ছেলেবেলা/৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আমরা যখন ছোটো ছিলুম তখন সন্ধ্যাবেলায় কলকাতা শহর এখনকার মতো এত বেশি সজাগ ছিল না । এখনকার কালে সূর্যের আলোর দিনটা যেমনি ফুরিয়েছে অমনি শুরু হয়েছে বিজলি আলোর দিন । সে সময়টাতে শহরে কাজ কম কিন্তু বিশ্রাম নেই । উনুনে যেন জ্বলা কাঠ নিভেছে তবু কয়লায় রয়েছে আগুন । তেলকল চলে না , ষ্টিমারের বাঁশি থেমে থাকে , কারখানাঘর থেকে মজুরের দল বেরিয়ে গেছে , পাটের-গাঁট-টানা গাড়ির মোষগুলো গেছে টিনের চালের নীচে শহুরে গোষ্ঠে । সমস্ত দিন যে শহরের মাথা ছিল নানা চিন্তায় তেতে আগুন , এখনও তার নাড়িগুলো যেন দব দব করছে । রাস্তার দু ধারে দোকানগুলোতে কেনাবেচা তেমনি আছে , কেবল সামান্য কিছু ছাই-চাপা । রকম-বেরকমের গোঙানি দিতে দিতে হাওয়াগাড়ি ছুটেছে দশ দিকে ; তাদের দৌড়ের পিছনে গরজের ঠেলা কম ।

আমাদের সেকালে দিন ফুরলে কাজকর্মের বাড়তি ভাগ যেন কালো কম্বল মুড়ি দিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ত শহরের বাতি-নেবানো নীচের তলায় । ঘরে-বাইরে সন্ধ্যার আকাশ থম থম করত । ইডেন গার্ডেনে গঙ্গার ধারে শৌখিনদের হাওয়া খাইয়ে নিয়ে ফেরবার গাড়িতে সইসদের হৈ হৈ শব্দ রাস্তা থেকে শোনা যেত । চৈৎ-বৈশাখ মাসে রাস্তায় ফেরিওয়ালা হেঁকে যেত ‘ বরীফ ' । হাঁড়িতে বরফ-দেওয়া নোনতা জলে ছোটো ছোটো টিনের চোঙে থাকত যাকে বলা হোত কুলফির বরফ , এখন যাকে বলে অইস কিংবা আইসক্রীম । রাস্তার দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই ডাকে মন কী রকম করত তা মনই জানে । আর-একটা হাঁক ছিল ‘ বেলফুল ' ।

বসন্তকালের সেই মালীদের ফুলের ঝুড়ির খবর আজ নেই , কেন জানি নে । তখন বাড়িতে মেয়েদের খোঁপা থেকে বেলফুলের গোড়ে মালার গন্ধ ছড়িয়ে যেত বাতাসে । গা ধুতে যাবার আগে ঘরের সামনে বসে সমুখে হাত-আয়না রেখে মেয়েরা চুল বাঁধত । বিনুনি-করা চুলের দড়ি দিয়ে খোঁপা তৈরি হত নানা কারিগরিতে । তাদের পরনে ছিল ফরাসডাঙার কালাপেড়ে শাড়ি , পাক দিয়ে কুঁচকিয়ে তোলা । নাপতিনি আসত , ঝামা দিয়ে পা ঘসে আলতা পরাত । মেয়েমহলে তারাই লাগত খবর-চালাচালির কাজে । ট্রামের পায়দানের উপড় ভিড় করে কলেজ আর আপিস ফেরার দল ফুটবল খেলার ময়দানে ছুটত না । ফেরবার সময় তাদের ভিড় জমত না সিনেমাহলের সামনে । নাটক-অভিনয়ের একটা ফুর্তি দেখা দিয়েছিল , কিন্তু কী আর বলব , আমরা সে-সময়ে ছিলুম ছেলেমানুষ ।

তখন বড়োদের আমোদে ছেলেরা দূর থেকেও ভাগ বসাতে পেত না । যদি সাহস করে কাছাকাছি যেতুম তা হলে শুনতে হত ‘ যাও খেলা কর গে ', অথচ ছেলেরা খেলায় যদি উচিতমতো গোল করত তা হলে শুনতে হত ‘ চুপ করো ' । বড়োদের আমোদ-আহ্লাদ সবসময় খুব যে চুপচাপে সারা হত তা নয় । তাই দূর থেকে কখনো কখনো ঝরনার ফেনার মতো তার কিছু কিছু পড়ত ছিটকিয়ে আমাদের দিকে । এ বাড়ির বারান্দায় ঝুঁকে পড়ে তাকিয়ে থাকতুম , দেখতুম ও বাড়ির নাচঘর আলোয় আলোময় । দেউরির সামনে বড়ো বড়ো জুড়িগাড়ি এসে জুটেছে । সদর দরজার কাছ থেকে দাদাদের কেউ কেউ অতিথিদের উপরে আগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন । গোলাপপাশ থেকে গায়ে গোলাপজল ছিটিয়ে দিচ্ছেন , হাতে দিচ্ছেন ছোটো একটি করে তোড়া । নাটকের থেকে কুলীন মেয়ের ফুঁপিয়ে কান্না কখনো কখনো কানে আসে , তার মর্ম বুঝতে পারি নে । বোঝবার ইচ্ছেটা হয় প্রবল । খবর পেতুম যিনি কাঁদতেন তিনি কুলীন বটে , কিন্তু তিনি আমার ভগ্নীপতি । তখনকার পরিবারে যেমন মেয়ে আর পুরুষ ছিল দুই সীমানায় দুই দিকে , তেমনি ছিল ছোটোরা আর বড়োরা । বৈঠকখানায় ঝাড়-লন্ঠনের আলোয় চলছে নাচগান , গুড়গুড়ি টানছেন বড়োর দল , মেয়েরা লুকনো থাকতেন ঝরোখার ও পারে , চাপা আলোয় পানের বাটা নিয়ে , সেখানে বাইরের মেয়েরা এসে জমতেন , ফিস্‌ফিস করে চলত গেরস্তালির খবর । ছেলেরা তখন বিছানায় । পিয়ারী কিংবা শংকরী গল্প শোনাচ্ছে , কানে আসছে —

‘ জোচ্ছনায় যেন ফুল ফুটেছে — '