ছেলেবেলা/৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

দিনগুলো এমনি চলে যায় একটানা । দিনের মাঝখানটা ইস্কুল নেয় খাবলিয়ে , সকালে বিকেলে ছিটকিয়ে পড়ে তারই বাড়তির ভাগ । ঘরে ঢুকতেই ক্লাসের বেঞ্চি-টেবিলগুলো মনের মধ্যে যেন শুকনো কনুয়ের গুঁতো মারে । রোজই তাদের একই আড়ষ্ট চেহারা ।

সন্ধেবেলায় ফিরে যেতুম বাড়িতে । ইস্কুলঘরে তেলের বাতিটা তুলে ধরেছে পরদিনের পড়া-তৈরি পথের সিগ্‌ন্যাল । এক-একদিন বাড়ির আঙিনায় আসে ভালুক-নাচ-ওয়ালা । আসে সাপুড়ে সাপ খেলাতে । এক-একদিন আসে ভোজবাজিওয়ালা , একটু দেয় নতুনের আমেজ । আমাদের চিৎপুর রোডে আজ আর ওদের ডুগ্‌ডুগি বাজে না । সিনেমাকে দূর থেকে সেলাম করে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে । শুকনো পাতার সঙ্গে এক জাতের ফড়িঙ যেমন বেমালুম রঙ মিলিয়ে থাকে আমার প্রাণটা তেমনি শুকনো দিনের সঙ্গে ফ্যাকাশে হয়ে মিলিয়ে থাকত ।

তখন খেলা ছিল সামান্য কয়েক রকমের । ছিল মার্বেল , ছিল যাকে বলে ব্যাটবল — ক্রিকেটের অত্যন্ত দূর কুটুম্ব । আর ছিল লাঠিম-ঘোরানো , ঘুড়ি-ওড়ানো । শহরে ছেলেদের খেলা সবই ছিল এমনি কম্‌জোরি । মাঠজোড়া ফুটবল-খেলার লম্ফঝম্ফ তখনো ছিল সমুদ্রপারে । এমনি করে একই মাপের দিনগুলো শুকনো খুঁটির বেড়া পুঁতে চলেছিল আমাকে পাকে পাকে ঘিরে ।

এমন সময় একদিন বাজল সানাই বারোয়াঁ সুরে । বাড়িতে এল নুতন বৌ , কচি শামলা হাতে সরু সোনার চুড়ি । পলক ফেলতেই ফাঁক হয়ে গেল বেড়া , দেখা দিল চেনাশোনার বাহির সীমানা থেকে মায়াবী দেশের নতুন মানুষ । দূরে দূরে ঘুরে বেড়াই , সাহস হয় না কাছে আসতে । ও এসে বসেছে আদরের আসনে , আমি যে হেলাফেলার ছেলেমানুষ ।

দুই মহলে বাড়ি তখন ভাগ করা । পুরুষরা থাকে বাইরে , মেয়েরা ভিতরকোঠায় । নবাবি কায়দা তখনো চলে আসছে । মনে আছে দিদি বেড়াচ্ছিলেন ছাদের উপর নতুন বৌকে পাশে নিয়ে , মনের কথা বলাবলি চলছিল । আমি কাছে যাবার চেষ্টা করতেই এক ধমক । এ পাড়া যে ছেলেদের দাগকাটা গণ্ডির বাইরের । আবার শুকনো মুখ করে ফিরতে হবে সেই ছ্যাৎলাপড়া পুরোনো দিনের আড়ালে ।

হঠাৎ দূর পাহাড় থেকে বর্ষার জল নেমে সাবেক বাঁধের তলা খইয়ে দেয় , এবার তাই ঘটল । বাড়িতে নতুন আইন চালালেন কর্ত্রী । বৌঠাকরুনের জায়গা হল বাড়ি-ভিতরের ছাদের লাগাও ঘরে । সেই ছাদে তাঁরই হল পুরো দখল । পুতুলের বিয়েতে ভোজের পাতা পড়ত সেইখানে । নেমন্তন্নের দিনে প্রধান ব্যক্তি হয়ে উঠত এই ছেলেমানুষ । বৌঠাকরুন রাঁধতে পারতেন ভালো , খাওয়াতে ভালোবাসতেন , এই খাওয়াবার শখ মেটাতে আমাকে হাজির পেতেন । ইস্কুল থেকে ফিরে এলেই তৈরি থাকত তাঁর আপন হাতের প্রসাদ । চিংড়িমাছের চচ্চ্‌ড়ির সঙ্গে পানতা ভাত যেদিন মেখে দিতেন অল্প একটু লঙ্কার আভাস দিয়ে , সেদিন আর কথা ছিল না । মাঝে মাঝে যখন আত্মীয়-বাড়িতে যেতেন , ঘরের সামনে তাঁর চটিজুতোজোড়া দেখতে পেতুম না , তখন রাগ করে ঘরের থেকে একটা-কোনো দামি জিনিস লুকিয়ে রেখে ঝগড়ার পত্তন করতুম । বলতে হত , “ তুমি গেলে তোমার ঘর সামলাবে কে । আমি কি চৌকিদার । '

তিনি রাগ দেখিয়ে বলতেন , ‘ তোমাকে আর ঘর সামলাতে হবে না , নিজের হাত সামলিয়ো । '

এ কালের মেয়েদের হাসি পাবে , তাঁরা বলবেন , নিজের ছাড়া সংসারে কি পরের দেওর ছিল না কোনোখানে । কথাটা মানি । এখনকার কালের বয়স সকল দিকেই তখনকার থেকে হঠাৎ অনেক বেড়ে গিয়েছে । তখন বড়ো-ছোটো সবাই ছিল ছেলেমানুষ ।

এইবার আমার নির্জন-বেদুয়িনি ছাদে শুরু হল আর-এক-পালা — এল মানুষের সঙ্গ , মানুষের স্নেহ । সেই পালা জমিয়ে দিলেন আমার জ্যোতিদাদা ।