জীবন-স্মৃতি/ভৃত্যরাজক তন্ত্র

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ভৃত্যরাজক তন্ত্র।

 ভারতবর্ষের ইতিহাসে দাসরাজাদের রাজত্বকাল সুখের কাল ছিল না। আমার জীবনের ইতিহাসেও ভৃত্যদের শাসনকালটা ষখন আলোচনা করিয়া দেখি তখন তাহার মধ্যে মহিমা বা আনন্দ কিছুই দেখিতে পাই না। এই সকল রাজাদের পরিবর্ত্তন বারম্বার ঘটিয়াছে কিন্তু তামাদের ভাগ্যে সকলতা’তেই নিষেধ ও প্রহারের ব্যবস্থার বৈলক্ষণ্য ঘটে নাই। তখন এ সম্বন্ধে তত্ত্বালোচনার অবসর পাই নাই—পিঠে যাহা পড়িত তাহা পিঠে করিয়াই লইতাম এবং মনে জানিতাম সংসারের ধৰ্ম্মই এই—বড় যে সে মারে, ছোট যে সে মার খায়। ইহার বিপরীত কথাটা, অর্থাৎ, ছোট যে সেই মারে, বড় যে সেই মার খায়—শিখিতে বিস্তর বিলম্ব হইয়াছে।

 কোন্‌টা দুষ্ট এবং কোন্‌টা শিষ্ট, ব্যাধ তাহ পাখীর দিক হইতে দেখে না, নিজের দিক হইতেই দেখে। সেই জন্য গুলি খাইবার পূর্ব্বেই যে সতর্ক পাখী চীৎকার করিয়া দল ভাগায় শিকারী তাহকে গালি দেয়। মার খাইলে আমরা কাঁদিতাম, প্রহারকর্ত্তা সেটাকে শিষ্টোচিত বলিয়া গণ্য করিত না। বস্তুত সেটা ভৃত্যরাজদের বিরুদ্ধে সিডিশন্‌। আমার বেশ মনে আছে সেই সিডিশন্‌ সম্পূর্ণ দমন করিবার জন্য জল রাখিবার বড় বড় জালার মধ্যে আমাদের রোদনকে বিলুপ্ত করিয়া দিবার চেষ্টা করা হইত। রোদন জিনিষটা প্রহারকারীর পক্ষে অত্যন্ত অপ্রিয় এবং অসুবিধাজনক একথা কেহই অস্বীকার করিতে পারিবে না।

 এখন এক-একবার ভাবি ভৃত্যদের হাত হইতে কেন এমন নিৰ্ম্মম ব্যবহার আমরা পাইতাম। মোটের উপরে আকার প্রকারে আমরা যে স্নেহদয়ামায়ায় অযোগ্য ছিলাম তাহা বলিতে পারি না। আসল কারণটা এই, ভৃত্যদের উপরে আমাদের সম্পূর্ণ ভার পড়িয়াছিল। সম্পূর্ণ ভার জিনিষটা বড় অসহ্য। পরমাত্মীয়ের পক্ষেও দুৰ্ব্বহ। ছোট ছেলেকে যদি ছোট ছেলে হইতে দেওয়া যায়—সে যদি খেলিতে পায়, দৌড়িতে পায়, কৌতূহল মিটাইতে পারে তাহা হইলেই সে সহজ হয়। কিন্তু যদি মনে কর উহাকে বাহির হইতে দিব না, খেলায় বাধা দিব, ঠাণ্ডা করিয়া বসাইয়া রাখিব তাহা হইলে অত্যন্ত দুরূহ সমস্যার সৃষ্টি করা হয়। তাহা হইলে, ছেলেমানুষ ছেলেমানুষির দ্বারা নিজের যে ভার নিজে অনায়াসেই বহন করে সেই ভার শাসনকর্ত্তার উপরে পড়ে। তখন ঘোড়াকে মাটিতে চলিতে না দিয়া তাহাকে কাঁধে লইয়া বেড়ান হয়। যে বেচারা কাঁধে করে তাহার মেজাজ ঠিক থাকেনা। মজুরির লোভে কাঁধে করে বটে কিন্তু ঘোড়া বেচারার উপর পদে পদে শোধ লইতে থাকে।

 এই আমাদের শিশুকালের শাসনকৰ্ত্তাদের মধ্যে অনেকেরই স্মৃতি কেবল কিল-চড় আকারেই মনে আছে—তাহার বেশি আর মনে পড়ে না। কেবল একজনের কথা খুব স্পষ্ট মনে জাগিতেছে।

 তাহার নাম ঈশ্বর। সে পূর্ব্বে গ্রামে গুরুমশায়গিরি করিত। সে অত্যন্ত শুচিসংযত আচারনিষ্ঠ বিজ্ঞ এবং গম্ভীরপ্রকৃতির লোক। পৃথিবীতে তাহার শুচিতারক্ষার উপযোগী মাটি জলের বিশেষ অসদ্ভাব ছিল। এইজন্য এই মৃৎপিণ্ড মেদিনীর মলিনতার সঙ্গে সৰ্ব্বদাই তাহাকে যেন লড়াই করিয়া চলিতে হইত। বিদ্যুদ্বেগে ঘটি ডুবাইয়া পুষ্করিণীর তিন চার হাত নীচেকার জল সে সংগ্ৰহ করিত। স্নানের সময় দুই হাত দিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া পুষ্করিণীর উপরিতলের জল কাটাইতে কাটাইতে অবশেষে হঠাৎ এক সময় দ্রুতগতিতে ডুব দিয়া লইত; যেন পুষ্করিণীটাকে কোনোমতে অন্যমনস্ক করিয়া দিয়া ফাঁকি দিয়া মাথা ডুবাইয়া লওয়া তাহার অভিপ্রায়। চলিবার সময় তাহার দক্ষিণ হস্তটি এমন একটু বক্রভাবে দেহ হইতে স্বতন্ত্র হইয়া থাকিত যে বেশ বোঝা যাইত তাহার ডান হাতটা তাহার শরীরের কাপড় চোপড় গুলাকে পর্য্যন্ত বিশ্বাস করিতেছে না। জলে স্থলে আকাশে এবং লোকব্যবহারের রন্ধ্রে, রন্ধ্রে, অসংখ্য দোষ প্রবেশ করিয়া আছে, অহোরাত্র সেই গুলাকে কাটাইয়া চলা তাহার এক বিষম সাধন ছিল। বিশ্ব-জগৎটা কোনো দিক্‌ দিয়া তাহার গায়ের কাছে আসিয়া পড়ে ইহা তাহার পক্ষে অসহ্য। অতলস্পর্শ তাহার গাম্ভীৰ্য্য ছিল। ঘাড় ঈষৎ বাঁকাইয়া মন্দ্র স্বরে চিবাইয়া চিবাইয়া সে কথা কহিত। তাহার সাধুভাষার প্রতি লক্ষ্য করিয়া গুরুজনেরা আড়ালে প্রায়ই হাসিতেন। তাহার সম্বন্ধে আমাদের বাড়িতে একটা প্রবাদ রটিয়া গিয়াছিল যে সে “বরানগর”কে “বরাহনগর” বলে। এটা জনশ্রুতি হইতে পারে কিন্তু আমি জানি, “অমুক লোক বসে আছেন”—না বলিয়া সে বলিয়াছিল “অপেক্ষা করচেন।” তাহার মুখের এই সাধুপ্রয়োগ আমাদের পারিবারিক কৌতুকালাপের ভাণ্ডারে অনেকদিন পর্য্যন্ত সঞ্চিত ছিল। নিশ্চয়ই এখনকার দিনে ভদ্রঘরের কোনো ভৃত্যের মুখে “অপেক্ষা করচেন” কথাটা হাস্যকর নহে। ইহা হইতে দেখা যায় বাংলায় গ্রন্থের ভাষা ক্রমে চলিতভাষার দিকে নামিতেছে এবং চলিতভাষা গ্রন্থের ভাষার দিকে উঠিতেছে;—একদিন উভয়ের মধ্যে যে আকাশ পাতাল ভেদ ছিল এখন তাহা প্রতিদিন ঘুচিয়া আসিতেছে।

 এই ভূতপূর্ব্ব গুরুমহাশয় সন্ধ্যাবেলায় আমাদিগকে সংযত রাখিবার জন্য একটি উপায় বাহির করিয়াছিল। সন্ধ্যাবেলায় রেড়ির তেলের ভাঙা সেজের চারদিকে আমাদের বসাইয়া সে রামায়ণ মহাভারত শোনাইত। চাকরদের মধ্যে আরও দুই চারিটি শ্রোতা আসিয়া জুটিত। ক্ষীণ আলোক ঘরের কড়িকাঠ পর্য্যন্ত মস্ত মস্ত ছায়া পড়িত, টিক্‌টিকি দেয়ালে পোকা ধরিয়া খাইত, চাম্‌চিকে বাহিরের বারান্দায় উন্মত্ত দরবেশের মত ক্রমাগত চক্রাকারে ঘুরিত, আমরা স্থির হইয়া বসিয়া হাঁ করিয়া শুনিতাম। যেদিন কুশলবের কথা আসিল, বীরবালকের তাহাদের বাপখুড়াকে একেবারে মাটি করিয়া দিতে প্রবৃত্ত হইল, সেদিনকার সন্ধ্যাবেলার সেই অস্পষ্ট আলোকের সভা নিস্তব্ধ ঔৎসুক্যের নিবিড়তায় যে কিরূপ পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল তাহা এখনো মনে পড়ে। এদিকে রাত হইতেছে, আমাদের জাগরণকালের মেয়াদ ফুরাইয়া আসিতেছে, কিন্তু পরিণামের অনেক বাকি। এহেন সঙ্কটের সময় হঠাৎ আমাদের পিতার অনুচর কিশোরী চাটুয্যে আসিয়া দাশুরায়ের পাঁচালি গাহিয়া অতি দ্রুত গতিতে বাকি অংশটুকু পূরণ করিয়া গেল;—কৃত্তিবাসের সরল পয়ারের মৃদুমন্দ কলধ্বনি কোথায় বিলুপ্ত হইল—অনুপ্রাসের ঝক্‌মকি ও ঝঙ্কারে আমরা একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া গেলাম।

 কোনো কোনোদিন পুরাণপাঠের প্রসঙ্গে শ্রোতৃসভায় শাস্ত্রঘটিত তর্ক উঠিত, ঈশ্বর সুগভীর বিজ্ঞতার সহিত তাহার মীমাংসা করিয়া দিত। যদিও ছোটো ছেলেদের চাকর বলিয়া ভৃত্যসমাজে পদমর্য্যাদায় সে অনেকের চেয়ে হীন ছিল, তবু, কুরুসভায় ভীষ্ম পিতামহের মত, সে আপনার কনিষ্ঠদের চেয়ে নিম্ন আসনে বসিয়াও আপন গুরুগৌরব অবিচলিত রাখিয়াছিল।

 এই আমাদের পরম প্রাজ্ঞ রক্ষকটির যে একটি দুর্বলতা ছিল তাহা ঐতিহাসিক সত্যের অনুরোধে অগত্য প্রকাশ করিতে হইল। সে আফিম খাইত। এই কারণে তাহার পুষ্টিকর আহারের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। এই জন্য আমাদের বরাদ্দ দুধ যখন সে আমাদের সাম্‌নে আনিয়া উপস্থিত করিত তখন সেই দুধ সম্বন্ধে বিপ্রকর্ষণ অপেক্ষা আকর্ষণ শক্তিটাই তাহার মনে বেশি প্রবল হইয়া উঠিত। আমরা দুধ খাইতে স্বভাবতই বিতৃষ্ণা প্রকাশ করিলে আমাদের স্বাস্থ্যোন্নতির দায়িত্ব পালন উপলক্ষ্যেও সে কোনোদিন দ্বিতীয়বার অনুরোধ বা জবরদস্তি করিত না।

 আমাদের জলখাবার সম্বন্ধেও তাহার অত্যন্ত সঙ্কোচ ছিল। আমরা খাইতে বাসিতাম। লুচি আমাদের সামনে একটা মোটা কাঠের বারকোসে রাশ করা থাকিত। প্রথমে দুই একখানি মাত্র লুচি যথেষ্ট উঁচু হইতে শুচিতা বাঁচাইয়া সে আমাদের পাতে বর্ষণ করিত। দেবলোকের অনিচ্ছাসত্ত্বেও নিতান্ত তপস্যার জোরে যে বর মানুষ আদায় করিয়া লয় সেই বরের মত, লুচি কয়খানা আমাদের পাতে আসিয়া পড়িত; তাহাতে পরিবেষণকৰ্ত্তার কুণ্ঠিত দক্ষিণ হস্তের দাক্ষিণ্য প্রকাশ পাইত না। তাহার পর ঈশ্বর প্রশ্ন করিত, আরো দিতে হইবে কি না। আমি জানিতাম কোন উত্তরটি সর্ব্বাপেক্ষা সদুত্তর বলিয়া তাহার কাছে গণ্য হইবে। তাহাকে বঞ্চিত করিয়া দ্বিতীয়বার লুচি চাহিতে আমার ইচ্ছা করিত না। বাজার হইতে আমাদের জন্য বরাদ্দমত জলখাবার কিনিবার পয়সা ঈশ্বর পাইত। আমরা কি খাইতে চাই প্রতিদিন সে তাহা জিজ্ঞাসা করিয়া লইত। জানিতাম সস্তা জিনিষ ফরমাস করিলে সে খুসি হইবে। কখনো মুড়ি প্রভৃতি লঘু পথ্য, কখনো বা ছোলাসিদ্ধ চিনাবাদামভাজা প্রভৃতি অপথ্য আদেশ করিতাম। দেখিতাম শাস্ত্রবিধি আচারতত্ত্ব প্রভৃতি সম্বন্ধে ঠিক সূক্ষ্ম বিচারে তাহার উৎসাহ যেমন প্রবল ছিল আমাদের পথ্যাপথ্য সম্বন্ধে ঠিক তেমনটি ছিল না।