জার্ম্মানীর যৌবন অভিযান
যৌবন অভিযান
শ্রীঅজিৎ কুমার মুখোপাধ্যায়,
প্রকাশক—
শ্রীবরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়,
মূল্য বার আনা।
কলিকাতা ক্লিয়ার টাইপ প্রেস,
প্রিণ্টার—শ্রীহৃষিকেষ দে,
১৫ নং কলেজ স্কোয়ার, কলিকাতা।
নিবেদন।
“জার্ম্মানীর যৌবন অভিযান” প্রবন্ধ হিসাবেই লেখা হয়েছিল। পুস্তকাকারে প্রকাশ করা সম্ভব হলো, শুধু প্রকাশক মহাশয়ের আগ্রহে এবং অনুগ্রহে।
সহৃদয় পাঠক পাঠিকার কাছে আমার বক্তব্য এই যে, পুস্তক প্রণয়ণে আমার এই প্রথম প্রচেষ্টা, সুতরাং, ত্রুটী অবশ্যম্ভাবী হ’লেও বোধ হয় অমার্জ্জনীয় নয়।
প্রুফ্-সংশোধনেও অশেষ ত্রুটী থেকে গেছে। ৬০ পাতার ৮ম লাইনের প্রথম কথাটী ‘লুপ্ত’ আছে; সেটী ‘সুপ্ত’ হ’বে। Punctuationএও ভুল আছে প্রচুর। পাঠক, পাঠিকার সহৃদয়তার ভরসায় এসব অনিচ্ছাকৃত ত্রুটীর জন্য ক্ষমা চাইছি।
১লা আশ্বিন গ্রন্থকার। ১৩৩৫
ভূমিকা
সুদূর অতীতে, মানুষ যখন ঘর সংসার রক্ষার কল্পনাতেই দিন কাটাত, তখন বোধহয় প্রতিবেশীর পরিচয় তাদের সঙ্কীর্ণ ছিল, স্বীয় সুখ, শান্তি, স্বার্থরক্ষার গণ্ডীর ভিতর আবদ্ধ। আত্ম রক্ষার জন্য প্রতিবেশীকে যতটুকু জানা দরকার—তদধিক পরিচয় ছিল অবান্তর। এ’র প্রধান কারণ,—তখন আদান প্রদানের আনন্দ ছিলনা, মন ছিল গ্রহণ-স্পৃহা বর্জ্জিত। কিন্তু আজ, একদিকে যেমন কলুষ স্বার্থের কলঙ্কিত ক্ষুধার তৃপ্তির সন্ধানে একদেশ দশদেশের মর্ম্মের পরিচয় নিচ্ছে, তেমনই অপরদিকে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষের পরিচয় ঘনিষ্ট হয়ে উঠ্ছে,—বিশ্ব শক্তিকে সংহত কর্বার উদ্দেশ্যে; নতুন জীবন, নতুন সভ্যতা—সন্ধানের তীর্থ যাত্রায়। তাই আজ একদেশের যৌবন অভিযান অপর দেশের যৌবন-বনে বিস্ময়ের বসন্তোৎসব লাগিয়ে দিয়েছে;— জার্ম্মানীর Wandervogel (উড়োপাখীর দল) আমাদের তরুণ মনে আদর্শ লোকের সন্ধান দিয়েছে। প্রত্যেক দেশেরই সমাজ বন্ধনের গ্রন্থিতে পচ্ ধরেছে। অথচ মানুষ সমাজ ছাড়া নয়। মানুষের মনও এরকম সমাজ, সংসারের মধ্যে থেকে, ক্রমশঃ আনন্দের স্বত্ত্ব হারিয়ে ফেলে একঘেয়ে নিরানন্দ জীবনের ছন্দ-হীনতায় বন্দী। ...এই মানব-মনের মুক্তি চাই। এই মুক্তি পথের অগ্রদূত হ’বে কারা?—যারা সংস্কার, স্বাধীনতার জন্য—আবহমানকাল জীবন দিয়ে এসেছে,—সেই তরুণরা।
জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে এসে আদর্শ জীবনের স্বপ্ন দেখাই স্বাভাবিক; সেই স্বপ্নকে সত্যে পরিণত কর্বার স্বাভাবিক আগ্রহও জীবনের এই সময়েই হয়। আবার এই স্বপ্নোদ্ধারের জন্য জীবন পণ করাও—স্বাভাবিক হয়—জীবনের এই শ্রেষ্ঠ সময়েই,—এই যৌবনেই। যৌবন নিকুঞ্জে শুধু পাখীই গান করেনা;—বন্দী অন্তরের হাহাকারের ঝোড়ো হাওয়াও তাকে দুলিয়ে দেয়।
নব অভিযানের পথের দাবী সুপরিস্ফুট হ’লেও পথে তা’র বাধা বিপত্তির অন্ত নেই। এই সব বিঘ্নের স্রষ্টা মানুষ নিজেই। নবীন যখন, সমাজ, সংসারের অঙ্গ বিশেষের ময়লা মোছাতে উন্মুখ,—প্রবীন, প্রাচীন রক্ষণ শীলের দল, তখন বাধা দিয়ে বলে থাকেন ‘ও কাজ অনাবশ্যক। ময়লা হলেও ও অনেকদিন ধরে জমেছে; আর চাম্ড়াটাকেও আলো হাওয়ার দুর্ভেদ্য করে রেখেছে।
আলো হাওয়ায় তাঁদের ভয়, কারণ তা’তে প্রকৃত স্বাধীনতার সৌন্দর্য্য আছে। জার্ম্মানীর Wandervogel’র দল, যখন তাদের অভিযান শুরু কর্লে, —ক্রুদ্ধ অসন্তোষের সুর তখন জার্ম্মানীর দশদিক্ ছেয়ে ফেলেছিল। দেশের জ্ঞানী, প্রবীন পণ্ডিতেরাও এই অসন্তুষ্টদের মধ্যে ছিলেন। Wandervogel’র দোষ— দুষ্টি এ’র কারণ নয়;—এ’র কারণ প্রবীনের তরুণ সম্প্রদায়ের স্বত্ত্বার প্রতি অশ্রদ্ধা; তা’দের দেহ, মনের তারুণ্যে অস্বীকার; তাদের শক্তির প্রতি অবজ্ঞা। জগতের কর্ম্ম জীবনে গৌরব সমষ্টির প্রধান অংশ এই তরুণদেরই প্রাপ্য। তা’ হ’লে কী হিসাবে এই তরুণ দের শক্তিকে অস্বীকার করা হয়, অবজ্ঞা করা হয়? প্রবীনেরা বোধকরি বল্বেন—এ’র উত্তর দেওয়া বাহুল্য। আমরা বল্বো, আপ্নাদের প্রবীনতার ও অভিজ্ঞতারও অস্বীকার আম্রা করিনা—আর আপ্নাদের নিকট ও প্রশ্নের সদুত্তরেরও প্রত্যাশা করিনা।
শক্তির আনন্দে তরুণ জরাজীর্ণকে বিদায় দিয়ে স্বাস্থ্যবানকে অভিষেক কর্বে; স্থবির মনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিপ্লব কর্বে; যৌবন দেবতার সন্ধানে যদি এই সভ্যতার মূলে আঘাত কর্তে হয়, ত’—তাও কর্বে। কাঁটাপথের কঠিনতায় চল্বে যৌবন অভিযান—নৃত্যের ছন্দে।এই পুস্তক প্রণয়ন করে জার্মানীর Wander vogelদের পরিচয় বাংলার তরুণ সম্প্রদায়ের নিকট দেওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য—তা’দের একটী সুন্দর দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত করা। হপ্তার ছ’দিন স্কুল, কলেজে হাজিরা দেওয়া ছাড়াও—বালক, বালিকা, তরুণ, তরুণীর অন্য কিছু কর্বার আছে, যা’—তাদের আনন্দের উপাদান, স্ফূর্ত্তির উৎস। জীবনকে দুঃখ-মলিন বলা’য় সত্যতার পরিচয় দেওয়া হয় বটে; সঙ্গে সঙ্গে—ঘৃনিত অগৌরবেরও পরিচয় দেওয়া হয়। জীবন আমার, তা’কে সৌন্দর্য্যে বিকশিত কর্বার শক্তি ভগবান আমাকেই দিয়েছেন; সাংসারিক বিধি নিষেধ, দুঃখ কষ্টের ভয়ে—সে শক্তিকে নিশ্চল করে রাখা পাপ। এই বাণীই জার্মানীর তরুণ বিপ্লবের অন্তর্নিহিত।
আধুনিক বাংলায়, তথা, ভারতে—সমস্যার সীমা নেই। সমাজের বুকে শত বর্ষের আবর্জ্জনা; ধর্ম্মের মর্ম্মে—অসীম সঙ্কীর্ণতা; আর রাষ্ট্রের ত’ কথাই নেই, —তা’র কলকাটী শোষণভক্ত বিজাতীয়ের হাতে। এ দেশের তরুণের নিরুদ্যম ভাব—পাপ-পঙ্কিল। সামান্য ক’টী বালক, বালিকা, যুবক, যুবতী নিয়ে Wandervogel’র সূচনা;—দেশব্যাপী আন্দোলনে তা’র পরিণতি। কিশোর, যুবার সামান্য সংঘ হ’তে ভারত ব্যাপী তরুণ আন্দোলনের সম্ভাবনা—এদেশেও স্বপ্ন নয়। কর্ম্ম জীবনের আদর্শে অনুপ্রানিত, ভারতের তরুণ—সম্প্রদায়েরও—বল বার অধিকার আছে—
“আম্রা মুক্তি পথের অগ্রদূত”।
জার্ম্মানীর যৌবন-অভিযান।
সক্ষম মানুষ বাধা বিপত্তিকে উপহাস করে পথে চলে। পথের বুকে তার এই চলা-পায়ের স্বচ্ছন্দ গতিটুকু বিস্ময়ের না হলেও আনন্দের বস্তু। কিন্তু যখন দেখি এই সক্ষম পা’য়ের অতীত ইতিহাসের পৃষ্ঠা হামাগুড়ি আর “হাঁটি হাঁটি পা’ পা’র” বর্ণনায় ভরপুর, তখন ঐ অতি সাধারণ গতিটুকুর তত্ত্ব বেশ গভীর হয়ে ওঠে। মানব জীবনের পরিণত কর্ম্মোদ্যমের পশ্চাতে সামান্য-সজীব-প্রচেষ্টা’র পরিচয় সর্ব্বদাই মেলে; একথা আর তখন অস্বীকার করা যায় না। তাই দেখি, আধুনিক জার্ম্মানীর যৌবন-অভিযান, যা আজ সারা জার্ম্মানীর মর্ম্মের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে পরিচিত, তা’র বহু-বৎসরের অতীতের পাতায় শৈশবের স্মৃতিটুকু চিরোজ্জ্বল করে রেখেছে কার্ল ফিশারের মানস-সন্তান ‘Wander Vogel’র মধ্যে। এই কার্ল ফিশারই জার্ম্মানীর যৌবন-অভিযানের যাত্রীদের ললাটে বিজয়-টীকা পরিয়ে দেন ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিস্মৃত-প্রাতের উচ্ছ্বসিত আনন্দের মধ্যে।
Potsdam’র রাস্তার ওপর অবস্থিত Berlin’র ক্ষুদ্র পল্লী Steglitz। তা’রই এক উচ্চ-বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন যুবক কার্ল ফিশার্। ১৮৯৬ সালে এক Shorthand Club কে তিনি ভবঘুরে’র আড্ডায় পরিণত করে ছাত্রদের বিদ্যালয়ের পথছাড়া আর এক পথ দেখিয়ে দিলেন;—সেটা হ’চ্চে খোলা পাহাড় আর বন জঙ্গলের পথ। পথটা হয়ত’ এই সব ছাত্রদের চোখে নতুন ঠেকেনি; কিন্তু সেই পথে গুরুজনদের সতর্কদৃষ্টি এড়িয়ে স্বাধীনভাবে চলা’র অভিনবত্ব তাদের মনে বিচিত্রবিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। কার্ল ফিশারের এই প্রচেষ্টা এত লোকপ্রিয় হয়ে উঠ্লো যে Steglitz ও অপরাপর সহর অচিরে ঐ পথ অবলম্বন কর্তে দ্বিধাবোধ কর্লেনা। এই সব ছাত্রেরা নিজেদের বল্তো Wandervogel—জার্ম্মানীর এক ভ্রাম্যমান-পাখী’র নামানুসারে। সহরের কঠিন ব্যস্ততা, পুরানো-ধাঁচের-জার্মান-বিদ্যালয়ের বিভীষিকা আর রক্ষণশীল গৃহের রূঢ়তা এই তিনের কবল হ’তে নিষ্কৃতি পাবার অদম্য আকাঙ্ক্ষাই ছিল এদের উত্তেজনার মূল; এদের শান্তি ছিল সাধারণ জীবন হ’তে অনেক দূরে মুক্ত-বাতাসের আনন্দে নিজেদের একান্তে পাবার সান্ত্বনায়।
সাধারণ মানুষের চোখেই পড়েনা যে সামান্য ক্ষুদ্র বালক বালিকার স্বতঃস্ফুর্ত্ত আনন্দের উচ্ছ্বাস লেখাপড়ার কঠিন বন্ধন আর কড়া শাসনে দুদিনেই ঝরে পড়ে; কার্ল ফিশারের চোখে তা পড়েছিল। তিনি এই সব শিশু-মানবের মুক্তির-স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্নোদ্ধারের চেষ্টাও করেছিলেন; তাই তিনি সাধারণ মানুষ ছিলেননা, ছিলেন—“ক্ষ্যাপা ফিশার্” সাধারণের নিকট অসাধারণত্বের একমাত্র পরিচয়োক্তি। রবিবার এবং অন্যান্য ছুটির বারে তিনি সঙ্গী বালক বালিকাদের নিয়ে সারাদিন বনে পাহাড়ে কাটিয়ে দিতেন। রাত্রে খোলা মাঠের ওপর চারিধারে চুল্লী জ্বেলে শুয়ে নিজেদের অভাব অভিযোগ আর বিদ্যালয়ের বিধি নিষেধ সম্বন্ধে আলোচনা করে নিশাভোর করে দিতেন। এই সব সময়ই ছিল তাঁ’র নিজের আদর্শে ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করবার উপযুক্ত।
কার্ল ফিশারের কাম্য ছিল অখণ্ড স্বাধীনতা, যা মানুষের শিশু-অবস্থা থেকে পরিণত বার্দ্ধক্যের অন্তিম দিন পর্যন্ত প্রতিদিনের চলাফেরায় সৃষ্টি কর্বে বাধাহীন স্বচ্ছন্দতা। এত বড় স্বাধীনতাকামী হলেও তিনি কঠিন আত্ম-সংযমী ছিলেন। অবাধ স্বাধীনতা আর উচ্ছৃঙ্খলতা যাঁদের কাছে ভিন্ন ঠেকেনা তাঁরা হয়ত— কার্ল-ফিশারের এই আত্ম-সংযমকে উপহাস কর্বেন, কিন্তু স্বাধীনতা-আতঙ্ক যাঁদের আছে—তাঁরাই যে উচ্ছৃঙ্খলতা’র জন্মদাতা এবং পরিপোষক তা’ তাঁরা জানেন কি? —তাঁদের বিধিনিষেধের ‘বজ্র আঁটনে’ বাঁধা-মানুষটী যখন ‘ফস্কা গেরো’র ফাক দিয়ে বেরিয়ে এসে তাঁদেরই সাম্নে নৃত্য কর্তে সুরু করে দেয়, মুক্তির আনন্দে, তখন চক্ষুমুদে—‘উচ্ছৃঙ্খলতা’-বলা ছাড়া আর তাঁদের কোনও উপায়ই থাকে কি? সুতরাং তাঁদের উপহাস নিছক উপহাস ছাড়া আর কিছু নয়।
গৃহ, ধর্ম্ম ও যুদ্ধপ্রিয় রাষ্ট্রের প্রচলিত আদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা কর্লেও পুরাতন জার্ম্মানীর রীতিনীতির পুণঃপ্রবর্তন তাঁর আনন্দের বিষয় ছিল। আধুনিক জীবনকে তিনি বিষদৃষ্টিতে দেখেছিলেন; পুরাতন জার্ম্মান-জীবনের ওপর তাঁর বিশেষ লোভ ছিল। অতীতের পূজারী হিসাবে তিনি এমন কি প্রাচীন Teutonic রীতিনীতির পুনরুদ্ধারেও সচেষ্ট ছিলেন। তাই তিনি আধুনিক জীবন, বিশেষতঃ আধুনিক-গ্রাম্য জীবনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে—অতীত জীবন ধারাকেই আদর্শ-রূপ দিয়েছিলেন।
প্রাচীন-জার্ম্মানীর যুগান্তরকারী আদর্শবাদী কার্ল-মূরের—প্রিয়-আশ্রয় ছিল ‘বোহেমিয়া’র অরণ্য। ১৮৯৮ সালের বসন্তে যখন সেই অরণ্য—পাতা, পাখী, ফল, ফুল আর নবীন সবুজের উৎসবে মেতে উঠেছে তখন একদিন কার্লফিশার্ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে এলেন সেই উৎসবে যোগদান কর্তে। পাখী’র কাকলী’র সঙ্গে মিশ্লো—বালক বালিকার কলরব; বনের সবুজের সঙ্গে মিশ্লো—মানব মনের সবুজটুকু। যা সত্যই আনন্দের উপাদান তাকে অগ্রাহ্য কর্বার উপায় নেই। পাথর, লোহার কঠিনতায় ধাক্কা খেয়ে তরুণ-মন ব্যথিয়ে উঠেছিল সেই ক্ষতের উপর প্রলেপ বুলিয়ে দিলে ঘন বনের গভীর শান্তি। প্রকৃতির এই মাতৃ-স্নেহকে অস্বীকার করা অসম্ভব, ![]()
যাত্রাপথে একদল ওয়ান্ডার্ভগেল তাই—জনসাধারণের কাছে কার্লফিশারের এই সব উৎসব অতি প্রিয় হয়ে উঠ্লো।
ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্তিম-আশা এই Wondervogelরা জার্ম্মানীর প্রবীণ-মনে বিদ্যুতের মত খেলে গেল; সাধারণের মুখে মুখে প্রচারিত হ’ল তাদের পরিচয়বাণী। তারা যেন রূপকথার রাজপুত্রের দল; প্রাসাদ, বিলাস, সুখ, সজ্জা সব ফেলে রেখে এসেছে পশ্চাতে; চলেছে নিত্য-আনন্দের সন্ধানে। তাই তাদের বর্ণনাটী ও খুব সাধারণ নয়—
‘কটা ধরনের অপরিস্কার লোক। মাথায় একটা নরম বাঁকা টুপী সবুজ, লাল, সোনালী ফিতেয় বিচিত্রিত, পিঠে মাল বোঝাই একটা থলে; ঘাড়ে একটা ঝুলপড়া হাঁড়ি আর একটা তান্পুরা।’—মধ্যযুগের ভ্রাম্যমান বিদ্যার্থীদের সঙ্গে এদের সাদৃশ্য ছিল যথেষ্ট, আধুনিক জার্ম্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমধ্যে—মধ্যযুগের দ্বন্দ-যুদ্ধ এবং পানাভ্যাস অনুকরনের স্পৃহা বর্ত্তমান; কিন্তু Wandervogel রা ছিল উক্ত স্পৃহা বর্জিত। সন্ধ্যায় তারা একই-মন্ত্রে দীক্ষিত আশপাশের সহর গ্রামের বালক বালিকাদের নিয়ে আগুনের চারধারে বসে গৃহ ও বিদ্যালয়ের অবস্থার আলোচনায় কাটাত। তারা খেলা করতো, গল্প শুন্তো, গান গাইতো। ১৮৪৮ সালের বিদ্রোহের সঙ্গীতে তারা গাইতো উদ্বোধন, তারপর—কৃষকদের সংস্পর্শে এসে তারা আবিস্কার কর্লে এক গ্রাম্য-সঙ্গীতের গুচ্ছ আর তাই তারা তানপুরার তারে বেঁধে ফেল্লে। এইসব গান ছিল জীবনের সরলতায় ভরা, আধুনিক সহর জীবনের কাব্য-হীনতার ছায়াও তাদের মধ্যে ছিলনা—; তাই যৌবন অভিযাত্রীদের কণ্ঠে ছিল তাদের চির আসনপাতা। Hans Breuer নামক তাদেরই এক নেতা এই গানগুলি চয়ন করে—Zupfgeigenhansl নামে প্রকাশ করেন।
গ্রাম্য-গাথা মুগ্ধ সুকুমার—Wandervcgelরা— তাদের ভ্রাম্যমান জীবনের সাহসিকতায় উত্তরোত্তর উৎফুল্ল হ’য়ে—বাল্য-জীবনের দিনগুলি পর্যটনে পরিপূর্ণ কর্বার জন্য—উৎসুক হয়ে রইল। এই সব ভ্রমনের মধ্যেই তাদের আনন্দোপলব্ধি এবং শিক্ষার সুযোগ যথেষ্ট মিল্তো; তখনকার মানসিক অবস্থা ফুটে উঠতো চিঠিতে কিম্বা ডাইরীর পাতায়। পর্যটনের রূপের সুন্দর পরিচয়—জনৈক Wondervogelর নিম্নোদ্ধৃত পত্রে পাওয়া যায়——“একটা থলেতে কিছু কাপড় চোপড়, কিছু খাবার, রাঁধবার হাঁড়ি আর দুটো কম্বল পুরে সেটাকে ঘাড়ে করে—১৯২৩ সালের ২৩শে জুন্ রাত ১১টার সময় আমরা Berlin ত্যাগ্ করলুম্। প্রত্যেকেরই হাঁটু-অবধি পায়জামা আর পায়ে জুতো ছিল। এক জনের কাঁধের পাশে একটা তান্পুরা ঝোলান ছিল। পরদিন ভোরে Train আমাদের Nurnberg পৌঁছে দিলে। সেখানে সহর দেখ্তে বেরুলুম্। অবিলম্বে ধর্ম্মশালার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া গেল। ভ্রাম্যমান যুবকদের মাথা গোঁজ্বার এবং আহার্য্য প্রস্তুতের উপযুক্ত আশ্রয় আজকাল অল্পমূল্যেই মেলে। এই সহরের অন্দরমহল আর তার পাহাড়ের উপরকার প্রাচীন-প্রাসাদ উপন্যাসের মত চমৎকার। সন্ধ্যায় আবার যখন আশ্রয়ে ফিরে এলুম্—তখন এটীকে এক গুঞ্জরিত মধুচক্রের মত মনে হ’ল—জীবনের আনন্দে পরিপূর্ণ! Hall’র ভেতর নাচ গান চলেছে। কেউ প্রাচীন গ্রাম্য-সঙ্গীত গেয়েই আনন্দ পাচ্ছে; এই গান সাধারণের অতিপ্রিয়;—তারা তানপুরা কিম্বা বেহালার সঙ্গে—এই সব গান গ্রামের মধ্য দিয়ে গেয়ে চলে যায়। আমাদের প্রত্যেকের বইয়েতে—Zupfgeigenhansl নামে তিনটা গান আছে। Hall’র অন্যধারে কেউবা দাবা খেল্ছে; কেউবা জিনিষ পত্র গোছাচ্ছে; কিন্তু সবাই কথা কইছে।
এই ভ্রাম্যমান জীবন মানুষকে কী রকম সরল এবং খাঁটী কোরে তোলে তা’ দেখে আনন্দ হয়। সবাইকেই মনে হয়—বন্ধু—সাথী। যুবকেরা রাষ্ট্র, সংসার, নীতি, ধর্ম্ম-প্রভৃতি অনেক সমস্যাতেই বিভিন্ন মতের প্রমাণ দিয়েছে—কিন্তু অপরপক্ষে তারা একথাও জানে যে, তা’রা একই যুগের মানুষ—যে যুগ পুরাতনের বিরুদ্ধে নূতন জীবনের আদর্শ খাড়া করেছে। রাত ৯০॥০ টার সময় গৃহস্বামী সুনিদ্রার শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে বিদায় নিলে শোবার ঘরে দীর্ঘ-পংক্তিতে যে যা’র খড়ের বিছানা বিছিয়ে নিলুম্।
পরদিন প্রাতে Nurnberg থেকে Rothenburg অভিমুখে চল্লুম; এটা চমৎকার যায়গা! একটা ছোট পাহাড়ে উঠ্তেই মনে হ’ল—যেন সমস্ত সহরটা-আমাদের চোখের সাম্নে নিজেকে উন্মুক্ত ক’রে দিয়েছে! মনে হ’ল আমরা যেন পঞ্চদশ কিম্বা ষোড়শ শতাব্দীর অন্তরে পেছিয়ে গেছি! সবচেয়ে চমৎকার লাগ্লো দোরের সাম্নে বালক বালিকাদের নাচগান। এই সব নাচকে আধুনিক নাচ ভেবে ভুল করোনা; আধুনিক নাচ এরা মোটেই পছন্দ করে না। গ্রাম্যনাচের আবেদনই এদের কাছে আরও আন্তরিক।
Black Forest’র মনোরম পর্বতগুলোর ওপর ঘুরে বেড়ালুম্। Lake of Constanceএ সাঁতার কাটলুম্; Slogan Alps আর Bavaria Alps’র শিখরে উঠলুম্ এবং সর্ব্বশেষে—উত্তর Bavaria পার্ব্বত্য পথের মধ্য দিয়ে Munich সহরের উদ্দেশে যাত্রা কর্লুম।”
মানুষের ঘরের বাইরেও যে অনাবিল আনন্দের উৎস আছে তার প্রমাণ এই পত্রটী। পথচলবার আকাঙ্খা নিয়ে এরা পথে এসে নেমেছে, তাই পথের দুধারে প্রাসাদ, কুটীর, মাঠ, পুকুর, বন, জঙ্গল সবই এদের হৃদয়বীণার তারে তুল্ছে আনন্দের ঝঙ্কার। ঘর—মানুষকে নিকট প্রতিবেশীর সঙ্গ হ’তেও বিছিন্ন করে, কিন্তু পথ—অজানা অচেনার দূরত্বকেও দরদী হাতের স্পর্শের মধ্যে বেঁধে ফেলে; কারণ তখন তারা সবাই এক-পথিক। তাই আভিজাত্যের বাধা-বন্ধন ছিঁড়ে—বিশ্ব-প্রাণের সংস্পর্শে আসবার বাসনায়—এই তরুণরা হয়েছে—পথের ধুলার মায়ায় মুগ্ধ। কাজ একাকী আরম্ভ কর্লেও সহকর্মীর অভাব কখনও হয় না। অদূর ভবিষ্যতে কর্মজীবনের পাশে এসে দাঁড়ায় অসংখ্য দরদী বন্ধু। এক অভিনব আদর্শ নিয়ে কার্ল্ফিশার্ কর্ম্মক্ষেত্রে নেমেছিলেন বটে; কিন্তু হয়ত তাঁরই অজানায় তাঁর কর্ম্ম-সূত্র ধরে কত তরুণ উৎসাহী জীবনের শেষ দিন পর্য্যন্ত অক্লান্ত উন্নত মস্তকে চলে গেছেন। একটা নতুন কিছুর সাড়া পড়লেই অনেকে জাগে; কেউ জেগে আবার তন্দ্রার ঘোরে চোখ বোঁজে আর কেউ—চোখ ধুয়ে বেরিয়ে আসে। যে বেরিয়ে আসে, বুঝতে হ’বে সাড়াটা তারই মর্ম্মে আঘাত করেছে, আর যে চোখ বোঁজে, তার ঘুমের ব্যাঘাত করেছে মাত্র; আর যে জাগেনি তার ত কথাই নেই, সে অচৈতন্য। জার্ম্মানীরও জীবন-গড়ার এই নতুন আদর্শের সাড়ায় ঐ রকম ঘটেছিল। তাই নব-আদর্শের শত্রুর সঙ্গে সঙ্গে মিত্রও গড়ে উঠেছিল অসংখ্য। তাই কার্ল্ফিশার্ ছাড়াও অনেক পণ্ডিত এবং চিন্তাশীল ব্যক্তি এই তরুণ বিদ্রোহে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। আধুনিক প্রচলিত জীবন এত সুখ স্বাচ্ছন্দের সৃষ্টি করেও প্রকৃত সুখের সন্ধান দিতে পারেনি; তাই এই প্রচলিত জীবন-যাত্রায় অনাস্থাবানের সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। অস্বস্তি, অসন্তোষ কার্ল্ফিশারের আদর্শ পাবার সঙ্গে সঙ্গেই—নিজেদের অস্তিত্ব হারাবার পথ খুঁজে পেলে। এমন কি কার্ল্ফিশার অসন্তুষ্ট ছাত্রদের Wandervogel গড়ে তোলবার আগেও Guritt নামে Steglitz’র এক শিক্ষক স্বাধীন-চিন্তার বাণী তাঁর ছাত্রদের নিকট প্রচার করেছিলেন। আর এই সব কাঁচা মাথায় এমন চিন্তার সৃষ্টি করেছিলেন যে তারা জীবনের শান্তি হারিয়ে বস্লো। স্বাধীন চিন্তার বাণী নিয়ে তিনি একাই বেরুলেন কারণ তখন আর কেউ প্রচলিত শিক্ষা-প্রণালীর বিরুদ্ধে কথা বল্তে সাহস করেনি। মানুষের স্বভাবই তাই। যা পরম্পরাগত তা’কে বইতে দেওয়াই তার ধর্ম্ম—তার মধ্যে গলদ থাকলেও। কিন্তু গলদ যখন আর গলধঃকরণ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে তখন হয়ত কেউ নির্ভয়েই তার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। Gurittও তাই দাঁড়িয়েছিলেন এবং কাজ করেছিলেন একাকী—সহকর্ম্মীদের (শিক্ষকদের) তফাতে,—যারা বিনা দ্বিধায় প্রচলিত-প্রণালীর বশ্যতা স্বীকার করেছিল। তিনি যুবকদের এমনভাবে পৃথিবীকে দেখতে শিখিয়েছিলেন —যা’ পূর্ব্বে অন্য কেউ কখনও শেখায়নি; যে শিক্ষা তাদের গতানুগতিক পথ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল আর অনেককেই চিরন্তন একঘেয়ে জীবনের মোহ হ’তে বিচ্যুত করে স্বাধীনচিন্তার পথে পা ফেল্তে শিখিয়েছিল। ঘরের গড়া বিধিনিষেধ, বেপরোয়া পায়ের তলায় ধুলো হয়ে গেল।Wandervogelbewegung ত শুরু হয়ে গেল। এর জীবন-যজ্ঞে যে সব হোতা—দূরদর্শী-প্রবীনতার ভণ্ডামী আর কুসংস্কার ত্যাগ করে প্রবীন বয়সেও তরুণের সহানুভুতি নিয়ে যোগদান করেছিলেন, তাঁদের দুএকজনের পরিচয় এবার দেব। Jansem নামে Rhine দেশের এক প্রবীন পণ্ডিত ছিলেন। কেমন করে তাঁর পাকাচুলের শুভ্রতা ভেদ করে মগজে গিয়ে পৌঁছাল বিদ্রোহী তরুণদের অভিনব বাণী। তাঁর শুভ্র ভ্রূ কুঞ্চিত হলনা; প্রশান্ত ললাটের রেখাগুলি হর্ষোচ্ছ্বাসে নেচে উঠলো মাত্র। জার্ম্মানীর যৌবন অভিযানকে তিনি আশীর্ব্বাদ কর্লেন। জার্ম্মানীর দক্ষিণ পশ্চিম জুড়ে Wandervogelর দল গড়্বার উদ্দেশ্যে তিনি উঠেপড়ে লাগ্লেন, তাঁর সম্পত্তি, যা এতকাল ধরে জীবনের সঙ্গে জড়িত ছিল তার মায়া তাঁকে ত্যাগ কর্তে হ’ল। সেই সম্পত্তি অসঙ্কোচে ব্যয় করে Wandervogelদের অসংখ্য শাখাসমিতি স্থাপনের ব্যবস্থা কর্লেন। প্রবীনের আশীর্ব্বচন তরুণের মর্ম্মের মনি-কোঠায় তোলা রইল।
পূর্ব্বোক্ত Hans Breuer কার্লফিশারের এক বন্ধু ছিলেন। তাঁর অন্তর ছিল কবির অন্তর। নিছক পার্থিব আমোদ প্রমোদে ছিল তাঁর দারুণ বিতৃষ্ণা; তাই উম্মুক্ত প্রকৃতির বুকে একটু শান্তির আশ্রয় খুঁজে বেড়িয়েছেন জীবনের শেষদিন পর্য্যন্ত। মানুষের স্বাভাবিক মনকে বা বিকার গ্রস্ত করে তোলে সেই মাদক দ্রব্যের তিনি শত্রু ছিলেন। প্রকৃতি-ঘেঁষা কবির যা স্বাভাবিক তাঁর ছিল তাই; গ্রাম্য-গীতি-গাথা চয়ন করবার আকুল আগ্রহ। তিনিই Zupfgeigenhansl সঙ্কলন করেন, যা আজ তরুণ-জার্ম্মানীর যৌবন অভিযানের প্রধান নিদর্শন।
সে সময়ে জার্মানীর বিদ্যালয় সমূহে শিক্ষাপ্রনালী ছিল প্রানহীনতায় ভরা। এমনকি তা’র আমূল পরিবর্ত্তণের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। Dr. Gustav Wyneken’র দৃষ্টি সেদিকে পড়েছিল, তাই অন্যান্য কর্ম্মীদের সহায়তায় তিনি ১৯০৬ সালে Wickersdorf এ স্বনামখ্যাত Free School Community (অবৈতনিক শিক্ষালয়) সমিতি স্থাপন করেন। নব্য-তন্ত্রের তরুণদের এটা হ’ল পীঠস্থান। তরুণ-জার্ম্মানীর মনের অগ্নি-বীনা তখন চড়াপর্দ্দায় বাঁধা নব আদর্শের শিক্ষা প্রনালী সেখানে দীপক রাগিনীর ঝঙ্কার তুল্লে; তাদের মানসিক বিপ্লবে নব ইন্ধনের কাজ কর্লে। হাজার হাজার যুবক শিক্ষক ও ছাত্র সেখানে তীর্থযাত্রায় যেতো প্রতিমাসে, আর ফিরে আস্তো তাঁর নবীনবিদ্যালয়ের আদর্শ নিয়ে। যা অবশ্যম্ভাবী এবারেও হ’ল তাই। পুরানো-পথে-চলায়-অভ্যস্ত-পা নূতন পথে বেধে যেতে লাগ্লো; দশদিক জুড়ে কলরব উঠ্লো নব্য শিক্ষা প্রনালী আমরা মান্বোনা। কেন না—ওটা পুরানো নয় বলে। শিক্ষক, পিতামাতা আর রাষ্ট্রশক্তি, বিরোধিতার বান নিয়ে এলো এই শিশু-অনুষ্ঠানটির প্রাণ নিতে। কিন্তু এ শিশু হলেও সজীব আশীর্ব্বচনের দুর্ভেদ্য অক্ষয় করচে মোড়া, তা তাঁদের জানা ছিলনা। শিশু তার পূর্ণ প্রাণ নিয়েই খেলা কর্তে লাগ্লো;—লাভের মধ্যে হ’ল এই বিরোধিতা বিপ্লবকে প্রগাঢ় করে তুল্ল। নবীনত্বের প্রতি সহানুভূতি বাতাসের বুকে উড়ে এলো—নব-প্রচেষ্টা বিস্তৃত হ’ল—বালক, বালিকা, যুবক, যুবতীর অন্তরে অন্তরে। তরুণের স্নিগ্ধ পরশে মঙ্গল-ঘটের জল উছ্লিয়ে উঠ্লো।
তরুণের মুক্তি যুদ্ধ জার্ম্মানীর দশদিক, জুড়ে পূর্ণ বিক্রমেই চলতে লাগ্লো। ১৯১৩ সাল এলো Leipsic যুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে; একশত বৎসর আগে মুক্তি যুদ্ধের সুন্দর মীমাংসা হয়ে গেছে—এই Leipsic’র যুদ্ধে। প্রণম্য Arndt আর Fichte আজ অতীতের ময়ূরসিংহাসনে বসে শত সহস্র দেশবাসীর বরণ নিচ্ছেন; তাঁদের পরিসমাপ্ত বিপ্লবান্দোলনের ও Leipsic যুদ্ধের শতবার্ষিক স্মৃতিউৎসব আজ। তাই সারা জার্ম্মানী আজ মাতাল, অতীত-গৌরবের স্মৃতির মদে।......... উৎসবের আনন্দে মানুষের প্রকৃত স্বভাব আপনা হ’তেই প্রকাশিত হয়। মাতাল মদ নিয়েই তার উৎসব সম্পন্ন করে, জুয়াড়ী জুয়ায় মাতোয়ারা হয়ে থাকে আর যার কিছু নেই সে শক্তি পরীক্ষাকরে রাস্তার ওপর উচ্ছৃঙ্খলভাবে নেচে। কিন্তু Wandrvogel’রা এই সব উৎসবে খুব সংযত থাক্তো। জার্মান ছাত্রদের পক্ষে—উৎসবে মদ্যপান ও আমোদে মত্ত থাকাই স্বাভাবিক; কিন্তু Wandervogel’রা ছিল এই সব অভ্যাসের বিরুদ্ধে। তাদের স্মৃতি-উৎসব সম্পন্ন হ’ল এক নব-সংঙ্ঘের প্রতিষ্ঠার মধ্যে। ১৯১৩ সালে ৩০০০ এইরূপ যুবা সম্মিলীত হ’ল Cassel’র নিকটবর্ত্তী Hohen Seissuer পাহাড়ে। শতবর্ষের এই উৎসব দিবসে তরুণদের সম্মিলীত হওয়ার সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন Erna Behme—“১৯১৩ সালের শত বার্ষিক উৎসবে জার্ম্মানীর প্রতিকোন হ’তে এই যুবকের দল Cassel’র উচ্চ Hoben পর্ব্বতারোহণে-যাত্রা কর্লেন। তরুণ-প্রাতের আলোয় আমরা একত্র হলুম্ ছোট ছোট দলে—খাড়া-পথের বাঁকে বাঁকে। সংখ্যায় বাড়্তে বাড়্তে শীর্ষে এসে পৌঁছে আশ্চর্য্য হয়ে গেলুম্—এতবড় একটা যৌবন সম্মিলন একই উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত দেখে। ......... অচিরেই চুন্নী জ্বলে উঠ্লো, যৌবন-যজ্ঞের একটা অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল—কত সরল, তাজা, তা ভোল্বার নয়। অবিলম্বে আর এক তরুণ-দলের স্রোত এসে আমাদের সঙ্গে মিলিত হ’ল!—তরুণ-কুলি-মজুরের স্রোত। ......... অনেক কষ্টে যুবকেরা কুশ্রী পাঠাগারের কক্ষচ্যুত হয়ে অন্ততঃ আজ একটা ছুটির দিন উপভোগ করে গেল!”—
এই সম্মিলীত সংঘের উদ্দেশ্য এক নব অনুষ্ঠানের সূচনা করা। ৩০০০ যুবা তাদের মিলনের পতাকা উড়িয়ে দিলে—পাহাড়ের চূড়ায়। পূণ্য দিবসের পূণ্য ক্ষণে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলে—বিশ্ববিখ্যাত তরুণ সম্মিলন —Freidentsche Jugend’র। জার্ম্মনীর এই Jugendই পূর্ব্ববর্ত্তী—Wandervogelbewegung’র বিস্তৃতি। বড় বড় সহরগুলি যখন আমোদ প্রমোদে ভীষণভাবে মত্ত তখন Hohen পাহাড়ে সমবেত এই তিন হাজার তরুণ দল দীক্ষা গ্রহন কর্লে এক মহান মন্ত্রে—“নিজেদের শক্তি আমরা নিজেরাই অর্জ্জন কর্বো, নিজেদের দায়ীত্ব নিজেরাই নেব আর অন্তরের— সত্যের স্পর্দ্ধায় গড়্বো আমাদের নিজেদের জীবন। এই বিরাট মুক্তির পথে আমরা থাক্বো অবিচ্ছিন্ন, অখণ্ড।”—
তিন হাজার পরস্পর অপরিচিত যুবা প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে উচ্চারণ কর্লে ভ্রাতৃ-মন্ত্র। জার্ম্মান-ইতিহাসের এক পৃষ্ঠা সোনার লেখায় উজ্জ্বল হ’য়ে উঠ্লো।
কার্ল ফিশার্ মাত্র গুটিকয়েক বালক ছাত্র নিয়ে অভিযান সুরু করেছিলেন। কালের গতির সঙ্গে Wandervogel’র গতিও দ্রুত হ’ল অপরাপর তরুণ তরুণীর সহভাগিতায়। অপরিণত অবস্থায় যার উদ্দেশ্য ছিল পথ পর্য্যটন মাত্র, বয়সের পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্দেশ্য মহৎ হতে মহত্তর হয়ে চল্লো। প্রথমে যে নিজের কথাই ভাব্তো, সে আজ সমাজ, সংসারের সমস্যায় মাথাঘামাতে আরম্ভ করেছে। সংসারের জোর-করে-বাঁধা-সম্পর্ক-সূত্র অন্ধের মত জীবনকে আঁক্ড়ে ধরে আছে;—খোল্বার উপায় নেই ছিঁড়্তে হ’বে। সমাজে স্তুপিকৃত আবর্জ্জনার তলায় মরার মত পড়ে মানুষের জীবন—সামান্য একটু মুক্তির জন্য কাত্রাচ্ছে; তাই এই আবর্জ্জনার সংস্কারের একান্ত আবশ্যক। জগতের মধ্যে যে জীব শ্রেষ্ঠ তার স্বাধীনতা অব্যাহত থাকাই কর্ত্তব্য। সে নিজে ছাড়া তার পায়ে পরাধীনতার শেকল আর কেউ পরাতে সক্ষম নয়; তাই তার আবশ্যক হয় অভূতপূর্ব্ব শিক্ষার, যে শিক্ষা তাকে নিজের গড়া নিগড় ভাঙ্গতে শেখাবে, নিজের মনের দুর্ব্বলতার মূলে আঘাত করতে শেখাবে। এই কারনেই—মানুষের সভ্য জগতের বুকে রুখে দাঁড়ায় মুক্তি সেনার দল। মুক্তির অদম্য আকাঙ্খা নিয়ে চল্তে চল্তে ১৯১৪ সালের মহা-যুদ্ধের সময় জার্ম্মানীর এই তরুণ-আন্দোলনের গতি অবরুদ্ধ হ’ল।
তখনকার জার্ম্মানীর একদিকে যেমন স্বার্থহীন, উদার মনের অভিযান শুরু হয়েছে অন্যদিকে তেমনই পৈশাচিক ষড়যন্ত্রের কালোপর্দ্দায় ঘিরে অমঙ্গলের রণমূর্ত্তি প্রকট হয়ে উঠেছে—বিশ্বলোকের সাম্নে। বড় হবার মোহে মানুষ নিজেকে বিস্মৃত হয়;—নিজের অস্বাভাবিক ক্ষুধার তৃপ্তির সন্ধানে সে আশ্পাশের লোক্কে অনাহারে রাখ্তে চায়। সমর-প্রিয়-জার্ম্মান রাষ্ট্রেরও হয়েছিল তাই। নিজের পশু-শক্তিকে বিস্তৃত কর্বার উদ্দেশ্যে সে চাইছিল কতকগুলি ছোট, বড় দেশ;— যার জীবনী শক্তি নিয়ে সে নিজের জীবনকে আরও অস্বাভাবিক করে তুল্বে। ইউরোপের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে এই কারণে ঘট্লো ভীষণ সংঘর্ষ আর পৃথিবী জুড়ে—জ্বলে উঠলো—মানবের-সুখ-শান্তি-জীবন, সর্ব্ব-ভূক সমরানল! জার্ম্মান-যুবকেরা জননী-জন্মভূমির জন্য যুদ্ধ কর্বার আহ্বান পেলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিকট হ’তে। যুদ্ধক্ষেত্রে বিভীষিকা সৃষ্টি কর্তে তারা চল্লো দলে দলে। যুদ্ধের নামেই রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে! তার ওপর আবার মাতৃভূমির ধর্ম্ম রক্ষার জন্য আহ্বান করা হয়েছে! জার্ম্মান-তরুণের মস্তিষ্ক ঘুলিয়ে উঠ্লো, সে বিনা দ্বিধায় রাইফেল্ কাঁধে বেরিয়ে এল। জিনিষটা এমন যে ভাব্বার পর্য্যন্ত সময় দেয় না। সেই জন্যই দেশে চিন্তাশীল বৈজ্ঞানিক সাহিত্যিক, ধার্ম্মিকের অভাব না থাক্লেও হীন স্বার্থকে মূল করে—ভীষণ কাটাকাটি, রক্তারক্তি অহরহঃ ঘটে থাকে। জার্ম্মানীর বিপক্ষ, ফরাসী দেশের সাহিত্য জগতে তখন দুজন মনীষী বর্ত্তমান। সমরাহ্বান আস্বার সঙ্গে সঙ্গেই—একজন ক্ষেপে উঠলেন—তাঁ’র শীর্ণ শরীর আর পাকা দাড়ি নিয়ে, অক্ষম কাঁধ তাঁর চঞ্চল হ’য়ে উঠ্লো Rifle বইবার জন্য। আর একজন কাতর কণ্ঠে আবেদন জানালেন দেশবাসীর কাছে—“ওগো, হীন স্বার্থের জন্য ভাই ভায়ের রক্তপান করোনা; এ কখনও মনুষ্যত্ব নয়। ওরা জার্ম্মান হ’লেও মানুষ, আমাদেরই ভাই; ভাইকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে ক্ষমা করায় মহত্ত্ব আছে! তোমরা যুদ্ধ থামাও! নচেৎ পরিনামে দেখ্বে পতি-হীনা, পুত্র-হীনা, ভ্রাতৃ-হীনার—দীর্ঘশ্বাসে মানব-জীবন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে; স্বর্গ থেকে পৃথিবীর ওপর নেমে আস্ছে—ভগবানের-অভিশাপ!”—এ আবেদন কারুর মর্ম্মে পৌছায়নি! এই দুই বিশ্ব-বিশ্রুত সাহিত্যিকের প্রথমটা হচ্চেন— ‘আনাতোল্ ফ্রাঁস্’— যিনি তাঁ’র Nobel priz’র সমস্ত টাকা Russia’র দুর্ভিক্ষে দান করেছিলেন;—আর দ্বিতীয় টী হ’চ্চেন—মহামানবতার মন্ত্র-দ্রষ্টা ঋষি ‘রঁম্যা রলা’।—যুদ্ধ জিনিষ এমনই অদ্ভুদ!জার্ম্মান-তরুণ যুদ্ধ ক্ষেত্রে নেমে এলো বটে; কিন্তু তারা তাদের বিদ্রোহ স্পৃহা বিস্মৃত হ’ল’না। তালে তালে পা’ ফেল্তে ফেল্তে চলেছে সমরাঙ্গনে, মৃত্যুর অবগুণ্ঠন খুলে দেখবার জন্য; জীবনের এই রুদ্র-সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গত কর্ছে— রণ-সঙ্গীত! সেখানেও তাদের প্রচলিত রণ-সঙ্গীতে অশ্রদ্ধা। তাই তারা সঙ্গে এনেছে পুরাতন গ্রাম্য-সঙ্গীত,—জার্ম্মানীর রণ-সঙ্গীতের স্থলে সৈন্যদের মুখে মুখে যার অভিষেক হ’য়ে গেল। তা’দের সাধারণ ক্রমোন্নতির পথ হতে বিচ্ছিন্ন কর্লেও, যুদ্ধ তাদের নব অভিজ্ঞতার অসংখ্য সুযোগ দিয়েছে। সামাজিক অন্যান্য শ্রেণীর যুবকের সঙ্গে মেশবার সুযোগও হয়ে গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। নতুন উন্মাদনায় পরস্পর সৈন্যদের মধ্যে নতুন সম্পর্ক স্থাপিত হ’ল। তাদের যুদ্ধকালীন জীবনের কিঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায়। সুদীর্ঘ-সমরের একঘেয়েমী প্রায় সবায়েরই মনকে বিষিয়ে তুলেছিল। ছাত্র তার বিদ্যালয়ের স্বপ্নে আত্ম-হারা হয়ে উঠ্লো; গৃহী তার প্রিয় জনের স্মৃতিতে দুফোঁটা অশ্রু ফেল্লে। রক্তের উত্তাপ তখন প্রায় নিভে এসেছে। Gottigen’র কলেজে Holzworth ছিলেন দর্শনের ছাত্র। যুদ্ধের সময় তিনি বন্দী হ’ন। তিনি লিখেছেন—“মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে গেল! প্রত্যেক অন্তঃকরণ পুনঃ পাঠারম্ভের প্রচণ্ড অভিলাষে প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে। সেখানে আমরা সবাই সমান।
“উচ্চ শিক্ষিত, অর্দ্ধ শিক্ষিত, অশিক্ষিত সবাই তখন এক—সৈন্য। এই সৈন্যত্বই আমাদের সমতার ভিত্তি; তারই উপর স্থাপিত আমাদের অচিন্ত্যপূর্ব্ব সখ্যতা। যুদ্ধকালে বিরুদ্ধবাদী দলেও একতার আন্তরিকতা থাকে। এমনকি আমারা যুদ্ধ ক্ষেত্রেও এক ছাত্র সংঘ প্রতিষ্ঠায় কৃতকার্য্য হয়ে ছিলুম। সে সংঘের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের পর আমাদের ছাত্রত্বের দাবী।”
যুদ্ধতে যে তাদের বিতৃষ্ণা এসেছিল তার প্রমান এই পত্রটী। ধ্বংস-লীলার প্রথম পর্যায় যখন সমাপ্ত, তখন আলস্যের মধ্যে এল অবসাদ, তারা ভাব্বার সময় পেলে—তারা কি করেছে? কেন করেছে?—ইত্যাদি। তখন প্রবুদ্ধ তরুণ-জার্ম্মান উপলব্ধি করলে যে, যুদ্ধ দ্বারা তারা জাতি হিসাবে ত’—কিছু উন্নত হয়নিই উপরন্তু—কতকগুলি ভীষণ স্বার্থপর লোকের ভণ্ডামীতে পড়ে তারা নিজেদের সত্ত্বা’কে হারাতে বসেছে; আত্মাকে অবমাননা করেছে, মানব জাতির মুখে মসীলেপন করেছে! এইরূপ মানসিক পরিবর্ত্তন হবার সঙ্গে সঙ্গেই যুবকদের এবং যুদ্ধ নেতাদের পরস্পর মতরিবোধের সৃষ্টি হ’ল। যুদ্ধ-নেতাদের পক্ষে জার্ম্মান তরুণদের ভুলিয়ে রাখা অসম্ভব হ’ল। ১৯১৭ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে তরুণ জার্ম্মানীর Freidentsch Bewegung’র এক সভা আহুত হ’ল ঐ সভায় বাইরের সামরিক বক্তারাও প্রবেশ লাভ করেছিলেন। প্রথামত তাঁরা যথেষ্ট চেষ্টা কর্লেন দেশাত্মবোধের অজুহাতে তরুণ জার্মানীর উপর প্রভাব বিস্তারের। তাঁদের সমস্ত শ্রমই পণ্ড হ’ল। এক তরুণ সদস্য সভার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বল্লেন—
“আমরা তোমাদের জগতের লো’ক হতে একেবারেই চাইনা। তোমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য আমরা নিজেদের বলী দিতে রাজি নই।...আমাদের আত্মার পরিবর্ত্তে সারা পৃথিবী পেলে আমরা কী করে লাভবান হই?”
যুদ্ধকর্ত্তাদের বিস্ময় আর শঙ্কার অবধি রইল না! যুদ্ধের জীবনীশক্তি যারা —তারা দৃঢ়ভাবে বেঁকে দাঁড়িয়েছে, স্বার্থ-কলুষ রাজনীতিকদের কার্সাজী যুদ্ধ প্রাঙ্গনেরই মত রহস্যোন্মুক্ত।—সুতরাং উপায় নেই। এই জার্ম্মান তরুণরা, যারা সমর সজ্জায় কনামা দ্বিধাবোধ করেনি তারা যুদ্ধের অর্থ সম্বন্ধে আর অজ্ঞ নয়; যুদ্ধের শোকাবহ পরিনামের পরিচয় তাদের কাছে আর ঢাকা নেই। Mr. Booth তাদের এই সময়কার মনোভাব জানিয়ে লিখেছেন—“Jugend Bewegung’র সভ্যেরা তাঁদের লেখায় যুদ্ধের পরিণামের পরিচয় সুন্দর ভাবে প্রকাশ করেছেন; আর জানিয়েছেন যে তাঁরা ভবিষ্যতে নতুন এবং উৎকৃষ্ট জীবনের জন্য কাজ কর্তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাঁদের রচণার একটী নিন্মে দিলাম—
‘সব যুদ্ধ, সব মৃত্যুর অতীতে রয়েছে আমাদের একটী দিনের গভীর আকাঙ্খ। যেদিন আমরা সারা পৃথিবীর তরুণদের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ কর্তে সক্ষম হ’ব। আশা করি সব দেশের সব প্রকৃত কর্ম্মীর মুক্তিমন্ত্র হ’বে ‘Umlearnen’,—যতদিন না পৃথিবীতে মিলনের চিরন্তন শান্তির আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। এ কাজ যদি বহুদ্বারা সাধিত হয় তা হলে যেসব বন্ধু জীবনদান করে গেছেন, তাঁরা তা বৃথাই করেন্ নি।”
যুদ্ধ পরস্পরের হিংসা, রেষারেষিরই পরিচায়ক সুতরাং তা মানব মনের সংঙ্কীর্ণতা ব্যতিত অন্য কিছু নয়। আধুনিক সভ্যতা মানুষের জীবনকে যতই জটিল করে দিচ্ছে, মানুষ, তথা জাতি ততই স্বার্থান্বেষী হ’য়ে পড়্ছে আর স্বার্থ সন্ধানে ঘট্ছে কাম্ড়া কাম্ড়ি রক্তারক্তি,—ঘৃনিত পশুরা যা করে থাকে ঠিক্ তাই। আধুনিক সভ্যতার বিরুদ্ধে বল্বার বড় কথা এই যে সে মানুষকে পশুতে পরিণত কর্চ্ছে। একথা মানবমনের মুক্তিকামী জার্ম্মান তরুণরা মর্ম্মে মর্ম্মে উপলব্ধি করেছিল; তাই তারা যুদ্ধ প্রিয় রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াল অসন্তোষের অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে। এই অসন্তোষ জনসাধারণের মধ্যেও পরিব্যাপ্ত হ’য়ে গেল। ১৯১৮ সালে সারা জার্ম্মানী ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়ে দাঁড়াল রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের রক্ত পতাকা হাতে করে। মহাযুদ্ধের যবনিকা পড়ে গেল তাড়াতাড়ি। জার্ম্মানীর রাজতন্ত্রের স্থলে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হ’ল। নব-স্বাধীনতার উচ্ছসিত আনন্দের মধ্যে জার্ম্মানী চীৎকার করে গেয়ে উঠ্লো—“আমরা মুক্ত।”যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। শান্তিকে বরণ করে শ্রান্ত তরুণদল ফিরে এলো পূর্ব্ব-জীবনের কাজে, কর্ম্মে। দুষ্প্রাপ্য অভিজ্ঞতা তারা অর্জ্জন করেছে; সেই অভিজ্ঞতা পুরাতন কর্ম্ম শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে তুলে। নব-স্বাধীনতার ছায়ায় তারা আদর্শ জীবনের সন্ধানে বার হলো পূর্ণোদ্যমে; সারা দেশ আবার যৌবন অভিযাত্রীদের সাড়ায় মেতে উঠ্লো।
এই তরুণ জার্ম্মানীর প্রতিভা যুদ্ধের পর শতমুখী হয়ে বিকশিত হ’ল। রাষ্ট্রে, সমাজে, শিক্ষায়, এক কথায় জীবনের সবদিকেই তারা নিত্য বস্তুর সন্ধানে চল্লো পথ কেটে। সঞ্চয় যখন অল্পই থাকে তখন তাকে ভাগ করলে শক্তির ক্ষীণতাই প্রকাশ হয় কিন্তু সঞ্চয়ের যখন আর সীমা থাকেনা—শক্তির প্রাচুর্য্য উছ্লে পড়ে, তখন ভাগ বাটোয়ারায় দীনতা থাকেনা। যুদ্ধের পর অসংখ্য তরুণ তরুণী এসে Wandervogel’র পরিণত আদর্শকে গ্রহণ করাতে—যৌবন অভিযানের প্রচেষ্টা আরও উদ্যম আর প্রাণের প্রাচুর্য্য নিয়ে বিভিন্ন পথে চালিত হ’ল। তখন আবার নানা রাজনৈতিক মত জার্ম্মানী ছেয়ে ফেলেছে, Socialism, Communism, Fascism ইত্যাদি। সুতরাং নানান্ রাজনৈতিক বা ধর্ম্ম-মত নিয়ে Jugend’র শাখা প্রশাখা গড়ে উঠ্লেো—German National Youth Union, The Democratic Youth Movement, The Socialist Youth Movement, the Catholic Youth Movement, the Proletariat Youth Movement, the Free German Youth প্রভৃতি। বিভিন্ন নামের ছাপ থাক্লেও সব সংঘেরই উদ্দেশ্য ছিল এক;—দেশকে নব আদর্শে জাগিয়ে দেওয়া, শান্তিপূর্ণ মঙ্গলময় জীবনের সন্ধান নেওয়া।......
তরুণদের নব আদর্শে নিখুঁতভাবে গড়ে তোল্বার চিরন্তর ব্যবস্থা কর্তে গেলেই শিক্ষার প্রধান প্রতিষ্ঠানটীকে অধিকার করা একান্ত আবশ্যক। যুদ্ধের পূর্ব্বে তরুণ জার্ম্মান, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের আধিপত্যের স্বপ্ন দেখেছিল মাত্র। তাদের স্বপ্নকে সত্য করে যুদ্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় কত্তৃপক্ষের কবল হতে বিছিন্ন হয়ে এসে পড়্লো নব-আদর্শবাদীদের প্রশান্ত ছায়ায়। ১৯১৯ সালের প্রায়ম্ভেই Warzburgএ জার্ম্মানীর পুরাতন ছাত্রদের এক সভা আহুত হয়। উদ্দেশ্য ছিল এক ছাত্রগণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রতিষ্ঠার কল্পনায় Studentenschaft’র জন্ম হয়। এই সভায় স্থির করা হয় উক্ত কল্পিত প্রতিষ্টানটী—কোনও রাষ্ট্রীয় শক্তিরদ্বারা শাসিত হ’বেনা—সে নিজেই হ’বে তার শাসক, নিজেই হ’বে তার প্রতিপালক, এক কথায় সে হ’বে সম্পূর্ণ স্বাধীন।............
নীতিশাস্ত্র একজনের কানের কাছে আওড়ালেই সে নৈতিক উন্নতি লাভ কর্বে এ আশা করা বাতুলতা। নিয়মের কঠিন বন্ধনে একজনকে বেঁধে ফেল্লেই সে সংযমী হয়না, উচ্ছৃঙ্খল হওয়াই তা’র পক্ষে স্বাভাবিক। সুতরাং নীতি আর সংযম জীবনে সহজভাবে গ্রহণ কর্বার জন্য তা’কে দিতে হবে স্বাচ্ছন্দ, স্বাধীনতা আর জীবনের প্রশান্তি। তরুণ-জার্ম্মান এই মত নিয়েই শিক্ষা সংস্কারে অবতীর্ণ হয়েছিল। তারা জান্তো যে এ সমস্যাটা শুধু তাদের দেশেরই নয়। পৃথিবীর সবদেশেই বিক্ষুব্ধ নর-নারীর, জীবনের প্রতি অসন্তোষ ক্রমে বেড়েই চলেছে। সব দেশেরই তরুণ সম্প্রদায়ের সম্মুখে বিস্তৃত কর্ম্ম-জীবন পড়ে।
সব দেশেরই তরুণের মন চঞ্চল হয়ে উঠ্লো বিশ্বপ্রাণের সঙ্গে মেশ্বার জন্য। তাই তরুণ জার্ম্মানীর কর্ম্মোদ্যমের অংশ স্বরূপ প্রস্তুত হল আন্তর্জাতিক ছাত্র-সম্মিলনের এক বিশেষ কার্য্য তালিকা। অলস থাকা এদের প্রকৃতিবিরুদ্ধ, তাই সেই কার্য্য-তালিকারই এক অংশ স্বরূপ Leipsicএ ১৯২২ সালের Apirlএ আন্তর্জাতিক ছাত্র-সম্মিলনের এক অধিষ্ঠান হয়ে গেল। বিভিন্ন ১৮টী জাতের ছাত্রেরা এখানে সম্মিলীত হয়েছিল—কতকগুলি সাধারণ সমস্যার আলোচনার জন্য। জার্ম্মান তরুণ বিভিন্ন দেশের তরুণের মনের পরিচয় পেলে। বিভিন্ন দেশের তরুণের মনোভাবের পরিচয় ত এরা পেলে, এখন আবশ্যক ভাবের আদান প্রদানের সুপরিচালনার জন্য— সাহিত্যের। প্রত্যেক আন্দোলনেরই মুখপত্র আছে এক বা একাধিক। সেই সাময়িক-পত্রিকাই হ’চ্চে আন্দোলন বিশেষের আত্ম প্রকাশের উপায়; ইংরাজীতে যাকে বলে Medium of expression, জার্ম্মানীর তরুণ আন্দোলনের মুখপত্র স্বরূপ অসংখ্য পত্রিকার সৃষ্টি হ’ল; সাপ্তাহিক, মাসিক, অর্দ্ধ-বার্ষিক, বার্ষিক প্রভৃতি। এই সাময়িক সাহিত্য বন্যার মতই জার্ম্মানী পরিব্যাপ্ত করে ফেল্লে তাদের চিন্তা, আদর্শ আর সামাজিক সমস্যার আলোচনার পসরা নিয়ে। ভাবে, ভাষায় নব আদর্শ অভিনব হ’য়ে উঠলো।
পাশ্চাত্য দেশে পুরুষের সঙ্গে নারীও ঘরের বাইরে কর্ম্ম-জীবনের সৃষ্টি করেছে বহুদিন। সংসার নারী এবং পুরুষ উভয়েরই; সংসারের বাইরেও যদি পুরুষের কিছু থাকে ত নারীরও তা আছে। তাই দেখি জার্ম্মানীর তরুণ আন্দোলনের সম্পর্কে অসংখ্য নারীকে। এই হ’ল নব-নারীত্বের রূপ। পুরুষরাও যেমন আন্তর্জাতিক সম্মিলনের বৈঠক বসিয়ে বিভিন্ন দেশের যোগাযোগের সূত্র রচনা কর্লে, নারীও তদন্তরূপ আহ্বান করলে ‘Women’s International League for Peace and Freedom; (শা ন্ত স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক-মহিলা সম্মিলন)। দেশবিদেশের তরুণী এল তাদের স্বভাবজাত আদর্শ নিয়ে। প্রচলিত পরাধীন, শান্তিহীন জীবনের বিরুদ্ধে প্রচার কর্লে “আমরা চাই শান্তি, চাই স্বাধীনতা।”—এই মহিলা সভার জার্ম্মান সদস্য Miss Gertrude Baer ইউরোপের তরুণ আন্দোলন সম্বন্ধে বলেন—“কিছুদিনের মধ্যেই জার্ম্মান তরুণ-সম্প্রদায়, প্রায় সব-সভ্যতামূলক সমস্যার আলোচনা নিয়ে শতাধিক সাময়িক সাহিত্য প্রকাশিত করেছেন। আমাদের ইতিহাসে ইতিপূর্ব্বে তরুণেরা কখনও শিক্ষায়, ধর্ম্মে— ও সামাজিক সমস্যায় এত উদ্যম-ভরা ছিলনা। এই সব সাময়িক-সাহিত্যের মধ্য দিয়ে তারা আত্মপ্রকাশের চমৎকার উপায় করেছে। ইহাও নিশ্চিৎ যে, তারা রাজনৈতিক সমস্যার পাকে বিজড়িত নয়;—এক নতুন জীবন, নতুন-সভ্যতা-প্রাপ্তির সমস্যায় তারা উৎসুক।” Miss Gertrude’র বক্তৃতারও স্থর সেই এক। জার্ম্মানী পুরাতনের ‘তক্ত-তাউসে’ নতুনকে অভিষেক কর্বে। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য,— নতুন-জীবন, নতুন সভ্যতার সন্ধান করা’। জার্ম্মানীর যৌবন-অভিযান যে পথে চল্তে শুরু করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে, আজও এই বিংশ শতাব্দীর বিংশ বৎসর পরেও সে একই পথে চলেছে অবিচলিত ভাবে,— যৌবন-দেবতার সন্ধানে। জার্ম্মানীর বনে, পাহাড়ে ভ্রমনোৎসব শুরু করেছিলেন কার্ল-ফিশার্, সেই প্রায় ৩০ বছর আগে, আজও তাক্ত যুদ্ধের প্রতিবন্ধ অগ্রাহ্য করে চল্ছে—পুনঃসংহত শক্তির বলে।
তরুণ মন যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে শিউরে উঠেছে। ভাই ভায়ের রক্ত-পান কর্তে পারেনা। এটা শুধু ধ্বংসেরই লীলা। সৃষ্টিই প্রকৃত-শক্তির পরিচায়ক; ধ্বংস মস্তিষ্ক-হীন পশু-শক্তির পরিচায়ক। তাই তরুণজার্ম্মান তাদের সব শক্তি নিয়েই দাঁড়াল যুদ্ধের বিরুদ্ধে, যুদ্ধ-কামীদের মুখে মসীলেপন কর্তে। সারা জার্ম্মানী তখন অবসাদে কাতর; তাদের সুদৃঢ় জীবনের মূলে কে আঘাত করে গেছে তা’ আর তাদের বুদ্ধির অতীত নয়। জীবনের প্রতিক্ষণেই তারা দেখ্ছে যুদ্ধের বিভীষিকা।...সামরিকতার বিরুদ্ধে তরুণ-জার্ম্মান আন্দোলনের অগ্নি-বান নিয়ে নাম্লো। Demonstration করে জন-সাধারনকে উত্তেজিত করে তুল্লে। এই সব Demonstration এ ৮।১০ বৎসরের বালক থেকে আরম্ভ করে অশীতিপর বৃদ্ধও যোগ দিতে দ্বিধা করেনি। —“বেশী দিনের কথা নয়, ১০,০০০ জার্ম্মান তাদের দৃঢ়-শান্তি-প্রিয়তা জ্ঞাপন কর্বার উদ্দেশ্যে যুদ্ধকর্ত্তা কাইসারের প্রাসাদে সমবেত হয়। ......তারা সব ক্ষুদ্র জার্ম্মান! তোমার কোমর পর্যন্ত পৌঁছায় কিনা সন্দেহ। ১২।১৪।১৬ বছরের ক্ষুদে জার্ম্মান শাস্তির জন্য চেঁচাতে এসেছে। চীৎকারে আকাশ ফাটিয়ে তারা বলছে ‘আমাদের শান্তি দাও’। থেকে থেকে কোনও বিস্রস্ত-কেশ বালক, কেরোসিন টীনের ওপর দাঁড়িয়ে নিশান ওড়ালে— “Nie wieder krieg!”— (আমরা যুদ্ধ চাইনা।) Lustgarten’র Bronze’র জেনারেল্রা তখন নিশ্চয় ভেবেছিল—পৃথিবীর শেষ হ’য়ে আছে। এখানে তাদের নাকের ওপর নিশান্ উড়িয়ে তের বছরের ছোঁড়ারা চেঁচাচ্ছে—আমরা তোমাদের সৈন্য কখনও হ’বনা! ইহাই Jugend”— ব্যাপারটীকে বড় চমৎকার লাগে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত জার্ম্মানী তার বালক-সন্তানদের নিয়ে এসেছে সমর-প্রিয়-শক্তির দ্বারে একটু শান্তি ভিক্ষার জন্য! ঠিক যেমন অভাবগ্রস্তা, অভিভাবকহীনা নারী ধনীর দ্বারে এসে দাঁড়ায়— সন্তানের হাত ধরে—একটু সাহায্য পাবার আশায়। .............এই ১০,০০০ বালকের বাপ, ভাই হয়ত যুদ্ধে জীবন দিয়েছে—যুদ্ধ সন্বন্ধে কোনও প্রশ্ন না কবেই। জার্ম্মানীর সাংসারিক জীবনকে মরুভূমি করে—সংসারের কর্ত্তারা, ভবিষ্যতের-আশা-সমষ্টি সব চলে গেছে ধ্বংসের পথে। ঘরে ঘরে প্রদীপের আলো নিভে গেছে; গৃহ-কর্ত্রীর হাত কেঁপে ওঠে; বধূর হাত থেকে প্রদীপ খসে পড়ে— দীপ জ্বালা আর হয় না! আঁধার ঘরে ম্রিয়মান বালকদের বুক জ্বলে ওঠে দারুণ প্রতিহিংসায়! তারা যুদ্ধের অবসান ঘটাবেই।
জার্ম্মানীর এই যৌবন-অভিযানকে অনেকেই বলে ![]()
একজন প্রবীণ ওয়ান্ডার্ভগেল তাঁহার অভিজ্ঞতার গল্প বলিতেছেন থাকেন Spontaneous বা স্বতঃস্ফুর্ত্ত। আমিও বলি তাই, কারণ কোন রাজনৈতিক Demagogue’র উত্তেজনায় এর সৃষ্টি নয়; এর সৃষ্টি মানব-মনের নিত্য আনন্দোপলব্ধির বিকাশে;—প্রাণের স্বাভাবিক বৃত্তির প্রেরণায়। যার সৃষ্টির কৃত্রিমতা নেই তার পরিণতিও স্বাভাবিক; কারণ তা’ প্রকৃত, নিত্য, সত্য বস্তু। শিশুর জন্মও স্বাভাবিক, তার পরিণতিও স্বাভাবিক, আর তার পরিণতির সাহায্যের জন্য মাতা পিতা আত্মীয়, স্বজনের ত্যাগ, স্নেহ সবই স্বাভাবিক। জার্ম্মানীর এই তরুণ আন্দোলন, যার জীবন সুরু হয়েছিল ১৮৯৬ সালে Steglitz সহরের ক্ষুদ্র ভবঘুরের দলের পথ-চলার-গানের সুরে, সেও স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফুর্ত্ত। জীবনের প্রচলিত ধারার বিপরীত দিকে—একটা নৃত্যশীলা স্রোতস্বিনীর সৃষ্টি করাই ছিল এদের উদ্দেশ্য। তাই Wondervogel Bewegung’র বিপ্লবপূর্ণ অসন্তোষ প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল—পর্য্যটনে আর সাহসিকতার মুক্তির ছন্দে। প্রকৃতির অন্তরালে মানবজীবন অস্বাভাবিক হয়ে উঠ্ছিল, তাই প্রকৃতির মর্ম্মে গিয়ে জীবনের সুপ্তআনন্দকে জাগিয়ে তুল্তে এরা প্রবৃত্ত হ’ল সর্ব্বপ্রথমে। জীবনে যখন একবার আনন্দকে উপলব্ধি করা হয়েছে তখন সেই আনন্দকে চিরন্তন করে রাখতে হবে মানবজীবনের প্রতিক্ষণের ইতিহাসে। জার্ম্মান-জীবনে যাকিছু পুরাতন সবই ছিল নিরানন্দ। ঘরের বাঁধন আর বিদ্যালয়ের শাসন দুইই ছিল বিভীষিকার ডিপো। হাসি, হর্ষের স্থান সেখানে ছিল না—তাই অশান্ত তরুণ বিপ্লবীরা ছাত্রদের পুরানো-অভ্যাস আর তাদের বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াল। ছাত্রদের মধ্যে একটা সমস্যার সাড়া পড়ে গেল—তাদের দুর্ব্বহ জীবনকে, সহজ, সুন্দরকরে তোলা যায় কিনা? তারই পথ খুজতে তারা প্রবৃত্ত হল। আন্দোলনও চল্লো বেড়ে; তরুণ মনও প্রশস্ত হ’তে লাগ্লো। তখন সে আবিষ্কার কর্লে যে, গলদটা গোড়ায়; আধুনিক সভ্যতার আদর্শই মানব জীবনের সুখ, শান্তি, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। মানুষ বিজ্ঞানে আবিষ্কারের পর আবিষ্কার করে চল্লো,—আর তার আত্ম-গরিমাও—স্বাভাবিকতা ছাড়িয়ে চল্লো বহু ঊর্দ্ধে। মানুষ অদৃশ্য মঙ্গলময় শক্তিকে অশ্রদ্ধা করে— প্রচার করলে—‘প্রাচীন সভ্যতা’র মানব আজ অতিমানব (Superman) ভগবানের সঙ্গে তার আর পার্থক্য নেই বললেই চলে’। নিজেকে মিথ্যা বড় করে মানুষ আজ নিজেরই সুখ, শান্তি হারাতে বসেছে। তাকে বাঁচাতে গেলে আধুনিক সভ্যতার আদর্শের মূলে আঘাত কর্তেই হবে। তাই, যুদ্ধের পর, বীতশ্রদ্ধ জার্ম্মানতরুণ-দল—অসন্তোষের চরম অবস্থায়—জার্ম্মানী এবং পৃথিবীর সব সভ্যতামূলক সমস্যার কিনারায় এসে দাঁড়াল —রক্ত চক্ষু হয়ে। তাই, রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে জড়িত হলেও তরুণ আন্দোলনের গতি ছিল সভ্যতামূলক পথে। জীবনের ওপর দারুণ বিতৃষ্ণার ভাব অল্প বয়স্ক বালকের মধ্যেও আপ্না হ’তেই সৃষ্ট হ’ল। বালক তার জ্ঞান হ’বার সঙ্গে সঙ্গেই আবিষ্কার কর্লে যে বাড়ীশুদ্ধ লোক তার গুরুজন; তার জীবন গঠনের ভারপ্রাপ্ত-শাসকের দল। সবাই হবে তার জীবন-তরীর কর্ণধার। নিজের জীবনও সে দেখতে পেলে ভবিষ্যতের আলোকোজ্বল পরিপূর্ণ আনন্দের মধ্যে নয়, ভবিষ্যতের মসীঘন-তমিস্রার কালিমা-পূর্ণ নিরানন্দের মধ্যে। আব্দার, আবেদন গুরুজনের রক্ত চক্ষুর ঘুর্ণীপাকে তলিয়ে যায়। অস্ফুট প্রতিবাদ, শাসন-শৃঙ্খল দৃঢ় করে বাঁধবার আয়োজন করে। এইত বালকের উন্নতিশীল ভবিষ্যৎ! বিতৃষ্ণা স্বাভাবিক নয়? সামান্য বালক, জার্ম্মান বালক হ’লেও পিতামাতার সঙ্গে তার সম্বন্ধ আর কারও চেয়ে কম সুন্দর, কম কমনীয় নয়। পিতা মাতার বিরুদ্ধে ভাব্তেও তার বুকে শেলের মত বাজে, চোখ, মুখ দারুন লজ্জায় রাঙা হ’য়ে যায়; কিন্তু এসব সত্ত্বেও আজ জার্ম্মান বালক তার সাংসারিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছে—লজ্জা, সরম, ভয় সব ত্যাগ করেই তা’কে গুরুজনদের সম্বন্ধে অপ্রিয় কথাই বল্তে হয়। Wandervogel’র যখন সুরু হয় তখন এক বালক তার বন্ধুকে পত্রোত্তরে লিখেছিল—
“তুমি লিখেছ যে বাপ, মা’র প্রতি আমাদের আসক্তি একটা ফাঁকা কথায় পর্য্যবসিত হ’য়েছে? একথা ঘুনাক্ষরেও বিশ্বাস করোনা! আমাদের ভালবাসেন বলেই বাবা, মা, এমন পথ অবলম্বন করেন,—যা’ আমাদের হতাশার গর্ভে নিয়ে আসে।............... দুঃখের বিষয় এই যে, তাঁরা আমাদের বোঝেন্না;—আমাদের আশা, আকাঙ্ক্ষা সম্বন্ধে ভুল ধারনা করে বসেন। কিন্তু এও ভয়াবহ যে, আমাদের অশান্তির জন্য তাঁদেরই কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর্তে হবে?—তাঁদের প্রকৃতই বিরক্তিকর বলে মনে হয়!—
এই চিঠিটা পড়ে মনে হয় জার্ম্মানীর ভাবী Citizen’র জীবন কত দুর্ব্বহ। ভবিষ্যতে যারা জার্ম্মানীর সুখ, দুঃখের ভাগী হবে, তার গৌরব সমষ্টির অংশ হ’বে, তাদের বাল্য জীবনে এত অশান্তি কিসের?—প্রচলিত জীবনই এই অশান্তির মূল। সেই জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে নগন্য বালক পর্য্যন্ত? প্রচণ্ড-মুক্তি-কামনায় সামান্য বালক তার স্নেহ বন্ধন ছিন্ন করতেও পরাঙ্মুখ নয়;— বুড়ো বটগাছের তলার ঘাস আজ বিদ্রোহ করে বলছে— “তোমার আওতায় আর আমরা বাড়্তে চাইনা; ওই মুক্ত প্রান্তরের বুকে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দাও।”
পরিণত বয়সের যাঁরা, তাঁরাও সংসারে আস্থাহীন, সংসারের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রধান অভিযোগ এই যে, সে মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তিগুলির রক্ষা না করে ধ্বংসই করে। প্রকৃত মনুষ্যত্বের জন্য যা কিছু আবশ্যক সবই আপ্না হ’তে মানুষের মধ্যে বিকশিত হয় যদি না মানুষের স্বাধীনতার ওপর অস্বাভাবিক চাপ দেওয়া হয়; কিন্তু সংসার মানুষের স্বাধিনতাটুকু সঙ্কীর্ণ করে তোলে স্বার্থান্বেষী-স্নেহ-বন্ধনে বেঁধে, দশজনের অভাব অভিযোগ একজনের স্কন্ধে চাপিয়ে দিয়ে। কাজেই সে আনন্দের সত্বাটুকু হারিয়ে ফেলে, দিনে দিনে হয়ে দাঁড়ায় প্রকাণ্ড স্বার্থপর; মনুষত্ব তখন তার কাছে হেঁয়ালী।...... Gustav Wyncken তাঁর Der Nene Anfang নামক পুস্তকে লিখেছেন—
“সংসারের গণ্ডীর মধ্যে নিজেদের শৃঙ্খলিত বলে মনে হয়। সেখানে আমাদের গুরুতা অস্বীকৃত। সেখানে আমাদের দেহ, মনের উপকারিতার, আর তার মর্য্যাদার উপলব্ধি প্রবীনেরা কোনও দিন করেন্নি। বইয়ের সাম্নে নত মস্তকে বস্তে বাধ্য করেছে যে শক্তি, তা’র ভণ্ডামি আর আমরা সহ্য কর্বোনা। যারা আমাদের গালাগালি করে, অপমান করে, স্বীয় মুর্খতা কলের মত নিঃশ্বব্দে আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়,— তাদের আর মান্বোনা। যা’কে বিদ্যালয় বলা হয় সেটী কুশ্রী কারাগার ছাড়া আর কিছু নয়। তা’র মধ্যে পচে মর্বার জন্য আর আমরা ফির্ছিনা।”
জীবনের সবদিকেই নিষ্কলঙ্ক স্বাধীনতাই যাঁদের কামনা, তাঁদের পক্ষে একথা বাড়াবাড়ি নয়। যে, জীবনের কোনও বন্ধনই মান্ছেন।—স্বাধীনতার সঙ্কীর্ণতার ভয়ে, সংসার তার কাছে নাগপাশ। তরুণ জার্ম্মানীর মুক্তি-আকাঙ্ক্ষা অপরিসীম। গৃহ, সংসার তাদের সমস্ত মায়াজাল বিছিয়েও জার্ম্মান তরুণকে বাঁধতে পারেনি, তা’র প্রধান কারণ গৃহ ও সংসার তখন ছিল কুসংস্কারে পরিপূর্ণ; তা’কে ‘ঢেলে সাজা’ ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র সবা’র বিরুদ্ধেই জার্ম্মান তরুণ অভিযান শুরু করেছে;—ধর্ম্মকেও সে বাদ দেয়নি। সারা জার্ম্মানী খৃষ্ট ধর্ম্মাবলম্বী,—যে ধর্ম্মের মূল মন্ত্র হচ্চে ক্ষমা। দিনের পর দিন সারা ইউরোপে সেই ধর্ম্মের আদর্শ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। বহু দিন পূর্ব্বে Roman Catholicদের ধর্ম্মগুরু Popeএরা বিলাসিতায় ডুবে খৃষ্ট ধর্ম্মের মহৎ আদর্শকে একেবারে পচা ডোবার পাঁকে পুঁতে ফেল্বার উপক্রম করেছিল; এমনকি একজন Pope ধর্ম্মকে অর্থোপার্জ্জনের উপায় স্বরূপ করে—, অর্থের পরিবর্ত্তে নিজ স্বাক্ষরিত একটী ছাড়-পত্র[১] দিতেন, তাতে এই মর্ম্মে লেখা থাক্তো যে আজ হ’তে অমুকের পূর্ব্বকৃত সব পাপক্ষয় হ’ল’। ধর্ম্ম হ’ল’ পণ্য; পসারী হলেন ধর্ম্মগুরু Pope! তখন এই Roman Catholicism’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে দাঁড়ালেন জার্ম্মানীর ধর্ম্ম-বিদ্রোহী— Martin Luther প্রতিবাদ করেছিলেন বলে তাঁর মতাবলম্বীদের ধর্ম্ম হ’ল’ Potestantism. কত বৎসর ধরে খৃষ্ট ধর্ম্ম সম্বন্ধে কত মত পরিবর্ত্তন, কত সংশয়-জ্ঞাপন হয়ে গেছে; এক কথায় ধর্ম্মকে নিয়ে সারা Europe ছেলেখেলা করেছে। Church’র সঙ্কীর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে অন্যায় আর কুসংস্কার পরিপূর্ণ হয়ে উঠ্লো; ধর্ম্ম, সেও মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তি বিকাশের প্রতিবন্ধক। ... জার্ম্মান তরুণ ধর্ম্মের বিরুদ্ধে বিপ্লবের নিশান ওড়ালে। ধর্ম্মের কথা উঠ্লেই তরুণ মন খাপ্পা হ’য়ে উঠ্তো। তরুণ বিপ্লবী Leipzig’র Walter Pahl লিখেছেন—
“আমরা খৃষ্টীয় জগতের অন্তরেই বেড়ে উঠেছি। আমরা সন্দিগ্ধচিত্ত, অবিশ্বাসী;—নিজেদের প্রতারিত বলে মনে করি। মা প্রার্থনা শিখিয়েছিলেন,—যার এক বর্ণও বুঝতুম্ না, শুধু কলের মত আবৃত্তি করে যেতুম্। ......তারপর এল যুদ্ধ। যৌবনের নীরব অত্যাচার মুক্তি চীৎকারে শিউরে উঠ্লো। Church’র ঈশ্বর লক্ষকোটী ভ্রাতার সংগ্রামকে আশীর্ব্বাদ কর্লে! ভগবানের নামে তারা আমাদের অন্তরকে দেহ হ’তে ছিনিয়ে নিয়ে রক্ত সমূদ্রে ভাসিয়ে দিলে! আত্মা আমাদের শিউরে উঠ্লো! শুধালুম্—কোথায় সেই ক্রীশ্চান্? প্রেমই যার জীবনের মুকুট,—জীবনের শক্তি? যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য সাত্টা তলোয়ারের খোঁচার মত বুকের মধ্যে খুঁচিয়ে উঠ্লো!.....‘ভগবান মৃত! বুকের মধ্যে একটা কান্না, অভিযোগ আর আকাক্ষা গুম্রে উঠ্লো! আমরা এই church’র শত্রু হলুম্। একঘেয়ে সভাসমিতি ছেড়ে নির্জ্জনতার অন্তরে চলে এলুম্—নূতন রাজ্য আর যৌবন দেবতার সন্ধানে। অন্তরের বাণী বলছে সব মন্দিরের শ্রেষ্ঠ মন্দির গড়্তে; তারই ভিত্তির একটা পাথর হ’বার আশায় এই নিরালার বুকে এসেছি।......এই নতুন দেবতা হ’চ্চে এই দেহ। খৃষ্টান ধর্ম্ম দেহ এবং আত্মা, জীবন এবং ধর্ম্ম, পৃথিবী এবং স্বর্গের সন্ধিসূত্র ছিন্ন করেছে। দেহ ও আত্মার এই বিচ্ছিন্নতা একটা ভূল, একটা পাপ। দেহ আমাদের নতুন বেদীর চারপাশে নাচ্বার জন্য প্রস্তুত; চক্ষু আমাদের তারার নব বিস্ময় দেখ্বার জন্য খোলা!..... আমরা চাই শুধু পরিপূর্ণ জীবন,”—
লেখাটুকু পড়ে লেখককে কি অধার্ম্মিক বলা চলে? প্রচলিত ধর্ম্মের বিরুদ্ধে তিনি খড়্গহস্ত; তাই বলে কি তিনি অধার্ম্মিক? শান্তিময় আদর্শের সন্ধান দিতে যদি ধর্ম্ম সক্ষম না হয়; তাহ’লে সে ধর্ম্মের অস্তিত্বই অনাবশ্যক। সে আদর্শের সন্ধান দিতে পারেনি বলেই জাম্মান তরুণ Church’র ধর্ম্মের প্রতি অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা জানালে। জীবনের এত জটিলতা এত কুটিলতা, যে ধর্ম্মের সাক্ষাতেই মানুষকে ভারাক্রান্ত করে তুল্ছে সে ধর্ম্ম সনাতন হ’লেও বর্জ্জনীয়। মানুষের জীবনের ধারাকেই এরা চায় উল্টে দিতে; এরা চায় সেই জীবন, যার পাথেয় হবে অনাহত শান্তি, যার কাব্য হ’বে মানবতার উদার ছন্দে গাঁথা। এই জীবনের সন্ধানেই চলেছে যৌবন অভিযান; এই হ’চ্চে তরুণ জার্ম্মানীর ধর্ম্ম।
সমাজে মানুষকে থাকতেই হ’বে। সামাজিক জীবন উন্নত না হ’লে জাতির অবনতি। সমাজে কুসংস্কার, অন্যায় বিলাসিতা, কদর্য্য ভাণ্ডামি থাক্লে জাতির অনন্ত দুর্ণাম। তাই চিরকাল আবশ্যক হয়েছে সমাজ সংস্কারকের। প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে সমাজের ধারা বা আদর্শ ভিন্ন হলেও কোনটাই নিখুঁত নয়। উপরন্তু উভয়েই অল্পবিস্তর আবর্জ্জনায় অন্ধকার। এই আবর্জ্জনার সংস্কারের প্রয়োজন, এ কথা তরুণ জার্ম্মান ভাল করেই জান্তো; তাই তারা শুধু শিক্ষিত সমাজ নয়, পল্লী সমাজের সংস্কারেও প্রবৃত্ত হ’ল। সরল পল্লীবাসীদের মধ্যে তাদের প্রতিপত্তি ছিল প্রচুর, সেই সুদূর অতীতের ভ্রমণের দিন থেকেই। সহর জীবনের জটিলতা তাদেরও মধ্যে অল্পবিস্তর বিস্তৃতি লাভ করেছিল। মুহূর্ত্তের বিলাসতায় কষ্টোপার্জ্জিত অর্থ ব্যয় করতে তারাও দ্বিধাবোধ কর্তোনা। আধুনিক শ্রীহীন জীবনের সোনার কাটীর পরশ তারাও পেয়েছে, তারাও ‘Sophisticated’। সুতরাং তাদের ও বাঁচাতে হ’বে।...
জার্ম্মান তরুণ তরুণী নিজেরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সহজ ঘুরে নব আদর্শের বাণী প্রচার কর্তো। তাদের বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা কর্তো যে তারা যে পথে যাচ্ছে সে পথ উন্নতির নয়—অবনতির। বিংশশতাব্দীর বুকে বসে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে ধ্বংস পথের যাত্রী হওয়া—; সৃষ্টিকে অবমাননা করা ছাড়া আর কিছু নয়। সে অধিকার প্রাণ, মন, বুদ্ধি সম্পন্ন মানবের নেই। গ্রামে গ্রামে তারা আবেদন জানালে। এক ক্ষুদ্র পল্লীতে Wandervogelদের কোন আবেদনপত্রের মর্ম্ম এইরূপ—“যারা প্রকৃতই জীবিত তাদের জন্য।
আমাদের সমাজে যা পচা, যা অপবিত্র তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর্বার জন্য সমস্ত তরুণদের সংঘবদ্ধ হ’তে হ’বে। মেলার ৮দিন ধরে ওরা তোমাদের সাম্নে অশ্লীল নাচ আর পুরাণো অসভ্য অভিনয় করে গেছে; যা’র মধ্যে প্রকৃত আনন্দ, প্রকৃত গ্রাম্য জীবনের ছায়াও নেই। ধ্বংসের পথে আমরা এগিয়েই চল্বো, যদি না প্রকৃত তরুণরা আন্তরিক আগ্রহে স্বীয় ভালটুকু রক্ষার চেষ্টা না করে। যে সব আমোদ প্রমোদ শুধু টাকার লোভে—আমাদের যৌবনের দেহ ও আত্মাকে শোষন কর্চ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের হাত ধরে আমরা দাঁড়াব’। সরল স্ত্রী, পুরুষের মতই আমাদের সভায় এসো—বিলাস, প্রসাধন ঘরে ফেলে রেখে। অন্তরের আনন্দই আমাদের অলঙ্কার।—”
নব্য পথে অভিনব আদর্শ নিয়ে জার্ম্মান যুবক ভগবানের শুভ আশীর্ব্বাদকে পাথেয় স্বরূপ অবলম্বন করে বেরিয়েছে যৌবন অভিযানে। সঙ্গী, সাথী সম্বন্ধে তার উদারতার সীমা নেই; তা’র পথে যে পা’ দিয়েছে, সেই তার সাথী; স্ত্রী, পুরুষ নির্ব্বিশেষে। নিজ উন্নতির মোহে সে নারীকে পশ্চাতে ফেলে আসেনি। প্রথম প্রথম শুধু বালক নিয়েই Wandervogel’র ভ্রাম্যমান জীবনের শুরু হয়েছিল, পরে বালিকারাও সঙ্গ নিলে তাদের পর্য্যটনে। কঠিন হাতের কোদালের সঙ্গে মিশলো কোমল হাতের ডিস্, প্লেট। অকৃত্রিম জীবনের আনন্দে কোমল কঠিনের সমন্বয় হ’ল। স্ত্রী, পুরুষের মুক্ত মেলামেশার অবাধ স্বাধীনতাই হ’ল নব-যৌন-নীতির মূলমন্ত্র; যৌন-নীতি-শাস্ত্রের নব বিকাশ।......... ছাত্রদের মন সংস্কার বর্জ্জিত উদারতারই পরিপোষক হ’ল’। অতীতে এই সব ছাত্রেরা কায়িক শ্রমকে ফেলেছিল অমর্য্যাদার গণ্ডীতে, আজ তাদের নিজেদের শ্রম না করলে সংঘের কাজ এগোয়না—; তারা রাজা, মুটে, নির্ব্বিশেষে সকলেরই সঙ্গে সহজ সখ্যতা স্থাপন করেছে আজ।.........
ধনী তা’র সম্পত্তির গৌরবেই দশজনকে শাসন কর্তে চায়—; সুতরাং তা’র শাসনের মূলে প্রেম নেই; আছে আধিপত্যের মোহ আর গর্ব্ব; একথা তরুণরা মর্ম্মে মর্ম্মে বুঝেছিল তাই—তারা Socialism বা সমাজ-তন্ত্র বাদের ভক্ত হয়ে দাড়াল’। মানব-মনের মুক্তির জন্য তাদের সংগ্রাম; এই মুক্ত মানব-মনের চরমোৎকর্ষ বিশ্ব প্রেমিকতা; তাই দেখি মুক্ত-জার্ম্মান তরুণের ভাই—অপর দেশের তরুণ; নিপীড়িত কুলিমজুররা তাদের দরদের বন্ধু। এই যৌবন অভিযাত্রীরা যেন এক নব সৃষ্টির মাল মস্লা। তাদেরই কেন্দ্র করে এক নতুন জগতের সৃষ্টি হ’চ্চে, যে জগতের দেবতা এবং মানুষ এক,— ধর্ম্ম এক। জার্ম্মানীর আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এই Wandervogelরা সৃষ্টি কর্লে নব-কাব্য, নব-সাহিত্য, নব নাটক। নব্য ভাবের ভারা নিয়ে এল বহু ঔপন্যাসিক, বহু কবি, বহু সাহিত্যিক। জার্ম্মানীর জীবনে এক্ নব সাহিত্যের সৃষ্টি হ’ল। যারা নতুন কিছু ভেবেছে তাদের এই নতুন ভাবনাটাকে কাজে, কর্ম্মে, সাহিত্যে, শিল্পে ফুটিয়ে তোলাই স্বাভাবিক। তাই দেখি ললিত কলার দিক থেকেও—এই নব্য ভাবের ভাবুকরা যথেষ্ট কিছু দান করেছে; এমনকি জার্ম্মানীর ললিত কলার যুগান্তর এনেছে বলে তারা স্পর্দ্ধা করে থাকে। তাদের এ স্পর্দ্ধা অসঙ্গত নয়। যারা জীবনের সবটুকুই উল্টে দিয়েছে—তারা যে ললিতকলারও নব সৃষ্টি করবে তা’তে আর আশ্চর্য্য কি? জার্ম্মান-তরুণ সূচনায় বিরোধিতার ব্যথা নিয়ে আজ সমাজের সুমেরু শিখরে আসন পেতেছে। স্থিতি তাদের সুদৃঢ় হোক্!...................
ভোরে যখন অরুণ আলোর আহ্বান আসে রুদ্ধ দুয়ার জানালার স্তব্ধতায়, তখন ঘর, পাড়া, পল্লী নির্ব্বিশেষে সবাই চোখ মেলে চায়; পথের কলরবে বেরিয়ে আসে জাগরণের জীবনী শক্তি নিয়ে। পথচলা সবা’রই ললাটের লিখন। ঠিক্ তেমনই—মৌন যৌবনের সুপ্ত শক্তির দ্বারে যখন জাগরণের ঝঞ্ঝা বেজে ওঠে, তখন—পল্লী সহর দেশ, মহাদেশ নির্ব্বিশেষে তরুণ সম্প্রদায়—নতুন পথে নেমে আসে ঝড়্কে সাথী করে। তাই দেখি যখন জার্ম্মানীতে যৌবন-অভিযান চলেছে—তখন অন্যান্য দেশ—অলস হয়ে বসে নেই; তারাও বেরিয়েছে অভিযানে। পথ তাদের ভিন্ন হ’তে পারে, মত তাদের ঠিক্ মিলতে না পারে; কিন্তু তারা চলেছে একই উদ্দেশ্যে;—যৌবন দেবতার সন্ধানে।......... মানুষের মত বা বিশ্বাস অভিন্ন হয়না কিন্তু মানুষ তার কর্ম্ম জীবনের প্রশস্ত পথে অনেক সূত্রে অভিন্ন থাকে; বিভিন্ন দেশের যৌবন অভিযানের যাত্রীরাও অভিন্ন, এই হিসাবে। এযুগ সন্দেহ আর অবিশ্বাসের কবল হ’তে মুক্ত হ’তে চায়—; এযুগ বিশ্বাসের যুগ, ভালবাসার যুগ। তরুণ সম্প্রদায়ের ওপর এযুগের অচল আস্থা, —অসীম বিশ্বাস।
জার্ম্মানীর এই ভ্রাম্যমান তরুণ দল, এই মুক্ত পাখীর ঝাঁক তাদের ছন্দোময় গ্রাম্য নৃত্য-সঙ্গীতে আমাদের মন্ জুড়ে বসেছে; আমরা তাদের ভালবাস্তে দ্বিধা রোধ করিনি।
একজন তার স্বভাব সরল ভাব, তার সহজ আকর্ষণ নিয়ে কাছে এসে দুদণ্ড বস্লে যেমন তা’কে আর মন্ থেকে ফেলে দেওয়া চলেনা, তেম্নি এই ভ্রাম্যমান Wandervogelদেরও—ভোলা দুষ্কর। তাদের অভিযান যা’ সবের বিরুদ্ধে, সে সব অসুবিধা অভাব আমাদের মধ্যেও বর্ত্তমান; কিন্তু আমরা নিদ্দিষ্ট ভাবে আজও অভিযান সুরু কর্তে পারিনি; জার্ম্মান তরুণ দল আমাদের বহু আগে চলে গেছে কঠিন পথে; তারা মুক্তি পথের অগ্রদূত। অলসতার বিরাট অবকাশ মন্কে রোগগ্রস্ত করে তোলে; শক্তিকে জীর্ণ করে দেয়। অকেজো থাকা আর অসম্ভব।... যৌবন দেবতার সন্ধান যৌবন জীবনেই পেতে হ’বে;—স্বার্থহীন কর্ম্ম জীবনের বিপুল বিস্তৃতির মধ্যে;—এরই নাম যৌবন-প্রশস্তি।—
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।
- ↑ Indulgence paper.