ছেলেবেলা/৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

আমাদের সময়কার কিছু পূর্বে ধনীঘরে ছিল শখের যাত্রার চলন । মিহিগলাওয়ালা ছেলেদের বাছাই করে নিয়ে দল বাঁধার ধুম ছিল । আমার মেজকাকা ছিলেন এইরকম একটি শখের দলের দলপতি । পালা রচনা করবার শক্তি ছিল তাঁর , ছেলেদের তৈরি করে তোলবার উৎসাহ ছিল । ধনীদের ঘরপোষা এই যেমন শখের যাত্রা তেমনি ব্যাবসাদারী যাত্রা নিয়েও বাংলাদেশের ছিল ভারি নেশা । এ পাড়ায় ও পাড়ায় এক-একজন নামজাদা অধিকারীর অধীনে যাত্রার দল গজিয়ে উঠত । দলকর্তা অধিকারীরা সবাই যে জাতে বড়ো কিংবা লেখাপড়ায় এমন-কিছু তা নয় । তারা নাম করেছে আপন ক্ষমতায় । আমাদের বাড়িতে যাত্রাগান হয়েছে মাঝে মাঝে । কিন্তু রাস্তা নেই , ছিলুম ছেলেমানুষ । আমি দেখতে পেয়েছি তার গোড়াকার জোগাড়যন্তর । বারান্দা জুড়ে বসে গেছে দলবল , চারি দিকে উঠছে তামাকের ধোঁয়া । ছেলেগুলো লম্বা-চুল-ওয়ালা , চোখে-কালি-পড়া , অল্প বয়সে তাদের মুখ গিয়েছে পেকে । পান খেয়ে খেয়ে ঠোঁট গিয়েছে কালো হয়ে । সাজগোজের আসবাব আছে রঙকরা টিনের বাক্সোয় । দেউড়ির দরজা খোলা , উঠোনে পিল পিল করে ঢুকে পড়ছে লোকের ভিড় । চার দিকে টগবগ করে আওয়াজ উঠছে , ছাপিয়ে পড়ছে গলি পেরিয়ে চিৎপুরের রাস্তায় । রাত্রি হবে নটা , পায়রার পিঠের উপর বাজপাখির মতো হঠাৎ এসে পড়ে শ্যাম , কড়া-পড়া শক্ত হাতের মুঠি দিয়ে আমার কনুই ধরে বলে , ‘ মা ডাকছে , চলো শোবে চলো । ' লোকের সামনে এই টানাহেঁচড়ায় মাথা হেঁট হয়ে যেত , হার মেনে চলে যেতুম শোবার ঘরে । বাইরে চলছে হাঁকডাক , বাইরে জ্বলছে ঝাড়লণ্ঠন , আমার ঘরে সাড়াশব্দ নেই , পিলসুজের উপর টিম টিম করছে পিতলের প্রদীপ । ঘুমের ঘোরে মাঝে-মাঝে শোনা যাচ্ছে নাচের তাল সমে এসে ঠেকতেই ঝমাঝম করতাল ।

সব-তাতে মানা করাটাই বড়োদের ধর্ম । কিন্তু একবার কী কারণে তাঁদের মন নরম হয়েছিল , হুকুম বেরল , ছেলেরাও যাত্রা শুনতে যাবে।ছিল নলদময়ন্তীর পালা। আরম্ভ হবার আগে রাত এগারোটা পর্যন্ত বিছানায় ছিলুম ঘুমিয়ে।বারবার ভরসা দেওয়া হল, সময় হলেই আমাদের জাগিয়ে দেওয়া হবে । উপরওয়ালাদের দস্তুর জানি , কথা কিছুতেই বিশ্বাস হয় না , কেননা তাঁরা বড়ো আমরা ছোটো ।

সে রাত্রে নারাজ দেহটাকে বিছানায় টেনে নিয়ে গেলুম । তার একটা কারণ , মা বললেন তিনি স্বয়ং আমাকে জাগিয়ে দেবেন , আর-একটা কারণ নটার পরে নিজেকে জাগিয়ে রাখতে বেশ-একটু ঠেলাঠেলির দরকার হত । এক সময়ে ঘুম থেকে উঠিয়ে আমাকে নিয়ে আসা হল বাইরে । চোখে ধাঁধা লেগে গেল । একতলায় দোতলায় রঙিন ঝাড়লণ্ঠন থেকে ঝিলিমিলি আলো ঠিকরে পড়ছে চার দিকে , সাদা বিছানো চাদরে উঠোনটা চোখে ঠেকছে মস্ত । এক দিকে বসে আছেন বাড়ির কর্তারা আর যাঁদের ডেকে আনা হয়েছে । বাকি জায়গাটা যার খুশি যেখান থেকে এসে ভরাট করেছে । থিয়েটরে এসেছিলেন পেটে-সোনার-চেন-ঝোলানো নামজাদার দল , আর এই যাত্রার আসরে বড়োয় ছোটোয় ঘেঁষাঘেঁষি । তাদের বেশির ভাগ মানুষই , ভদ্দরলোকেরা যাদের বলে বাজে লোক । তেমনি আবার পালাগানটা লেখানো হয়েছে এমন-সব লিখিয়ে দিয়ে যারা হাত পাকিয়েছে খাগড়া কলমে , যারা ইংরেজি কপিবুকের মক্‌শো করে নি । এর সুর , এর নাচ , এর সব গল্প বাংলাদেশের হাট ঘাট মাঠের পয়দা-করা ; এর ভাষা পণ্ডিতমশায় দেন নি পালিশ করে ।

সভায় যখন দাদাদের কাছে এসে বসলুম , রুমালে কিছু কিছু টাকা বেঁধে আমাদের হাতে দিয়ে দিলেন । বাহবা দেবার ঠিক জায়গাটাতে ঐ টাকা ছুঁড়ে দেওয়া ছিল রীতি । এতে যাত্রাওয়ালার ছিল উপরি পাওনা , আর গৃহস্থের ছিল খোশনাম ।

রাত ফুরোত , যাত্রা ফুরোতে চাইত না । মাঝখানে নেতিয়ে-পড়া দেহটাকে আড়কোলা করে কে যে কোথায় নিয়ে গেল জানতেও পারি নি । জানতে পারলে সে কি কম লজ্জা । যে মানুষ বড়োদের সমান সারে বসে বকশিশ দিচ্ছে ছুঁড়ে , উঠোনসুদ্ধ লোকের সামনে তাকে কিনা এমন অপমান । ঘুম যখন ভাঙল দেখি মায়ের তক্তপোশে শুয়ে আছি । বেলা হয়েছে বিস্তর , ঝাঁ ঝাঁ করছে রোদ্দুর । সূর্য উঠে গেছে অথচ আমি উঠি নি , এ ঘটে নি আর কোনদিন ।

শহরে আজকাল আমোদ চলে নদীর স্রোতের মতো । মাঝে-মাঝে তার ফাঁক নেই । রোজই যেখানে-সেখানে যখন-তখন সিনেমা , যে খুশি ঢুকে পড়ছে সামান্য খরচে । সেকালে যাত্রাগান ছিল যেন শুকনো গাঙে কোশ-দুকোশ অন্তর বালি খুঁড়ে জল তোলা । ঘন্টা কয়েক তার মেয়াদ , পথের লোক হঠাৎ এসে পড়ে , আঁজলা ভরে তেষ্টা নেয় মিটিয়ে ।

আগেকার কালটা ছিল যেন রাজপুত্তুর । মাঝে-মাঝে পালপার্বণে যখন মর্জি হত আপন এলেকায় করত দান-খয়রাত । এখনকার কাল সদাগরের পুত্তুর , হরেক রকমের ঝকঝকে মাল সাজিয়ে বসেছে সদর রাস্তার চৌমাথায় । বড়ো রাস্তা থেকে খদ্দের আসে , ছোটো রাস্তা থেকেও ।