ঝাঁশীর রাজকুমার/উপসংহার
উপসংহার।
এইরূপে শ্রীযুক্ত দামোদর রাও গঙ্গাধর বার্ষিক ২০।২৫ লক্ষ টাক। আয়ের ঝাঁশী রাজ্যের অধীশ্বর হইয়াও দৈবদুর্ব্বিপাকে ইংরাজ সরকারের আশ্রয়চ্ছায়াতলে সামান্য বৃত্তিভোগী ব্যক্তির ন্যায় ইন্দোর নগরে বাস করিতে লাগিলেন। মুন্সী ধরম নারায়ণের তত্ত্বাবধানে তিনি ইংরাজী, পারসী, উর্দ্দূ, ও মারাঠী ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। বাল্য বয়সে, অজ্ঞ দশায় তাঁহার ভবিষ্য জীবন সম্বন্ধে যে সকল অভূতপূর্ব্ব পরিবর্ত্তন সূচিত হইয়াছিল, বয়োবৃদ্ধির সহিত তিনি ক্রমে তৎসম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করিতে লাগিলেন।
মহারাজ গঙ্গাধর রাওয়ের রাজ-পদের উত্তরাধিকার হইতে বঞ্চিত হইলেও, লর্ড ডালহাউসীর অনুগ্রহে দামোদর রাও ঝাঁশী নরেশের স্বকীয় ধন সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বলিয়া গণ্য হইয়াছিলেন। ঝাঁশীর রাজপ্রাসাদ ও উদ্যানাদি, গঙ্গাধর রাওয়ের খানদেশস্থিত ১২০০ টাকা আয়ের ভূসম্পত্তি, বারাণসী ও পুণা প্রভৃতি নগরীস্থিত তাঁহার পূর্ব্বপুরুষদিগের বিনির্ম্মিত অট্টালিকা প্রভৃতিতে তাঁহার স্বত্ব গবর্ণমেণ্টের দ্বারা স্বীকৃত হইয়াছিল। কেবল তাহাই নহে, ঝাঁশীর রাজকোষস্থিত ৫ লক্ষ মুদ্রাও তাঁহার নামে সরকারী ধনাগারে গচ্ছিত ছিল। এই সকল সম্পত্তির উপর ইংরাজী আইন অনুসারে রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের কোন স্বত্ব ছিল না। তথাপি সিপাহী বিদ্রোহের সময় রাণী ইংরাজদিগের বিপক্ষতাচরণ করিয়াছিলেন, এই অপরাধে দামোদর রাওয়ের অজ্ঞাতবাস কালে গবর্ণমেণ্ট তাঁহার পূর্ব্বোক্ত ধনসম্পত্তিসমূহ খাস করিয়া লইলেন। এক জনের দোষে আর একজনের দণ্ড হইল!
দামোদর রাও বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে বৃদ্ধগণের মুখে এই সকল ঘটনা অবগত হইলেন। ঝাঁশীর ব্লুবুকে (Blue Book) প্রকাশিত কাগজ পত্র ও মেজর ইভান্স্ বেল প্রভৃতি ইংরাজ লেখকদিগের রচিত তাঁহার দত্তক-বিধানাদি সংক্রান্ত আলোচনা পাঠ করিয়া তিনি স্বীয় অবস্থার সম্বন্ধে অধিকতর জ্ঞান লাভ করিলেন। তিনি বিদ্যমান থাকিতে যে মহারাজ গঙ্গাধর রাওয়ের ব্যক্তিগত ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিবার অধিকার বৃটিশ গবর্ণমেণ্টের নাই, এই কথা তাঁহার বোধগম্য হইল। তখন তিনি ঐ সকল সম্পত্তির পুনর্লাভের জন্য গবর্ণমেণ্টের নিকট আবেদন করিলেন। গঙ্গাধর রাওয়ের পরিত্যক্ত প্রায় ২৫।৩০ লক্ষ টাকার সম্পত্তির অধিকারী হইবার তাঁহার প্রার্থনা ছিল। দুঃখের বিষয়, বৃটিশ গবর্ণমেণ্ট সে প্রার্থনায় কর্ণপাত করিলেন না।
পাশ্চাত্য রাজনীতির মহিমাগুণে দামোদর রাও ঝাঁশী সংক্রান্ত এক কপর্দ্দকও পাইলেন না। তিনি গোত্রান্তরিত হওয়ায় তাঁহার জন্মদাতা বাসুদেব রাওয়ের ধনসম্পত্তি হইতেও তিনি বঞ্চিত হইয়াছিলেন। অতঃপর তাঁহার জনক-কুল উত্তরাধিকারিবিহীন হওয়ায় তাঁহাদিগের ধন সম্পত্তিও কোম্পানির কোষগামী হইল!
দামোদর রাও ইন্দোরে অবস্থান করিতেছেন, অবগত হইয়া তাঁহার এক পিতৃব্য-পত্নী তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য তথায় গমন করেন। তাঁহার ঔদার্য্যগুণে ও বিশেষ চেষ্টায় দামোদর রাওয়ের পরিণয় কার্য্য সুসম্পন্ন হয়। এতদুপলক্ষে ইংরাজ গবর্ণমেণ্টের নিকট অর্থ-সাহায্য প্রার্থনা করা হইয়াছিল। কিন্তু তাহাতে কোন ফলোদয় হয় নাই। সে যাহা হউক, দামোদর রাওয়ের অপত্যলাভ করিবার পূর্ব্বেই তাঁহার পত্নী ১৮৭২ খৃষ্টাব্দে লোকান্তরিত হন। সুতরাং তাঁহাকে পুনর্ব্বার দার-পরিগ্রহ করিতে হয়। এই দ্বিতীয় বার বিবাহের ফলে ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে তিনি একটি পুত্র লাভ করেন। সেই পুত্রের নাম লক্ষাণ রাও।
১৮৭০ খৃষ্টাব্দে মধ্যভারতে দুর্ভিক্ষের সূচনা হওয়ায় মাসিক দেড়শত টাকায় দামোদর রাওয়ের জীবিকানির্ব্বাহ কষ্টকর হইয়া উঠিল। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি ঋণগ্রস্ত হইলেন। জেনারেল মিড তখন মধ্যভারতের পোলিটিকেল এজেণ্ট ছিলেন। দামোদর রাও স্বীয় অর্থকষ্টের বিষয় তাঁহার গোচর করিলেন। কিন্তু মিড সাহেবের হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হইল না। ইহার পর স্যর হেন্রি ডেলি তাঁহার পদে নিযুক্ত হইয়া ইন্দোরে আগমন করেন। দামোদর রাও তাঁহাকেও স্বীয় দুরবস্থার বিষয় জ্ঞাপন করিতে বিরত হন নাই। কিন্তু তিনিও সে বিষয়ে কর্ণপাত করিলেন না। তখন দামোদর রাও কলিকাতায় গবর্ণর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক মহোদয়ের নিকট এক আবেদন পত্র প্রেরণ করেন। সৌভাগ্যক্রমে, তাঁহার আবেদন পাঠে এই সদাশয় রাজ প্রতিনিধির চিত্তে দয়ার সঞ্চার হইল। লাট সাহেব অনুগ্রহপূর্ব্বক দামোদর রাওয়ের মাসিক বৃত্তি ১৫০ হইতে২০০ টাকায় উন্নীত করিয়া দিলেন। তদ্ভিন্ন তাঁহার ঋণপরিশোধের জন্য রাজকোষ হইতে দশ সহস্র রৌপ্য মুদ্রাও প্রদত্ত হইয়াছিল। ঝাঁশীর রাণী মহোদয়ার প্রিয়তম হতভাগ্য পুত্রের প্রতি ইহাই ইংরাজ গবর্ণমেণ্টের শেষ অনুগ্রহ!
দামোদর রাওয়ের প্রকৃত স্বত্বের ও ন্যায়সঙ্গত প্রার্থনার তুলনায় মাসিক দুই শত টাকা বৃত্তি নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর সন্দেহ নাই। এই কারণে তিনি মহারাজ গঙ্গাধর রাওয়ের স্বকীয় ধন সম্পত্তির অন্ততঃ কিয়দংশও যাহাতে লাভ করিতে পারেন, তাহার জন্য কয়েক বার ভারত গবর্ণমেণ্টের নিকট প্রার্থনা করিয়াছিলেন। রাজকোষে তাঁহার নামে যে ৫ লক্ষ টাকা গচ্ছিত ছিল, নিতান্ত পক্ষে তাহাও পাইতে পারিবেন বলিয়া তাঁহার আশা ছিল। এই নিমিত্ত তিনি বিলাতে ভারত সচিবের নিকটেও সুবিচার-প্রার্থী হইয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার আবেদনের উত্তরে ষ্টেট সেক্রেটারি হার্টিংটন মহাশয় ১৮৮২ খৃষ্টাব্দের ২২শে জুন তাঁহাকে জানাইলেন,—
The confiscation of the private possessions of the Jhansi Raj, consequent on the rebellion of the Rani during the mutiny of 1857, has long since been carried into effect, and I see no reason to re-open the question. The memorialist who appears to have been treated with reasonable liberality, may therefore be informed that I decline to interfere in his behalf.
অর্থাৎ—ঝাঁশীর রাণীর বিদ্রোহাপরাধে ঝাঁশীর রাজ্য-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সম্পত্তি রাজকোষভুক্ত হইবার পর বহু দিবস অতীত হইয়াছে। এত দিন পরে সে কথা আর উত্থাপন করিবার আমি কোনও কারণ দেখিতেছি না। আবেদনকারীর প্রতি ভারত গবর্ণমেণ্ট যথোচিত সদ্ব্যবহার করিয়াছেন বলিয়াই বোধ হইতেছে। সুতরাং আমি তাঁহার আনুকূল্যে আর কিছু করিতে প্রস্তুত নহি।
এইরূপে ঝাঁশীর রাজকুমার হতভাগ্য দামোদর রাও গঙ্গাধরের পৈত্রিক-সম্পত্তি লাভের সমস্ত আশা বিলীন হইল!
ইহার পরও দামোদর রাও এ বিষয়ে চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই। ইংরাজ সরকার তাঁহার আবেদনের বিচার করিতে অস্বীকৃত হইলে তিনি ন্যায্য সম্পত্তিলাভের জন্য কর্ত্তৃপক্ষের নামে দেওয়ানি নালিশ করিবার সঙ্কল্প করিলেন। কিন্তু তাঁহার সে চেষ্টা সফল হইবার পথেও বিঘ্ন উপস্থিত হইল। এই কার্য্যের জন্য যে সকল কাগজ পত্রের আবশ্যকতা ছিল, তাহা গবর্ণমেণ্টের পররাষ্ট্র বিভাগ হইতে পাইবার তাঁহার উপায় ছিল না। তদ্ভিন্ন তাঁহার অর্থবলেরও অসদ্ভাব ছিল। অর্থসাহায্য পাইবার আশায় তিনি এ দেশের ছোট বড় প্রায় ১২১ জন রাজার নিকট আবেদনপত্র প্রেরণ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার দুর্ভাগ্যক্রমে কেহই তাঁহার প্রার্থনাপূরণে অগ্রসর হন নাই। কেবল রামপুর বেরেলীর নবাব সাহেব তাঁহাকে সাহায্যস্বরূপ এক সহস্র মুদ্রা প্রেরণপূর্ব্বক স্বীয় ঔদার্য্য প্রকাশ করিয়াছিলেন। কিন্তু ঐ সামান্য অর্থে তাঁহার উদ্দেশ্যসিদ্ধির সম্ভাবনা না থাকায় দামোদর রাওকে অভিযোগের সঙ্কল্প ত্যাগ করিতে হইল।
দামোদর রাও এক্ষণে ইন্দোর রেসিডেন্সীতে অবস্থান করিয়া স্বীয় দুর্ভাগ্যের লীলাতরঙ্গ গণনায় জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলি অতিবাহিত করিতেছেন। পরলোকগত মহারাজ তুকোজী রাও হোলকর তাঁহার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ প্রকাশ করিতেন। রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের পুত্র বলিয়া এখনও অনেকে তাঁহার প্রতি সম্মান প্রকাশ করিয়া থাকেন। ঝাঁশী রাজ্য এক্ষণে নামশেষ হইলেও যতদিন ইতিহাসে রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের নাম গৌরবের সহিত ঘোষিত হইবে, ততদিন প্রত্যেক স্বদেশভক্তের হৃদয়ে তাঁহার প্রিয়পুত্র মন্দভাগ্য দামোদর রাওয়ের এই দুঃখকাহিনী মুদ্রিত থাকিবে, সন্দেহ নাই।