জাপান-যাত্রী/৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

 ২৯ বৈশাখ। বিকেলের দিকে যখন পিনাঙের বন্দরে ঢুকচি, আমাদের সঙ্গে যে বালকটি এসেছে, তার নাম মুকুল, সে বলে’ উঠ্‌ল, ইস্কুলে একদিন পিনাং সিঙাপুর মুখস্থ করে’ মরেচি—এ সেই পিনাং। তখন আমার মনে হল ইস্কুলের ম্যাপে পিনাং দেখা যেমন সহজ ছিল, এ তার চেয়ে বেশি শক্ত নয়। তখন মাষ্টার ম্যাপে আঙুল বুলিয়ে দেশ দেখাতেন, এ হচ্চে জাহাজ বুলিয়ে দেখানো।

 এরকম ভ্রমণের মধ্যে “বস্তুতন্ত্রতা” খুব সামান্য। বসে’ বসে’ স্বপ্ন দেখবার মত। না করচি চেষ্টা, না করচি চিন্তা, চোখের সামনে আপনা আপনি সব জেগে উঠ্‌চে। এই সব দেশ বের করতে, এর পথ ঠিক করে’ রাখ্‌তে, এর রাস্তাঘাট পাকা করে’ তুলতে, অনেক মানুষকে অনেক ভ্রমণ এবং অনেক দুঃসাহস করতে হয়েছে, আমরা সেই সমস্ত ভ্রমণ ও দুঃসাহসের বোতলে-ভরা মোরব্বা উপভোগ করচি যেন। এতে কোন কাঁটা নেই, খোসা নেই, আঁটি নেই,—কেবল শাঁসটুকু আছে, আর তার সঙ্গে যতটা সম্ভব চিনি মেশানো। অকূল সমুদ্র ফুলে ফুলে উঠ্‌চে, দিগন্তের পর দিগন্তের পর্দ্দা উঠে উঠে যাচ্চে, দুর্গমতার একটা প্রকাণ্ড মূর্ত্তি চোখে দেখ্‌তে পাচ্চি; অথচ আলিপুরে খাঁচার সিংহটার মত তাকে দেখে আমোদ বোধ করছি; ভীষণও মনোহর হয়ে দেখা দিচ্ছে।

 আরব্য উপন্যাসে আলাদিনের প্রদীপের কথা যখন পড়েছিলুম, তখন সেটাকে ভারি লোভনীয় মনে হয়েছিল। এ ত সেই প্রদীপেরই মায়া। জলের উপরে স্থলের উপরে সেই প্রদীপটা ঘস্‌চে, আর অদৃশ্য দৃশ্য হচ্ছে, দূর নিকটে এসে পড়চে। আমরা এক জায়গায় বসে আছি, আর জায়গাগুলোই আমাদের সামনে এসে পড়চে।

 কিন্তু মানুষ ফলটাকেই যে মুখ্যভাবে চায় তা নয়, ফলিয়ে তোলানোটাই তার সব চেয়ে বড় জিনিষ। সেই জন্যে, এই যে ভ্রমণ করচি, এর মধ্যে মন একটা অনুভব করচে―সেটি হচ্ছে এই যে, আমরা ভ্রমণ করচিনে। সমুদ্রপথে আস্‌তে আস্‌তে মাঝে মাঝে দূরে দূরে এক-একটা পাহাড় দেখা দিচ্ছিল, আগাগোড়া গাছে ঢাকা; ঠিক যেন কোন্ দানবলোকের প্রকাণ্ড জন্তু তার কোঁকড়া সবুজ রোঁয়া নিয়ে সমুদ্রের ধারে ঝিমতে ঝিমতে রোদ পোয়াচ্চে; মুকুল তাই দেখে বল্লে ঐখানে নেবে যেতে ইচ্ছা করে। ঐ ইচ্ছাটা হচ্চে সত্যকার ভ্রমণ করবার ইচ্ছা। অন্য কর্ত্তৃক দেখিয়ে দেওয়ার বন্ধন হতে মুক্ত হয়ে নিজে দেখার ইচ্ছা। ঐ পাহাড়-ওয়ালা ছোট ছোট দ্বীপগুলোর নাম জানিনে; ইস্কুলের ম্যাপে ও-গুলোকে মুখস্থ করতে হয় নি; দূর থেকে দেখে মনে হয় ওরা একেবারে তাজা রয়েছে, সার্কূলেটিং লাইব্রেরির বইগুলোর মত মানুষের হাতে হাতে ফিরে নানা চিহ্ণে চিহ্ণিত হয়ে যায় নি; সেই জন্যে মনকে টানে। অন্যের পরে মানুষের বড় ঈর্ষা। যাকে আর কেউ পায় নি, মানুষ তাকে পেতে চায়। তাতে যে পাওয়ার পরিমাণ বাড়ে তা নয়, কিন্তু পাওয়ার অভিমান বাড়ে।

 সূর্য্য যখন অস্ত যাচ্ছে, তখন পিনাঙের বন্দরে জাহাজ এসে পৌঁছল। মনে হল বড় সুন্দর এই পৃথিবী। জলের সঙ্গে স্থলের যেন প্রেমের মিলন দেখ্‌লুম। ধরণী তার দুই বাহু মেলে সমুদ্রকে আলিঙ্গন করচে। মেঘের ভিতর দিয়ে নীলাভ পাহাড়গুলির উপরে যে একটি সুকোমল আলো পড়চে সে যেন অতি সূক্ষ্ম সোনালি রঙের ওড়নার মত—তাতে বধূর মুখ ঢেকেচে, না প্রকাশ করচে, তা’ বলা যায় না। জলে স্থলে আকাশে মিলে এখানে সন্ধ্যাবেলাকার স্বর্ণতোরণের থেকে স্বর্গীয় নহবৎ বাজতে লাগল।

 পালতোলা সমুদ্রের নৌকাগুলির মত মানুষের সুন্দর সৃষ্টি অতি অল্পই আছে। যেখানে প্রকৃতির ছন্দেলয়ে মানুষকে চল্‌তে হয়েছে, সেখানে মানুষের সৃষ্টি সুন্দর না হয়ে থাক্‌তে পারে না। নৌকাকে জল বাতাসের সঙ্গে সন্ধি করতে হয়েছে, এই জন্যেই জল বাতাসের শ্রীটুকু সে পেয়েচে। কল যেখানে নিজের জোরে প্রকৃতিকে উপেক্ষা করতে পারে, সেইখানেই সেই ঔদ্ধত্যে মানুষের রচনা কুশ্রী হয়ে উঠ্‌তে লজ্জমাত্র করে না। কলের জাহাজে পালের জাহাজের চেয়ে সুবিধা আছে, কিন্তু সৌন্দর্য্য নেই। জাহাজ যখন আস্তে আস্তে বন্দরের গা ঘেঁষে এল, যখন প্রকৃতির চেয়ে মানুষের দুশ্চেষ্টা বড় হয়ে দেখা দিল, কলের চিম্‌নিগুলো প্রকৃতির বাঁকা ভঙ্গিমার উপর তার সোজা আঁচড় কাটতে লাগ্‌ল, তখন দেখ্‌তে পেলুম মানুষের রিপু জগতে কি কুশ্রীতাই সৃষ্টি করচে। সমুদ্রের তীরে তীরে, বন্দরে বন্দরে, মানুষের লোভ কদর্য্য ভঙ্গীতে স্বর্গকে ব্যঙ্গ করচে —এম্‌নি করেই নিজেকে স্বর্গ থেকে নির্ব্বাসিত করে দিচ্চে।

 তোসা মারু, পিনাং বন্দর।