জ্ঞাতি-শত্রু/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

 হরিসাধনবাবুর বাড়ীতে প্রবেশ করিবার পূর্ব্বেই অন্তঃপুরবাসিনী রমণীগণের হৃদয়-ভেদী ক্রন্দনের রোল আমার কর্ণগোচর হইল। সে করুণ রোদন, সে মর্ম্মপর্শী আর্ত্তনাদ শ্রবণ করিলে কাহার হৃদয় না দ্রবীভূত হয়? আমি অনেক কষ্টে অশ্রু সম্বরণ করিতে সক্ষম হইয়াছিলাম।

 হরিসাধন বাবুব আধুনিক বসতবাটিখানি নিতান্ত ক্ষুদ্র নহে, সমগ্র বাড়ী ও তাহার চতুষ্পার্শ্বস্থ ও মধ্যস্থ পরিমাণ প্রায় দশ কাঠা হইবে। বাড়ীখানি দ্বিতল। একতলে বাহির মহলের একটি বৈঠকখানায় শক্তিসাধন আমাকে লইয়া গেলেন।

ঘরখানি বড়। দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে বার-তের হাতের কম নহে। ঘরখানি রাস্তার ঠিক পার্শ্বে উহার আটটি জানালা ও দুইটি দরজা। ভিতরে মেজের উপর ঢালা বিছানা। প্রথমে মাদুর, পরে সতরঞ্চ, তাহার উপর প্রকাণ্ড লেপ, সর্ব্বোপরি দুগ্ধফেননিভ শুভ্র একখানি চাদর।

 শক্তিসাধন সেই বিছানার উপর বসিতে অনুরোধ করিলেন। বিছানার একপার্শ্বে দুইটী বৈঠকে দুইটি বাঁধান হুঁকা ছিল। একটী ব্রাহ্মণের, অপরটী শূদ্রের। আমরা উভয়ে বসিবামাত্র একজন ভৃত্য (বেয়ারা) এক কলিকা তামাকু লইয়া অগ্নিতে ফুৎকার প্রদান করিতে করিতে গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল এবং বৈঠক দুইটীকে আমাদের নিকট আনয়ন করিয়া, হস্তস্থিত কলিকাটী ব্রাহ্মণের হুঁকার উপর বসাইয়া শক্তিসাধনের হস্তে দিয়া প্রস্থান করিল।

 শক্তিসাধন ভৃত্যের হস্ত হইতে হুঁকাটী গ্রহণ করিয়া আমাকে দিলেন। কিন্তু আমি ধূমপান করি না জানিতে পারিয়া বিশেষ লজ্জিত হইলেন। আমি তাঁহাকে বলিলাম, “এখন যে জন্য এখানে আসিলাম, তাহার কি করিতেছেন? আপনার দাদার কিরূপে মৃত্যু হয় এবং কখনই বা তাঁহার রোগের সূত্রপাত হয় সমস্ত কথা প্রকাশ করুন।”

 শক্তিধন উত্তর করিলেন, “পূর্ব্বেই বলিয়াছি, গত কল্য এ বাড়ীতে একটা ভোজ ছিল। নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণের আহারাদির পর আমরা কয়েকজন বিশেষ আত্মীয় ব্যক্তি দাদার সহিত এক সঙ্গে আহার করিতে বসি। বেলা দুইটার পর আমাদের আহার শেষ হয়। আমিও এই বৈঠকখানায় আসিয়া একপার্শ্বে শয়ন করি। এক ঘণ্টার মধ্যেই অন্যান্য সকলে স্ব স্ব গৃহে প্রত্যাগমন করেন। কেবল আমিই এইখানে ছিলাম। বেলা বারটায় সময় শুনিলাম, দাদা বমি করিতেছেন। আমি তখনই বাড়ীর ভিতরে গমন করিলাম এবং ডাক্তার বাবুকে সংবাদ দিবার জন্য লোক প্রেরণ করিতেছিলাম, কিন্তু দাদা আমাকে স্বয়ং নিষেধ করিলেন। তিনি বলিলেন, গুরু আহার বশতঃই ঐরূপ বমি হইয়াছে, শীঘ্রই আরোগ্য হইবে। দাদার স্ত্রীও তখন তাঁহার কথায় সায় দিলেন। কিছুক্ষণ পরে দাদা নিদ্রিত হইয়া পড়িলে আমি এখান হইতে প্রস্থান করিলাম।”

 সমস্ত কথা শুনিয়া আমি শক্তিসাধন বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তাহার পর?”

 শ। রাত্রি দশটার পর এখানকার ভৃত্য আমার বাসায় সংবাদ দিল, দাদার অসুখ বৃদ্ধি হইয়াছে। আমি তখন নিদ্রিত ছিলাম, কাজেই আসিতে বিলম্ব হইল। যখন এ বাড়ীতে আসিলাম, তখন রাত্রি প্রায় বারটা। বাড়ীতে আসিয়া যাহা দেখিলাম, তাহাতে আমার অন্তরাত্মা শুখাইয়া গেল। দেখিলাম, দাদা অচেতন অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছেন, ডাক্তার বাবু অতি মনোযগের সহিত তাঁহার নাড়ী পরীক্ষা করিতেছেন, আর বাড়ীর মেয়েরা রোদন করিতেছেন। আমাকে দেখিয়া দাদার স্ত্রী আরও কাঁদিয়া উঠিলেন। আমারও চক্ষে জল আসিল, আর তথায় দাঁড়াইতে পারিলাম না। ধীরে ধীরে বৈঠকখানায় আসিয়া বসিয়া পড়িলাম। এইরূপে রাত্রি শেষ হইল। দাদার আর চৈতন্য হইল না। ডাক্তার বাবু হতাশ হইয়া আটটার সময় বাড়ী ফিরিয়া গেলেন। দশটার মধ্যেই দাদা আমাদের সকলকে কাঁদাইয়া এ পৃথিবী ত্যাগ করিলেন।

 শক্তিসাধনের সকল কথা শুনিয়া আমি স্তম্ভিত হইলাম। ভাবিলাম, যখন ডাক্তার বাবু প্রথম হইতে শেষ পর্য্যন্ত এখানে থাকিয়া রোগীর চিকিৎসা করিয়াছেন, তখন শক্তিসাধন কেমন করিয়া সন্দেহ করিলেন যে, হরিসাধন বাবুকে কেহ বিষ প্রয়োগে হত্যা করিয়াছেন। ডাক্তারবাবু যখন সার্টিফিকেট দিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করিলেন না, তখন তিনি যে তাঁহার মৃত্যুতে কোন প্রকার সন্দেহ করেন নাই তাহা বেশ বুঝিতে পারা যায়। শক্তিসাধনের অনুমান মিথ্যা বলা যায় না,যতক্ষণ না হরিসাধন বাবুর মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করিয়া পরীক্ষা করা যাইতেছে। পরীক্ষান্তে প্রকৃতসংবাদ পাওয়া যাইবে। কিন্তু শক্তিসাধন হঠাৎ এরূপ সন্দেহ করেন কেন? স্বীকার করি, তিনি তাঁহার দাদার নিকট বসিয়া আহার করিয়া ছিলেন। যদি তিনি কাহাকেও খাদ্যের সহিত ঐ বিষ মিশ্রিত করিতে দেখিয়া থাকেন, তাহা হইলে তিনি তখনই তাঁহাকে গ্রেপ্তার করেন নাই কেন?

 এই প্রকার চিন্তা করিয়া আমি শক্তিসাধনের দিকে চাহিলাম ও তাঁহার আপাদ মস্তক বিশেষ করিয়া নিরীক্ষণ করিলাম। পরে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার দাদাকে কেহ বিষ প্রয়োগে হত্যা করিয়াছে এ সন্দেহ কেন হইল? যখন সকলেই এমন কি আপনাদের পারিবারিক ডাক্তার পর্য্যন্ত বলিতেছেন যে, তিনি কলেরায় মারা গিয়াছেন, আর যখন বাস্তবিকই এ পল্লিতে ভয়ানক কলেরার উপদ্রব, তখন তিনিও যে ঐ রোগে মারা পরেন নাই, এ অবিশ্বাস আপনার কেন হইল?

 শক্তিসাধন সহসা কোন উত্তর করলেন না। তিনি মস্তক অবনত করিয়া একমনে কি চিন্তা করিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে বলিলেন, পূর্ব্বেই বলিয়াছি, জ্ঞাতিশত্রু আমাদিগকে পৈত্রিক সম্পত্তি হইতে বঞ্চিত করিয়াছেন। সেই শত্রুই মৌখিক প্রণয় দেখাইয়া আবার এখানে আসিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। কাল যখন আহার করিতে বসি, তখন তিনি দাদার ঠিক পার্শ্বেই বসিয়াছিলেন, আহার করিতে করিতে তিনি অনেকবার দাদার পাতে হাত দিয়াছিলেন, সেই জন্যই আমার সন্দেহ।

 আমি আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, সে কি! আহার করিতে করিতে তিনি এরূপ করিয়াছিলেন কেন?

 শক্তিসাধন ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, সে কথা কেমন করিয়া বলিব?

 আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি তবে কাহাকে সন্দেহ করেন বলুন? আর কি উপলক্ষে এই ভোজন হইয়াছিল?

 শ। দাদা একটা নূতন বিষয় ক্রয় করিয়াছেন, সেই কারণেই আনন্দ ভোজের আয়োজন। সন্দেহের কথা আর কি বলিব, আপনাকে ত সকল কথাই বলিলাম।

 আ। আপনারাও পূর্ব্বে নিমন্ত্রিত হইয়াছিলেন এবং নিশ্চয়ই সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিয়াছিলেন?

 শ। আজ্ঞে না, আমি সে পাত্র নই; নিমন্ত্রিত হইয়াছিলাম, যাই নাই।

 আ। আপনার জ্যেষ্ঠ নিশ্চয়ই গিয়াছিলেন এবং সেখানে আহারাদি করিয়া তাঁহাদিগকে অপ্যায়িত করিয়াছিলেন।

 শক্তিসাধন সম্মতিসূচক উত্তর দিলেন। আমি আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলাম না; ভাবিলাম, শক্তিসাধন এত কথা বলেন কেন? আহারের কথা উল্লেখ করায় বোধ হইতেছে, তিনি সেই জ্ঞাতি শত্রুকে আহারের সময় বিষ প্রয়োগে তাঁহার জ্যেষ্ঠের প্রাণসংহার করিয়াছে বলিয়া সন্দেহ করিয়াছেন, হরিসাধন বিষ প্রয়োগে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছেন কি না, মৃতদেহ পরীক্ষা করিলেই জানা যাইবে। যদি বাস্তবিক তাহাই হয়, তাহা হইলে সেই জ্ঞাতিকেই সন্দেহ করিয়া গ্রেপ্তার করা সর্ব্বতোভাবে উচিত কিন্তু তাহাতে শক্তিসাধনকে প্রথমে ফরিয়াদী হইতে হয়।

 এই প্রকার চিন্তা করিয়া আমি শক্তিসাধনকে বলিলাম, আমি আপনার মনোগত অভিপ্রায় বুঝিতে পারিয়াছি। আপনি সে জ্ঞাতিকেই সন্দেহ করিয়াছেন। মনে করিতেছেন, তিনি আহার করিবার সময় আপনার জ্যেষ্ঠের কোন খাদ্যের সহিত কৌশলে বিষ মিশ্রিত করিয়া দিয়াছেন।

 আমার কথা শেষ হইতে না হইতে শক্তিসাধন চমকিয়া উঠিলেন, আরও দুই একবার তিনি এরূপে চমকিত হইয়াছিলেন বলিয়া আমি আর সে বিষয় গ্রাহ্য করিলাম না। ভাবিলাম, ভ্রাতৃ বিয়োগে লোকটার মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছে।

 কিছুক্ষণ কি ভাবিয়া তিনি বলিলেন, আপনি সত্যই অনুমান করিয়াছেন। আমারও ঠিক সেইরূপ সন্দেহ হইয়াছে।

 ঠিক এই সময়ে দুই তিনজন আত্মীয় অতিবিষণ্ণ বদনে ঘাট হইতে ফিরিয়া আসিলেন। একজন এক ভৃতকে তখনি পারিবারিক ডাক্তার বাবুর বাড়ীতে পাঠাইয়া দিলেন। শুনিলাম, ডাক্তারের সাটিফিকেট প্রয়োজন।

 ভৃত্যকে ডাক্তারের বাড়ীতে পাঠাইয়া দিয়া তাঁহারা সকলেই সেই বৈঠকখানায় প্রবেশ করিলেন। তখন শক্তিসাধন বাবু আমাকে নির্দ্দেশ করিয়া বলিলেন যে, আমি তাঁহার জ্যেষ্ঠের আকস্মিক মৃত্যুতে সন্দেহ করিয়া অনুসন্ধানের জন্য সেখানে গমন করিয়াছি। তিনিই যে আমাকে সেখানে ডাকিয়া লইয়া গিয়াছিলেন, একথা তিনি বলিলেন না, আমিও উল্লেখ করিলাম না।

 আমাকে দেখিয়া তাঁহারা আশ্চর্য্যান্বিত ও বিরক্ত হইলেন। ভাবিলেন, এই বিপদের সময় আমি তাঁহাদিগকে কষ্ট দিবার জন্যই সেখানে গমন করিয়াছি।

 কিছুক্ষণ পরে একজন জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনিই কি তবে ঘাটের রেজিষ্ট্রার বাবুকে দাহ করিবার অনুমতি দিতে নিষেধ করিয়াছেন?

 আমি বিষম ফাঁপরে পড়িলাম, কিছুক্ষণ ভাবিয়া সত্যকথা প্রকাশ করিতেই মনস্থ করিলাম, পরে বলিলাম, শক্তিসাধন বাবু তাঁহার জ্যেষ্ঠের মৃত্যুতে সন্দেহ করিয়া থানায় সংবাদ দিয়াছিলেন, তাঁহার মুখে যেরূপ শুনিলাম, তাহাতে সকলেরই সন্দেহ হওয়া উচিত।

 যিনি আমাকে প্রশ্ন করিয়াছিলেন, আমার উত্তর শুনিয়া আন্তরিক বিরক্ত হইলেন। কিছু কর্কশ স্বরে শক্তিসাধনবাবুকে বলিলেন, তবে আপনারই এই কাজ? আপনিই এই দাহকার্য্যে ব্যাঘাত ঘটাইয়াছেন?

 এই কথা শেষ হইতে না হইতে ভৃত্য ডাক্তার বাবুকে লইয়া প্রত্যাগমন করিল। সকল কথা শুনিয়া তিনি ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, আপনারা মিথ্যা ভয় করিতেছেন। আমি স্বয়ংই ঘাটে যাইতাম, কিন্তু বিশেষ কার্য্যোপলকে যাইতে পারি নাই। হরিসাধন বাবু কলেরায় মারা পড়িয়াছেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। আমি এখনই সার্টিফিকেট লিখিয়া দিতেছি।

 এই বলিয়া ডাক্তার বাবু তখনই একখানা সার্টিফিকিট লিখিয়া দিলেন। যাঁহারা ঘাট হইতে ফিরিয়া আসিয়াছিলেন, তাঁহারা কাগজখানি লইয়া পুনরায় তথায় গমন করিলেন। শক্তিসাধন আমারই নিকট বসিয়া রহিলেন।

 ডাক্তার বাবু প্রস্থান করিবার পূর্ব্বে আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনি কেমন করিয়া জানিলেন, হরিসাধন বাবু কলেরায় মারা পড়িয়াছেন? শক্তিসাধন বাবুর সন্দেহ—কোন লোক বিষ প্রয়োগে তাঁহাকে হত্যা করিয়াছে।

 ডাক্তারবাবু ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, ভ্রাতার প্রাণবিয়োগে বোধ হয় উহাঁর মস্তিষ্ক বিকৃত হইয়া গিয়াছে, নতুবা তাঁহার এরূপ সন্দেহ হইবে কেন?

 আ। আপনি কি দৃঢ় বিশ্বাস করেন যে, তিনি কলেরায় মারা গিয়াছেন?

 ডা। আজ্ঞে হাঁ। সন্দেহের কেন কারণ নাই।

 আ। কেন নাই? হরিসাধন বাবুর শত্রুর অভাব ছিল না।

 ডাক্তার বাবু হাসিয়া উঠিলেন, তিনি বলিলেন, হরিসাধন বাবুর শত্রু? না মহাশয়, আমার বোধ হয়, তাঁহার আর কোন শত্রু নাই।

 আমি আশ্চর্য্যান্বিত হইলাম জিজ্ঞাসা করিলাম, তাঁহার জ্ঞাতিভ্রাতাগণ কি মোকদ্দমা করিয়া তাঁহার পৈতৃক সম্পত্তি দখল করিয়া লন নাই?

 ডা। আজ্ঞে হাঁ, লইয়াছেন, কিন্তু এখন আর তাঁহাদের সহিত হরিসাধন বাবুর মনোমালিনা নাই। রসময় বাবুর কন্যার বিবাহে জ্ঞাতি ভ্রাতাগণের সহিত তাঁহার সদ্ভাব হইয়াছিল। এখন তাঁহারা আর হরিবাবুর শত্রু নহেন,বিশেষ বন্ধু বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।

 আ। আপনি সেরূপ মনে না করিলেও তাঁহার ভ্রাতা শক্তিসাধন বাবু সেরূপ ভাবেন না। তিনি বলিয়াছেন, তাঁহাদের জ্ঞাতিভ্রাতাগণ মৌখিক আলাপ রাখিয়া ভিতরে ভিতরে তাঁহার জ্যেষ্ঠের সর্ব্বনাশের চেষ্টায় ছিলেন। এখন সুবিধা পাইয়া কার্য্য সিদ্ধি করিয়াছেন।

 ডাক্তার বাবু গম্ভীরভাবে বলিলেন, “শক্তিসাধন বাবুর এই এইরূপ অন্যায় সন্দেহের কোন কারণ নাই। কিন্তু যখন তিনি সন্দেহ করিয়া এই সকল কথা পুলিসের গোচর করিয়াছেন, তখন আপনারা অবশ্যই তাহার সন্ধান লইবেন। কিন্তু আমি যতদূর জানি, তাহাতে হরিসাধন বাবুর জ্ঞাতি ভ্রাতাগণকে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্দ্দোষী বলিয়াই মনে হয়।”

 এই বলিয়া ডাক্তার বাবু তথা হইতে প্রস্থান করিলেন। আমি শক্তিসাধনের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনার জ্যেষ্ঠের পুত্রাদি কয়জন?”

 শক্তিসাধন অতি বিনীতভাবে উত্তর করিলেন, “দাদার দুই-তিনটী সন্তান হইয়াছিল কিন্তু কালের বিচিত্র গতি—একটীও জীবিত নাই।”

 আমি আরও আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “তবে আপনি এখানে থাকেন না কেন?”

 শক্তিসাধন কথাটা এবারও চাপা দিবার চেষ্টা করিলেন কিন্তু পারিলেন না। অবশেষে আমার নির্ব্বন্ধাতিশয় দেখিয়া অতিশয় লজ্জিত হইয়া বলিলেন, “আমি জাতিচ্যুত হইয়াই স্বতন্ত্র বাস করিতেছি।”

 অত্যন্ত আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “সে কি? আপনি জাতিচ্যুত হইলেন কেন?”

 শ। সে সকল কথা আমায় আর জিজ্ঞাসা করিবেন না। ব্রাহ্মণের সন্তান হইয়া নীচজাতির হস্তে আহার করিয়াছিলাম, এই অপরাধে জাতিচ্যুত হইয়াছি।

 আ। আজকাল অনেকেই ত ঐরূপ করিতেছেন?

 শ। হইতে পারে— মিথ্যা নয়; কিন্তু আমার জ্যেষ্ঠ একজন গোঁড়া হিন্দু ছিলেন। তিনি হিন্দুত্ব বজায় রাখিতে সদাই যত্ন করিতেন।

 আ। এ বাড়ীতে আপনার ত অংশ আছে?

 শ। আজ্ঞে না।

 আ। কেন?

 শ। ইহা দাদার স্বোপার্জ্জিত সম্পত্তি। আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি জ্ঞাতিগণ কাড়িয়া লইয়াছে।

 আমি তখন আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলাম না। শক্তি সাধনকে লইয়া ঘটে গমন করিলাম। দেখিলাম, রেজিষ্ট্রার সার্টিফিকেটখানি পুলিস সাহেবের নিকট পাঠাইবার উদ্যোগ করিতেছেন। আমাকে দেখিয়া অনেকটা আশ্বস্ত হইলেন এবং কি করিবেন জিজ্ঞাসা করিলেন।

 আমি তখন হরিসাধনের মৃতদেহ দেখিতে ইচ্ছা করিলাম। রেজিষ্ট্রার সসম্ভ্রমে আমাকে সেই মৃতদেহের নিকট লইয়া গেলেন। পরে নিকটস্থ কোন লোককে আবরণ উন্মোচন করিতে আদেশ করিলেন।

 হরিসাধনের মৃতদেহ দেখিয়া আমার সন্দেহ আরও বর্দ্ধিত হইল। সহজ অবস্থায় মারা পড়িলে মৃতদেহ যেরূপ থাকে, ইহার অবস্থা তদপেক্ষা অনেক বিকৃত। আমি রেজিষ্ট্রারকে ভাল করিয়া পরীক্ষা করিতে অনুরোধ করিলাম।

 রেজিষ্ট্রার একজন প্রবীণ লোক। বয়স প্রায় পঞ্চাশ বৎসর। প্রায় পঁচিশ বৎসর ঐ কার্য্য করিতেছেন। মড়া দেখিয়া তাঁহার ঐ বিষয়ে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি জন্মিয়াছে। যখন তিনি প্রথমে হরিসাধনের মৃতদেহ দেখিয়াছিলেন, তখন কি বুঝিয়াছিলেন বলিতে পারি না। কিন্তু আমার অনুরোধে তিনি দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করিয়া অতি গম্ভীরভাবে বলিলেন, “আপনার অনুমান সত্য বলিয়া বোধ হইতেছে। পূর্ব্বে অন্যরূপ বুঝিয়াছিলাম, কিন্তু এখন আমারও বিশেষ সন্দেহ হইতেছে। ডাক্তারের সার্টিফিকেট পাইলেও আমি এ দেহ সৎকারের হুকুম দিতে পারিব না। ইহাকে পরীক্ষা করিতেই হইবে।”

 আমিও সেইরূপ পরামর্শ দিলাম। তখন রেজিষ্ট্রার সেই মৃতদেহ পরীক্ষার জন্য হাঁসপাতালে পাঠাইয়া দিলেন। আমিও আর সেখানে কালবিলম্ব না করিয়া রেজিষ্ট্রারের নিকট বিদায় লইলাম এবং শক্তিসাধনকে লইয়া শ্মশান হইতে বহির্গত হইলাম। পথে শক্তিসাধনের বাসার সন্ধান জানিয়া লইয়া তাহাকে বিদায় দিয়া আমি একাই হাঁসপাতালের দিকে গমন করিলাম।