বিষয়বস্তুতে চলুন

ছোট কৈলাশ এবং বড় কৈলাশ

উইকিসংকলন থেকে

BENGALI FAMILY LIBRARY.

গার্হস্থ্য বাঙ্গালা পুস্তক সঙ্গ্রহ।

ছোট কৈলাশ এবং বড় কৈলাশ।

শ্রীযুক্ত মধুসূদন মুখোপাধ্যায়

কর্ত্তৃক

ইংরাজী ভাষা হইতে

অনুবাদিত।


Second Edition.

CALCUTTA:

BAHIR MIRZAPORE.

Printed for the Vernacular Literature Com-

mittee, at the Sucharu Press, by

Lallchand Biswas & co.

June 1860.


[Price 1 Anna—মূল্য ৴৹ এক আনা।]

BENGALI FAMILY LIBRARY.

গার্হস্থ্য বাঙ্গালা পুস্তক সঙ্গ্রহ।

ছোট কৈলাশ এবং বড় কৈলাশ।

শ্রীযুক্ত মধুসূদন মুখোপাধ্যায়

কর্ত্তৃক

ইংরাজী ভাষা হইতে

অনুবাদিত।


Second Edition.

CALCUTTA:

BAHIR MIRZAPORE.

Printed for the Vernacular Literature Committee,

at the Sucharu Press, by Lallchand

Biswas & co.

June 1860.


[Price 1 Anna—মূল্য ৴৹ এক আনা।]

ছোট কৈলাশ এবং বড় কৈলাশ।

 কোন সময়ে এক গ্রামে দুই ব্যক্তি বসতি করিত, দুই জনেরই এক নাম, উভয়কেই লোকে কৈলাশ বলিয়া ডাকিত, তাহাদের এক জনের চারি ঘোড়া, আর এক জনের কেবল একটিমাত্র ঘোড়া ছিল। পাছে দুই নামে গোলযোগ হয়, অতএব বিশেষ করিবার নিমিত্ত যাহার চারি ঘোড়া লোকে তাহাকে বড় কৈলাশ এবং যাহার কেবল একটি মাত্র ঘোড়া তাহাকে ছোট কৈলাশ বলিত। এটি অতি আশ্চর্য্য উপাখ্যান, এক্ষণে তাহাদের উভয়ের মধ্যে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল তাহা পাঠকদিগকে শুনাই।

 []ছোট কৈলাশ আপনার একমাত্র ঘোড়াটি ঐ বড় কৈলাশকে গাঁতা দিয়া সমস্ত সপ্তাহ তাহার নিমিত্ত চাষের কর্ম্ম করিত। বড় কৈলাশ তৎপরিবর্ত্তে সপ্তাহের মধ্যে কেবল এক দিন অর্থাৎ রবিবারে আপনার চারি ঘোড়া দিয়া ঐ ছোট কৈলাশকে সাহায্য করিত। তাহাতে সে একেবারে ঐ পাঁচ ঘোড়া লাঙ্গলে যুড়িয়া অহঙ্কারে চাবুক মারিয়া কহিত, ওর সাত দিন, আমার এক দিন; ওর সাত দিনে যা হইবে আমার এক দিনে তা হইবে।

 বড়কৈলাশ-প্রভৃতি আর আর চাষালোকেরা নিজ নিজ ক্ষেত্রমধ্যে চাষ করিতে গিয়া দেখিত, যে ছোট কৈলাশ একেবারে পাঁচটা ঘোড়া লাঙ্গলে যুড়িয়া কৃষি কার্য্য করি-তেছে। সে বড়ই আহ্লাদিত, ঘন ঘন চাবুক মারিয়া কহি-তেছে, বাহবা! আমার পাঁচ ঘোড়া।

 বড় কৈলাশ এই কথাতে রাগান্ধ হইয়া কহিত, কৈলাশ তুমি এমন কথা বলিও না, তোমারতো পাঁচটা ঘোড়া নয়, কেবল একটা। কিন্তু আরবার কোন ব্যক্তিকে ঐ স্থান দিয়া গমনাগমন করিতে দেখিলে ছোট কৈলাশ পূর্ব্বকথা সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হইয়া কহিত, বাহা! আমার পাঁচ ঘোড়া।

 ইহা শুনিয়া বড় কৈলাশ কহিল এক্ষণে স্থির কহিতেছি, তুমি আপনার মুখ বন্ধ কর; আরবার আমি একথা শুনিতে পাইলে, তোমার ঐ ঘোড়াটির মাথাতে এমনি লাঠি মারিব, যে, এখনই সে ভূমিতে পড়িয়া মরিবে; তাহা হইলে একবারে তোমার সব শেষ হইবে।

 ছোট কৈলাশ ভীত হইয়া বলিল আমি ওকথা আর বলিব না, যথার্থ কহিতেছি আমি আর বলিব না; কিন্তু যখন আরও কতকগুলিন লোক সেই স্থান দিয়া যাইতেই মাথা লাড়িয়া তাহাকে সেলাম করে, তখন সে বড় খুশী হইয়া মনে করে পাঁচ ঘোড়া যুড়িয়া আমার ভূমি চাষ করা কেমন সুন্দর দেখাইতেছে। অতএব সে চাবুক মারিয়া উচ্চৈঃ-স্বরে কহে, বাহবা! আমার পাঁচ ঘোড়া।

 আমি তোমার ঘোড়াকে বাহবা দেখাইব, ইহা বলিয়া বড় কৈলাশ ছোট কৈলাশের ঐ এক মাত্র ঘোড়ার মস্তকে এমনি আঘাত করিল যে উহা ভূমিতে পড়িয়া মরিয়া গেল।

 ছোট কৈলাশ রোদন করিতে বলিল, আহা কি দুঃখ! এক্ষণে আমার আর একটীও ঘোড়া নাই। কি করে, সে ঘোটকের চামড়া খানি খুলিয়া বাতাসে শুখাইতে দিল, এবং ভালরূপে শুষ্ক হইলে, তাহা একটা থলিয়ার ভিতর পুরিয়া আপন পৃষ্ঠে ঝুলাইয়া লওত নিকটবর্ত্তী সহরের ভিতর বিক্রয় করিতে গেল।

 বহু দূর না গেলে সে নগরে পৌঁছিতে পারা যায় না। পথি মধ্যে এক নিবিড় অন্ধকারময় বন ছিল। সেই বন দিয়া যাইতেই অতিশয় ঝড় উপস্থিত হইল। তখন কৈলাশ নিরুপায় হইয়া, কি করিবে তাহার কিছুই অনুভব করিতে পারিল না। সূর্যদেব অস্ত হইয়াছেন, সন্ধ্যাকাল আগত, রাত্রি হইবার পূর্ব্বে না সহরে পৌঁছিতে পারে, না ঘরে পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিতে পারে, কারণ সেই স্থান হইতে দুইই বহু দূর ছিল।

 পথের ধারে অনেক শস্য-ক্ষেত্র ছিল, তন্মধ্যে এক কৃষকের বাস স্থান। ঐ বসদ্বাটীর জানালাগুলিন বদ্ধ থাকিলেও তাহার উপর দিয়া অল্প২ আলো বাহির হইতেছিল। ছোট কৈলাশ মনে চিন্তা করিতে লাগিল, আমি ঐ বাটীর চাঁদনিতে থাকিয়া এ রাত্রি কাটাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিলে, বোধ করি গৃহস্থেরা আমায় থাকিতে দিলেও দিতে পারে। অতএব সে দ্বারে যাইয়া আঘাত করিতে লাগিল।

 কৃষকের স্ত্রী দ্বার মোচন পূর্ব্বক তাহার সমুদায় প্রার্থনা শ্রবণ করিয়া কহিল, আমার স্বামী ঘরে নাই, আমি একাকিনী এই বাটির মধ্যে এক্ষণে অবস্থিতি করিতেছি, তুমি আর কোন স্থানে গমন কর, আমি কোন মতে অপরিচিত লোককে গৃহ মধ্যে স্থান দিতে পারি না।

 ছোট কৈলাশ আপন সম্মুখে কৃষক স্ত্রীকে দ্বারে খিল দিতে দেখিয়া বলিতে লাগিল, ভাল তবে আমি বাহিরে শুইয়া রাত্রি যাপন করি।

 সেই বাটীর অতি নিকটে একটা শুষ্ক ঘাসের পালুই ছিল, তাহার সঙ্গে এবং ঘরের সঙ্গে খড়ের ছাউনি একচালা দ্বারা সংযোগ থাকাতে এক ঝুপড়ির মত হইয়াছিল।

 ছোট কৈলাশ ছাদ বোধে মনে২ স্থির করিল, আমি এই খানেই শুইয়া থাকি, ঘাসের পালুই আমার পক্ষে অদ্য উত্তম শয্যা হইবেক, এবং (চালের উপর একটা হাড়গিলার বাসা, তথা ঐ পক্ষীটা বসিয়া রহিয়াছে) দেখিয়া সে মনে করিল বোধ করি ঐ হাড়গিলা পক্ষীটা আসিয়া আমার পায়ে ঠোকরাইবে না।

 ছোট কৈলাশ গুড়িমারিয়া ঝুপড়ির ভিতর প্রবেশ পূর্ব্বক তন্মধ্যে শয়ন করিয়া রহিল, কিন্তু কোন মতেই তাহার নিদ্রা হইল না; নিদ্রা হইবার প্রত্যাশায় সে এপাশ ওপাশ লড়িতে চড়িতে লাগিল, আর জানালার কপাট সকল উপর পর্য্যন্ত উত্তম রূপে বদ্ধ না হওয়াতে, সে ঘরের ভিতর যাহা২ হইতেছিল, সকলই বাহিরে থাকিয়া দেখিতে পাইল। দেখিল, ঘরের মধ্যে মদ্য মাংস প্রভৃতি নানা প্রকার উপাদেয় খাদ্য দ্রব্য আছে, কৃষকের স্ত্রী ও আর এক বৈরাগী দুই জনে বসিয়া তাহা আহার করিতেছে। মদের বোতল লইয়া কৃষক ভার্য্যা বৈরাগীকে মদ ঢালিয়া দিতেছে। বৈরাগী মাছ ভাজা অতিশয় ভাল বাসিত, অতএব ব্যস্ত সমস্ত হইয়া তাহা মাছ ভাজা দিয়া আহার করিতে লাগিল।

 ছোট কৈলাশ জানালার কাছ পর্য্যন্ত আপনার মাথাটি বাড়াইয়া মনেই চিন্তা করিতে লাগিল, আর তোর ভাল হোগ! কাবাব, কোপ্তা, পলাও, প্রভৃতি সকলই দেখিতে পাইতেছি; এত বড় মজার খাওয়া, আমি উহার কিছু পাইতে ইচ্ছা করি।

 এমত সময়ে সে শুনিতে পাইল যেন একজন ঘোড়ায় চড়িয়া খট্ খট্ করিয়া আসিতেছে। সে ঐ স্ত্রীলোকের স্বামী ঘরে আসিতেছিল।

 কৃষক বড় ভালমানুষ ছিল, দোষের মধ্যে এই, সে গোঁড়া বৈরাগীদিগকে অতিশয় ঘৃণা করিয়া তাহাদিগকে চক্ষেও দেখিতে পারিত না, দেখিলে তাহার অতিশয় রাগ উপস্থিত হইত, তজ্জন্য ঐ বৈরাগী কৃষক স্থানান্তর যাওয়াতে তাহার স্ত্রীকে দেখিতে গিয়াছিল। দুষ্টাস্ত্রীর মনের ভাব কে বুঝিতে পারে, সে গৃহের মধ্যে যাহা যাহা উপাদেয় খাদ্য দ্রব্য ছিল, তাহা ঐ বৈরাগীকে প্রেমভাবে খাওয়াইতেছিল। কিন্তু স্বামির আগমনের শব্দ শুনিয়া সে সশঙ্কচিত্তে বৈরাগির নিকটে নিবেদন করিল, দেখ ভাই বৈরাগী! বড় বিপদ দেখিতে পাই, তোমার পলাইবারও কোন সুযোগ দেখিতেছি না, অতএব তুমি এই প্রকাণ্ড সিন্দুকের মধ্যে লুকাইয়া থাক। বৈরাগী জানিত যে কৃষক তাহাদের এক প্রকার শত্রু, তাহাদিগকে দেখিতে পারে না। কিজানি কাটিয়া ফেলিলেও ফেলিতে পারে, কাজেকাজেই ঐ স্ত্রীলোকের কথাতে তাহাকে সম্মত হইয়া সিন্দুকের মধ্যে লুকাইতে হইল। ইত্যবসরে কৃষকভার্য্যা সত্বর হইয়া, সরাপ প্রভৃতি আর আর উত্তমোত্তম খাদ্যদ্রব্য লইয়া এক তুন্দুরের মধ্যে রাখিল। তাহার স্বামী যেন কোন মতে তাহা দেখিতে না পায়, একারণ সে বড়ই উৎকণ্ঠিতা হইল, কিজানি দেখিলে সে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করিবে, আজতো বড়ঘটা দেখিতে পাই, এত আয়োজনইবা কাহার নিমিত্তে হইয়াছিল?

 ছোট কৈলাশ এই রূপে ঝুপড়ির মধ্যে হইতে খাবার জিনিস পত্র সরাইতে দেখিয়া দুঃখে হায় হায়, শব্দ করিতে লাগিল।

 অনন্তর কৃষক ছোট কৈলাশকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, উপরে কেও? কেও? ওখানে কেন শুইয়া আছ? ইচ্ছা হয় তো আমার সঙ্গে বাটীর ভিতরে আইস। কৃষকের এই কথাতে কৈলাশ যেরূপে পথ হারাইয়াছিল, তাহার আদ্যান্ত সমুদায় বিবরণ জ্ঞাত করাইয়া সে রাত্রি ঐ কৃষকের বাটীতে থাকিয়া রাত্রি কাটাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিল। তাহাতে কৃষক বলিল, ভাল, অদ্য রাত্রি তুমি আমার বাটীতে থাকিয়া কালযাপন করিও, কিন্তু আগেতো কিছু আহার করিতে হইবে।

 গৃহে উপস্থিত হইলে কৃষকভার্য্যা আত্মীয়ভাবে উভয়কেই সম্বর্দ্ধনা করিয়া কেবল ডাল ভাত আনিয়া তাহাদিগকে ভোজন করিতে দিল। কৃষক অতিশয় ক্ষুধার্ত্ত ছিল, ক্ষুধার বলে ঐ সকল খাদ্য সামগ্রী সে ব্যগ্র হইয়া আহার করিতে লাগিল, কিন্তু কাবাব, মাছ ভাজা, মৎস্যের ঝোল প্রভৃতি যে সকল উপাদেয় খাদ্য দ্রব্য তুন্দুরে লুক্কায়িত ছিল, ছোট কৈলাশ তাহা জানিত, ভোজন করিতে করিতে উহা স্মরণ হইলে সে বড়ই অন্যমনস্ক হইল।

 অপর নিকটবর্ত্তী নগরে বিক্রয় করিবার নিমিত্ত যে থলিয়ার ভিতরে সে ঘোড়ার চামড়াখানি রাখিয়াছিল, তাহা তাহার হাতের নিকট ছিল। পুর্ব্বদত্ত ডাল ভাত ভক্ষণ না করিয়া, ছোট কৈলাশ থলিয়াস্থিত শুষ্ক চর্ম্মের উপর গোপন ভাবে আঘাত করিবাতে, চামড়াখানি কোঁ কোঁ শব্দ করিয়া উঠিল।

 ছোট কৈলাশ বলিল, আরে মর চুপ? এত গোল করিস কেন? আরবার আঘাত করিল; পরে তাহাতে ঐ থলিয়া পূর্ব্বাপেক্ষা আরও অধিক শব্দ করিয়া উঠিল।

 কৃষক বলিল, বাহবা, এ আবার কি? তোমার থলিয়ার ভিতর কি আছে? ছোট কৈলাশ বলিল, মহাশয় এ এক জন কুহকী মায়াবিদ্যা দ্বারা ভূত ভবিষ্যৎ সকল বিষয় বলিয়া দিতে পারে, এ বলিতেছে তুন্দুরে কাবাব মাছ ভাজা এবং ঝোল প্রভৃতি উপাদেয় সামগ্রী থাকিতেও ডাল ভাত খাওয়া তোমাদের পক্ষে কোন মতেই উচিত নয়।

 বটে! এই শব্দ করিয়া কৃষক অতি শীঘ্র তুন্দুরের নিকট গিয়া তাহা খুলিবামাত্র দেখে, যে তাহার স্ত্রী তন্মধ্যে উত্তমোত্তম ভক্ষ্য দ্রব্য সকল লুকাইয়া রাখিয়াছে; গন্ধেতে তুন্দুরটা আমোদিত। ইহাতে থলিয়াস্থিত কুহকীর ভোজ বিদ্যার প্রতি তাহার অতিশয় শ্রদ্ধা হইল, সে বিশ্বাস করিল ঐ মায়াবীই ভোজ বিদ্যা প্রভাবে তাহাদিগকে উহা বলিয়া দিয়াছে। কৃষক ভার্য্যা একটিও কথা বলিল না; ধীরে ধীরে খাবার সামগ্রী গুলিন সন্মুখে আনিয়া দিলে তাহারা ব্যগ্র হইয়া ঐ কাবাব মাছ ভাজা এবং মৎস্যের ঝোল সকল ভোজন করিতে লাগিল। খাওয়া সাঙ্গ হইলে ছোট কৈলাশ পুনর্ব্বার থলিয়াটিকে আঘাত করাতে পূর্ব্ববৎ উহা কোঁ কোঁ করিয়া উঠিল।

 কৃষক জিজ্ঞাসা করিল, এখন আবার কি বলে? ছোট কৈলাশ বলিল, কুহকী ঘরের কোণে উনানের নিকট তিন বোতল সরাপ আছে, তাহা লইয়া পান করিতে বলিতেছে। কি করে কৃষকের রমণী এই কথা শুনিবামাত্র সেই স্থান হইতে লুক্কায়িত মদ্য আনিয়া তাহাদিগকে পান করিতে দিলে, কৃষক ও কৈলাশ তাহা পান করিয়া অতিশয় আহ্লাদিত হইল। মদ্য পান করিয়া অল্প একটুক নেশা হইয়াছে, এমত সময়ে সে মনে করিল ছোট কৈলাশের থলিয়াস্থিত কুহকীর ন্যায় একটা কুহকী পাইলে আমার পক্ষে বড় ভাল হয়।

 কৃষক জিজ্ঞাসা করিল, ভাই কৈলাশ! আমি এক্ষণে আনন্দভাবে আছি, তোমার কুহকী ভোজ বিদ্যা বলে কি শয়তানের কথা বলিয়া দিতে পারে? আমার ইচ্ছা হয় তাহাকে এক বার দেখি।

 ছোট কৈলাশ বলিল সে বলিবে না কেন? অবশ্যই বলিবে, আমি তাহাকে যাহা বলি সে তাহাই করে, ইহা বলিয়া সে থলিয়ার উপর পুনর্ব্বার আঘাত করাতে তন্মধ্যস্থ চামড়াখানি কোঁকোঁ করিয়া উঠিল। ঐ দেখ তুমি শুনছ না, সে বলিতেছে আমি অবশ্য উত্তর করিব। কিন্তু তুমি যে শয়তানের কথা কহিতেছ সে দেখিতে অতিশয় কুৎসিৎ, অতএব তাহাকে না দেখাই উচিত বোধ হইতেছে।

 কৃষক বলিল, ইঃ, আমি ভয় করি না; তাহাকে কিসের মত দেখায়?

 ছোট কৈলাশ বলিল, তাহাকে ঠিক জীবিত বৈরাগীর ন্যায় দেখায়।

 কৃষক বলিল তবে উহা যথার্থই কুৎসিৎ বটে, কিন্তু তুমি বেশ জেন, আমি গোঁড়া বৈরাগীদিগকে দৃষ্টি পথে সহ্য করিতে পারি না। ভাল, তাহাতে কিছু আইসে যায় না, উহা ভূততো বটে, তাহা জানিতে পারিলেই হলো, বোধ করি তাহাকে দেখিলে আমার বড় একটা ভয় হইবে না, সহজেই সহ্য করিতে পারিব, এক্ষণে আমার অতিশয় সাহস হইয়াছে, কিন্তু একটা কথা বলি, সে যেন আমার অতি নিকটে না আইসে।

 ভাল আমার মায়াবীকে জিজ্ঞাসা করি, এই কথা বলিয়া ছোট কৈলাশ ঐ থলিয়াটি আরবার আঘাত করিয়া কৃষকের কাণে হাত দিয়া বলিল কুহকী কি বলে তা শুন।

 কৃষক বলিল, আমি তো কিছুই শুনিতে পাই না; ওকি বলিতেছে?

 ছোট কৈলাশ বলিল, সে বলিতেছে ঘরের কোণে সিন্দুকের ভিতর শয়তান হেট হইয়া রহিয়াছে, তুমি গিয়া খুলিলেই তাহা দেখিতে পাইবে, কিন্তু সাবধান সিন্দুকের ডালাখানি শক্ত করিয়া ধরিও যেন সে পালিয়া না যায়।

 আমি ধর্‌বো, কিন্তু তুমি সাহায্য করিও, এই কথা বলিয়া কৃষক যে সিন্দুকে তাহার স্ত্রী বৈরাগীকে লুকাইয়া রাখিয়াছিল তাহার নিকটে গেল। বৈরাগী তাহার ভিতর বসিয়া ভয়ে বড় কম্পবান্ হইতে লাগিল।

 কৃষক অল্পে অল্পে ডালা খানি তুলিয়া ভিতরে উকি মারিবামাত্র দশ হাত পিছে লাফিয়া আইল, এবং উচ্চৈঃস্বরে বলিল এখন আমি দেখেছি, দেখেছি, ভূতটা ঠিক আমাদের বৈরাগির মত; বাপরে বাপ্‌ কি ভয়ানক বিষয়।

 এই রূপ মনের চঞ্চলতা হেতু মদ্যপান করিবার আবশ্যক হওয়াতে, অধিক রাত্রি পর্য্যন্ত তাহারা মদ্যপান করিতে লাগিল।

 অনন্তর কৃষক ছোট কৈলাশকে সম্বোধন করিয়া বলিল, তুমি কুহকীকে আমার নিকট বিক্রয় কর, যে মূল্য চাহিবে আমি তাহাই দিব, এক্ষণে কত মূল্য লইবে তাহা বল, অধিক দাম দুনা করিবার আবশ্যক নাই, আমি একেবারে কহিতেছি, তুমি উহা আমাকে বিক্রয় করিলে আমি তোমায় এক আঢ়ী টাকা দিব।

 ছোট কৈলাশ বলিল ইহা কি হইতে পারে? আমি তোমাকে যথার্থ কহিতেছি, তাহা কখনই হইতে পারিবে না, ভাল একবার বিবেচনা কর দেখি, এমত এক কুহকী দ্বারা আমার কত উপকার হয়?

 কৃষক বলিল, এ কথা যথার্থ বটে, কিন্তু আমি উহাকে পাইতে বড়ই ইচ্ছা করি, অতএব অনুগ্রহ করিয়া তুমি আমাকে উহা দেহ, এই কথা বলিয়া কৃষক বারম্বার উহা চাহিতে লাগিল।

 অবশেষে ছোট কৈলাশ বলিল, ভাল তুমি অতি দয়ালু মনুষ্য। অদ্য রাত্রিকালে আমাকে আশ্রয় দিয়া অনেক অনুগ্রহ প্রকাশ করিয়াছ, আমি একটি কথাও বলিব না। তুমি এক আঢ়ী টাকা দিলেই আমি তোমাকে কুহকী বিক্রয় করিব, কিন্তু যেন মনে থাকে, আঢ়ীটা কোন মতে অসম্পূর্ণ না হয়।

 কৃষক বলিল, তার জন্যে ভাবনা করিও না, আমি তোমাকে এক আঢ়ী টাকা বলিয়াছি, পূর্ণ এক আঢ়ী টাকাই দিব, কিন্তু এই সিন্দুকটি তোমাকে লইয়া যাইতে হইবে, আমি আর ক্ষণকালের নিমিত্তেও ইহা বাটীতে রাখিব না, কি জানি অমঙ্গলকারী ঐ ভূতটা ইহার ভিতর থাকিলেও থাকিতে পারে।

 অনন্তর ছোটকৈলাশ শুষ্ক চর্ম্ম সংযুক্ত থলিয়াটি কৃষককে প্রদান করিয়া তৎপরিবর্ত্তে পূর্ণিত এক আঢ়ী টাকা পাইল। আর তৎস্থান হইতে প্রস্থান করিবার কালীন কৃষক পণাতিরিক্ত আর এক খানি হাতগাড়ী তাহাকে দিল; তাহাতে সে স্বচ্ছন্দে টাকার আঢ়ী এবং সিন্দুকটা লইয়া গমন করিতে পারিল।

 এই রূপে সে কৃষকের স্থানে বিদায় প্রাপ্ত হইয়া যে সিন্দুকের ভিতর ঐ বৈরাগী ছিল, সেই সিন্দুক, এবং এক আঢ়ী টাকা এই সকল জিনিস পত্র সঙ্গে লওত চলিয়া গেল।

 পূর্ব্ব কথিত বনের এক ভাগে অতি বিস্তারিত গভীর জল পূর্ণ একটা নদী ছিল। অতিশয় স্রোতস্বতী, তাহাতে তৃণ মাত্র তিষ্ঠিতে পারিত না, স্রোতের বেগে সকলই ভাসিয়া যাইত। কেহই তাহাতে সাঁতার দিতে পারিত না। ইতি পূর্ব্বে তাহার উপর একটা নূতন সাঁকো বন্ধন হইয়াছিল, ছোট কৈলাশ যাইতে যাইতে ঐ সাঁকোর মধ্য-স্থলে বিরাম করিয়া এমনি চীৎকার করিয়া কহিতে লাগিল, যেন তাহা সিন্দুক মধ্য স্থিত বৈরাগীর কর্ণগোচর হয়, আরে মলো যা, এ কদাকার সিন্দুকটা লইয়া আমি কি করিব, এটা কি ভারি, যেন পাথরে পূর্ণিত হইয়াছে। দূর কর, আমি আর উহাকে টানিয়া লইয়া যাইতে পারি না। জলে ফেলিয়া দি, কেন এত দুঃখ ভোগ করি? তবে আমার বাটী পৌছন পর্য্যন্ত জলে ভাসিতে২ যদি ইহা আমার সঙ্গে যায়, বড়ই ভাল, নতুবা ইহার জন্য আমার কি ক্ষতি আছে।

 অল্পে২ সিন্দুকটা তুলিয়া দোলাইতে লাগিল, যেন সে জল মধ্যে নিক্ষেপ করিতে যাইতেছে।

 বৈরাগী সিন্দুকের মধ্য হইতে চীৎকার করিয়া বলিল, ত্যাগ কর, ত্যাগ কর; সিন্দুক যেমন আছে তেমনি থাকুক, প্রথমতঃ আমাকে এক বার বাহির হইতে দেও।

 ছোট কৈলাশ যেন অতিশয় ভয় পাইয়াছে, এই রূপ ছল করিয়া বলিতে লাগিল, বাপ্‌রে বাপ্, আরে মলো, কি আপদ, ভূতটা এখনও ইহার ভিতরে আছে। অতি শীঘ্রই ইহাকে জলে ফেলিয়া দেওয়া আমার উচিত হইয়াছে, মরুক, এটা ডুবিয়া মরুক।

 এই কথা শুনিবামাত্র বৈরাগী প্রাণ ভয়ে কম্পিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিল, না, না, না, এমন কর্ম্ম কদাচ করিও না; তুমি আমাকে ছাড়িয়া দিলে আমি তোমায় আর এক আঢ়ী টাকা দিব।

 ছোট কৈলাশ সিন্দুক খুলিয়া বলিল, এ কথা ভাল বটে, সত্য করিয়া বলিতেছ আমাকে এক আঢ়ী টাকা দিবে। বৈরাগী সত্য করণান্তর আস্তে২ গুড়ি মারিয়া তাহার ভিতর হইতে বাহিরে আইল, এবং খালি সিন্দুক জলে নিঃক্ষেপ করতঃ আপনার ঘরে গিয়া ছোট কৈলাশের নিমিত্ত টাকাতে একটা আঢ়ী পূর্ণ করিল। অপর বৈরাগী ছোট কৈলাশকে সম্বোধন করিয়া কহিল, ভাই তুমি! আমার প্রাণ রক্ষা করিয়াছ, অতএব এক্ষণে তাহার পুরস্কার স্বরূপ এই আঢ়ক পূর্ণ মুদ্রা সকল লহ। পূর্ব্বে এক আঢ়ী টাকা ও এক খানি হাতগাড়ী সে কৃষকের নিকট পাইয়াছিল, এক্ষণে বৈরাগীর নিকট আর এক আঢ়ী টাকা পাওয়াতে দুই আঢ়ী টাকা দ্বারা তাহার হাত গাড়ী পূর্ণ হইয়া গেল।

 বাটীতে পৌঁছিলে পর, সে আঢ়ী স্থিত টাকা গুলিন ঘরের মেঝ্যার মধ্যে ঢালিয়া দিয়া দেখিল যে টাকাতে একটা রাশি হইয়াছে। মনে২ বিবেচনা করিতে লাগিল, যাহা হউক, ঘোড়া যাউক তাহতে দুঃখ নাই, তৎপরিবর্ত্তে আমি বিস্তর লাভ করিয়াছি। আমি একটা ঘোড়ায় এত ধন পাইয়াছি, এ কথা বড় কৈলাশ শুনিলে অতিশয় উদ্বিগ্ন হইবে। কিন্তু কি রূপে এ সকল হইল তাহা আমি যথার্থতঃ প্রকাশ করিয়া বলিব না।

 এই বিবেচনাতে সে একটা আঢ়ী আনিবার নিমিত্ত বড় কৈলাশের নিকট এক বালককে পাঠাইয়া দিল।

 বালক প্রমুখাৎ আঢ়ীর কথা শুনিয়া বড় কৈলাশ মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিল, আঢ়ীতে তাহার কি প্রয়োজন আছে? ভাল কি মাপ্ করিবে আমি তাহা জানিতে চাহি, অতএব সে আঢ়ীর তলায় গুড় মাখাইয়া দিল, যেন পরিমিত দ্রব্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা গুলিন তাহাতে শক্ত রূপে লাগিলা থাকে।

 যাহা ভাবিল তাহাই ঘটিল, কারণ আড়ীটা পুনঃ প্রাপ্ত হইয়া বড় কৈলাশ দেখিল, যে তাহাতে ক্ষুদ্র২ দুই তিনটী সিকি ও দুয়ানী লাগিয়া রহিয়াছে। চটচট্যা গুড়ের নিমিত্ত তাহা পড়িতে পারে নাই।

 বড় কৈলাশ বিস্ময়াপন্ন হইয়া কহিল, বাহবা! ইহাতে সিকি দুয়ানি লাগিয়াছে কেন? ভাল দেখা যাউক দেখি ইহা কি প্রকারে ঘটিয়াছে। দৌড়া দৌড়ী করিয়া ছোট কৈলাশের বাটীতে গমন করতঃ সে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তুমি এত টাকা কোথায় পাইলে? ছোট কৈলাশ বলিল, কেন? কল্য আমি ঘোড়ার চামড়া বিক্রয় করিয়া এই সমুদায় টাকা প্রাপ্ত হইয়াছি, আর কি?

 বড় কৈলাশ বলিল বটে, আমার বোধে ইহার তো বেশ্ দাম হইয়াছে, তুমি ইহা অপেক্ষা অধিক আর কি প্রত্যাশা কর? পরে সে বাটী গিয়া কুঠার বাহির করত একে একে আপনার চারিটি ঘোড়ার মস্তকে আঘাত করিল, তাহাতে ঘোড়াগুলিন মরিয়া গেলে তাহাদের গাত্র হইতে চর্ম্ম খসাইয়া লইল, এবং মস্তকে বহন করিয়া নিকটবর্ত্তী সহরে বিক্রয় করিতে গেল। চামড়া চাই, চামড়া চাই, কেহ শুষ্ক চামড়া লবে, বলিয়া সে পথে পথে চীৎকার করিতে লাগিল। তাহাতে অনেকানেক জুতাওয়ালা দোকানদার এবং মুচী আসিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, তোমার এ চাম্‌ড়ার দাম কি?

 বড় কৈলাশ বলিল, এক এক খান চামড়ার দাম এক এক আঢ়ী টাকা? তাহারা বলিল, তুমি কি পাগল হইয়াছ, আঢ়ী দ্বারা টাকা কে কোথায় পরিমাণ করিয়া থাকে, কিসে এমন বোধ হইল যে আমরা আঢ়ীতে টাকা পরিমাণ করি।

 চাম্‌ড়া চাই, চাম্‌ড়া চাই, কেহ ভাল চাম্‌ড়া লবে? আরবার সে পথে পথে এই রূপ চীৎকার করিয়া বেড়ায়, এবং মূল্যের কথা কেহ জিজ্ঞাসা করিলে তাহাকে উত্তর করে, ইহাদের প্রত্যেকের মূল্য এক এক আঢ়ী টাকা।

 “এ পাগ্লা আমাদের সঙ্গে কি ঠাট্টা করিতেছে” এই কথা বলিয়া জুতাওলা মুচীরা আপনাদিগের দোকান হইতে টুকরা টুকরা চাম্‌ড়ার ছিপ্টি বাহির করিয়া বড় কৈলাশের স্কন্ধের উপর প্রহার করিতে লাগিল, আর পরিহাস করিয়া কহিল, চাম্‌ড়া চাই, চাম্‌ড়া চাই; আমরা তোমাকে যথার্থ কহিতেছি, যতক্ষণ পর্য্যন্ত তোমার পৃষ্ঠ হইতে রক্ত বাহির না হয়, ততক্ষণ আমরা তোমার চাম্‌ড়ায় এই প্রকার কস লাগাইব। বড় কৈলাশ জ্ঞান বয়েসে এত মার খায় নাই, মারের চোটে দৌড়া দৌড়ি করিয়া যেমন সে পলাইয়া গেল, অমনি তাহারা তাড়াদিয়া তাহাকে সহরের বাহির করিয়া দিল।

 ঘরে উপস্থিত হইয়া বড় কৈলাশের ক্রোধের আর পরিসীমা রহিল না, সে রাগভরে বলিতে লাগিল, ছোট কৈলাশ অবশ্য আমাকে ইহার জবাব দিবে, দুরাত্মা আমায় বড় ক্লেশ দিয়াছে, আমি তাহাকে প্রাণে মারিয়া ফেলিব!

 ইতিমধ্যে ছোট কৈলাশের বাটিতে তাহার পিতামহী মরিয়া ছিল। বুড়ী জীবদ্দশাতে তাহার প্রতি অত্যন্ত কুব্যবহার করিত, সর্ব্বদা সকল কথাতে ক্রোধান্ধ হইয়া তাহার উপর নির্দ্দয় আচার করিত, তথাপি সে তাহার মৃত্যুতে অতিশয় শোকান্বিত হইল। আপনার উষ্ণ শয্যাতে বুড়ীর মৃত দেহটি রাখিয়া দেখিতে লাগিল, যে ইহাতে তাহাকে পুনরায় জীবিত করে কি না। বুড়ীকে এই রূপ অবস্থায় সমস্ত রাত্রি রাখিয়া ঘরের এক কোণায় এক খানি চৌকি পাতিয়া আপনি ঘুমাইতে লাগিল। শুদ্ধ এবার এরূপ করে নাই, পূর্ব্বেও এই প্রকার সে অনেক বার করিয়াছিল।

 দুই প্রহর রাত্রিকালে বড় কৈলাশ এক খান কুড়ালি হস্তে করিয়া ছোট কৈলাশের বাটীতে প্রবেশ করিল। যে স্থানে তাহার শয্যা আছে, তাহা সে উত্তম রূপে জানিত, অতএব একেবারে ঠিক সেই স্থলে উপস্থিত হইয়া তাহার পিতামহী বুড়ীর মৃত দেহকে ছোট কৈলাশ বোধে কুঠারাঘাত করিল। আর আহ্লাদে বলিতে লাগিল, কেমন দুষ্ট! এক্ষণে তুমি আর আমার সঙ্গে ঠাট্টা তামাসা করিবে না? তৎপরে সে হাসিতে২ ঘরে চলিয়া গেল। তদ্দর্শনে ছোট কৈলাশ সাতিশয় ভীত হইয়া মনেই চিন্তা করিতে লাগিল, কি দুরাত্মা ও আমার প্রাণ বধ করিতে উদ্যত। ভাগ্যে দিদি মরা ছিল, নতুবা এ দুরাত্মা ক্রোধে তাহাকে প্রাণে মারিয়া ফেলিত।

 অনন্তর সে প্রতিবাসির বাটী হইতে একটী ঘোড়া চাহিয়া আনিয়া আপনার গাড়ীতে যুড়িল। আর বৃদ্ধা পিতামহীকে উত্তম পরিচ্ছদ পরাইয়া গাড়ী খানির মধ্যস্থলে খাড়া করিয়া বসাইল। যেন শবটী গাড়ীর হেলনাতে কোন প্রকারে পড়িয়া না যায়, এ জন্য উত্তম রূপে বন্ধন করত স্বয়ং ঐ গাড়ী চালাইতে২ এক বনে চলিয়া গেল। সূর্য্যোদয় হইলে এক আড্‌ডায় উপস্থিত হইয়া সে কিছু কাল বিরাম করিল, পরে জলপান করিবার ইচ্ছা হইলে সে তাহার ভিতরে প্রবেশ করিল।

 আড্‌ডাওয়ালা নিজে বড় উত্তম এবং ধনাঢ্য লোক ছিলেন; দোষের মধ্যে অতিশয় রাগী, বোধ হয় যেন লঙ্কামরীচে তাঁহার শরীর নির্ম্মিত হইয়াছিল।

 তিনি ছোট কৈলাশকে দেখিবামাত্র সেলাম করিয়া কহিলেন, অদ্য তুমি প্রাতঃকালে বেশ লড়িয়া চড়িয়া বেড়াইতেছ।

 ছোট কৈলাশ বলিল, হাঁ মহাশয়! আমি আপন বৃদ্ধা পিতামহীকে সঙ্গে লইয়া একবার সহরে বেড়াইতে আইলাম, তিনি ঐ শকটের বহির্ভাগে বসিয়া আছেন, দুর্ব্বলতা হেতুক আমি তাঁহাকে ভিতরে আনিতে পারিলাম না। আপনি অনুগ্রহ করিয়া এক বাটী সরবৎ লইয়া তাহাকে পান করিতে দিউন, কিন্তু একটি কথা বলি, পিতামহী ঠাকুরাণী কাণে কিছু খাট, অতএব অতিশয় চীৎকার করিয়া তাঁহার সঙ্গে কথা কহিও।

 ভাল, আমি তাহাই করিব, ইহা বলিয়া দোকানদার এক বাটী সরবৎ লইয়া ঐ বুড়ীর নিকটে গিয়া দেখিল, বুড়ী খাড়া হইয়া শকট মধ্যে বসিয়া রহিয়াছে।

 দোকানদার বলিল বৃদ্ধে! তোমার পৌত্ত্র পান করিবার জন্য এক বাটী সরবৎ পাঠাইয়া দিয়াছে, এই লও পান কর। মরামানুষ কি রূপে কথা কহিতে পারিবে, বুড়ী কাষ্ঠবৎ স্থির হইয়া রহিল একটি কথাও কহিয়া উত্তর করিল না।

 আড্‌ডাওয়ালা বলিল, তুমি কি আমার কথা শুনিতে পাওনা? এই দেখ তোমার পৌত্ত্র পান করিবার নিমিত্ত এক বাটী সরবৎ পাঠাইয়া দিয়াছে।

 তিনি তিন চারিবার এই রূপ করিয়া চেঁচাইলেও বুড়ী লড়িল চড়িল না, তাহাতে তিনি অত্যন্ত ক্রোধ পরবশ হইয়া সমস্ত সরবৎটা ঠিক বুড়ীর নাকের উপর ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন। শবটি কেবল খাড়া করিয়া বসান ছিল। ভালরূপে বদ্ধ না থাকাতে গাড়ীর পশ্চাদ্ভাগে পড়িয়া গেল।

 বাপ্ সকলরে, বেরোরে, মেরেফেল্লে রে, এইরূপ চীৎকার করিয়া ছোট কৈলাশ দৌড়িয়া দ্বারের বহির্গত হইয়া আড্‌ডাওয়ালাকে ধরিল, এবং নানা প্রকার তিরস্কার পূর্ব্বক তাহাকে কহিতে লাগিল, ওরে পাপাত্মা কি করিলি? তুই আমার বৃদ্ধা পিতামহীকে মারিয়া ফেলিয়াছিস, এই দেখ্ এহার কপালে একটা বড় গর্ত্ত হইয়াছে।

 দোকানদার করযোড় করিয়া ছোট কৈলাশকে বলিল, কি দুর্ভাগ্য! ক্রুদ্ধ স্বভাব প্রযুক্ত আমার কপালে এই সকল ঘটিয়া থাকে; তা যাহা হউক, ভাই ছোট কৈলাশ তুমি যদি এ কথা কাহারো কাছে না বল, তবে আমি তোমাকে এক আঢ়ী টাকা দিব, আর আপন পিতামহীর ন্যায় তোমার পিতামহীকেও সৎকার করিব, তুমিতো ভাল জান, এ কথা প্রকাশ হইলে আমার মাথা কাটা যাইবে। উঃ সেকি কুৎসিৎ এবং ঘৃণার্হ বিষয়।

 ছোট কৈলাশ সম্মত হইল। দোকানদার তাহাকে পরিপূর্ণ এক আঢ়ী টাকা দিয়া আপন পিতামহীর ন্যায় তাহার পিতামহীর সৎকার করিল।

 অনন্তর ছোট কৈলাশ আর একবার টাকার বোঝা সুদ্ধ আপন বাটীতে পৌঁছিয়া, বড় কৈলাশের বাটী হইতে আঢ়ী আনিবার কারণ অতি শীঘ্র এক বালককে পাঠাইয়া দিল।

 আঢ়ীর কথা শুনিয়া বড় কৈলাশ বলিল, ইহার মানে কি? আমি তো তাহাকে প্রাণে বধ করিয়াছি, যাহা হউক, স্বয়ং যাইয়া আমাকে এ বিষয়ের তত্ত্ব লইতে হইবে। অতএর সে নিজে আঢ়ীটি হাতে করিয়া ছোট কৈলাশের বাটীতে উপস্থিত হইল।

 আপন প্রতিবাসির আরও অধিক টাকার আয় দেখিয়া সে অত্যন্ত বিস্ময়াপন্ন হওত তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, কৈলাশ! ঐ সকল টাকা তুমি কোথায় পাইয়াছ?

 ছোট কৈলাশ বলিল, কেন, সে দিন রাত্রিকালে তুমি আমাকে মারিতে আসিয়াছিলে, কিন্তু আমাকে বধ করিতে পরি নাই, আমার বৃদ্ধা পিতামহীকে হত্যা করিয়াছ, আমি তাঁহার মৃত দেহ বিক্রয় করিয়া এক আঢ়ী টাকা পাইলাম।

 ইহার তো বেশ দাম হইয়াছে, বটে, এই কথা বলিয়া বড় কৈলাশ শীঘ্র২ আপন গৃহে গেল, এবং কুড়ালি হস্তে লইয়া এক আঘাতেই আপনার বুদ্ধা পিতামহীর প্রাণ বিনাশ করিল। পরে তাহাকে এক শকটে পুরিয়া নগরে লইয়া গেল। সেখানে এক চিকিৎসক বাস করিতেন, বড় কৈলাশ প্রথমতঃ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনি এই মৃত দেহটী কি ক্রয় করিবেন।[]

 কবিরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন, ইহা কাহার দেহ? তুমি কি প্রকারে পাইলে?

 বড় কৈলাশ বলিল, ইনি আমার পিতামহী ইহার পরিবর্ত্তে এক আঢ়ী টাকা পাইবার নিমিত্ত আমি ইহার প্রাণ বধ করিয়াছি।

 চিকিৎসক উত্তর করিয়া কহিলেন, ছি ছি! তুমি কি উন্মত্ত হইয়াছ? এমন কথা মুখে আনিও না, আনিলে তোমার অতিশয় দুর্গতি হইবে। আর তৎকৃত কর্ম্মের মহাপাপ বিষয়ে বিস্তারিত রূপে ব্যাখ্যা করিয়া কবিরাজ তাহাকে কহিলেন, ওরে নরাধম কুলকুঠার! আমি তোকে নিশ্চয় কহিতেছি, তুই এই কর্ম্মের নিমিত্তই অবশ্যই দণ্ড যোগ্য হইবি। এই সকল কথাতে বড় কৈলাশের মনে এমত ভয় জন্মিল, যে সে কবিরাজের নিকট হইতে ক্ষিপ্তের ন্যায় দৌড়িয়া শকটে আরোহণ পূর্ব্বক আপন বাটীতে চলিয়া আইল। কবিরাজ এবং আর আর ব্যক্তিরা জ্ঞান শূন্য বোধে তাহাকে যথা ইচ্ছা তথা যাইতে দিলেন, কিছুই বলিলেন না।

 বড় কৈলাশ রাজ পথে উপস্থিত হইবামাত্র মনে মনে বলিতে লাগিল, দুরাত্মা ছোট কৈলাশ আমাকে বড়ই প্রবঞ্চনা করিয়াছে, আমি তাহারই স্থানে এই সকল কার্যের হিসাব লইব, ছোট কৈলাশ! এই সকল কার্যের হিসাব বাছা তোমাকে দিতে হবে। গৃহে গিয়া এধার ওধার অন্বেষণ করত একটা মস্ত থলিয়া পাইল। কাল বিলম্ব নাই। থলিয়াটি হস্তে করিয়া তৎক্ষণাৎ ছোট কৈলাশের বাটীতে উপস্থিত হইল, এবং কহিতে লাগিল, ওরে পাপাত্মা তুই আরবার আমার সহিত চাতুর্য্য প্রকাশ করিলি, তোর দোষেই আমি প্রথমতঃ আপনার চারিটি ঘোড়াকে নষ্ট করিলাম, এখন পিতামহীও গেল, থাক্২ এরূপ চাতুর্য্য তুই আমার সঙ্গে আর করিতে পারিবি না। ইহা বলিয়া সে ছোট কৈলাশকে আক্রমণ করত আপনার থলিয়ার ভিতর পুরিল। আর স্কন্ধে লটকাইয়া যাইতে বলিতে লাগিল, এখন কি হয় এবার তোরে ডুবাইয়া মারিব।

 একে ছোট কৈলাশ অধিক ভারী, তাহাতে আবার অনেক দূর না গেলে নদীতে পৌঁছান যায় না। বড় কৈলাশ কতক দূর যাইতে পথের পার্শ্ববর্ত্তী এক বড় মানুষের বাটী দেখিতে পাইল, ভিতরে সংকীর্ত্তন হইতেছে; লোকেরা মৃদঙ্গাদি যন্ত্র সংমিলন করিয়া মধুর স্বরে গান করিতেছে। তাহা শুনিয়া সে আরও অধিক দূর গেল না, ঐ বাটীর দ্বারে বোঝাটি নামাইয়া সঙ্গীত শ্রবণ করিবার নিমিত্ত তাহার ভিতরে প্রবেশ করিতে মানস করিল। সকলেই ভিতরে আছে, কেহ বাহিরে নাই, মনে করিল ছোট কৈলাশ কোন মতে থলিয়ার বাহির হইয়া পলাইতে পারিবে না। অতএব ভারিয়া চিন্তিয়া সে ভিতরে গমন করিল।

 ছোট কৈলাশ থলিয়ার মধ্য হইতে ওহো! ওহো! শব্দ করিয়া দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিল, এবং এপাশ ওপাশ করিয়া মুখ বন্ধন রজ্জু গাছটি ছিড়িতে চেষ্টা করিল, কিন্তু কোন প্রকায়েই ছিড়িতে পারিল না। দৈবাৎ সে স্থান দিয়া পক্ককেশ বিশিষ্ট এক বৃদ্ধ রাখাল যাইতেছিল। গরুর পাল তাড়াইবার নিমিত্ত তাহার হস্তে এক গাছি লগূড়ও ছিল। তাড়াইবার কালীন গরুগুলা যাইতেই ধাক্কা লাগিয়া যে থলিয়ার ভিতর ছোট কৈলশ ছিল, সেই থলিয়াটি গড়িয়া যাওয়াতে, কৈলাশও পড়িয়া গেল।

 তখন ওহো শব্দ করিয়া ছোট কৈলাশ বলিল, আমি অতি যুবা পুরুষ, এক্ষণে স্বর্গে যাইবার সময় নহে আমাকে বদ্ধ করা অনুচিত।

 এই কথা শুনিয়া রাখাল বলিল, আমিতো বৃদ্ধ হইয়াছি, আহা আমার ভাগ্যে অদ্যাবধি স্বর্গ রাজ্যে পৌঁছিবার কোন সুযোগ হইল না।

 এতচ্ছ্রবণে ছোট কৈলাশ উচ্চৈঃস্বরে কহিল, ওহে বৃদ্ধ! হইবে না কেন? তুমি এই থলিয়াটির বন্ধন খুলিয়া আমার পরিবর্ত্তে ইহার ভিতরে প্রবেশ কর, মুহুর্ত্তেকের মধ্যেই স্বর্গরাজ্যে যাইবে। একান্তচিত্তে আমি এই কর্ম্ম করিব, ইহা বলিয়া রাখাল ঐ থলিয়ার বন্ধন খুলিয়া দিলে তৎক্ষণাৎ ছোট কৈলাশ তাহা হইতে লাফাইয়া পড়িল।

 বৃদ্ধ গুড়ি মারিয়া তাহার ভিতরে প্রবেশ করিবার সময়ে এই কথা বলিল, আমি যাই, কিন্তু তুমি আমার গরুর পালটি সাবধানে রাখিও। অবশ্য তাহা করিব, ইহা বলিয়া ছোট কৈলাশ থলিয়াটিকে দৃঢ়তররূপে বন্ধন করিয়া রাখালের গরু বাছুর তাড়াইয়া লইয়া গৃহে গমন করিল। বড় কৈলাশ কিঞ্চিৎকাল বিলম্বে ঐ সংকীর্ত্তনের বাটী হইতে বহির্গত হইয়া পূর্ব্ববৎ সেই থলিয়াকে আপন স্কন্ধে ঝুলাইয়া লইল। বৃদ্ধ রাখাল ছোট কৈলাশের অর্দ্ধেকও ভারী ছিলনা। এ জন্য পূর্ব্বাপেক্ষা লঘু বোধ হইলে সে মনে২ বিবেচনা করিল, আমি ধর্ম্মসঙ্গীত শ্রবণ করিয়াছি, বোধ হয় তাহাতেই এই থলিয়া আমাকে হাল্কা লাগিতেছে। এইরূপে সে প্রশস্ত অতি গভীর একটা নদীর নিকটে গমন করিয়া থলিয়াসুদ্ধা রাখালকে জলমধ্যে নিক্ষেপ করিল। ও যে রাখাল বড় কৈলাশতো তাহা জানেনা, অতএব সে মনে২ স্থির করিল যে এবার ছোট কৈলাশকে আমি ডুবাইয়া মারিলাম। তখন সে চীৎকার করিয়া কহিল, থাকরে দুরাত্মা এখন জলের ভিতরে থাক, তুই আমার সঙ্গে আর কখন চাতুরী করিতে পারিবি না। অনন্তর বড় কৈলাশ গৃহে গমন কালীন কোন চৌমাথা রাস্তার নিকটে উপস্থিত হইয়া দেখিল, যে ছোট কৈলাশ গরুর-পাল তাড়াইয়া ঘরে যাইতেছে। তাহাতে সে অতিশয় আশ্চর্য্য হইয়া বলিল, এ আবার কি? আমি তো তোমাকে জলে ফেলিয়া দিয়াছিলাম, তুমি কি মর নাই?।

  ছোট কৈলাশ বলিল, হাঁ প্রায় আধ ঘণ্টা হইল তুমি আমায় জলে ফেলিয়া দিয়াছিলে বটে।

 বড় কৈলাশ জিজ্ঞাসা করিল, তবে তুমি এমন সুন্দর২ গরু গুলিন কোথায় পাইয়াছ।

 ছোট কৈলাশ বলিল, ইহাদিগকে সামুদ্রিক গাভী কহে। তুমি আমাকে জলে ফেলিয়া দিয়া বড় উপকার করিয়াছ, আমি তোমাকে অসঙ্খ্য ধন্যবাদ করি, এখন সে স্থান হইতে উত্তীর্ণ হইয়া আসিয়াছি ক্রমে অত্যন্ত ধনবান হইব, আর যে রূপে এই গরু গুলিন পাইয়াছি তাহার তাবদ্বৃত্তান্ত শুন। যৎকালে আমি থলিয়ার মধ্যে ছিলাম। ভয়ের আর পরিসীমা ছিলনা, সেতুমধ্য হইতে তুমি আমাকে শীতল জলে নিক্ষেপ করিলে ভোঁভোঁ শব্দে আমার কাণে বায়ু প্রবেশ করিল, তাহাতে আমি একেবারে তলমধ্যে মিনগ্ন হইলাম বটে; কিন্তু নিম্নভাগে সুকোমল সুন্দর২ তৃণ আছে বলিয়া কোন বেদনা পাইলাম না। পতন হইবামাত্র থলিয়াটির বন্ধন মুক্ত হইল। দেখিলাম একটি সুরূপা মনোহারিণী স্ত্রী শ্বেত বস্ত্র পরিধান করিয়া আমার নিকটে গমন করত আমাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, কেও ছোট কৈলাশ! মরি মরি বাছা তোমার এমন দশা কেন? উঠ উঠ, এরূপে হস্তোত্তোলনপূর্ব্বক আমাকে উঠাইয়া বলিলেন, প্রথমতঃ তোমার নিমিত্ত কতকগুলিন গরু আছে লও। পথপ্রান্তবর্ত্তী এক ক্রোশ দূরে আর এক পাল গরু আছে তাহাও আমি তোমাকে প্রদান করিব, তখন আমি বুঝিতে পারিলাম যে সমুদ্রবাসী লোকদিগের পক্ষে নদীই পথ স্বরূপ হইয়াছে। কেননা তাহারা কেহ শকটারোহণে কেহবা পদব্রজে সমুদ্র হইতে নদীর শেষভাগস্থ ভূমি পর্য্যন্ত গমনাগমন করিতেছিল। আহা তাহার সৌন্দর্য্যের কথা কি কহিব! নানাবিধ বর্ণের পুষ্প সকল প্রস্ফূটিত হইয়া রহিয়াছে, এক গাছিও শুষ্ক তৃণ নাই, সকলই তেজোবন্ত। এখানে যেমন পক্ষী সকল শূন্যমার্গে আমাদের কাণের পাশ দিয়া উড়িয়া যায়, সেখানেও মৎস্যেরা আমার কর্ণের পার্শ্ব দিয়া সন্তরণ করিয়া যাইতেছিল। তথাকার লোক সকলই বা কিরূপ সুন্দর, গো মেষ প্রভৃতি পশুপালগুলী ক্ষেত্র মধ্যে কেমন সুখে তৃণ ভক্ষণ করিতেছিল[]

 বড় কৈলাশ জিজ্ঞাসা করিল, জলের নিম্নভাগ যদি এমত রমণীয় স্থান তবে এত শীঘ্র তুমি কেন তথা হইতে প্রত্যাগমন করিলে। আমি হইলে কখন আসিতাম না।

 ছোট কৈলাশ বলিল, কেন তুমি কি আমার কৌশল বুঝিতে পারিলে না? পূর্ব্বেই তোমাকে কহিয়াছি যে সমুদ্র বাসিনী বালিকা আমায় এক ক্রোশ দূরে পথপ্রান্তবর্ত্তী আর এক পাল গরুদিতে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, সেই পথের অর্থ নদী, সমূদ্র বাসীদের নদীই পথ, অন্য কোন পথ নাই। নদী দিয়া এক ক্রোশ গমন করিতে হইলে অধিক বেড় হয়। আমি তাহার ঘোর ফের সকলই উত্তম জানি, বিবেচনা করিলাম যদি একটু বাঁকিয়া স্থল স্পর্শ পূর্বক মাঠ দিয়া যাই, তবে অর্দ্ধ ক্রোশ মাত্র পথ হইবে, এমন সোজা পথে গমন কেন না করি। মাঠ হইতে ঠিক সোজা নদীর ধারে গেলেই আমি অনায়াসে অতি শীঘ্র সেই পশু পালের নিকট পৌঁছাইতে পারিব। এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া বড় কৈলাশ উচ্চৈঃস্বরে কহিল, তোমার মত ভাগ্যবান মনুষ্য আমিতো কখন দেখি নাই। কি বোধ কর, আমিও কি নদীর তটে গমন করিলে, এই প্রকার সামুদ্রিক গোপাল প্রাপ্ত হইতে পারি?

 ছোট কৈলাশ বলিল, সন্দেহ, কি? অবশ্যই পাইবে কেবল একটা কথা এই, তুমি নিজে বড় ভারী, আমি তোমাকে বহন করিয়া নদীর নিকটে লইয়া যাইতে পারিব না। যদি সেখানে যাইবার ইচ্ছা থাকে, তবে স্বয়ং যাইয়া আস্তে আস্তে থলিয়ার মধ্যে প্রবেশ কর, আমি পরমাহ্লাদিত হইয়া তোমাকে জল মধ্যে নিক্ষেপ করিব।

 বড় কৈলাশ বলিল, আমি তোমার নিকট অত্যন্ত বাধিত হইলাম, কিন্তু একটা কথা বলি শুন, জল মধ্যে গমন করিয়া সামুদ্রিক পশু পাল যদি না পাই, তবে আমি ফিরে আসিয়া তোমাকে অত্যন্ত প্রহার করিব।

 ছোট কৈলাশ বলিল, না আমিতোমার পরমবন্ধু এখন আর তুমি আমার উপর এমন কঠিন ব্যবহার করিও না। পরে তাহারা উভয়েই হৃষ্ট চিত্তে নদীর নিকটে গমন করিল, গরুগুলিন অত্যন্ত তৃষ্ণাতুর ছিল, জল দেখিবামাত্র দৌড়িয়া জলে পড়িয়া জল পান করিতে লাগিল।

 ছোট কৈলাশ ঈঙ্গিত দ্বারা তাহাকে বলিল, দেখ, দেখ, পুনর্ব্বার জল মধ্যে প্রবেশ করিবার নিমিত্ত গরুগুলা কি ব্যস্ত সমস্ত হইয়াছে।

 বড় কৈলাশ বলিল, শীঘ্র২ তুমি আমাকে থলিয়ার মধ্যে পুর, নতুবা মারি খাইবে। - পরে সে বলদের পৃষ্ঠদেশ হইতে একটা বড় থলিয়া লইয়া আস্তে আস্তে তাহার ভিতরে প্রবেশ করিল, আর প্রবেশ করিবার সময়ে ছোট কৈলাশকে বলিল, পাছে আমি না ডুবি, তুমি গোটা কতক পাথর আনিয়া ইহার ভিতরে দেহ।

 ছোট কৈলাশ বলিল, মিত্র! এ বিষয়ে কোন ভয় নাই, তুমি যে প্রকারে ডুব, আমি তাহার বিহিত চেষ্টা করিব। তদনন্তর সে তাড়াতাড়ি গমন করত একটা প্রকাণ্ড প্রস্তর আনয়ন পূর্ব্বক থলিয়ার মধ্যে রাখিল, এবং এক ধাক্কায় থলিয়া সুদ্ধা বড় কৈলাশকে জলে ফেলিয়া দিল।

 বড় কৈলাশ নদীতে পড়িয়া শোঁ শোঁ শব্দে একেবারে তল মধ্যে নিমগ্ন হইয়া মরিয়া গেল।

 ছোট কৈলাশ আপন শত্রুর বিনাশ দেখিয়া মনে মনে বড় হৃষ্ট হইল, বারম্বার করতালি দিয়া উচ্চেঃস্বরে কহিল, আহা! ভাই বড় কৈলাশ, আমার ভয় হইতেছে, তুমি সামুদ্রিক গরুর পাল কখনই পাইবে না, তোমায় আমায় মারা মারি সম্পর্ক আজ পর্য্যন্ত ফুরাইল। অপর প্রফুল্ল বদনে হাস্য করিতে২ ছোট কৈলাশ আপন গরুগুলিন তাড়াইয়া গৃহে চলিয়া গেল।

সমাপ্ত।


  1. এদেশে ঘোটকদ্বারা কৃষিকার্য্যের ব্যবহার নাই, কিন্তু পৃথিবীর পশ্চিম খণ্ডস্থ অনেক দেশে ঐ কর্ম্ম কেবল ঘোটকদ্বারা নির্ব্বাহ হইয়া থাকে, আমাদের এদেশস্থ লোকেরা যে রূপ হেলিয়া গরু ব্যবহার করে তাহারা সে রূপ করে না।
  2. মৃত শরীর ক্রয় বা বিক্রয় করার রীতি এ দেশে বড় প্রচলিত নাই, কিন্তু পৃথিবীর পশ্চিম খণ্ডস্থ চিকিৎসকেরা বালকদিগককে শরীরস্থান বিদ্যা শিখাইবার নিমিত্ত শব ক্রয় করিয়া তাহা বিদীর্ণ করত শবের অন্তর্ভাগে যে সকল নাড়ী এবং অন্যান্য নর্ম্ম আছে তাহা শিক্ষা দেন এবং রোগেরও পরীক্ষা করেন।
  3. ছোট কৈলাশের বর্ণিত সমুদ্রের অধোভাগের অবস্থা শুনিয়া পাঠকদিগের যেন ভ্রম নাহয়।