ছেলেবেলা/ভূমিকা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

গোঁসাইজির কাছ থেকে অনুরোধ এল ছেলেদের জন্যে কিছু লিখি । ভাবলুম ছেলেমানুষ রবীন্দ্রনাথের কথা লেখা যাক । চেষ্টা করলুম সেই অতীতের প্রেতলোকে প্রবেশ করতে । এখনকার সঙ্গে তার অন্তরবাহিরের মাপ মেলে না । তখনকার প্রদীপে যত ছিল আলো তার চেয়ে ধোঁওয়া ছিল বেশি । বুদ্ধির এলাকায় তখন বৈজ্ঞানিক সার্ভে আরম্ভ হয় নি , সম্ভব-অসম্ভবের সীমাসরহদ্দের চিহ্ন ছিল পরস্পর জড়ানো । সেই সময়টুকুর বিবরণ যে ভাষায় গেঁথেছি সে স্বভাবতই হয়েছে সহজ , যথাসম্ভব ছেলেদেরই ভাবনার উপযুক্ত । বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমানুষি কল্পনাজাল মন থেকে কুয়াশার মতো যখন কেটে যেতে লাগল তখনকার কালের বর্ণনার ভাষা বদল করি নি কিন্তু ভাবটা আপনিই শৈশবকে ছাড়িয়ে গেছে । এই বিবরণটিকে ছেলেবেলাকার সীমা অতিক্রম করতে দেওয়া হয় নি — কিন্তু শেষকালে এই স্মৃতি কিশোর-বয়সের মুখোমুখি এসে পৌঁছিয়েছে । সেইখানে একবার স্থির হয়ে দাঁড়ালে বোঝা যাবে কেমন করে বালকের মনঃপ্রকৃতি বিচিত্র পারিপার্শ্বিকের আকস্মিক এবং অপরিহার্য সমবায়ে ক্রমশ পরিণত হয়ে উঠেছে । সমস্ত বিবরণটাকেই ছেলেবেলা আখ্যা দেওয়ার বিশেষ সার্থকতা এই যে , ছেলেমানুষের বৃদ্ধি তার প্রাণশক্তির বৃদ্ধি । জীবনের আদিপর্বে প্রধানত সেইটেরই গতি অনুসরণযোগ্য । যে পোষণপদার্থ তার প্রাণের সঙ্গে আপনি মেলে বালক তাই চারি দিক থেকে সহজে আত্মসাৎ করে চলে এসেছে । প্রচলিত শিক্ষাপ্রণালী দ্বারা তাকে মানুষ করবার চেষ্টাকে সে মেনে নিয়েছে অতি সামান্য পরিমাণেই ।

এই বইটির বিষয়বস্তুর কিছু কিছু অংশ পাওয়া যাবে জীবনস্মৃতিতে , কিন্তু তার স্বাদ আলাদা , সরোবরের সঙ্গে ঝরনার তফাতের মতো । সে হল কাহিনী , এ হল কাকলি ; সেটা দেখা দিচ্ছে ঝুড়িতে এটা দেখা দিচ্ছে গাছে । ফলের সঙ্গে চার দিকের ডালপালাকে মিলিয়ে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে । কিছুকাল হল একটা কবিতার বইয়ে এর কিছু কিছু চেহারা দেখা দিয়েছিল , সেটা পদ্যের ফিল্‌মে । বইটার নাম ছড়ার ছবি । তাতে বকুনি ছিল কিছু নাবালকের , কিছু সাবালকের । তাতে খুশির প্রকাশ ছিল অনেকটাই ছেলেমানুষি খেয়ালের । এ বইটাতে বালভাষিত গদ্যে ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর