চোখের বালি/৫৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন



& θ ο চোখের বালি বিনোদিনী বিহারীকে কহিল, “এখন আমার প্রতি তোমার যাহা আদেশ, তাহা বলে ।” বিহারী কছিল, “বোঠান, তুমিই বলে, তুমি কী করিতে চাও।” : বিনোদিনী কহিল, “শুনিলাম, গরিবদের চিকিৎসার জন্ত গঙ্গার ধারে তুমি একখানি বাগান লইয়াছ— আমি সেখানে তোমার কোনো একটা কাজ করিব। কিছু না হয় তো আমি রাৰিয়া দিতে পারি।” বিহারী কহিল, “বোঠান, আমি অনেক ভাবিয়াছি । নানান হাঙ্গামে আমাদের জীবনের জালে অনেক জট পড়িয়া গেছে। এখন নিভৃতে বসিয়া বলিয়া তাহারই একটি একটি গ্রন্থি মোচন করিবার দিন আসিয়াছে। পূর্বে সমস্ত পরিষ্কার করিয়া লষ্টতে হইবে। এখন হয়ে যাহা চায় তাহাকে আর প্রশ্ৰয় দিতে সাহস হয় না। এ পর্যন্ত যাহা-কিছু ঘটিয়াছে, যাহা-কিছু সহ করিয়াছি, তাহার সমস্ত আবর্তন, সমস্ত আন্দোলন শাস্ত করিতে না পারিলে জীবনের সমাপ্তির জন্ত প্রস্তুত হইতে পারিব না । যদি সমস্ত অতীতকাল অমুকুল হুইত তবে সংসারে একমাত্র তোমার দ্বারাই আমার জীবন সম্পূর্ণ হইতে পায়িত— এখন তোমা হইতে আমাকে বঞ্চিত হইতেই হইবে । এখন আর মুখের জন্ত চেষ্টা বৃথা, এখন কেবল আস্তে আস্তে সমস্ত ভাঙচুর সারিয়া লইতে হইবে।” ( এই সময় অন্নপূর্ণ ঘরে ঢুকিতেই বিনোদিনী কহিল, “ম, আমাকে তোমার পায়ে স্থান দিতে হইবে। পাপিষ্ঠ বলিয়া আমাকে তুমি ঠেলিয়ে না।” অন্নপূর্ণ কছিলেন, “ম, চলে, আমার সঙ্গেই চলো।” ) /অন্নপূর্ণ ও বিনোদিনীর কাশীতে যাইবার দিন কোনো স্বযোগে বিহার বিরলে বিনোদিনীর সহিত দেখা করিল। কহিল, “ৰোঠান, তোমার একটা-কিছু চিহ্ন আমি কাছে রাখিতে চাই ।” বিনোদিনী কহিল, “আমার এমন কী আছে যাহা চিহের মতো কাছে রাখিতে পায় ?” বিহারী লজা ও সংকোচের সহিত কছিল, “ইংরেজের একটা প্রথা আছে, প্রিয়জনের একগুচ্ছ চুল স্বরণের জন্ত রাখিয়া দেয়— যদি তুমি— ) বিনোদিনী। ছি ছি, কী ঘৃণা। আমার চুল লইয়া কী করিবে। সেই অশুচি মৃতবত্ত আমার এমন কিছুই নছে যাহা আমি তোমাকে দিকে পারি। আমি হতভাগিনী তোমার কাছে থাকিতে পারিব না— আমি এমন একটা-কিছু দিতে চাই যাহা আমার হইয়া তোমার কাজ করিবে— বলে, তুমি লইবে ? ८छोtषज्ञ बांलि 8 ৰিহাস্ত্রী কছিল, “লইব ।” তখন বিনোদিনী তাহার অঞ্চলের প্রান্ত খুলিয়া হাজার টাকার দুখানি নোট বিহারীর হাতে দিল । - বিহারী স্থগভীর আবেগের সহিত স্থিরদৃষ্টিতে বিনোদিনীয় মুখের দিকে চাহিয়া কুছিল । খানিক বাদে বিহারী কছিল, “আমি কি তোমাকে কিছু দিতে পারিব না ।” 鸭 বিনোদিনী কহিল, “তোমার চিহ্ন আমার কাছে আছে, তাহা আমার অঙ্গের ভূষণ— তাহ কেহ বাড়িতে পারিবে না। আমার আর কিছু দরকার নাই।" বলিয়া সে নিজের হাতের সেই কাটা দাগ দেখাইল । বিহারী আশ্চর্য হইয়া রহিল। বিনোদিনী কহিল, “তুমি জান না— এ তোমারই আঘাত— এবং এ আঘাত তোমারই উপযুক্ত । ইহা এখন তুমিও পিরাইতে পার না।” মালিমার উপদেশসত্ত্বেও আশা বিনোদিনী-সম্বন্ধে মনকে নিষ্কণ্টক করিতে পারে নাই । রাজলক্ষ্মীর সেবায় ছুইজনে একত্রে কাজ করিয়াছে কিন্তু আশা যখনই বিনোদিনীকে দেখিয়াছে তখনই তাহার বুকের মধ্যে ব্যথা লাগিয়াছে— মুখ দিয়া সহজে কথা বাহির হয় নাই, এবং হাপিধার চেষ্ঠা, তাহাকে পীডন করিয়াছে । বিনোদিনীর নিকট হইতে সামান্ত কোনো সেবা গ্রহণ করিতেও তাহার সমস্ত চিত্ত বিমুখ হইয়াছে। বিনোদিনীর সাজা পান অনেক সময়ে শিষ্টতার খাতিরে তাহাকে গ্রহণ করিতে হুইয়াছে, কিন্তু আড়ালে তাহা ফেলিয়া দিয়াছে । কিন্তু আজ যখন বিদায়কাল উপস্থিত হইল, মালিমা সংসার হইতে দ্বিতীয় বার চলিয়া যাইতেছেন বলিয়া আশার হৃদয় যখন আশ্রজলে আর্দ্র হইয়া গেল, তখন সেইসঙ্গে বিনোদিনীর প্রতি তাহার করুণার উদয় হইল । যে একেবারে চলিয়া যাইতেছে তাহাকে মাপ করিতে পারে না, এমন কঠিন মন অল্পই আছে। আশা জনিত, বিনোদিনী মহেন্দ্রকে ভালোবাসে, মহেন্দ্রকে ভালো না বাসিবেই বা কেন । মহেন্দ্রকে ভালোবাসা যে কিরূপ অনিবার্য, আশা তাহার নিজের হৃদয়ের ভিতর হইতেই জানে। নিজের ভালোবাসার সেই বেদনায় বিনোদনীর প্রতি আজ তাহার বড়ো দয়া হইল । বিনোদিনী মহেক্সকে চিরদিনের জন্য ছাড়িয়া যাইতেছে, তাহার যে দুবিধহু দুঃখ তাহা অাশা অতিবড়ো শত্রুর জগুও কামনা করিতে পারে না – মনে করিয়া তাহার চক্ষে জল আসিল ; এক কালে সে বিনোদনীকে ভালোবালিয়াছিল, সেই ভালোবাসা তাহাকে স্পর্শ করিল। সে ধীরে ধীরে বিনোদিনীর কাছে আপিয়৷ > అ চোখের বালি অত্যন্ত করুণার সঙ্গে, স্নেহের সঙ্গে, বিষাদের সঙ্গে মুচুম্বরে কহিল, “দিদি, তুমি চলিলে ?” t বিনোদিনী আশার চিবুক ধরিয়া কহিল, “ই বোন, আমার যাইবার সময় আসিয়াছে। এক সময় তুমি আমাকে ভালোবালিয়াছিলে— এখন স্বখের দিনে সেই ভালোবাসার একটুখানি আমার জন্তে রাখিয়ো ভাই; আর-সব ভুলিয়া যেয়ে ।” মহেন্দ্র আসিয়া প্রণাম করিয়া কহিল, “বোঠান, মাপ করিয়ো ।” : তাহার চোখের প্রান্তে দুই ফোটা অশ্র গড়াইয়া পড়িল । ৰিনোদিনী কহিল, “তুমিও মাপ করিয়ো ঠাকুরপো, ভগবান তোমাদের চিরস্থৰী' করুন ।”