাকে। তাহা স্বাভাবিক, এ বিষয়ে রাজা এবং প্রজাতে কিছুই বিশেষ নাই, অতএব চায়নাদেশীয় মহারাজ সকল অঙ্গহইতে আপনার বাম অঙ্গকে অতিশয় শ্রেষ্ঠ বোধ করিতেন, ইহাতেই উৎকৃষ্ট বিষয়ে সেই বুলবুল প্রধান অর্থাৎ হৃদয়ের ধন হইল। কৃত্রিম পক্ষী বিষয়ে প্রধান বাদ্যকর পঁচিশ খণ্ডে একখানি গ্রন্থ প্রস্তুত করিলেন। পুস্তকখানি একে চায়না ভাষায় বিস্তারিত কঠিন কঠিন শব্দেতে ভূষিত, তাহাতে আবার গ্রন্থকার আপন গুণপনা প্রকাশ করিতে ত্রুটি করেন নাই। সুতরাং লোকদিগের কিছুই বোধগম্য হইল না। কিন্তু পাছে রাজা নির্বোধ বিবেচনা করেন, অথবা প্রাণে সংহার করেন, এজন্য সকল লোকেই ভীত হইয়া কহিল, আমরা পুস্তক পাঠ করিয়া উত্তমরূপে বুঝিতে পারিয়াছি। এই রূপে এক বৎসর কাল লোকদিগের আনন্দের আর পরিসীমা রহিল না। মহারাজ, সভাসদ্গণ, এবং চায়নাদেশীয় প্রায় তাবল্লোকেই কৃত্রিম বুলবুলের গীতটাকে মুখস্থ করিল। পক্ষী গান করিলে তাহারাও তাহার সঙ্গে সঙ্গে গাইত। তাহাদের পূর্ব্বাপেক্ষা অধিক আহ্লাদিত হইবার মূল কারণ এই; বালকের। পথে পথে রি, রি, রি, কঁ, কঁ, ক, কু, কু, কু, ইত্যাদি শব্দে গান করিয়া বেড়াইত। মহারাজও ঐরূপ গান করিতেন।

 এক দিন সন্ধ্যাকালে ভূপতি মহাশয় খট্টোপরি শয়ন করিয়া কৃত্রিম বুলবুলের উৎকৃষ্ট গীত শ্রবণ করিতেছিলেন, এমত সময়ে পক্ষির বাক্সের ভিতরহইতে কড়াৎ করিয়া একটা শব্দ হইল। শব্দ হইবামাত্র অন্তরস্থ প্রধান তারগাছটি হর্ হবু শব্দ করাতে চাকাগুলা ঘুরিয়া পড়িয়া একেবারে হঠাৎ ঐ বাদ্য যন্ত্রকে নিস্তব্ধ করিয়া ফেলিল। রাজা শয্যাহইতে লম্ফ প্রদান পূর্ব্বক আপনার চিকিৎসককে ডাকিতে লাগিলেন, দেখ দেখ, আমার কৃত্রিম বুলবলের কি হইয়াছে? কিন্তু উহা কি জীবিত যে কবিরাজের ঔষধে কোন উপকার হইতে পারিবে, অতএব চিকিৎসক তাহার কিছুই করিতে পারিলেন না। পরদিন প্রাতঃকালে এক জন ঘড়িওয়ালাকে আনাইলেন। ঘড়িওয়ালা বিস্তর কথা কহিয়া অনেক পরীক্ষার পর পূর্ব্ববৎ ঐ পক্ষীকে কতক কতক বিযয়ে এক প্রকার সুশৃঙ্খল করিল বটে, কিন্তু বলিল, তোমরা সর্ব্বদা এ যন্ত্রটিকে ব্যবহার না করিয়। বহুদিনের পর এক বার ব্যবহার করিও। বিস্তর ব্যবহার হওয়াতে ইহার আলজিহ্বা ক্ষয় হইয়াছে, নূতন আলজিহ্বা বসাইলে পাছে বাদ্যের হানি হয়, এ কারণ সাহস করিয়া তাহাও বসাইতে পারি না। বৎসরের মধ্যে কেবল এক বার ঐ কৃত্রিম পক্ষীর গীত শুনা যাইবে, এক্ষণে পক্ষীর যে অবস্থা এক বারও তাহার পক্ষে অনেক বলিতে হইবে। কি জানি, ইহাতে সে ভাল না থাকিলেও থাকিতে পারে। বাজাওয়ালা কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করিয়া বক্তৃতাদ্বারা সপ্রমাণ করিতে চাহিল যে পূর্ব্বে পক্ষী যেরূপ উত্তম ছিল, এক্ষণে সেই রূপই আছে। এমন বিবেচনা করা কর্তব্য। সুতরাং লোক সকলও তাহার কথায় সেই রূপ বিবেচনা করিল।

 পরে যথার্থ মনোদুঃখ হেতুক চীন দেশীয় লোকেরা একেবারে সশঙ্কিত হইয়াছিল, তাহারা আপনাদিগের রাজাকে অতিশয় প্রেম করিত, তিনিও এমনি পীড়িত হইলেন, যে সকলেই অনুভব করিল, রাজার পীড়া আরোগ্য হইবার নহে। তৎপদে যিনি মৃতন অভিষিক্ত হইবেন, তাঁহাকেও মনোনীত করিল। রাজপথে যাইতে যাইতে লোকেরা উজীর মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হইলে যদ্যপি জিজ্ঞাসা করিত, প্রাচীন মহারাজ কিরূপ আছেন? উজীর মাথা নাড়িয়া শোক প্রকাশ পূর্ব্বক আপন রীত্যনুসারে ফুঃ বলিয়া তাহাদের কথা উড়াইয়া দিতেন, কোন উত্তর করিতেন না।

 রাজা পাংশুবর্ণ এবং স্পন্দ রহিত হইয়া অত্যুত্তম প্রশস্ত খড়ে শয়ন করিয়াছিলেন। সভাসদ্গণ সকলেই অনুভব করিল, তিনি পঞ্চত্ব পাইয়াছেন, এজন্য তাঁহাকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক নূতন রাজাকে সম্বর্দ্ধনা করিতে চলিল। ভট্টরাজ প্রভূতি রাজভৃত্যেরা সর্ব্বত্র এই দুর্ঘটনার সংবাদ প্রচার করিল, রাজবাটীর সকল কুঠরী এবং যাতায়াত স্থান কাপড়ের দ্বারা মুড়িল, যেন কোন মতে পদ শব্দ না শুনিতে পাওয়া যায়, ইহাতে সকলই স্তব্ধ, কোন স্থানে কোন প্রকার গোল হওনের সম্ভাবনা নাই। কিন্তু মহারাজ বিবর্ণ হইয়া মৃতবৎ সোণার ঝাপট। লাগান মক্কলের প্রশস্ত মশারির ভিতর অত্যত্তম পর্য্যঙ্কোপরি শয়ন করিয়া থাকিলেও তৎকাল পর্যন্ত মরেন নাই। যে গৃহে তিনি শয়ন করিতেন, তাহারই উচ্চভাগে একটি গবাক্ষ দ্বার ছিল, তাহা দিয়া চন্দ্রের জ্যোতি রাজা এবং কৃত্রিম বুলবুলের উপর পড়িল। রাজার একেবারে শ্বাসাবরোধ, বুকে যেন একখান পাতর চাপান রহিয়াছে, তিনি এমত বোধ করিলেন। চক্ষু উন্মীলন করিয়া দেখেন, যে ও পাতর নহে, যমরাজ নিজে তাঁহার বক্ষঃস্থলে উপবেশন করিয়াছেন, মস্তকে তাঁহার স্বর্ণ মুকুট, এক হস্তে খড়গ এবং অন্য হস্তে জয়পতাকা রহিয়াছে। অদ্ভুত মূর্তি সকল শয্যার চতুষ্পার্শ্বে মক্‌মলের মশারি দিয়া উঁকি মারিয়া দেখিতেছে, কতক গুলা বড় কদাকার, কতক দেখিতে অতি মনোহর এবং মাধুর্য্য রূপ, তাহারা কে? তাহারা ঐ মহারাজের ভাল এবং মন্দকর্ম্ম সকল, এক্ষণে মৃত্যুকে তাঁহার হৃদয় মধ্যে উপবিষ্ট দেখিয়া উহারা তাঁহার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওত আপনাদিগের সকল কথা চুপে চুপে রাজাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল।

 কেমন মহারাজ, এ কথা আপনকার মনে হয়? ও কথা আপনকার মনে হয়? এই রূপ পরস্পর অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাতে ভয়ে তাঁহার মস্তকহইতে ঘর্ম্ম নির্গত হইতে লাগিল। রাজা তাহাদিগকে নিস্তব্ধ করিবার কারণ উচ্চৈঃস্বরে কহিলেন, আমি ইহার কিছুই জানি না। ওখানে কে আছে? ঢাক বাজাও ঢাক বাজাও, কিন্তু তাহারা ও কথাতে মনোযোগ না করিয়া বারম্বার সেই রূপ পরস্পর জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল, মৃত্যু মস্তক লাড়িয়া আপনার সম্মতি প্রদান করিলেন! বাজাও বাজাও, এই রূপ শব্দ করিয়া রাজা চীৎকার করিতে লাগিলেন, অদ্ভুত মূর্তিদিগের কথা বার্তায় তিনি অস্থির হওত, কৃত্রিম বুলবুলটিকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ওরে স্বর্ণময় মনোহর পক্ষী, গান কর, তুমি কি গান করিতে জান না। আমি তোমাকে কত স্বর্ণ এবং অমূল্য প্রস্তর দিয়াছি, অন্য কথা দূরে থাকুক, আপনার স্বর্ণ ফিতাগাছটিও তোমার গলদেশে ঝুলাইয়া রাখিলাম, যেন তাহাতে তোমার শোভা বৃদ্ধি করে! এক্ষণে আমি আজ্ঞা করিতেছি, তুমি গান কর, গান কর। ও তো জীবিত পক্ষী নয়, যে কথা শুনিবে, কোন ব্যক্তি ফিরাইয়া না দিলে ও যে কোন গীত গাইতে পারে না। তৎকালে সেখানে কোন লোক ছিল না, যে তারে পাক দেয়, সুতরাং কৃত্রিম বুলবুলকে নিস্তব্ধ থাকিতে হইল। মৃত্যুও রাজার প্রতি একদৃষ্টে নিরীক্ষণ করিয়া রহিলেন, ভয়েতে চতুর্দ্দিক্ অভিভূত।

 এমত সময়ে হঠাৎ এক সুমধুর শব্দ গবাক্ষ দ্বার দিয়া নিঃসরণ হইল। এ আর কেহই নহে, সেই জীবিত বুলবুল মহারাজের বিপদের কথা শ্রবণ করিয়া তাঁহার অন্তঃকরণে ভরসা এবং সান্ত্বনা দিবার কারণ দ্রুত গমনে ঐ রাজগৃহের সন্নিকটস্থ এক বৃক্ষশাখায় বসিয়া ঐরূপ গান করিতেছিল। গীতের এমনি মনোহর ভাব যে তাহা শ্রবণ করিয়া পূর্ব্বোক্ত অদ্ভুত অপচ্ছায়। সকল ক্রমে দুর্ব্বল হইয়া উঠিল। মহারাজার শীর্ণ কায়ায় শীঘ্র শীঘ্র রক্ত পরিচালন হওয়াতে ক্রমশঃ তিনি সবল বোধ করিতে লাগিলেন। মৃত্যুও সেই মিষ্টরবে মোহিত হইয়া বলিলেন, আহা! বুলবুল! তুমি উত্তম গান করিতেছ, আরও গাও, আরও গাও। বুলবুল উত্তর করিল, যমরাজ, আপনার আজ্ঞা আমি লঙ্ঘন করিতে পারি না, অবশ্যই গান করিব, কিন্তু যাহা যাহা আপনার নিকট প্রার্থনা করি, তাহা আমাকে দিউন। হস্তস্থিত ঐ অমূল্য স্বর্ণময় খড়গখানি আমাকে প্রদান করুন। জয়পতাকাটি দেখিতে বড় সুন্দর উহাও আমি চাহি। মহারাজের যে মুকুটটি আপনকার মস্তকোপরি আছে, তাহা আমাকে দিউন।

 মৃত্যু তাহার মধুর ধ্বনিতে একেবারে বিহ্বল হইয়া আপনার ঐ আসবাব গুলীন পুরস্কার স্বরূপ বুলবুলকে দিলেন, তাহাতে সে পূর্ব্বাপেক্ষা আরও পরিশ্রম করিয়া উত্তম রূপে গীত গাইতে আরম্ভ করিল। মৃত্যু, বিরহ, এবং চিরবিচ্ছেদ প্রভৃতি বিষয়ে যে যে শোকসূচক হৃদয় বিদারক সংগীত সকল আছে, বুলবুল তাহাই গাইতে লাগিল, যমরাজ নিজে নির্দয় চিত্ত হইলেও সুললিত সংগীত মোহে তাঁহার কঠিন অন্তঃকরণে দয়ার সঞ্চার হইল। আর কিছু নাই যে তাহাকে পারিতোষিক দেন, নয়ন যুগলে দর দর করিয়া অশ্রুপাত পূর্ব্বক ধূমের ন্যায় গবাক্ষ দ্বার দিয়া তিনি স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। মহারাজ বলিলেন, ওহে ক্ষদ্র শ্রেষ্ঠ পক্ষী! আমি তোমার নিকট যাবজ্জীবন বাধিত হইয়া থাকিলাম, অসঙ্খ্য ধন্যবাদ করি। তুমি কে? তাহা আমি ভাল রূপে জানি, আমি কুকর্ম্ম করিয়া রাজ্যহইতে তোমাকে দূরীভূত করিয়াছিলাম তথাপি তুমি আমার এই বিপদ কাল জানিয়া মধুর ধ্বনিতে কুৎসিত অপছায়া সকলকে শয্যার চতুষ্পার্শ্বহইতে তাড়াইয়া দিলে, অধিক কি বলিব, মৃত্যু নিজে আমার হৃদয় মধ্যে উপবেশন করিয়াছিল, তাহাকেও তুমি দূরীভূত করিয়াছ, অতএব কি দিয়া তোমার পুরস্কার করিব। বুলবুল বলিল, প্রথমে আমি গান করিলে আপনি চক্ষুহইতে অশ্রুপাত করিয়াছেন, ইহাতেই আমি যথেষ্ট পুরস্কার পাইয়াছি, অধিক পারিতোষিকের আবশ্যক নাই। আমি প্রাণ থাকিতেও এ বিষয়টি কখন ভুলিতে পারিব না, গায়কের পক্ষে উহা রত্ন স্বরূপ ইহাতেই অন্তঃকরণকে পরম পুলক্ষিত করে। কিন্তু এক্ষণে আমি গান করি, আপনি নিদ্রা যাউন, তাহা হইলে আপনকার শরীর সবল এবং স্বাস্থ্যযুক্ত হইবে। অনন্তর বুলবুল গান করিতে করিতে মহারাজকে ঘুম পাড়াইল। সুনিদ্রাদ্বারা রাজার পীড়াজনিত ক্লেশ দূর হওয়াতে তাঁহার শরীরের পক্ষে উহা বিশেষ উপকারক হইল। ক্রমে রাত্রিপ্রভাত গবাক্ষ দ্বার দিয়া সূর্য্য কিরণ গৃহমধ্যে প্রবিষ্ট হইল, রাত্রিকালের উত্তম সুযুপ্তিদ্বারা রাজা আপন শরীরে বল এবং স্বাস্থ্য পাইয়া শয্যাহইতে গাত্রোত্থান করিলেন। দেখেন, কোন ভূত্যই নিকটে নাই, তাহারা সকলেই অনুমান করিয়াছিল, রাজা মরিয়াছেন, এজন্য তত বেলা পর্য্যন্ত কেহই তাঁহার নিকটে ফিরিয়া আসে নাই। কিন্তু বুলবুল তখন পর্য্যন্তও সেই বৃক্ষশাখাতে উপবিষ্ট হইয়া মধুর স্বরে গান করিতেছিল। মহারাজ বলিলেন, ওহে মনোহর বুলবুল পক্ষী, তুমি আমার নিকটে সর্ব্বদা থাক, বরং স্বেচ্ছানুসারে গান করিও। আমি তোমাকে গান করিতে কখন আজ্ঞা করিব না। বল তো ঐ কৃত্রিম পক্ষীটাকে সহস্র অংশে খণ্ড খণ্ড করিয়া ফেলি। বুলবুল বলিল, মহারাজ, এমন কর্ম্ম কদাচ করিও না, যত দিন সাধ্য ছিল, পক্ষীটি তত দিন আপনকার হিত চেষ্টা করিয়াছে! এক্ষণে পারে না, তা কি হবে, পূর্ব্বে উহাকে যেরূপে রাখিয়াছিলেন, এক্ষণেও সেই রূপ রাখুন। রাজবাটীতে বাসা নির্মাণ করিয়া আমি কোন মতেই থাকিতে পারিব না। মন হইলে সন্ধ্যাকালে আগমন করত আমি আপনকার জানালার নিকটস্থ বৃক্ষশাখায় বসিয়া গান করিতে থাকিব, তাহাতে আপনাকে সদ্বিবেচক এবং আনন্দিত করিবে। সংসারে সখীই বা কে এবং দুঃখীই বা কে আমি তাহা গান করিব, মহাশয়ের চতুষ্পার্শ্বে যে যে লোকেরা থাকে, তাহাদের মধ্যে কে ভাল এবং কে মন্দ তাহাও বলিয়া দিব, কেহই আপনকার নিকটে আর গোপন থাকিতে পারিবে না। কারণ রাজসভাহইতে অধিক দূরবর্তী কৃষকদিগের কুটীর পর্যন্তও এ ক্ষুদ্র পক্ষী যায়। রাজমুকুটে পবিত্র গন্ধ থাকিলেও আমি এ মুকুট অপেক্ষা আপনার অন্তঃকরণকে অধিক ভাল বাসি, আমি মহারাজের নিকট আসিয়া গান করিব বটে, কিন্তু প্রথমতঃ আপনি আমার কাছে একটি অঙ্গীকার করুন।

 মহারাজ বলিলেন, অঙ্গীকার আর কি, আমার যাহা আছে সকলই তোমার কাছে অঙ্গীকার করিলাম, ইহা বলিয়া মহারাজ স্বর্ণময় খড়গখানি আপনার বক্ষঃস্থলে চাপিয়া ধরিলেন। বুলবুল বলিল, মহারাজ, আমি যে বিষয়টি আপনার নিকটে প্রার্থনা করিতেছি, তাহা কেবল এই, আপনি কাহারও কাছে প্রকাশ করিবেন না, যে আমার ক্ষুদ্র পক্ষী সকল বিষয় আমাকে বলিয়া দেয়। তাহা হইলে বড়ই মঙ্গল হইবে। ইহা বলিয়া বলবুল পক্ষী উড়িয়া চলিয়া গেল। ক্ষণকাল বিলম্বে ভৃত্যগণ রাজাকে দেখিতে আইলে রাজা তাহাদিগকে নমস্কার করিয়া একে একে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, ও কে অমুক ইত্যাদি, তাহারা তো জানে না য়ে তখন পর্যন্তও রাজা জীবিত আছেন, অতএব তাহার বাক্য শুনিয়া একেবারে চমৎকৃত হইয়া উঠিল।

সমাপ্ত।