ছেলেবেলা/১১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

খাঁচায় পাখি পোষার শখ তখন ঘরে ঘরে ছিল । সবচেয়ে খারাপ লাগত পাড়ার কোনো বাড়ি থেকে পিঁজরেতে-বাঁধা কোকিলের ডাক । বৌঠাকরুন জোগাড় করেছিলেন চীনদেশের এক শ্যামা পাখি । কাপড়ের ঢাকার ভিতর থেকে তার শিষ উঠত ফোয়ারার মতো । আরও ছিল নানা জাতের পাখি , তাদের খাঁচাগুলো ঝুলত পশ্চিমের বারান্দায় । রোজ সকালে একজন পোকাওয়ালা পাখিদের খোরাক জোগাত । তার ঝুলি থেকে বেরত ফড়িঙ , ছাতুখোর পাখিদের জন্যে ছাতু ।

জ্যোতিদাদা আমার সকল তর্কের জবাব দিতেন । কিন্তু মেয়েদের কাছে এতটা আশা করা যায় না । একবার বৌঠাকরুনের মর্জি হয়েছিল খাঁচায় কাঠবিড়ালি পোষা । আমি বলেছিলুম কাজটা অন্যায় হচ্ছে , তিনি বলেছিলেন গুরুমশায়গিরি করতে হবে না । একে ঠিক জবাব বলা চলে না । কাজেই কথা-কাটাকাটির বদলে লুকিয়ে দুটি প্রাণীকে ছেড়ে দিতে হল । তার পরেও কিছু কথা শুনেছিলুম , কোনো জবাব করি নি ।

আমাদের মধ্যে একটা বাঁধা ঝগড়া ছিল কোনোদিন যার শেষ হল না , সে কথা বলছি ।

উমেশ ছিল চালাক লোক । বিলিতি দরজির দোকান থেকে যত-সব ছাঁটাকাটা নানা রঙের রেশমের ফালি জলের দরে কিনে আনত , তার সঙ্গে নেটের টুকরো আর খেলো লেস মিলিয়ে মেয়েদের জামা বানানো হত । কাগজের প্যাকেট খুলে সাবধানে মেলে ধরত মেয়েদের চোখে , বলত ‘ এই হচ্ছে আজকের দিনের ফ্যাশন ' । ঐ মন্ত্রটার টান মেয়েরা সামলাতে পারত না । আমাকে কী দুঃখ দিত বলতে পারি নে । বারবার অস্থির হয়ে আপত্তি জানিয়েছি , জবাবে শুনেছি জ্যাঠামি করতে হবে না । আমি বৌঠাকরুনকে জানিয়েছি , এর চেয়ে অনেক ভালো , অনেক ভদ্র , সেকেলে সাদা কালাপেড়ে শাড়ি কিংবা ঢাকাই । আমি ভাবি আজকালকার জর্জেট-জড়ানো বৌদিদিদের রঙকরা পুতুল-গড়া রূপ দেখে দেওরদের মুখে কি কোনো কথা সরছে না । উমেশের সেলাই-করা ঢাকনি-পরা বৌঠাকরুন যে ছিলেন ভালো । চেহারার উপর এত বেশি জালিয়াতি তখন ছিল না ।

তর্কে বৌঠাকরুনের কাছে বরাবর হেরেছি , কেননা তিনি তর্কের জবাব দিতেন না ; আর হেরেছি দাবাখেলায় , সে খেলায় তাঁর হাত ছিল পাকা ।

জ্যোতিদাদার কথা যখন উঠে পড়েছে তখন তাঁকে ভালো করে চিনিয়ে দিতে আরও কিছু বলার দরকার হবে । শুরু করতে হবে আরও-একটু আগেকার দিনে ।

জমিদারির কাজ দেখতে প্রায় তাঁকে যেতে হত শিলাইদহে । একবার যখন সেই দরকারে বেরিয়েছিলেন আমাকেও নিয়েছিলেন সঙ্গে । তখনকার পক্ষে এটা ছিল বেদস্তুর , অর্থাৎ যাকে লোকে বলতে পারত , বাড়াবাড়ি হচ্ছে । তিনি নিশ্চয় ভেবেছিলেন , ঘর থেকে এই বাইরে চলাচল এ একটা চলতি ক্লাসের মতো । তিনি বুঝে নিয়েছিলেন , আমার ছিল আকাশে বাতাসে চরে বেড়ানো মন — সেখান থেকে আমি খোরাক পাই আপনা হতেই । তার কিছুকাল পরে জীবনটা যখন আরও উপরের ক্লাসে উঠেছিল আমি মানুষ হচ্ছিলুম এই শিলাইদহে ।

পুরোনো নীলকুঠি তখনো খাড়া ছিল । পদ্মা ছিল দূরে । নীচের তলায় কাছারি , উপরের তলায় আমাদের থাকবার জায়গা । সামনে খুব মস্ত একটা ছাদ । ছাদের বাইরে বড়ো বড়ো ঝাউগাছ , এরা একদিন-নীলকর সাহেবের ব্যবসার সঙ্গে বেড়ে উঠেছিল । আজ কুঠিয়াল সাহেবের দাবরাব একেবারে থম থম করছে । কোথায় নীলকুঠির যমের দূত সেই দেওয়ান , কোথায় লাঠি-কাঁধে কোমর-বাঁধা পেয়াদার দল , কোথায় লম্বা-টেবিল-পাতা খানার ঘর যেখানে ঘোড়ায় চড়ে সদর থেকে সাহেবরা এসে রাতকে দিন করে দিত — ভোজের সঙ্গে চলত জুড়ি-নৃত্যের ঘূর্ণিপাক , রক্তে ফুটতে থাকত শ্যাম্পেনের নেশা , হতভাগা রায়তদের দোহাই-পাড়া কান্না উপরওয়ালাদের কানে পৌঁছত না , সদর জেলখানা পর্যন্ত তাদের শাসনের পথ লম্বা হয়ে চলত । সেদিনকার আর যা-কিছু সব মিথ্যে হয়ে গেছে , কেবল সত্য হয়ে আছে দুই সাহেবের দুটি গোর । লম্বা লম্বা ঝাউগাছগুলি দোলাদুলি করে বাতাসে , আর সেদিনকার রায়তদের নাতি-নাতনিরা কখনো কখনো দুপুররাত্রে দেখতে পায় সাহেবের ভূত বেড়াচ্ছে কুঠিবাড়ির পোড়ো বাগানে ।

একলা থাকার মন নিয়ে আছি । ছোটো একটি কোণের ঘর , যত বড়ো ঢালা ছাদ তত বড়ো ফলাও আমার ছুটি । অজানা ভিন দেশের ছুটি , পুরোনো দিঘির কালো জলের মতো তার থই পাওয়া যায় না । বউ-কথা-কও ডাকছে তো ডাকছেই , উড়ো ভাবনা ভাবছি তো ভাবছিই । এই সঙ্গে সঙ্গে আমার খাতা ভরে উঠতে আরম্ভ করেছে পদ্যে । সেগুলো যেন ঝরে পড়বার মুখে মাঘের প্রথম ফসলের আমের বোল — ঝরেও গেছে ।

তখনকার দিনে অল্প বয়সের ছেলে , বিশেষত মেয়ে , যদি অক্ষর গুণে দু ছত্র পদ্য লিখত তা হলে দেশের সমজদাররা ভাবত , এমন যেন আর হয় না , কখনো হবে না ।

সে-সব মেয়ে-কবিদের নাম দেখেছি , কাগজে তাদের লেখাও বেরিয়েছে । তার পরে সেই অতি সাবধানে চোদ্দো অক্ষর বাঁচিয়ে লেখা ভালো ভালো কথা আর কাঁচা কাঁচা মিল যেই গেল মিলিয়ে , অমনি তাদের সেই নামমোছা পটে আজকালকার মেয়েদের সারি সারি নাম উঠছে ফুটে ।

ছেলেদের সাহস মেয়েদের চেয়ে অনেক কম , লজ্জা অনেক বেশি । সেদিন ছোটো বয়সের ছেলে-কবি কবিতা লিখেছে মনে পড়ে না , এক আমি ছাড়া । আমার চেয়ে বড়ো বয়সের এক ভাগনে একদিন বাৎলিয়ে দিলেন চোদ্দো অক্ষরের ছাঁচে কথা ঢাললে সেটা জমে ওঠে পদ্যে । স্বয়ং দেখলুম এই জাদুবিদ্যের ব্যাপার । আর হাতে হাতে সেই চোদ্দো অক্ষরের ছাঁদে পদ্মও ফুটল ; এমন-কি তার উপরে ভ্রমরও বসবার জায়গা পেল । কবিদের সঙ্গে আমার তফাত গেল ঘুচে , সেই অবধি এই তফাত ঘুচিয়েই চলেছি ।

মনে আছে , ছাত্রবৃত্তির নীচের ক্লাসে যখন পড়ি সুপারিণ্টেণ্ডেণ্ট্‌ গোবিন্দবাবু গুজব শুনলেন যে , আমি কবিতা লিখি । আমাকে ফরমাশ করলেন লিখতে , ভাবলেন নর্মাল-স্কুলের নাম উঠবে জ্বল্‌জ্বলিয়ে । লিখতে হল , শোনাতেও হল ক্লাশের ছেলেদের , শুনতে হল যে এ লেখাটা নিশ্চয় চুরি । নিন্দুকরা জানতে পারে নি , তার পরে যখন সেয়ানা হয়েছি তখন ভাব-চুরিতে হাত পাকিয়েছি । কিন্তু এ চোরাই মালগুলো দামি জিনিস ।

মনে পড়ে পয়ারে ত্রিপদীতে মিলিয়ে একবার একটা কবিতা বানিয়েছিলুম , তাতে এই দুঃখ জানিয়েছিলুম যে , সাঁতার দিয়ে পদ্ম তুলতে গিয়ে নিজের হাতের ঢেউয়ে পদ্মটা সরে সরে যায় , তাকে ধরা যায় না । অক্ষয়বাবু তাঁর আত্মীয়দের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে এই কবিতা শুনিয়ে বেড়ালেন ; আত্মীয়রা বললেন , ছেলেটির লেখবার হাত আছে ।

বৌঠাকরুনের ব্যবহার ছিল উলটো । কোনোকালে আমি যে লিখিয়ে হব , এ তিনি কিছুতে মানতেন না । কেবলই খোঁটা দিয়ে বলতেন , কোনোকালে বিহারী চক্রবর্তীর মতো লিখতে পারব না । আমি মন-মরা হয়ে ভাবতুম , তাঁর চেয়ে অনেক নীচের ধাপের মার্কা যদি মিলত তা হলে মেয়েদের সাজ নিয়ে তাঁর খুদে দেওর-কবির অপছন্দ অমন করে উড়িয়ে দিতে তাঁর বাধত ।

জ্যোতিদাদা ঘোড়ায় চড়তে ভালোবাসতেন । বৌঠাকরুনকেও ঘোড়ায় চড়িয়ে চিৎপুরের রাস্তা দিয়ে ইডেন গার্ডেনে বেড়াতে যেতেন , এমন ঘটনাও সেদিন ঘটেছিল । শিলাইদহে আমাকে দিলেন এক টাট্টুঘোড়া । সে জন্তুটা কম দৌড়বাজ ছিল না । আমাকে পাঠিয়ে দিলেন রথতলার মাঠে ঘোড়া দৌড় করিয়ে আনতে । সেই এবড়ো-খেবড়ো মাঠে পড়ি-পড়ি করতে করতে ঘোড়া ছুটিয়ে আনতুম । আমি পড়ব না , তাঁর মনে এই জোর ছিল বলেই আমি পড়ি নি । কিছুকাল পরে কলকাতার রাস্তাতেও আমাকে ঘোড়ায় চড়িয়েছিলেন । সে টাট্টু নয় , বেশ মেজাজি ঘোড়া । একদিন সে আমাকে পিঠে নিয়ে দেউড়ির ভিতর দিয়ে সোজা ছুটে গিয়েছিল উঠোনে যেখানে সে দানা খেত । পরদিন থেকে তার সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল ।

বন্দুক-ছোঁড়া জ্যোতিদাদা কস্ত করেছিলেন , সে কথা পূর্বেই জানিয়েছি । বাঘ-শিকারের ইচ্ছা ছিল তাঁর মনে । বিশ্বনাথ শিকারী একদিন খবর দিল , শিলাইদহের জঙ্গলে বাঘ এসেছে । তখনি বন্দুক বাগিয়ে তিনি তৈরি হলেন । আশ্চর্যের কথা এই , আমাকেও নিলেন সঙ্গে । একটা মুশকিল কিছু ঘটতে পারে , এ যেন তাঁর ভাবনার মধ্যেই ছিল না ।

ওস্তাদ শিকারী ছিল বটে বিশ্বনাথ । সে জানত , মাচানের উপর থেকে শিকার করাটা মরদের কাজ নয় । বাঘকে সামনে ডাক দিয়ে লাগাত গুলি । একবারও ফসকায় নি তার তাক ।

ঘন জঙ্গল । সেরকম জঙ্গলের ছায়াতে আলোতে বাঘ চোখেই পড়তে চায় না । একটা মোটা বাঁশগাছের গায়ে কঞ্চি কেটে কেটে মইয়ের মতো বানানো হয়েছে । জ্যোতিদাদা উঠলেন বন্দুক হাতে । আমার পায়ে জুতোও নেই , বাঘটাতাড়া করলে তাকে যে জুতোপেটা করব তার উপায় ছিল না । বিশ্বনাথ ইশারা করলে । জ্যোতিদাদা অনেকক্ষণ দেখতেই পান না । তাকিয়ে তাকিয়ে শেষকালে ঝোপের মধ্যে বাঘের গায়ের একটা দাগ তাঁর চশমাপরা চোখে পড়ল । মারলেন গুলি । দৈবাৎ লাগল সেটা তার শিরদাঁড়ায় । সে আর উঠতে পারল না । কাঠকুটো যা সামনে পায় কামড়ে ধরে লেজ আছড়ে ভীষণ গর্জাতে লাগল । ভেবে দেখলে মনে সন্দেহ লাগে । অতক্ষণ ধরে বাঘটা মরবার জন্যে সবুর করে ছিল , সেটা ওদের মেজাজে নেই বলেই জানি । তাকে আগের রাত্রে তার খাবার সঙ্গে ফিকির করে আফিম লাগায় নি তো! এত ঘুম কেন ।

আরও একবার বাঘ এসেছিল শিলাইদহের জঙ্গলে । আমরা দুই ভাই যাত্রা করলুম তার খোঁজে , হাতির পিঠে চড়ে । আখের খেত থেকে পট পট করে আখ উপড়িয়ে চিবতে চিবতে পিঠে ভূমিকম্প লাগিয়ে চলল হাতি ভারিক্কি চালে । সামনে এসে পড়ল বন । হাঁটু দিয়ে চেপে , শুঁড় দিয়ে টেনে গাছগুলোকে পেড়ে ফেলতে লাগল মাটিতে । তার আগেই বিশ্বনাথের ভাই চামরুর কাছে গল্প শুনেছিলুম , সর্বনেশে ব্যাপার হয় বাঘ যখন লাফ দিয়ে হাতির পিঠে চড়ে থাবা বসিয়ে ধরে । তখন হাতি গাঁ গাঁ শব্দে ছুটতে থাকে বনজঙ্গলের ভিতর দিয়ে , পিঠে যারা থাকে গুঁড়ির ধাক্কায় তাদের হাত পা মাথার হিসেব পাওয়া যায় না । সেদিন হাতির উপর চড়ে বসে শেষ পর্যন্ত মনের মধ্যে ছিল ঐ হাড়গোড়-ভাঙার ছবিটা । ভয় করাটা চেপে রাখলুম লজ্জায় । বেপরোয়া ভাব দেখিয়ে চাইতে লাগলুম এ দিকে , ও দিকে । যেন বাঘটাকে একবার দেখতে পেলে হয় । ঢুকে পড়ল হাতি ঘন জঙ্গলের মধ্যে । এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল । মাহুত তাকে চেতিয়ে তোলবার চেষ্টাও করল না । দুই শিকারী প্রাণীর মধ্যে বাঘের ‘ পরেই তার বিশ্বাস ছিল বেশি । জ্যোতিদাদা বাঘটাকে ঘায়েল করে মরিয়া করে তুলবেন , নিশ্চয় এটাই ছিল তার সবচেয়ে ভাবনার কথা । হঠাৎ বাঘটা ঝোপের ভিতর থেকে দিল এক লাফ । যেন মেঘের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ল একটা বজ্রওয়ালা ঝড়ের ঝাপটা । আমাদের বিড়াল কুকুর শেয়াল দেখা নজর — এ যে ঘাড়েগর্দানে একটা একরাশ মুরদ , অথচ তার ভার নেই যেন । খোলা মাঠের ভিতর দিয়ে দুপুরবেলার রৌদ্রে চলল সে দৌড়ে । কী সুন্দর সহজ চলনের বেগ । মাঠে ফসল ছিল না । ছুটন্ত বাঘকে ভরপুর করে দেখবার জায়গা এই বটে — সেই রৌদ্রঢালা হলদে রঙের প্রকাণ্ড মাঠ ।

আর-একটা কথা বাকি আছে , শুনতে মজা লাগতে পারে । শিলাইদহে মালী ফুল তুলে এনে ফুলদানিতে সাজিয়ে দিত । আমার মাথায় খেয়াল গেল ফুলের রঙিন রস দিয়ে কবিতা লিখতে । টিপে টিপে যে রসটুকু পাওয়া যায় সে কলমের মুখে উঠতে চায় না । ভাবতে লাগলুম , একটা কল তৈরি করা চাই । ছেঁদাওয়ালা একটা কাঠের বাটি , আর তার উপরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চালাবার মতো একটা হামানদিস্তের নোড়া হলেই চলবে । সেটা ঘোরানো যাবে দড়িতে-বাঁধা একটা চাকায় । জ্যোতিদাদাকে দরবার জানালুম । হয়তো মনে মনে তিনি হাসলেন , বাইরে সেটা ধরা পড়ল না । হুকুম করলেন , ছুতোর এল কাঠকোঠ নিয়ে । কল তৈরি হল । ফুলে-ভরা কাঠের বাটিতে দড়িতে-বাঁধা নোড়া যতই ঘোরাতে থাকি ফুল পিষে কাদা হয়ে যায় , রস বেরয় না । জ্যোতিদাদা দেখলেন , ফুলের রস আর কলের চাপে ছন্দ মিলল না । তবু আমার মুখের উপর হেসে উঠলেন না ।

জীবনে এই একবার এঞ্জিনিয়ারি করতে নেবেছিলুম । যে যা নয় নিজেকে তাই যখন কেউ ভাবে , তার মাথা হেঁট করে দেবার এক দেবতা তৈরি থাকেন , শাস্ত্রে এমন কথা আছে । সেই দেবতা সেদিন আমার এঞ্জিনিয়ারির দিকে কটাক্ষ করেছিলেন , তার পর থেকে যন্ত্রে হাত লাগানো আমার বন্ধ , এমন-কি সেতারে এসরাজেও তার চড়াই নি ।

জীবনসমৃতিতে লিখেছি , ফ্লটিলা কোম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের নদীতে স্বদেশী জাহাজ চালাতে গিয়ে কী করে জ্যোতিদাদা নিজেকে ফতুর করে দিলেন । বৌঠাকরুনের মৃত্যু হয়েছে তার আগেই । জ্যোতিদাদা তাঁর তেতালার বাসা ভেঙে চলে গেলেন । শেষকালে বাড়ি বানালেন রাঁচির এক পাহাড়ের উপর ।