জেবুন্নিসা বেগম/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


ঔরঙ্গজেব বাদশাহের উপর জেবুন্নিসা বেগমের প্রভাব

 জানা যায়—জেবুন্নিসা বেগম ও তাঁহার পিতার মধ্যে প্রায়ই নানা বিষয়ে বাদানুবাদ ও আলোচনা হইত। সেই সব চর্চ্চায় ঔরঙ্গজেব বাদশাহ্‌ তাহার দুহিতার বিদ্যা ও বুদ্ধিবল দেখিয়া অবাক হইতেন। উক্ত বাদশাহের ন্যায় কুটিল রাষ্ট্রনীতিপরায়ণ ব্যক্তি যাঁহার সহিত তর্কবিতর্কে নির্ব্বাক হইতেন—সেই ব্যক্তির যে কিরূপ প্রখর বুদ্ধি ও বিদ্যাবল ছিল ইহা সহজেই অনুমান করা যায়।

 একজন ক্রীড়াদক্ষ ব্যক্তি সিংহাদি মারাত্মক জন্তুকে সুকৌশলে বশীভূত করিয়া যেরূপ কেবল অঙ্গুলি সঙ্কেতে পরিচালন করে, সুচতুরা জেবুন্নিসা বেগমও ব্যাঘ্রের মত তাঁহার পিতার উপর সেইরূপ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন।

 কঠোর-প্রকৃতি ঔরঙ্গজেব বাদশাহের নিকট কোন অন্তঃপুর মহিলাই কোন বিষয়ে প্রশ্রয় পাওয়া দূরের কথা—অগ্রসর হইতে শঙ্কিত হইত। তিনি বাদশাহী মহলে কোন সময়েই কাহাকেও কোন বিষয়ে স্বাধীনতা দিতেন না; কিন্তু জেবুন্নিসা বেগম অনেক বিষয়েই স্বাধীনতা পাইতেন। তাঁহার কথার কাছে কাহারও কথা ঔরঙ্গজেব বাদশাহের নিকট লাগিত না।

 বাদশাহী অন্তঃপুরে কেহই কবিতাপুস্তক পাঠ বা কবিতা আবৃত্তি করিতে পারিত না। বিশেষতঃ সুপ্রসিদ্ধ কবি শম্‌সুদ্দীন মহম্মদ হাফেজের রচিত ভুবনবিখ্যাত “দিওয়ান্‌-এ-হাফেজ” পাঠ করা একেবারে নিষেধ ছিল। কেননা উক্ত গ্রন্থ নিরাশ প্রেমিকের বিলাপে এবং সুরা ও সুন্দরীর প্রশংসায় পূর্ণ। যদিও উক্ত পুস্তকের কবিতাগুলি সাধারণ চক্ষে দেখিলে এরূপ দেখায় বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐ সব কবিতা ঈশ্বর-প্রেমে উন্মত্ত প্রেমিকের ব্যাকুলতা প্রকাশ ব্যতীত আর কিছুই নহে। জেবুন্নিসা বেগম তাঁহার পিতার কঠিন হৃদয় নিজবশে আনিতে পারায় ঐ নিষিদ্ধ কবিতা পুস্তক পাঠ করিতে অধিকার পাইয়াছিলেন।

 ঔরঙ্গজেব বাদশাহ ও জেবুন্নিসা বেগম “সুন্নী” মতাবলম্বী ছিলেন। এই কারণে দরবারে ঐ সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিগণই অধিক ছিল এবং তাহাদেরই প্রাধান্যও ছিল। তথাপি “শীয়া” মতাবলম্বী লোক যে না ছিল এমন নহে। দরবারস্থ উক্ত সম্প্রদায়ভুক্ত লোক ব্যতীত ঔরঙ্গজেব বাদশাহের পুত্ত্র শাহজাদা মহম্মদ মোঅজ্জম এবং অন্তঃপুরের মহিলাগণের মধ্যেও অনেকেই “শীয়া” মতাবলম্বী ছিল।

 উক্ত দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মতের অনৈক্য হেতু প্রায়ই বিবাদ কলহের সূত্রপাত হইত। ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় এই বিরোধ মিটাইবার জন্য অনেকেই যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু কেহই কৃতকার্য্য হন নাই। অবশেষে বুদ্ধিমতি জেবুন্নিসা বেগম সুকৌশলে উভয় পক্ষকে প্রবোধ প্রদান পূর্ব্বক তাহাদিগের বাদবিসংবাদ মিটাইয়া অশান্তি ও উপদ্রব বারণ করিয়াছিলেন। কেহই তাঁহার মীমাংসা ঠেলিতে পারে না—উভয় সম্প্রদায়ভুক্ত লোকেরাই উহা শিরোধার্য্য পূর্ব্বক গ্রহণ করে।

 এইরূপে জেবুন্নিসা বেগম অনেক সময়েই প্রখর বুদ্ধিবলে সামাজিক ও অন্যান্য বিষয়ের বিবাদ কলহ নিষ্পত্তি করিতেন। সুচতুর রাজনীতি-বিশারদ ঔরঙ্গজেব বাদশাহ পর্য্যন্ত রাজকার্য্যের জটিল বিষয়ে সময় সময় তাঁহার কন্যার পরামর্শ গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। ঔরঙ্গজেব বাদশাহের উপর জেবুন্নিসা বেগমের এ প্রকার প্রভাব দেখিয়া তাঁহার অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য সর্ব্বদাই লোকে চেষ্টা করিত। হিংসুকেরও অভাব ছিল না—তাঁহার ক্ষমতা দেখিয়া কেহ কেহ যে ঈর্ষা না করিত এমনও নহে।