ছেলেবেলা/১৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মাঝে মাঝে জ্যোতিদাদা যেতেন হাওয়া বদল করতে গঙ্গার ধারের বাগানে । বিলিতি সওদাগরির ছোঁওয়া লেগে গঙ্গার ধার তখনো জাত খোওয়ায় নি । মুষড়ে যায় নি তার দুই ধারে পাখির বাসা , আকাশের আলোয় লোহার কলের শুঁড়গুলো ফুঁসে দেয় নি কালো নিশ্বাস ।

গঙ্গার ধারের প্রথম যে বাসা আমার মনে পড়ে , ছোটো সে দোতলা বাড়ি । নতুন বর্ষা নেমেছে । মেঘের ছায়া ভেসে চলেছে স্রোতের উপর ঢেউ খেলিয়ে , মেঘের ছায়া কালো হয়ে ঘনিয়ে রয়েছে ও বনের মাথায় । অনেকবার এইরকম দিনে নিজে গান তৈরি করেছি , সেদিন তা হল না । বিদ্যাপতির পদটি জেগে উঠল আমার মনে —


‘ এ ভরা বাদর মাহ ভাদর ,
শূন্য মন্দির মোর । '

নিজের সুর দিয়ে ঢালাই করে রাগিণীর ছাপ মেরে তাকে নিজের করে নিলুম । গঙ্গার ধারে সেই সুর দিয়ে মিনে-করা এই বাদল-দিন আজও রয়ে গেছে আমার বর্ষাগানের সিন্ধুকটাতে । মনে পড়ে , থেকে থেকে বাতাসের ঝাপটা লাগছে গাছগুলোর মাথার উপর , ঝুটোপুটি বেধে গেছে ডালে-পালায় , ডিঙিনৌকাগুলো সাদা পাল তুলে হাওয়ার মুখে ঝুঁকে পড়ে ছুটেছে , ঢেউগুলো ঝাঁপ দিয়ে দিয়ে ঝপ ঝপ শব্দে পড়ছে ঘাটের উপর । বৌঠাকরুন ফিরে এলেন ; গান শোনালুম তাঁকে ; ভালো লাগল বলেন নি , চুপ করে শুনলেন । তখন আমার বয়স হবে ষোলো কি সতেরো । যা-তা তর্ক নিয়ে কথা-কাটাকাটি তখনো চলে , কিন্তু ঝাঁজ কমে গিয়েছে ।

তার কিছুদিন পরে বাসা বদল করা হল মোরান সাহেবের বাগানে । সেটা রাজবাড়ি বললেই হয় । রঙিন কাঁচের জানলা-দেওয়া উঁচুনিচু ঘর , মার্বল পাথরে বাঁধা মেজে , ধাপে ধাপে গঙ্গার উপর থেকেই সিঁড়ি উঠেছে লম্বা বারান্দায় । ঐখানে রাত জাগবার ঘোর লাগত আমার মনে , সেই সবরমতী নদীর ধারের পায়চারির সঙ্গে এখানকার পায়চারির তাল মেলানো চলত । সে বাগান আজ আর নেই , লোহার দাঁত কড়মড়িয়ে তাকে গিলে ফেলেছে ডাণ্ডির কারখানা ।

ঐ মোরান-বাগানের কথায় মনে পড়ে এক-একদিন রান্নার আয়োজন বকুলগাছ-তলায় । সে রান্নায় মসলা বেশি ছিল না , ছিল হাতের গুণ । মনে পড়ে পইতের সময় বৌঠাকরুন আমাদের দুই ভাইয়ের হবিষ্যান্ন রেঁধে দিতেন , তাতে পড়ত গাওয়া ঘি । ঐ

‘ আজি শরত-তপনে প্রভাতস্বপনে
কী জানি পরান কী যে চায় ' ।

আর মনে আসে একটি তপ্ত দিনের ঝাঁ ঝাঁ দুই প্রহরের গান —

‘ হেলাফেলা সারাবেলা
এ কী খেলা আপন-সনে ' ।

বড়দাদার আর-একটি অভ্যাস ছিল চোখে পড়বার মতো , সে তাঁর সাঁতার কাটা । পুকুরে নেমে কিছু না হবে তো পঞ্চাশ বার এপার-ওপার করতেন । পেনেটির বাগানে যখন ছিলেন তখন গঙ্গা পেরিয়ে চলে যেতেন অনেক দূর পর্যন্ত । তাঁর দেখাদেখি সাঁতার আমরাও শিখেছি ছেলেবেলা থেকে । শেখা শুরু করেছিলুম নিজে নিজেই । পায়জামা ভিজিয়ে নিয়ে টেনে টেনে ভরে তুলতুম বাতাসে । জলে নামলেই সেটা কোমরের চার দিকে হাওয়ার কোমরবন্দর মতো ফুলে উঠত । তার পরে আর ডোববার জো থাকত না । বড়োবয়সে যখন শিলাইদহের চরে থাকতুম তখন একবার সাঁতার দিয়ে পদ্মা পেরিয়েছিলুম । কথাটা শুনতে যতটা তাক-লাগানো আসলে ততটা নয় । মাঝে মাঝে চরা-পড়া সেই পদ্মার টান ছিল না তাকে সমীহ করবার মতো ; তবু ডাঙার লোকের কাছে ভয়-লাগানো গল্পটা শোনাবার মতো বটে , শুনিয়েওছি অনেকবার । ছেলেবেলায় যখন গিয়েছি ড্যালহৌসি পাহাড়ে , পিতৃদেব আমাকে একা-একা ঘুরে বেড়াতে কখনো মানা করেন নি । পায়ে-চলা রাস্তায় আমি ফলাওয়ালা লাঠি হাতে এক পাহাড় থেকে আর-এক পাহাড়ে উঠে যেতুম । তার সকলের চেয়ে মজা ছিল মনে মনে ভয় বানিয়ে তোলা । একদিন ওৎরাই পথে যেতে যেতে পা পড়েছিল গাছের তলায় রাশ-করা শুকনো পাতার উপর । পা একটু হড়কে যেতেই লাঠি দিয়ে ঠেকিয়ে দিলুম । কিন্তু না ঠেকাতেও তো পারতুম । ঢালু পাহাড়ে গড়াতে গড়াতে অনেকদূর নীচে ঝরনার মধ্যে পড়তে কতক্ষণ লাগত । কী যে হতে পারত সেটা এতখানি করে মার কাছে বলেছি । তা ছাড়া ঘন পাইনের বনে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ ভালুকের সঙ্গে দেখা হলেও হতে পারত , এও একটা শোনাবার মতো জিনিস ছিল বটে । ঘটবার মতো কিছুই ঘটে নি , কাজেই অঘটন সব জমিয়েছিলুম মনে । আমার সাঁতার দিয়ে পদ্মা পার হওয়ার গল্পও এ-সব গল্পের থেকে খুব বেশি তফাত নয় ।

সতেরো বছরে পড়লুম যখন , ভারতীর সম্পাদকি বৈঠক থেকে আমাকে সরে যেতে হল ।

এই সময়ে আমার বিলেত যাওয়া ঠিক হয়েছে । আর সেই সঙ্গে পরামর্শ হল , জাহাজে চড়বার আগে মেজদাদার সঙ্গে গিয়ে আমাকে বিলিতি চালচলনের গোড়াপত্তন করে নিতে হবে । তিনি তখন জজিয়তি করছেন আমেদাবাদে ; মেজবৌঠাকরুন আর তাঁর ছেলেমেয়ে আছেন ইংলণ্ডে , ফর্লো নিয়ে মেজদাদা তাঁদের সঙ্গে যোগ দেবেন এই অপেক্ষায় ।

শিকড়সুদ্ধ আমাকে উপড়ে নিয়ে আসা হল এক খেত থেকে আর-এক খেতে । নতুন আবহাওয়ার সঙ্গে বোঝাপড়া শুরু হল । গোড়াতে সব-তাতেই খটকা দিতে লাগল লজ্জা । নতুন লোকের সঙ্গে আলাপে নিজের মানরক্ষা করব কী করে এই ছিল ভাবনা । যে অচেনা সংসারের সঙ্গে মাখামাখিও সহজ ছিল না , আর পথ ছিল না যাকে এড়িয়ে যাওয়ার , আমার মতো ছেলের মন সেখানে কেবলই হুঁচট খেয়ে মরত ।

আমেদাবাদে একটা পুরনো ইতিহাসের ছবির মধ্যে আমার মন উড়ে বেড়াতে লাগল । জজের বাসা ছিল শাহিবাগে , বাদশাহি আমলের রাজবাড়িতে । দিনের বেলায় মেজদাদা চলে যেতেন কাজে ; বড়ো বড়ো ফাঁকা ঘর হাঁ হাঁ করছে , সমস্ত দিন ভূতে-পাওয়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি । সামনে প্রকাণ্ড চাতাল , সেখান থেকে দেখা যেত সাবরমতী নদী হাঁটুজল লুটিয়ে নিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে বালির মধ্যে । চাতালটার কোথাও কোথাও চৌবাচ্ছার পাথরের গাঁথনিতে যেন খবর জমা হয়ে আছে বেগমদের স্নানের আমিরিআনার ।

কলকাতায় আমরা মানুষ , সেখানে ইতিহাসের মাথাতোলা চেহারা কোথাও দেখি নি । আমাদের চাহনি খুব কাছের দিকের বেঁটে সময়টাতেই বাঁধা । আমেদাবাদে এসে এই প্রথম দেখলুম চলতি ইতিহাস থেমে গিয়েছে , দেখা যাচ্ছে তার পিছনফেরা বড়ো ঘরোয়ানা । তার সাবেক দিনগুলো যেন যক্ষের ধনের মতো মাটির নীচে পোঁতা । আমার মনের মধ্যে প্রথম আভাস দিয়েছিল ‘ ক্ষুধিত পাষাণ ' এর গল্পের ।

সে আজ কত শত বৎসরের কথা । নহবৎখানায় বাজছে রোশনচৌকি দিনরাত্রে অষ্ট প্রহরের রাগিণীতে , রাস্তায় তালে তালে ঘোড়ার খুরের শব্দ উঠছে , ঘোড়সওয়ারতুর্কি ফৌজের চলছে কুচকাওয়াজ , তাদের বর্শার ফলায় রোদ উঠছে ঝকঝকিয়ে । বাদশাহি দরবারের চার দিকে চলেছে সর্বনেশে কানাকানি ফুস্‌ফাস্‌ । অন্দরমহলে খোলা তলোয়ার হাতে হাবসি খোজারা পাহারা দিচ্ছে । বেগমদের হামামে ছুটছে গোলাবজলের ফোয়ারা , উঠছে বাজুবন্ধ-কাঁকনের ঝন্‌ঝনি । আজ স্থির দাঁড়িয়ে শাহিবাগ , ভুলে-যাওয়া গল্পের মতো ; তার চার দিকে কোথাও নেই সেই রঙ , নেই সেই-সব ধ্বনি — শুকনো দিন , রস-ফুরিয়ে যাওয়া রাত্রি ।

পুরনো ইতিহাস ছিল তার হাড়গুলো বের করে ; তার মাথাটা খুলিটা আছে , মুকুট নেই । তার উপরে খোলস মুখোস পরিয়ে একটা পুরোপুরি মূর্তি মনের জাদুঘরে সাজিয়ে তুলতে পেরেছি তা বললে বেশি বলা হবে । চালচিত্তির খাড়া করে একটা খসড়া মনের সামনে দাঁড় করিয়েছিলুম , সেটা আমার খেয়ালেরই খেলনা । কিছু মনে থাকে , অনেকখানি ভুলে যাই বলে এইরকম জোড়াতাড়া দেওয়া সহজ হয় । আশি বছর পরে এসে নিজেরই যে-একখানা রূপ সামনে আজ দেখা দিয়েছে আসলের সঙ্গে তার সবটা লাইনে লাইনে মেলে না , অনেকখানি সে মনগড়া ।

এখানে কিছুদিন থাকার পর মেজদাদা মনে করলেন , বিদেশকে যারা দেশের রস দিতে পারে সেইরকম মেয়েদের সঙ্গে আমাকে মিলিয়ে দিতে পারলে হয়তো ঘরছাড়া মন আরাম পাবে । ইংরেজি ভাষা শেখবারও সেই হবে সহজ উপায় । তাই কিছুদিনের জন্যে বোম্বাইয়ের কোনো গৃহস্থঘরে আমি বাসা নিয়েছিলুম । সেই বাড়ির কোনো-একটি এখনকার কালের পড়াশুনোওয়ালা মেয়ে ঝক্‌ঝকে করে মেজে এনেছিলেন তাঁর শিক্ষা বিলেত থেকে । আমার বিদ্যে সামান্যই , আমাকে হেলা করলে দোষ দেওয়া যেতে পারত না । তা করেন নি । পুঁথিগত বিদ্যা ফলাবার মতো পুঁজি ছিল না , তাই সুবিধে পেলেই জানিয়ে দিতুম যে কবিতা লেখবার হাত আমার আছে । আদর আদায় করবার ঐ ছিল আমার সবচেয়ে বড়ো মূলধন । যাঁর কাছে নিজের এই কবিআনার জানান দিয়েছিলেম , তিনি সেটাকে মেপেজুখে নেন নি , মেনে নিয়েছিলেন । কবির কাছ থেকে একটা ডাকনাম চাইলেন , দিলেম জুগিয়ে — সেটা ভালো লাগল তাঁর কানে । ইচ্ছে করেছিলেম সেই নামটি আমার কবিতার ছন্দে জড়িয়ে দিতে । বেঁধে দিলুম সেটাকে কাব্যের গাঁথুনিতে ; শুনলেন সেটা ভোরবেলাকার ভৈরবী সুরে ; বললেন , ‘ কবি , তোমার গান শুনলে আমি বোধ হয় আমার মরণদিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি । '

এর থেকে বোঝা যাবে , মেয়েরা যাকে আদর জানাতে চায় তার কথা একটু মধু মিশিয়ে বাড়িয়েই বলে , সেটা খুশি ছড়িয়ে দেবার জন্যেই । মনে পড়ছে তাঁর মুখেই প্রথম শুনেছিলুম আমার চেহারার তারিফ । সেই বাহবায় অনেক সময় গুণপনা থাকত । যেমন একবার আমাকে বিশেষ করে বলেছিলেন , ‘ একটা কথা আমার রাখতেই হবে , তুমি কোনো দিন দাড়ি রেখো না , তোমার মুখের সীমানা যেন কিছুতেই ঢাকা না পড়ে । '

তাঁর এই কথা আজ পর্যন্ত রাখা হয় নি , সে কথা সকলেরই জানা আছে । আমার মুখে অবাধ্যতা প্রকাশ পাবার পূর্বেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ।

আমাদের ঐ বটগাছটাতে কোনো কোনো বছরে হঠাৎ বিদেশী পাখি এসে বাসা বাঁধে । তাদের ডানার নাচ চিনে নিতে নিতেই দেখি তারা চলে গেছে । তারা অজানা সুর নিয়ে আসে দূরের বন থেকে । তেমনি জীবনযাত্রার মাঝে মাঝে জগতের অচেনা মহল থেকে আসে আপন-মানুষের দূতী , হৃদয়ের দখলের সীমানা বড়ো করে দিয়ে যায় । না ডাকতেই আসে , শেষকালে একদিন ডেকে আর পাওয়া যায় না । চলে যেতে যেতে বেঁচে-থাকার চাদরটার উপরে ফুলকাটা কাজের পাড় বসিয়ে দেয় , বরাবরের মতো দিনরাত্রির দাম দিয়ে যায় বাড়িয়ে ।