ছেলেবেলা/৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পড়াশুনোর জাঁতাকল চলছেই । ঘর্ঘর শব্দে এই কলে দম দেওয়ার কাজ ছিল আমার সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথের হাতে । তিনি ছিলেন কড়া শাসনকর্তা । তম্বুরার তারে অত্যন্ত বেশি টান দিতে গেলে পটাং করে যায় ছিঁড়ে । তিনি আমাদের মনে যতটা বেশি মাল বোঝাই করতে চেয়েছিলেন তার অনেকটাই ডিঙি উলটিয়ে তলিয়ে গেছে , এ কথা এখন আর লুকিয়ে রাখা চলবে না । আমার বিদ্যেটা লোকসানি মাল ।

সেজদাদা তাঁর বড়ো মেয়েকে শিখিয়ে তুলতে লেগেছিলেন । যথাসময়ে তাকে দিয়েছিলেন লোরেটোতে ভরতি করে । তার পূর্বেই তার ভাষায় প্রথম দখল হয়ে গেছে বাংলায় ।

প্রতিভাকে বিলিতি সংগীতে পাকা করে তুললেন । তাতে করে তাকে দিশি গানের পথ ভুলিয়ে দেওয়া হয় নি সে আমরা জানি । তখনকার দিনে ভদ্র পরিবারে হিন্দুস্থানি গানে তার সমান কেউ ছিল না । বিলিতি সংগীতের গুণ হচ্ছে তাতে সুর সাধানো হয় খুব খাঁটি করে , কান দোরস্ত হয়ে যায় , আর পিয়ানোর শাসনে তালেও ঢিলেমি থাকে না । এ দিকে বিষ্ণুর কাছে দিশি গান শুরু হয়েছে শিশুকাল থেকে । গানের এই পাঠশালায় আমাকেও ভরতি হতে হল । বিষ্ণু যে গানে হাতেখড়ি দিলেন এখনকার কালের কোনো নামী বা বেনামী ওস্তাদ তাকে ছুঁতে ঘৃণা করবেন । সেগুলো পাড়াগেঁয়ে ছড়ার অত্যন্ত নীচের তলায় । দুই-একটা নমুনা দিই —

এক যে ছিল বেদের মেয়ে
এল পাড়াতে
সাধের উলকি পরাতে ।
আবার উলকি পরা যেমন-তেমন
লাগিয়ে দিল ভেলকি
ঠাকুরঝি ,
উলকির জ্বালাতে কত কেঁদেছি
ঠাকুরঝি ।


আরও কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া লাইন মনে পড়ে । যেমন —


চন্দ্র সূর্য হার মেনেছে , জোনাক জ্বালে বাতি
মোগল পাঠান হদ্দ হল ,
ফার্সি পড়ে তাঁতি ।


গণেশের মা , কলাবউকে জ্বালা দিয়ো না ,
তার একটি মোচা ফললে পরে
কত হবে ছানাপোনো ।

অতি পুরোনো কালের ভুলে-যাওয়া খবরের আমেজ আসে এমন লাইনও পাওয়া যায় । যেমন —

এক যে ছিল কুকুরচাটা
শেয়ালকাঁটার বন
কেটে করলে সিংহাসন ।


এখনকার নিয়ম হচ্ছে প্রথমে হারমোনিয়মে সুর লাগিয়ে সা রে গা মা সাধানো , তার পরে হালকা গোছের হিন্দি গান ধরিয়ে দেওয়া । তখন আমাদের পড়াশুনোর যিনি তদারক করতেন তিনি বুঝেছিলেন , ছেলেমানুষি ছেলেদের মনের আপন জিনিস , আর ঐ হালকা বাংলা ভাষা হিন্দি বুলির চেয়ে মনের মধ্যে সহজে জায়গা করে নেয় । তা ছাড়া , এ ছন্দের দিশি তাল বাঁয়া-তবলার বোলের তোয়াক্কা রাখে না । আপনা-আপনি নাড়িতে নাচতে থাকে । শিশুদের মন-ভোলানো প্রথম সাহিত্য শেখানো মায়ের মুখের ছড়া দিয়ে , শিশুদের মন-ভোলানো গান শেখানোর শুরু সেই ছড়ায় — এইটে আমাদের উপর দিয়ে পরখ করানো হয়েছিল ।

তখন হারমোনিয়ম আসে নি এ দেশের গানের জাত মারতে , কাঁধের উপর তম্বুরা তুলে গান অভ্যেস করেছি । কল-টেপা সুরের গোলামি করি নি ।

আমার দোষ হচ্ছে , শেখবার পথে কিছুতেই আমাকে বেশি দিন চালাতে পারে নি । ইচ্ছেমতো কুড়িয়ে-বাড়িয়ে যা পেয়েছি ঝুলি ভরতি করেছি তাই দিয়েই । মন দিয়ে শেখা যদি আমার ধাতে থাকত তা হলে এখনকার দিনের ওস্তাদরা আমাকে তাচ্ছিল্য করতে পারত না , কেননা সুযোগ ছিল বিস্তর । যে কয়দিন আমাদের শিক্ষা দেবার কর্তা ছিলেন সেজদাদা ততদিন বিষ্ণুর কাছে আনমনাভাবে ব্রহ্মসংগীত আউড়েছি । কখনো কখনো যখন মন আপনা হতে লেগেছে তখন গান আদায় করেছি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে । সেজদাদা বেহাগে আওড়াচ্ছেন অতি-গজ-গামিনী রে , আমি লুকিয়ে মনের মধ্যে তার ছাপ তুলে নিচ্ছি । সন্ধে-বেলায় মাকে সেই গান শুনিয়ে অবাক করা খুব সহজ কাজ ছিল ।

আমাদের বাড়ির বন্ধু শ্রীকণ্ঠবাবু দিনরাত গানের মধ্যে তলিয়ে থাকতেন । বারান্দায় বসে বসে চামেলির তেল মেখে স্নান করতেন , হাতে থাকত গুড়গুড়ি , অম্বুরি তামাকের গন্ধ উঠত আকাশে , গুন গুন গান চলত , ছেলেদের টেনে রাখতেন চার দিকে । তিনি তো গান শেখাতেন না , গান তিনি দিতেন ; কখন তুলে নিতুম জানতে পারতুম না । ফুর্তি যখন রাখতে পারতেন না দাঁড়িয়ে উঠতেন , নেচে নেচে বাজাতে থাকতেন সেতার , হাসিতে বড়ো বড়ো চোখ জ্বল জ্বল করত , গান ধরতেন —


‘ ময় ছোড়োঁ ব্রজকী বাসরী ' ।


সঙ্গে সঙ্গে আমিও না গাইলে ছাড়তেন না ।

তখনকার আতিথ্য ছিল খোলা দরজার । চেনাশোনার খোঁজখবর নেবার বিশেষ দরকার ছিল না । যারা যখন এসে পড়ত তাদের শোবার জায়গাও মিলত , অন্নের থালাও আসত যথানিয়মে । সেই রকমের অচেনা অতিথি একদিন লেপমোড়া তম্বুরা কাঁধে করে তাঁর পুঁটুলি খুলে বসবার ঘরের এক পাশে পা ছড়িয়ে দিলেন । কানাই হুঁকোবরদার যথারীতি তাঁর হাতে দিলে হুঁকো তুলে । সেকালে ছিল অতিথির জন্যে এই যেমন তামাক তেমনি পান । তখনকার দিনে বাড়ি-ভিতরে মেয়েদের সকাল বেলাকার কাজ ছিল ঐ— পান সাজতে হত রাশি রাশি , বাইরের ঘরে যারা আসত তাদের উদ্দেশে। চট্‌পট্‌ পানে চুন লাগিয়ে ,কাঠি দিয়ে খয়ের লেপে, ঠিকমতো মসলা ভরে , লঙ্গ দিয়ে মুড়ে সেগুলো বোঝাই হতে থাকত পিতলের গামলায় ; উপরে পরত খয়েরের ছোপলাগা ভিজে ন্যাকড়ার ঢাকা । ও দিকে বাইরে সিঁড়ির নীচের ঘরটাতে চলত তামাক সাজার ধুম । মাটির গামলায় ছাই-ঢাকা গুল , আলোবোলার নলগুলো ঝুলছে নাগলোকের সাপের মতো , তাদের নাড়ির মধ্যে গোলাপ-জলের গন্ধ । বাড়িতে যাঁরা আসতেন সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার মুখে তাঁরা গৃহস্থের প্রথম আসুন মশায় ডাক পেতেন এই অম্বুরি তামাকের গন্ধে । তখন এই একটা বাঁধা নিয়ম ছিল মানুষকে মেনে নেওয়ার । সেই ভরপুর পানের গামলা অনেকদিন হল সরে পড়েছে , আর সেই হুঁকোবরদার জাতটা সাজ খুলে ফেলে ময়রার দোকানে তিন দিনের বাসি সন্দেশ চটকে চটকে মাখতে লেগেছে ।

সেই অজানা গাইয়ে আপন ইচ্ছেমতো রয়ে গেলেন কিছুদিন । কেউ প্রশ্নও করলে না । ভোরবেলা মশারি থেকে টেনে বের করে তাঁর গান শুনতেম । নিয়মের শেখা যাদের ধাতে নেই , তাদের শখ অনিয়মের শেখায় । সকাল বেলায় সুরে চলত বঙশী হমারি রে ।

তার পরে যখন আমার কিছু বয়েস হয়েছে তখন বাড়িতে খুব বড়ো ওস্তাদ এসে বসলেন যদু ভট্র । একটা মস্ত ভুল করলেন , জেদ ধরলেন আমাকে গান শেখাবেনই ; সেইজন্যে গান শেখাই হল না । কিছু কিছু সংগ্রহ করেছিলুম লুকিয়ে-চুরিয়ে — ভালো লাগল কাফি সুরে রুম ঝুম বরখে আজু বাদরওয়া , রয়ে গেল আজ পর্যন্ত আমার বর্ষার গানের সঙ্গে দল বেঁধে । মুশকিল হল , এই সময়ে আর-এক অতিথি হাজির হল কিছু না বলে কয়ে । বাঘমারা বলে তাঁর খ্যাতি । বাঙালি বাঘ মারে এ কথাটা সেদিন শোনাত খুব অদ্ভুত , কাজেই বেশির ভাগ সময় আটকা পড়ে গেলুম তাঁরই ঘরে । যে বাঘের কবলে পড়েছিলেন বলে আমাদের বুকে চমক লাগিয়েছিলেন সে বাঘের মুখ থেকে তিনি কামড় পান নি , কামড়ের গল্পটা আন্দাজ করে নিয়েছিলেন মিউজিয়মে মরা বাঘের হাঁ থেকে — তখন সে কথা ভাবি নি , এখন সেটা পষ্ট বুঝতে পারছি । তবু তখনকার মতো ঐ বীরপুরুষের জন্য ঘন ঘন পান-তামাকের জোগাড় করতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল । দূর থেকে কানে পৌঁছত কানাড়ার আলাপ ।

এই তো গেল গান । সেজদাদার হাতে আমার অন্য বিদ্যের যে গোড়াপত্তন হয়েছিল সেও খুব ফলাও রকমের । বিশেষ কিছু ফল হয় নি , সে স্বভাবদোষে । আমার মতো মানুষকে মনে রেখেই রামপ্রসাদ সেন বলেছিলেন , মন , তুমি কৃষিকাজ বোঝো না । কোনোদিন আবাদের কাজ করা হয় নি ।

চাষের আঁচড় কাটা হয়েছিল কোন্‌ কোন্‌ খেতে তার খবরটা দেওয়া যাক ।

অন্ধকার থাকতেই বিছানা থেকে উঠি , কুস্তির সাজ করি , শীতের দিনে শির্‌শির্‌ করে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতে থাকে । শহরে এক ডাকসাইটে পালোয়ান ছিল , কানা পালোয়ান , সে আমাদের কুস্তি লড়াত । দালানঘরের উত্তর দিকে একটা ফাঁকা জমি , তাকে বলা হয় গোলাবাড়ি । নাম শুনে বোঝা যায় , শহর একদিন পাড়াগাঁটাকে আগা-গোড়া চাপা দিয়ে বসে নি , কিছু কিছু ফাঁক ছিল । শহুরে সভ্যতার শুরুতে আমাদের গোলাবাড়ি গোলা ভরে বছরের ধান জমা করে রাখত , খাস জমির রায়তরা দিত তাদের ধানের ভাগ । এই পাঁচিল ঘেঁষে ছিল কুস্তির চালাঘর । এক হাত আন্দাজ খুঁড়ে মাটি আলগা করে তাতে এক মোন সরষের তেল ঢেলে জমি তৈরি হয়েছিল । সেখানে পালোয়ানের সঙ্গে আমার প্যাঁচ কষা ছিল ছেলেখেলা মাত্র । খুব খানিকটা মাটি মাখামাখি করে শেষকালে গায়ে একটা জামা চড়িয়ে চলে আসতুম । সকাল-বেলায় রোজ এত করে মাটি ঘেঁটে আসা ভালো লাগত না মায়ের , তাঁর ভয় হত ছেলের গায়ের রঙ মেটে হয়ে যায় পাছে । তার ফল হয়েছিল ছুটির দিনে তিনি লেগে যেতেন শোধন করতে । এখনকার কালের শৌখিন গিন্নিরা রঙ সাফ করবার সরঞ্জাম কৌটোতে করে কিনে আনেন বিলিতি দোকান থেকে , তখন তাঁরা মলম বানাতেন নিজের হাতে । তাতে ছিল বাদাম-বাটা , সর , কমলালেবুর খোসা , আরও কত কী — যদি জানতুম আর মনে থাকত তবে বেগম-বিলাস নাম দিয়ে ব্যাবসা করলে সন্দেশের দোকানের চেয়ে কম আয় হত না । রবিবার দিন সকালে বারান্দায় বসিয়ে দলন-মলন চলতে থাকত , অস্থির হয়ে উঠত মন ছুটির জন্যে । এ দিকে ইস্কুলের ছেলেদের মধ্যে একটা গুজব চলে আসছে যে , জন্মমাত্র আমাদের বাড়িতে শিশুদের ডুবিয়ে দেওয়া হয় মদের মধ্যে , তাতেই রঙটাতে সাহেবি জেল্লা লাগে ।

কুস্তির আখড়া থেকে ফিরে এসে দেখি মেডিক্যাল কলেজের এক ছাত্র বসে আছেন মানুষের হাড় চেনাবার বিদ্যা শেখাবার জন্যে । দেয়ালে ঝুলছে আস্ত একটা কঙ্কাল । রাত্রে আমাদের শোবার ঘরের দেয়ালে এটা ঝুলত , হাওয়ায় নাড়া খেলে হাড়গুলো উঠত খট খট করে । তাদের নাড়াচাড়া করে করে হাড়গুলোর শক্ত শক্ত নাম সব জানা হয়েছিল , তাতেই ভয় গিয়েছিল ভেঙে ।


দেউড়িতে বাজল সাতটা । নীলকমল মাস্টারের ঘড়ি-ধরা সময় ছিল নিরেট । এক মিনিটের তফাত হবার জো ছিল না । খট্‌খটে রোগা শরীর , কিন্তু স্বাস্থ্য তাঁর ছাত্রেরই মতো , এক দিনের জন্যেও মাথাধরার সুযোগ ঘটল না । বই নিয়ে শ্লেট নিয়ে যেতুম টেবিলের সামনে । কালো বোর্ডের উপর খড়ি দিয়ে অঙ্কের দাগ পড়তে থাকত — সবই বাংলায় , পাটিগণিত , বীজগণিত , রেখাগণিত । সাহিত্যে ‘ সীতার বনবাস ' থেকে একদম চড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘ মেঘনাদবধ ' কাব্যে । সঙ্গে ছিল প্রাকৃত-বিজ্ঞান । মাঝে মাঝে আসতেন সীতানাথ দত্ত , বিজ্ঞানের ভাসা ভাসা খবর পাওয়া যেত জানা জিনিস পরখ করে । মাঝে একবার এলেন হেরম্ব তর্করত্ন । লাগলুম কিছু না বুঝে মুগ্ধবোধ মুখস্থ করে ফেলতে । এমনি করে সারা সকাল জুড়ে নানারকম পড়ার যতই চাপ পড়ে মন ততই ভিতরে ভিতরে চুরি করে কিছু কিছু বোঝা সরাতে থাকে , জালের মধ্যে ফাঁক করে তার ভিতর দিয়ে মুখস্থ বিদ্যে ফসকিয়ে যেতে চায় , আর নীলকমল মাস্টার তাঁর ছাত্রের বুদ্ধি নিয়ে যে মত জারি করতে থাকেন তা বাইরের পাঁচজনকে ডেকে ডেকে শোনাবার মতো হয় না ।

বারান্দার আর-এক ধারে বুড়ো দরজি , চোখে আতশ কাঁচের চশমা , ঝুঁকে পড়ে কাপড় সেলাই করছে , মাঝে মাঝে সময় হলে নমাজ পড়ে নিচ্ছে — চেয়ে দেখি আর ভাবি কী সুখেই আছে নেয়ামত । অঙ্ক কষতে মাথা যখন ঘুলিয়ে যায় চোখের উপর স্লেট আড়াল করে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি , দেউড়ির সামনে চন্দ্রভান , লম্বা দাড়ি কাঠের কাঁকই দিয়ে আঁচড়িয়ে তুলছে দুই কানের উপর দুই ভাগে । পাশে বসে আছে কাঁকন-পরা ছিপ ছিপে ছোকরা দরোয়ান , কুটছে তামাক । ঐখানে ঘোড়াটা সক্কালেই খেয়ে গেছে বালতিতে বরাদ্দ দানা , কাকগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে ঠোকরাচ্ছে ছিটিয়ে-পড়া ছোলা , জনি কুকুরটার কর্তব্যবোধ জেগে ওঠে — ঘেউ ঘেউ করে দেয় তাড়া ।

বারান্দায় এক কোণে ঝাঁট দিয়ে জমা করা ধুলোর মধ্যে পুঁতেছিলুম আতার বিচি । কবে তার থেকে কচি পাতা বেরবে দেখবার জন্যে মন ছট্‌ফট্‌ করছে । নীলকমল মাস্টার উঠে গেলেই ছুটে গিয়ে তাকে দেখে আসা চাই , আর দেওয়া চাই জল । শেষ পর্যন্ত আমার আশা মেটে নি । যে ঝাঁটা একদিন ধুলো জমিয়েছিল সেই ঝাঁটাই দিয়েছিল ধুলো উড়িয়ে ।

সুর্য উপরে উঠে যায় , অর্ধেক আঙিনায় হেলে পড়ে ছায়া । নটা বাজে । বেঁটে কালো গোবিন্দ কাঁধে হলদে রঙের ময়লা গামছা ঝুলিয়ে আমাকে নিয়ে যায় স্নান করাতে । সাড়ে নটা বাজতেই রোজকার বরাদ্দ ডাল ভাত মাছের ঝোলের বাঁধা ভোজ । রুচি হয় না খেতে ।

ঘণ্টা বাজে দশটার । বড়ো রাস্তা থেকে মন-উদাস-করা ডাক শোনা যায় কাঁচা-আম-ওয়ালার । বাসনওয়ালা ঠং ঠং আওয়াজ দিয়ে চলছে দূরের থেকে দূরে । গলির ধারের বাড়ির ছাতে বড়োবউ ভিজে চুল শুকোচ্ছে রোদ্দুরে , তার দুই মেয়ে কড়ি নিয়ে খেলেই চলেছে , কোনো তাড়া নেই । মেয়েদের তখন ইস্কুল যাওয়ার তাগিদ ছিল না । মনে হত মেয়ে-জন্মটা নিছক সুখের । বুড়ো ঘোড়া পালকিগাড়িতে করে টেনে নিয়ে চলল আমার দশটা-চারটার আন্দামানে । সাড়ে চারটের পর ফিরে আসি ইস্কুল থেকে । জিম্‌নাষ্টিকের মাস্টার এসেছেন । কাঠের ডাণ্ডার উপর ঘণ্টাখানেক ধরে শরীরটাকে উলটপালট করি । তিনি যেতে না যেতে এসে পড়েন ছবি-আঁকার মাস্টার ।

ক্রমে দিনের মরচে পড়া আলো মিলিয়ে আসে । শহরের পাঁচমিশালি ঝাপসা শব্দে স্বপ্নের সুর লাগায় ইঁটকাঠের দৈত্যটার দেহে।

পড়বার ঘরে জ্বলে ওঠে তেলের বাতি । অঘোর মাস্টার এসে উপস্থিত । শুরু হয়েছে ইংরেজি পড়া । কালো মলাটের রীড়ার যেন ওত পেতে রয়েছে টেবিলের উপর । মলাটটা ঢল্‌ঢলে , পাতাগুলো কিছু ছিঁড়েছে , কিছু দাগি , অজায়গায় হাত পাকিয়েছি নিজের নাম ইংরেজিতে লিখে — তার সবটাই ক্যাপিটল অক্ষর । পড়তে পড়তে ঢুলি , ঢুলতে ঢুলতে চমকে উঠি । যত পড়ি তার চেয়ে না পড়ি অনেক বেশি ।


বিছানায় ঢুকে এতক্ষণ পরে পাওয়া যায় একটুখানি পোড়ো সময় । সেখানে শুনতে শুনতে শেষ হতে পায় না-

‘ রাজপুত্তুর চলেছে তেপান্তর মাঠে ' ...