ঝাঁশীর রাজকুমার/ইংরাজ-হস্তে রাজকুমার
ইংরাজ-হস্তে রাজকুমার।
(আত্ম-কাহিনী)
“আমরা গোয়ালের পরিত্যাগ-পূর্ব্বক যখন তালবেট কোঠরায় গমন করি, তখন তত্রত্য ঠাকুর শঙ্কর সিংহের উপদেশ-ক্রমে আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হইয়া বিভিন্ন স্থানে বাস করিবার ব্যবস্থা করিয়াছিলাম, এ কথা ইতঃপূর্ব্বেই বিবৃত করিয়াছি। তদনুসারে যাহারা স্থানান্তরে যাইতে বাধ্য হইয়াছিল, তাহাদিগের মধ্যে হ্ননে খাঁ রিসালদার ও গণপত রাও মারাঠা পাটন অঞ্চলে গমন করে। তাহারা সেখানকার রাজা পৃথ্বী সিংহের অধীনতায় চাকরী পাইয়াছিল।
পাটনের অনতিদূরে আগর নামক স্থানে ইংরাজদিগের এক সেনা-নিবাস ছিল। মেজর ফ্লীক্ নামক জনৈক সদাশয় ইংরাজ সেখানকার পোলিটিকেল এজেণ্ট ছিলেন। পাটনে অবস্থান কালে হ্ননে খাঁ মধ্যে মধ্যে গিয়া এজেণ্ট সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিত। ক্রমশঃ তাঁহার সহিত তাহার পরিচয় একটু ঘনিষ্ঠ হইল। একদিন ফ্লীক্ মহোদয় ঝাঁশীর রাণী সাহেবার প্রসঙ্গ উত্থাপিত করিলে হ্ননে খাঁ কৌশল-পূর্ব্বক আমার দুরবস্থার কথা তাঁহাকে জ্ঞাপন করে। রাণী সাহেবার ৯।১০ বর্ষ বয়স্ক পুত্র ইংরাজ সরকারের ভয়ে গহন অরণ্যে অজ্ঞাত-বাস করিতে বাধ্য হইয়া অশেষ যন্ত্রণাভোগ করিতেছে, ইহা অবগত হইয়া সহৃদয় ফ্লীক্ সাহেবের হৃদয়ে করুণার সঞ্চার হইল। রাণী সাহেবার সম্বন্ধে তাঁহার ধারণা তদানীন্তন অন্যান্য ইংরাজদিগের ন্যায় কুসংস্কার-কলুষিত ছিল না। এই কারণে, হ্ননে খাঁ যখন বলিল—“আপনি দয়া করিয়া রাণী সাহেবার নিরীহ শিশুটির রক্ষণভার গ্রহণ করিলে সর্ব্বত্র আপনার সুযশঃ বিঘোষিত হইবে,” তখন তিনি বলিলেন, “আমরা অতীব আনন্দের সহিত সেই বীর-রমণীর পুত্রকে আশ্রয় দান করিব।”
সেই সময়ে কর্ণেল শেক্সপীয়ার মধ্য ভারতের পোলিটিকেল এজেণ্ট ছিলেন। ইন্দোরে তাঁহার কর্ম্মস্থান ছিল। মেজর ফ্লীক্ তাঁহাকে হ্ননে খাঁর প্রার্থনার বিষয় বিজ্ঞাপন করিলে তিনি তাঁহার প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করিলেন এবং আমাকে ইন্দোরে প্রেরণ করিবার জন্য মিঃ ফ্লীককে পত্র লিখিলেন। অনন্তর ফ্লীক্ মহোদয়ের আদেশক্রমে আমাকে লইবার জন্য হ্ননে খাঁ পাটনে আগমন করিল। পথে কেহ যাহাতে তাহার প্রতিকূল আচরণ করিতে না পারে, তজ্জন্য সে মেজর সাহেবের নিকট হইতে “সেণ্টাল ইণ্ডিয়া হর্স্” নামক তুরগিদলের দুই জন অশ্বারোহী সৈনিক সঙ্গে লইয়াছিল। পাটনে আসিয়া সে গণপত রাও মারাঠাকে পূর্ব্বোক্ত সৈনিকযুগল সহ আমার নিকট প্রেরণ করে।
আমাদের অবস্থানাদির সম্বন্ধে গণপত রাও ও হ্ননে খাঁর কিছুই অগোচর ছিল না। আমরা তালবেট কোঠরা হইতে সিপ্রিতে গমন করিয়াছিলাম, ইহা তাহারা অবগত হইয়াছিল। আমাদের সিপ্রিত্যাগের সংবাদ পাইবার পূর্ব্বেই গণপত রাও সেণ্টাল ইণ্ডিয়া হর্সের সৈনিক যুগল সহ পাটন হইতে সিপ্রি অভিমুখে যাত্রা করে। বড়োদ গ্রামের কমাওয়েস্দারের আদেশে আমরা পাটনে প্রেরিত হইতেছিলাম। এই কারণে পথের মধ্যে পূর্ব্বোক্ত নদীর তটে গণপত রাওয়ের সহিত আমাদিগের সাক্ষাৎকার ঘটিল। আমার অবস্থা দেখিয়া গণপত রাওয়ের নেত্র অশ্রুপূর্ণ হইল। তাহার পর যাহা ঘটিল, তাহা ইতঃপূর্ব্বেই বিবৃত হইয়াছে।
এতদিনে আমার দুর্দ্দশার কিঞ্চিৎ অবসান হইল। বহুদিন দুঃসহ কষ্টভোগের পর এই অনাথ বালকের প্রতি অপার লীলাময় জগদীশ্বরের করুণার সঞ্চার হইল। নচেৎ এরূপ অচিন্তিতপূর্ব্ব ঘটনানিচয়ের সমাবেশে আমার পথকষ্টের শেষ হইত না।
আমি স্বকীয় অশ্বাদি সহ ইংরাজ সৈনিকদিগের সমভিব্যাহারে পাটনে উপস্থিত হইলাম। রঘুনাথ সিংহ প্রভৃতি অনুচরেরা আমার সঙ্গেই ছিল। তাহাদের ও গণপত রাওয়ের চেষ্টায় তত্রত্য রাজা পৃথ্বী সিংহের সহিত আমি পরিচিত হইলাম। ঝাঁশী রাজ্য নিতান্ত ক্ষুদ্রায়তন ছিল না। রাণী সাহেবার সদ্গুণাবলীও রাজা পৃথ্বী সিংহের নিকট সুবিদিত ছিল। একারণে তিনি আমার প্রতি বিশেষ সমাদর প্রকাশ-পূর্ব্বক আমাকে কয়েক দিন তাঁহার নিকট থাকিতে বিশেষ অনুরোধ করিলেন। তিনি আমার ব্যয়নির্ব্বাহের জন্য প্রত্যহ দশ টাকা করিয়া দিতেন। এজেণ্ট সাহেবের দ্বারা আজমীরের রেসিডেণ্ট সাহেবকে পত্র লিখাইয়া তিনি আমার ভাল বন্দোবস্ত করিয়া দিবেন, বলিয়াছিলেন। কিন্তু মন্দভাগ্য বশতঃ তাঁহার প্রস্তাবে সম্মতি-প্রকাশ করা তখন আমার নিকট সুবুদ্ধির কার্য্য বলিয়া বোধ হইল না। আমি তাঁহাকে বলিলাম, “আগরের ছাউনীতে আমাকে লইয়া যাইবার জন্য যখন ইংরাজ সরকারের সৈনিকেরা আসিয়াছে, তখন তাহাদিগের সহিত তথায় যাওয়াই আমি সঙ্গত মনে করিতেছি।” আমার এইরূপ উত্তর শ্রবণ করিয়া পৃথ্বী সিংহ অতীব অপ্রসন্ন হইলেন এবং পাটনের এক ক্রোশ দূরবর্ত্তী ‘মেঘজীন’ নামক স্থানে আমার থাকিবার আদেশ করিলেন। তথায় আমাকে কিয়ৎ পরিমাণে বন্দীর ন্যায় থাকিতে হইত। মেঘজীনে অবস্থানকালে আমার আহারাদির ব্যয়নির্ব্বাহসম্বন্ধে রাজা পূর্ব্বব্যবস্থার কিছুমাত্র ব্যতিক্রম করেন নাই। প্রায় তিন মাস আমাকে তথায় থাকিতে হইল।
রাজা পৃথ্বী সিংহ আমার সহিত ইংরাজ সৈনিকযুগলকেও অবরুদ্ধ করিয়াছিলেন। তাহারা সে কথা আগরের এজেণ্ট মেজর ফ্লীকের গোচর করিলে তিনি আজমীরের রেসিডেণ্ট সাহেবকে তাহা জ্ঞাপন করিলেন। এই বিষয় লইয়া রাজার সহিত রেসিডেণ্টের তিনমাস পর্য্যন্ত পত্র-ব্যবহার চলে। পরিশেষে রেসিডেণ্ট তাঁহাকে লিখিয়া পাঠান যে, “আগরের এজেণ্টের সৈনিকদিগকে বন্দী করিবার আপনার কোন কারণ নাই। অতএব আপনি ঝাঁশীর রাণীর পুত্রের সহিত তাহাদিগকে অবিলম্বে আগরে পাঠাইয়া দিবেন।” এইরূপ আদেশপত্র পাইয়া রাজা আমাদিগকে ছাড়িয়া দিলেন।
পাটনের রাজা আমার ব্যবহারে মনে মনে অসন্তুষ্ট হইলেও আমার প্রতি শেষ পর্য্যন্ত সদ্ব্যবহার করিতে বিরত হন নাই। আগরের ছাউনীতে যাইবার জন্য যখন আমি তাঁহার নিকট বিদায় গ্রহণ করিতে যাই, তখন তিনি আমাকে পাথেয় স্বরূপ ৬ শত মুদ্রা প্রদান করিলেন। তদ্ভিন্ন তাঁহার আদেশ ক্রমে দুই একটি উষ্ট্র ও দুইটি শকট সহ কতিপয় প্রহরী পথকষ্টনিবারণের জন্য আমার অনুবর্ত্তী হইয়াছিল।
কয়েক দিবস মার্গক্রমণের পর আমরা আগরের ছাউনীতে উপনীত হইলাম। তত্রত্য এজেণ্ট মেজর ফ্লীক মহোদয় সসম্মানে আমাকে অভ্যর্থিত করিয়া মধুর বাক্যে অভয় দান করিলেন। সে সময়ে আমার নিকট হস্তস্থিত বত্রিশ তোলা ওজনের দুইটি সুবর্ণ বলয় ভিন্ন আর কিছুই ছিল না। প্রথম দিন সাহেব বাহাদুরের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য রঘুনাথ সিংহ যে আয়োজন করিয়াছিলেন ও দরবারের নিয়মানুসারে আমাকে মেজর মহোদয়ের করকমলে যে সকল উপঢৌকন প্রদান করিতে হইল, তাহার ব্যয় নির্ব্বাহার্থ আমি সে দুটিকে বিক্রয় করিতে বাধ্য হইলাম। ঝাঁশী হইতে পলায়ন করিবার সময় আমার নিকট যে সকল ধনরত্ন ছিল, তাহার এক কপর্দ্দকও আর অবশিষ্ট রহিল না। আমি কমলার সম্পূর্ণ অবকৃপার পাত্র হইলাম।
আমি পাটনে আসিয়াছি, এই সংবাদ অবগত হইয়া আমার প্রাণরক্ষক ও রাণী সাহেবার বিশ্বস্ত সর্দ্দার রামচন্দ্র রাও দেশমুখ ৭।৮টি অশ্ব ও ৯।১০ জন অনুচর সহ আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। আমার অপর অনুচরেরাও ক্রমে ক্রমে আমার সহিত মিলিত হইতে লাগিল। গণপত রাও মারাঠা আমার সঙ্গে ছিল। কেবল হ্ননে খাঁ পাটনের রাজার অধীনতায় কর্ম্মগ্রহণ করিয়াছিল বলিয়া আমার সঙ্গে আসিতে পারিল না। তদ্ভিন্ন অপর সকল অনুচরই আমার সহিত আগরের ছাউনীতে উপস্থিত হইয়াছিল। রামচন্দ্র রাও দেশমুখ, গণপত রাও ও রঘুনাথ সিংহ এজেণ্ট সাহেবকে আমার সমস্ত অবস্থা জ্ঞাপন করিয়া আমার প্রতি তাঁহার করুণার উদ্রেক করিলেন। তাঁহাদিগের চেষ্টার ফলেই আমার ভাবী অবস্থা যাহাতে সুখকর হয়, মেজর ফ্লীক্ তাহার ব্যবস্থা করিতে কৃতসঙ্কল্প হন।
আগরের পোলিটিকেল এজেণ্ট অতিশয় মহৎ প্রকৃতির লোক ছিলেন সত্য, কিন্তু আমার ভবিষ্যৎ নির্ণয়সম্বন্ধে তাঁহার স্বাধীনভাবে কার্য্য করিবার শক্তি ছিল না। কারণ, ঝাঁশী প্রদেশ তাঁহার শাসনসীমার বহির্ভূত ছিল। মধ্যভারতের পোলিটিকেল এজেণ্টই প্রকৃতপক্ষে আমার ভাগ্য বিধাতা ছিলেন। কাজেই মিঃ ফ্লীক স্বীয় অনুরোধ-পত্র সহ আমাকে ইন্দোরে রেসিডেণ্ট সাহেবের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। আগর পরিত্যাগের পর পঞ্চম দিবসে অর্থাৎ ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে ৫ই মে আমরা ইন্দোরের সেনানিবাসে উপনীত হইলাম।
ইন্দোরে রেসিডেণ্ট স্যার রিচমণ্ড শেক্সপীয়রের সহিত আমার সাক্ষাৎ হইলে তিনি আমাকে কুশল প্রশ্নাদি জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহার নেটিব এসিষ্টাণ্ট বা দেশীয় সহকারী মুন্সী ধরম নারায়ণ নামক জনৈক কাশ্মীরী ব্রাহ্মণের প্রতি ভারত গবর্ণমেণ্টের পক্ষ হইতে আমার লালন পালনের ভার অর্পিত হইল। আমার অনুচরদিগের মধ্যে সেবাজীবী ও সৈনিক শ্রেণীর লোক ভিন্ন কেহ বুদ্ধিমান্ কারবারী বা নীতি-কুশল ব্যক্তি ছিল না। এই কারণে মুন্সী ধরম নারায়ণ তাহাদিগের মধ্যে ৪।৫ জনকে আমার সেবার জন্য রাখিয়া অপর সকলকে বিদায় দান করিলেন। অনন্তর রেসিডেণ্ট মহাশয় ভারত গবর্ণমেণ্টকে লিখিয়া আমার জন্য মাসিক ১৫০ টাকা বৃত্তির বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। আমি তখন অল্পবয়স্ক বালক ছিলাম, আমার নিকট কোন কর্ম্মকুশল বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিও সে সময়ে ছিল না; এই কারণে রেসিডেণ্ট সাহেবের নির্দ্ধারণ সম্বন্ধে আর কোন প্রকার আন্দোলন আলোচনা হইল না। সুতরাং ঐ দেড়শত মুদ্রা-পরিমিত বৃত্তিই আমার পক্ষে যথেষ্ট বলিয়া চূড়ান্ত আদেশ হইয়া গেল।”