ছাত্রের পরীক্ষা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ছাত্র শ্রীমধুসূদন। শ্রীযুক্ত কালাচাঁদ মাস্টার পড়াইতেছেন

অভিভাবকের প্রবেশ

অভিভাবক । মধুসূদন পড়াশুনো কেমন করছে কালাচাঁদবাবু ?

কালাচাঁদ । আজ্ঞে , মধুসূদন অত্যন্ত দুষ্ট বটে , কিন্তু পড়াশুনোয় খুব মজবুত । কখনো একবার বৈ দুবার বলে দিতে হয় না। যেটি আমি একবার পড়িয়ে দিয়েছি সেটি কখনো ভোলে না ।

অভিভাবক । বটে! তা , আমি আজ একবার পরীক্ষা করে দেখব।

কালাচাঁদ । তা , দেখুন-না ।

মধুসূদন । ( স্বগত) কাল মাস্টারমশায় এমন মার মেরেছেন যে আজও পিঠ চচ্চড় করছে । আজ এর শোধ তুলব । ওঁকে আমি তাড়াব ।

অভিভাবক । কেমন রে মোধো , পুরোনো পড়া সব মনে আছে তো ?

মধুসূদন । মাস্টারমশায় যা বলে দিয়েছেন তা সব মনে আছে ।

অভিভাবক । আচ্ছা , উদ্ভিদ্‌ কাকে বলে বল্‌ দেখি ।

মধুসূদন । যা মাটি ফুঁড়ে ওঠে ।

অভিভাবক । একটা উদাহরণ দে ।

মধুসূদন । কেঁচো!

কালাচাঁদ । ( চোখ রাঙাইয়া ) অ্যাঁ! কী বললি!

অভিভাবক । রসুন মশায় , এখন কিছু বলবেন না ।

মধুসূদনের প্রতি

তুমি তো পদ্যপাঠ পড়েছ ; আচ্ছা , কাননে কী ফোটে বলো দেখি ?

মধুসূদন । কাঁটা ।

কালাচাঁদের বেত্র-আস্ফালন

কী মশায় , মারেন কেন ? আমি কি মিথ্যে কথা বলছি ?

অভিভাবক । আচ্ছা , সিরাজউদ্দৌলাকে কে কেটেছে ? ইতিহাসে কী বলে ?

মধুসূদন । পোকায় ।

বেত্রাঘাত

আজ্ঞে , মিছিমিছি মার খেয়ে মরছি — শুধু সিরাজউদ্দৌলা কেন , সমস্ত ইতিহাসখানাই পোকায় কেটেছে! এই দেখুন ।

প্রদর্শন । কালাচাঁদ মাস্টারের মাথা-চুলকায়ন

অভিভাবক । ব্যাকরণ মনে আছে ?

মধুসূদন । আছে ।

অভিভাবক । ‘ কর্তা ' কী , তার একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও দেখি ।

মধুসূদন । আজ্ঞে , কর্তা ও পাড়ার জয়মুন্‌শি ।

অভিভাবক । কেন বলো দেখি ।

মধুসূদন । তিনি ক্রিয়া-কর্ম নিয়ে থাকেন ।

কালাচাঁদ । ( সরোষে) তোমার মাথা!

পৃষ্ঠে বেত্র

মধুসূদন । ( চমকিয়া) আজ্ঞে , মাথা নয় , ওটা পিঠ ।

অভিভাবক । ষষ্ঠী-তৎপুরুষ কাকে বলে ?

মধুসূদন । জানি নে ।

কালাচাঁদবাবুর বেত্র-দর্শায়ন

মধুসূদন । ওটা বিলক্ষণ জানি — ওটা যষ্টি-তৎপুরুষ ।

অভিভাবকের হাস্য এবং কালাচাঁদবাবুর তদ্‌বিপরীত ভাব

অভিভাবক । অঙ্কশিক্ষা হয়েছে ?

মধুসূদন । হয়েছে ।

অভিভাবক । আচ্ছা , তোমাকে সাড়ে ছ'টা সন্দেশ দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে যে , পাঁচ মিনিট সন্দেশ খেয়ে যতটা সন্দেশ বাকি থাকবে তোমার ছোটো ভাইকে দিতে হবে । একটা সন্দেশ খেতে তোমার দু-মিনিট লাগে , কটা সন্দেশ তুমি তোমার ভাইকে দেবে ?

মধুসূদন । একটাও নয় ।

কালাচাঁদ । কেমন করে !

মধুসূদন । সবগুলো খেয়ে ফেলব । দিতে পারব না ।

অভিভাবক । আচ্ছা , একটা বটগাছ যদি প্রত্যহ সিকি ইঞ্চি করে উঁচু হয় তবে যে বট এ বৈশাখ মাসের পয়লা দশ ইঞ্চি ছিল ফিরে বৈশাখ মাসের পয়লা সে কতটা উঁচু হবে ?

মধুসূদন । যদি সে গাছ বেঁকে যায় তা হলে ঠিক বলতে পারি নে , যদি বরাবর সিধে ওঠে তা হলে মেপে দেখলেই ঠাহর হবে, আর যদি ইতিমধ্যে শুকিয়ে যায় তা হলে তো কথাই নেই ।

কালাচাঁদ । মার না খেলে তোমার বুদ্ধি খোলে না! লক্ষ্মীছাড়া , মেরে তোমার পিঠ লাল করব , তবে তুমি সিধে হবে।

মধুসূদন । আজ্ঞে , মারের চোটে খুব সিধে জিনিসও বেঁকে যায় ।

অভিভাবক । কালাচাঁদবাবু , ওটা আপনার ভ্রম । মারপিট করে খুব অল্প কাজই হয় । কথা আছে গাধাকে পিটোলে ঘোড়া হয় না , কিন্তু অনেক সময়ে ঘোড়াকে পিটোলে গাধা হয়ে যায় । অধিকাংশ ছেলে শিখতে পারে , কিন্তু অধিকাংশ মাস্টার শেখাতে পারে না । কিন্তু মার খেয়ে মরে ছেলেটাই । আপনি আপনার বেত নিয়ে প্রস্থান করুন , দিনকতক মধুসূদনের পিঠ জুড়োক , তার পরে আমিই ওকে পড়াব ।

মধুসূদন । ( স্বগত) আঃ , বাঁচা গেল ।

কালাচাঁদ । বাঁচা গেল মশায়! এ ছেলেকে পড়ানো মজুরের কর্ম , কেবলমাত্র ম্যানুয়েল লেবার । ত্রিশ দিন একটা ছেলেকে কুপিয়ে আমি পাঁচটি মাত্র টাকা পাই , সেই মেহনতে মাটি কোপাতে পারলে দিনে দশটা টাকাও হয় ।