বিষয়বস্তুতে চলুন

জাহানারার আত্মকাহিনী/প্রথম স্তবক

উইকিসংকলন থেকে

জাহানারার আত্মকাহিনী[]

প্রথম স্তবক

 ওগো মরণ! তুমি মানুষের রূপ পরিগ্রহ করে আমার সন্মুখে দাঁড়িয়ে আছ, তোমার প্রাণহীন আঁখি নিয়ে আমার সম্মুখে ভ্রূকুটি নিক্ষেপ করছ! তোমার শীতল নিঃশ্বাস আমার মুখমণ্ডলকে শীতলতর করে দিচ্ছে,—সঙ্গে সঙ্গে আমার শেষ আশা বিলীন হয়ে আসছে। দারার ছিন্নশির ভূমিতে লুটিয়ে পড়েছে। পুত্রের ছিন্ন মুণ্ড পিতা শাহজাহানের নিকট প্রেরিত হয়েছে। তারপর কারাগারে সেই মুণ্ড আমার নিকট এসেছে। দুর্ভাগ্য হিন্দুস্থান, তোমার নাম বাঁশীর সুরে, করতালের কলরোলে একদিন পৃথিবীতে ধ্বনিত হয়েছিল। যে রক্তধারায় তোমার পুণ্যভূমি পরিধৌত হয়েছিল—তা’ তোমাকে খণ্ডিত-দেহ করেছে, তোমাকে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করতে পারে নি। কেন পারে নি বলত? আমার সুকোমল কেশদাম আমি ছিন্ন করে ফেলেছি; আমার কণ্ঠ থেকে মণিমালা ছিন্ন করে দিলাম—কিন্তু কই? উত্তর ত পেলাম না।

 আমার নয়নের সম্মুখে অন্ধকার নেমে আসছে, আমি আমার অন্তরকে প্রশ্ন করেছি—আমি অতীতের দিকে চেয়ে দেখেছি। আমি কোন উত্তর পাই নি।

 আমি দেখছি সৈন্যের স্রোত একটির পর একটি ঝঞ্ঝার বুকে উর্ম্মিমালার মত ভারতের প্রান্তর পর্ব্বত ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। সেই ঝঞ্ঝা সমস্ত দেশকে ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছে, দেশের যুগ যুগ সঞ্চিত ধনরত্ন ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

 তারপর একদিন শান্তি এসেছিল। দেবতার আবাসের মত প্রাসাদ গড়ে উঠেছিল ভারতের পুণ্যভূমিতে। তারপর আবার ঝঞ্ঝা এসেছে— সঙ্গে সঙ্গে সৈন্যের অবিশ্রান্ত পদধ্বনি আর অবিরাম রক্তস্রোত।

 যমুনা বয়ে চলেছে আগ্রাদুর্গের শিলাতল পরিধৌত করে; সেই জলস্রোত পরিণত হল রক্তস্রোতে। যুগ যুগ সঞ্চিত রক্তস্রোত বয়ে চলেছে সমুদ্রের পানে—সমুদ্র-জলরাশি রক্তরঞ্জিত হয়ে উঠেছে। রক্তরাগরঞ্জিত উর্ম্মির্মালা ঊর্দ্ধ আকাশে তারার বিরুদ্ধে আস্ফালন করছে। নীল-মেঘপুঞ্জ আমার মাথার উপর ভেসে বেডাচ্ছে। সেই নীল মেঘ বসুন্ধরা আর জলধারায় সমস্ত লালিমা নিঃশেষ করে নিয়েছে। বর্ষণমুখর মেঘ রক্ত মোক্ষণ করছে।

 এখনো এক বৎসর অতীত হয়নি—আমরা আগ্রার দুর্গে বন্দিনী হয়েছি। সে দিন যুবরাজ দারা আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধার্থে অগ্রসর হয়েছিলেন। আমি আজও দেখতে পাচ্ছি—এক বিরাট সৈন্যবাহিনী সুবর্ণমণ্ডিত একটি সরীসৃপের মত ভারতের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অতিক্রম করে চলেছে দিক্‌চক্রবালের দিকে। আমি সহস্র সহস্র গজ-উষ্ট্র অশ্বের পদধ্বনি আজও শুনতে পাচ্ছি। রাজপুতের উজ্জ্বল বর্ষাবাহিনী পরিরত হয়ে যুবরাজ দারা তার প্রিয় হস্তী ফতেজঙ্গের[] উপরে সমাসীন—আলোকস্তম্ভের মত সৈন্যরাজির মধ্যস্থলে যুবরাজ দারা শুকো সমস্ত মানবের দৃষ্টিগোচর হয়েছিলেন।

 উঃ! যুবরাজ দারার পরাজয়ের দুঃসংবাদ আগ্রার দুর্গে প্রচারিত হল, আমি আকুল ক্রন্দন করলাম, কেবল ক্রন্দন। সে ক্রন্দন আজও আমার শেষ হয়নি। কি ভীষণ দুর্ভাগ্য আমার ভ্রাতার! আমি তাঁর নাম পর্য্যন্ত উচ্চারণ করতে পারি নি। যুবরাজ দারা! তোমার প্রাণে ছিল অপূর্ব্ব মহিমা। তোমার অন্তরে ধ্বনিত হত সম্রাট আকবরের মিলনের সুর। একই ভগবান যেমন জগতের ভাগ্যবিধাতা, তেমনি একই বিধান সমগ্র বিশ্বের নিয়ন্তা। যুবরাজ দারা। তোমার ছিল দুর্ব্বলতা, তোমার ছিল অহঙ্কার। অহঙ্কারই রচনা করল তোমার পতন! তোমার বিরুদ্ধ দলের ছিল শক্তি, আওরঙ্গজেবের ছিল কৌশল।

 তোমাকে আমি ঘৃণা করি, হে খলরাজ আওরঙ্গজেব! তোমাকে আমি ভীষণ ঘৃণা করি। তোমার প্রতিভা যেমন তীব্র, তোমার হৃদয় তেমনি কঠিন। তোমার একমাত্র চিন্তা—তুমি হবে ভারতের একচ্ছত্র সম্রাট, তুমি হবে মানুষের দেহমন দুটিরই অধীশ্বর! তোমার নয়নে ভাসছে অপূর্ব্ব সম্মিত হাসি, আর তোমার পদতলে দলিত হচ্ছে— তোমার বিরুদ্ধচারী শত্রু। মনে পড়ে তোমার? শৈশবের সেই পরিব্রাজকের ভবিষ্যৎ বাণী[]?

 আবার শুনছি—অশ্ব গজের পদধ্বনি, কিন্তু এবার সৈন্যদল অতি ক্ষুদ্র। তারা প্রত্যাবর্ত্তন করছে দিল্লীর পথে—প্রতারিত, পরাজিত বিপর্য্যন্ত দারা। উন্মুক্ত তরবারি হস্তে যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুগণ দারাকে পরাস্ত করে নি, শত্রুর অঙ্গ ছিল সুচতুর কৌশল। যে যুবরাজ দারা এক বৎসর পূর্ব্বেও পিতার পার্শ্বে স্বর্ণসিংহাসন অলঙ্কৃত করেন, তিনি আজ চলেছেন দিল্লীর রাজপথে আভরণহীন অনাবৃত রুগ্নহস্তী পৃষ্ঠে— নিরাভরণ দারা, ছিন্নবস্ত্রপরিহিত দারা, “দাসাৎ অপি দীনতম” শৃঙ্খলাবদ্ধ দারা। প্রজাকুল এই দৃশ্যে বিচলিত, পুরবাসী আওরঙ্গজেবকে অন্তরে অভিশাপ দিচ্ছে, পুরমহিলারা অবগুণ্ঠনের অন্তরালে অশ্রুসিক্ত; কিন্তু কারও সাহস নেই যে স্পষ্ট প্রতিবাদ করে।

 আমি আগ্রার দুর্গে এক বিস্তৃত প্রকোষ্ঠে মৃদু আলোক শিখার পার্শ্বে বসে কম্পিত হস্তে লিখছি আমার এই আত্মকাহিনী, কিন্তু আমার অন্তরের গোপনের কথা আমি গোপনই রাখছি। যদি তাই না করি, তবে আমি জীবনধারণ করব কি করে? আমি যে নারীমাত্র! কিন্তু এইখানে এই নির্জ্জন রাত্রিতে আমি আমার দুঃখের সঙ্গীত বিস্মৃতিকে দিয়ে যাব, আমি বিস্মৃতির কাছে গচ্ছিত রেখে যাব আমার জীবনের দুঃখ আর গাঁথা।

 আমার প্রিয় ছিল আমার সহোদর দারা, আমি তাঁর অনুরক্ত ভগিনী ছিলাম। দারার অভিপ্রায় ছিল আমাদের পূর্ব্বপুরুষ সম্রাট আকবরের স্বপ্ন সম্ভব করে তুলবেন। শাশ্বত হয়ে থাকুক সেই শাশ্বত পুরুষের শাশ্বত প্রয়াস। অন্ধকার গহ্বরে সুগুপ্ত ভারতের ধনরত্ন সম্রাট আকবরকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি। অযুত যুগ ধরে মানুষ যে চিন্তা করেছিল, যে সত্য উপলব্ধি করেছিল, সম্রাট আকবর সেই প্রনষ্ট ধন উদ্ধারের প্রয়াস করেছিলেন। সম্রাট স্বপ্ন দেখেছিলেন—ভারত তার অতীত আত্মার সন্ধানে ফিরে যাচ্ছে, ভারত তার আত্মার সৌন্দর্য্যগৌরবে সম্রাজ্ঞী হয়ে উঠবে—সৌন্দর্য্য একদিন ভারতকে ভগবানের সান্নিধ্যে নিয়ে গিয়েছিল।

 যমুনার অপর তীরে ফুটে উঠেছে তাজমহল-—পূর্ণিমার চন্দ্রালোকে তাজ ফুটে উঠেছে যেন শুভ্র হীরকখণ্ড—মৃত্যু-পরীর পাখার মতন শুভ্র সমুজ্জ্বল। সমাধি পরিবৃতা মাতা তাজবিবির কানে কানে মৃত্যু গুঞ্জনে ধ্বনিত হ’ত কোরাণের পুণ্যবাণী[]। আজ আর তাজবিবির কর্ণে প্রবেশ করে না সেই সঙ্গীত। মাতার সমাধি পার্শ্বে প্রোথিত রয়েছে দারার রক্তপ্লুত ছিন্ন যুক্ত। আজ মায়ের অস্থিখণ্ডে লাগছে এক শীতের কম্পন। তাজ কি আজ তাঁর চিরনিদ্রার মাঝে ভাবছেন— আমার পুত্রের মুণ্ড যে দিন স্কন্ধচ্যুত হয়েছিল, সেই দিনই পৃথিবীতে একটি বিরাট আদর্শ ভুলুণ্ঠিত হয়ে পড়েছিল?

 ঐ দেখ সূর্য্য উঠছে তাজমহলের শুভ্র মিনারের অপর পার্শ্বে—তাজ আর শুভ্র হীরক খণ্ড নয়, এক বিরাট রক্তবিন্দু মাত্র।

 আওরঙ্গজেব! তোমাকে অভিসম্পাত করি, ভাগ্যহীন দারাকে তুমি পদদলিত করেছ, তুমি তাকে নিরীশ্বরবাদী অপবাদ দিয়ে হত্যা করেছ[]

 আরঙ্গজেব! তুমি তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুরাদ ও ভ্রাতুষ্পুত্রদের গোয়ালিয়র দুর্গে আফিঙের বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছ[]—আমাকে সে বিষ দিলে না কেন? তা হলে আমার অনুভূতি লুপ্ত হয়ে যেত, আমার চিন্তা নৈরাশের গভীরতা অনুভব করতে পারত না, আমি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতাম।  আওরঙ্গজেব, আজ রজনীতেও আমি বেঁচে আছি—আমি চিন্তা করতে পারছি। আমি নীরবে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তোমাকে আমার বার্ত্তা প্রেরণ করছি, মৃত্যুর রাজ্য অতিক্রম করে আমার বার্ত্তা তোমার নিকট পৌঁছবে। আজ নিশীথে এক গুপ্ত শক্তি আমার ইন্দ্রিয়গ্রামকে আচ্ছন্ন করেছে.....

 ঘনকৃষ্ণ ছায়ারাশি মাটির উপরে ভেসে আসছে, তুমি বোধ হয় দেখতে পাচ্ছ না। আমি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি, ঐ কালো ছায়া মূর্ত্তি—কুব্জ পৃষ্ঠ নুব্জ দেহ—হঠাৎ সে ছায়া মূর্ত্তিগুলি এক সঙ্গে আকাশে উঠছে, ঐ যে সেই মূর্ত্তি মেঘে রূপান্তরিত হচ্ছে, তারপর ঝঞ্ঝা, ঐ দেখ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, অগ্নির লেলিহান শিখা উঠেছে, সমস্ত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কুব্জ পৃষ্ঠ থেকে তোমার শৃঙ্খল খসে পড়বে। ভীষণ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সম্রাট আকবরের স্বপ্ন—তৈমুর বংশের ছত্রাধীনে অখণ্ড ভারতের স্বপ্নবিলীন হয়ে যাবে।

 আওরঙ্গজেব! আমি ভবিষ্যৎ বাণী করছি—হে শক্তিমান্, তুমি ভগবানকে ভয় কর, তাঁকে ভালবাস না। তোমাকেও মানুষ ভয় করবে, ভালবাসবে না; সম্রাট আকবর যখন একখণ্ড তাম্রমুদ্রা দান করতেন, সে মুদ্রা স্বর্ণ-খণ্ডে পরিণত হয়ে যেত। কিন্তু তুমি যা’ দান কর, তা’ কণ্টকে পরিবর্ত্তিত হয়ে উঠে। সম্রাট আকবর মিলনের প্রয়াস করেছিলেন—আর তুমি ধ্বংসের অভিযান করে চলেছ। আমি তোমাকে অভিসম্পাত করছি—আওরঙ্গজেব! তুমি তোমার পিতার প্রতি যে ব্যবহার করেছ তা’ তুমি সমস্ত জীবনে ভুলতে পারবে না; তুমি যে পথে চলবে, সমস্ত জীবন ধরে সে পথে তোমার ছায়া তোমাকে অতিক্রম করে যাবে, তোমাকে বিপথে পরিচালিত করবে। পবিত্র কোরাণের কোন বাণী তোমাকে তোমার ছায়ার আতঙ্ক থেকে মুক্তি দিতে পারবে না।

 হিন্দুস্থান আজ বিজেতার ক্রীতদাসী। কখনো লোভে, কখনো ঘৃণায় হিন্দুস্থান লুণ্ঠিত হয়েছে। যদি কোন বিরাটের প্রেরণা নিয়ে ভারতের রাষ্ট্র পরিচালনা করা হ’ত তবে ভারতবর্ষ নিশ্চয় তার সমস্ত সন্তানের জননী হতে পারত। আজও হয়ত দিল্লীর প্রাসাদে ময়ূর সিংহাসন নিজের উজ্জ্বলতায় শোভা পাচ্ছে, কিন্তু সিংহাসনের মণিমাণিক্য দূর থেকে আহ্বান করছে বিপদ—যেমন চুম্বক আহ্বান করে লৌহকে।

 দূর থেকে আসছে এক শীতল প্রভঞ্জন। আমি শিউরে উঠ্‌ছি, সে হচ্ছে ঝঞ্ঝার ইঙ্গিত রক্তসমুদ্রের দূত। শক্তিশালী সম্রাটের পদতলে লুণ্ঠিত হয় রাজ্যের বিধান, রক্তপ্রবাহ মুছে নিয়ে যায় সে পদচিহ্ন। রাত্রিতে শুনতে পাচ্ছি সমস্ত দিল্লীব্যাপী এক বিরাট ক্রন্দন রোল— যেমন উঠেছিল আর একবার তৈমুরের দিল্লী অভিযানের দিনে। আর একবার উঠ্‌ছে পাণিপথের প্রবল ঝড়।

 মৃত মানবই একমাত্র শান্তির অধিকারী—না না, তারাও নয়। ধনরত্ন লোভে কি মৃত্যুর সমাধি অমানিত হয় নি? আমি কিন্তু মূল্যবান প্রস্তর অথবা মর্ম্মরদেবীর নিম্নে সমাধিস্থ হতে চাই না, একমাত্র তৃণই হবে আমার সমাধির আবরণ! যদি কোনদিন চরণাঘাতে দলিত হয়, তবু তৃণখণ্ড আবার নতুন হয়ে জন্মাবে।

 ভগবান পদদলিতকে কোলে তুলে নেন।

  1. এই পুস্তকের পাণ্ডুলিপি আগ্রা প্রাসাদের জেসমিন প্রাসাদের (সামান বুরুজ) ভগ্নমর্ম্মর শিলাতলে আবিষ্কৃত হয়েছিল। পাণ্ডুলিপিখানি অসম্পূর্ণ। খণ্ডিত অংশগুলিকে একত্রিত করে ন্যূনাধিক পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনীতে পরিবর্ত্তিত করা হয়েছে। সেই ক্বতিত্ব বিদেশিনী আন্‌দ্রিয়া বুটেনশনের। জাহানারা অপহারা রাজকুমারী—ভ্রাতার মৃত্যু, পিতার কারাজীবন ও মুঘলসন্তানদের নৃশংস মৃত্যুর সাক্ষী জাহানারার করুণকাহিনী মুঘল যুগের অপূর্ব্ব-সম্পদ। এই কাহিনীতে আছে সৌন্দর্য্য ও বিভীষিকার অপরূপ সমন্বয় মানবাত্মার শাশ্বত রূপ।
  2. মুঘল সম্রাটগণের হস্তী ও অশ্বপ্রীতি অসীম, প্রত্যেকটি রাজকীয় হস্তীর নামকরণ করা হত। “হস্তী-যুদ্ধ” সম্রাট পরিবারের একাধিকার ছিল রাজোপহারের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল। পরাজিত শত্রুর সম্পদের মধ্যে হস্তী সম্রাটের অবশ্য প্রাপ্য ছিল। আকবরের হস্তীর নাম ছিল ফিল্‌-ই-ইলাহি (আল্লাহ্‌র হস্তী), জাহাঙ্গীরের হস্তীর নাম নুর-ই-ফিল্‌ (হস্তীর আলো) দারাশুকোর হস্তী ছিল ফতেজঙ্গ (যুদ্ধ বিজয়ী)।
  3. কথিত আছে যে, একজন পরিব্রাজক মুঘলরাজবংশধরদের হস্ত পরীক্ষা করে সমস্ত রাজকুমারদের ভবিষ্যৎ বলেছিলেন। আওরঙ্গজেবকে বলেছিলেন—তুমি হবে তৈমুরবংশের বিনাশকর্তা। মুঘল রাজগণ জ্যোতিষ শাস্ত্র ও সামুদ্রিক বিচার বিশ্বাস করতেন। এমন কি যুদ্ধযাত্রার পূর্ব্বে নক্ষত্রের গতির উপর সৈন্যচালনা নির্ভর করত। রাজবংশের সমস্ত সন্তানের জন্ম কুণ্ডলী ও কোষ্ঠী তৈরী করা হত।
  4. অভিজাত মুসলিম পরিবারের সমাধির পার্শ্বে কোরাণ আবৃত্তি করার জন্য লোক নিযুক্ত করা হয়। সুর-লয়-সমন্বিত কোরাণের আবৃত্তি দূর থেকে সঙ্গীতের মত শোনায়।
  5. পরাজিত দ্বারা শুকোকে “নিরীশ্বরবাদী” অপবাদে বিচার করা হয়। মুসলিম রীতি অনুসারে নিরীশ্বরবাদীর মৃত্যুদণ্ডের বহু নিদর্শন আছে। কিন্তু সে দণ্ডের বৈধতা সম্বন্ধে মতভেদ আছে। দারা যথার্থ ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন এ বিষয়ে সন্দেহ নাই।
  6. মুঘল যুগে রাজবংশের সন্তানদের রাজদ্রোহিতার অপরাধে প্রায়ই গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দী করা হত। গোয়ালিয়র দুর্গ অনেকটা ইংলণ্ডের টাওয়ার অব লগুন অথবা ফরাসীদেশের বাস্তিল দুর্গের মত। মুঘল রাজবংশের সন্তানদের অনেক সময় হত্যা না করে স্বল্প মাত্রায় আফিঙের জল পান করতে দেওয়া হ’ত। আফিঙের বিষ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তার বুদ্ধিভ্রংশ করে দিত, ক্রমশঃ তার অনুভূতি অস্পষ্ট হয়ে যেত। আফিঙ-বিষে জর্জ্জরিত মানুষের জীবন মৃত্যু অপেক্ষাও কষ্টদায়ক। তুর্ক জাতির মধ্যেও এই আফিঙ-বিষ প্রয়োগের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তুরস্কে ওসমানালী বংশে প্রবাদ প্রচলিত ছিল—রাজকুলের কোন আত্মীয় নেই। একাধিক ভ্রাতার জন্ম রাজকুলে অমঙ্গল বলে বিবেচিত হত।