ঝাঁশীর রাজকুমার/বনবাস ও অজ্ঞাত-বাস
বনবাস ও অজ্ঞাত-বাস।
(আত্ম-কাহিনী)
“আমার জননীদেবী রাণী লক্ষ্মী বাঈ কৈলাসবাস[১] করিলে, আমরা তিন দিনমাত্র গোয়ালের (গোয়ালিয়র) নগরে অবস্থিতি করিয়াছিলাম। তাহার পর জননী দেবীর অস্থিসঞ্চয়পূর্বক আমরা, তাঁহার অনুগত কর্ম্মচারী সর্দ্দার রামচন্দ্র রাও দেশমুখ, রঘুনাথ সিংহ, গণপত রাও মারাঠা, হ্ননে খাঁ রিসালদার (তুরগসৈন্যের নায়ক) ও অপর কতিপয় বিশ্বাসী অনুচর-সহ শ্রীমন্ত রাও সাহেব পেশওয়ের[২] সঙ্গ পরিত্যাগ করিলাম। সে সময়ে আমাদের নিকট রাণী সাহেবার সেনাদলের অন্তর্ভুক্ত ৬০ জন সৈনিক, ২২টি অশ্ব ও ৬টী উষ্ট্র অবশিষ্ট ছিল। ইংরাজদিগের সেনাদল ক্রমশঃ জয়লাভ করিতেছে দেখিয়া রাণী সাহেবার দলের অপর সকলে যথাদৃষ্ট পথে প্রস্থান করিয়াছিল। কিছু দিন পরে রাজ-প্রতিনিধি লর্ড ক্যানিং মহোদয়ের অভয় বাণী প্রচারিত হইলে, তাহারা ইংরাজ সরকারের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া আপনাদিগের প্রাণ বাঁচাইল।
সে যাহা হউক, গোয়াহ্লেরের (গোয়ালিয়রের) যুদ্ধ ব্যাপার কিয়ৎ পরিমাণে শান্ত হইলে চতুর্থ দিবসে আমরা পূর্ব্বোক্ত ৬০ জন অনুচর-সহ নগর পরিত্যাগ করিলাম, এবং মানবসঞ্চারবিহীন পথ অবলম্বন করিয়া চন্দেরী অভিমুখে অগ্রসর হইলাম। পথে আমাদিগের কষ্টের সীমা ছিল না। আমরা বিশ্রাম বা নিশাযাপনের জন্য কোন গ্রামে নিশ্চিন্তভাবে অবস্থান করিবার সুবিধাও পাইতাম না। গ্রামবাসীরা যদি কোন প্রকারে জানিতে পারিত যে, আমরা বিদ্রোহী রাণী সাহেবার লোক—তাহা হইলে তাহারা ইংরাজদিগের ভয়ে গ্রামের ত্রিসীমার মধ্যে আমাদিগকে বাস করিতে দিত না। কাজেই নিতান্ত নিরুপায় হইয়া আমরা ইংরাজদিগের হস্তে ধৃত হইবার ভয়ে বেত্রবতী নদীর তীরবর্ত্তী দুর্গম স্থানসমূহে গুপ্তভাবে কালাতিপাত করিতে বাধ্য হইলাম। আমাদের সঙ্গে তাঁবু বা অন্য কোন প্রকার বস্ত্রাবাস না থাকায় আমাদিগকে অনাবৃত প্রান্তরে উন্মুক্ত আকাশতলে কালযাপন করিতে হইত। এক এক সময়ে গহন-কাননে, হিংস্র পশুদিগের আবাসস্থানে আশ্রয় গ্রহণ পূর্ব্বক কালক্ষেপ করিতেও আমরা বাধ্য হইতাম।
সেই সকল সর্ব্বজন ভয়ঙ্কর অরণ্য-মধ্যে কখন কখন সূর্য্যদেবের দর্শনলাভও আমাদিগের পক্ষে দুর্ঘট হইত। আমাদিগের আশ্রয়-স্থানসমূহ লোকালয় হইতে বহুদূরবর্ত্তী ও মনুষ্যসমাজের পক্ষে দুর্গম ছিল। এই কারণে সময়ে সময়ে দুই তিন দিন পর্য্যন্ত আমরা অরণ্যজাত ফলমূলাদি ভক্ষণ করিয়া কোন প্রকারে জঠরজ্বালার নিবৃত্তি করিতে বাধ্য হইতাম। তখন ঐ অঞ্চলের প্রায় সর্ব্বত্র ইংরাজ সৈন্যের অবাধ সঞ্চার ছিল। তাহাদিগের হস্তে ধৃত হইবার ভয়ে, আমার অনুচরবর্গের মধ্যে কেহই কাননাশ্রয় পরিত্যাগপূর্ব্বক আহার্য-সংগ্রহের জন্য গ্রামে গমন করিতে সাহস করিত না। কখনও ৪।৫ দিন অন্তর, কখনও বা ৮।১০ দিন অন্তর দুই চারি জন অনুচর অতি সাবধানে ছদ্মবেশে নিকটবর্ত্তী গ্রামে গমন করিত এবং বহু কষ্টে গোপন ভাবে ডাউল, আটা প্রভৃতি খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করিয়া আনিত। বর্ষাকাল সমাগত হওয়ায় এই সকল আধিভৌতিক বিপদের উপর যখন আমাদিগের ভাগ্যে আধিদৈবিক কষ্টেরও সমাবেশ হইল, মধ্যে মধ্যে আমাদিগের উপর পর্জ্জন্যদেবের বিশেষ অনুগ্রহ ঘটিতে লাগিল, তখন আমাদিগের দুর্গতির আর শেষ থাকিল না, খাদ্যসংগ্রহ অধিকতর দুষ্কর হইয়া উঠিল। এইরূপ কষ্টকর অবস্থায় দুই মাস অতীত হইলে বর্ষার বিক্রম দিনদিন বাড়িতে লাগিল। এতদিন আমরা ধীরতার সহিত সকল কষ্টই সহ্য করিয়াছিলাম। এখন ভবিষ্যৎ ভাবিয়া কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় ও অতীব ব্যাকুল হইলাম।
এইরূপ অবস্থায় ঘূরিতে ঘূরিতে আমরা চন্দেরী ললিতপুর (ললতপুর) পরগণার অন্তর্গত তালবেট কোঠরা নামক গ্রামের প্রান্তভাগে উপস্থিত হইলাম। ঐ গ্রামের ঠাকুর দেওয়ান শঙ্কর সিংহ ও গম্ভীর সিংহের সহিত সাক্ষাৎকার-পূর্ব্বক আমরা তাঁহাদিগের নিকট কিছুদিনের জন্য আশ্রয়-প্রার্থনা করিলাম। তাঁহারা বলিলেন, “আপনারা ঝাঁশীর বিদ্রোহি দলের নায়িকা রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের অনুগত লোক; আপনাদিগকে আশ্রয় দিলে আমাদিগকে ইংরাজ সরকারের বিরাগ-ভাজন হইতে হইবে। বিশেষতঃ ললতপুরে ইংরাজ সৈন্যের একটি থানা (ক্ষুদ্র শিবির) আছে এবং এ সকল প্রদেশে তাহারা প্রায়ই বিচরণ করিয়া থাকে। সুতরাং আমরা আপনাদিগকে গ্রামের মধ্যে আশ্রয় দিতে পারিব না। তবে যদি আপনারা সন্নিহিত জঙ্গলে গোপনে অবস্থান করিতে পারেন, তাহা হইলে আমরা আপনাদের কিছু সাহায্য করিতে পারি।” এত দিন বনের মধ্যেও আমাদের সাহায্য করিবার কেহ ছিল না। এই কারণে ঠাকুর মহোদয়দিগের প্রস্তাব আমাদিগের আশানুরূপ না হইলেও উহা মন্দের ভাল, মনে করিয়া আমরা তাহাতেই সন্তোষ ও সম্মতি প্রকাশ করিলাম। তালবেট কোঠরার জঙ্গলেই আমাদিগের বসতির ব্যবস্থা করা গেল।
আমাদিগের দলে রঘুনাথ সিংহই সর্ব্বপ্রধান ছিলেন। রাণী সাহেবার বহুদিনের পুরাতন ভৃত্য বলিয়া সকলেই তাঁহাকে সম্মান করিত। তাঁহার সহিত ঠাকুরদিগের পরামর্শে স্থির হইল যে, সকলে একত্র বাস করিলে ইংরাজ সেনার দৃষ্টি অতিক্রম করা দুঃসাধ্য হইতে পারে। অতএব আমাদিগের পক্ষে ছয় দলে বিভক্ত হইয়া পরস্পরের নিকট হইতে ১০।৫ ক্রোশ দূরে—ভিন্ন ভিন্ন অরণ্যে বাস করাই বিধেয়। তদনুসারে রামচন্দ্র রাও দেশমুখ প্রভৃতি প্রধান অনুচরেরা এক একটি দলে বিভক্ত হইয়া অতীব দুঃখিত চিত্তে আমার নিকট হইতে বিচ্ছিন্ন হইলেন। কিছু কিছু খরচ পত্র দিয়া আমি তাঁহাদিগকে ১৩টি অশ্ব ও ২টি উষ্ট্রসহ বহু কষ্টে বিদায় দিলাম। রঘুনাথ সিংহ প্রমুখ আমরা দশ বার জন তালবেট কোঠরার জঙ্গলই বসতির যোগ্য বলিয়া মনোনীত করিলাম। কাশী নাম্নী রাণী সাহেবার এক দাসীও আমাদিগের সঙ্গে থাকিল। স্থির হইল, আমরা ঠাকুরদিগকে মাসিক ৫০০ শত টাকা প্রদান করিলে তাঁহারা ১২ জনের উপযোগী খাদ্য সামগ্রী যথা নিয়মে জঙ্গলের মধ্যে আমাদিগের নিকট পাঠাইয়া দিবেন। তদ্ভিন্ন তাঁহাদিগকে আমাদিগের ৪টি উষ্ট্র ও ৯টি অশ্ব আপনাদের আলয়ে রাখিয়া পালন করিতে হইবে। ইংরাজ-সৈন্যের গতিবিধির সংবাদও আমাদিগকে যথাকালে প্রদান করিতে তাঁহারা প্রতিশ্রুত হইলেন। এই প্রতিজ্ঞা অনুসারে আমরা চারি পাঁচ দিন অন্তর তাঁহাদিগের নিকট হইতে পর্য্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য সামগ্রী প্রাপ্ত হইতাম। সময়ে সময়ে ইংরাজ-সৈন্যের গতিবিধির সংবাদও আমাদিগের নিকট প্রেরিত হইত।
কোঠরা গ্রাম হইতে ৪।৫ মাইল দূরে বেত্রবতী নদীর তটস্থিত পর্ব্বতের মধ্যে বিস্তৃত গুহার ন্যায় একটি স্থান আছে, সেই খানেই আমরা বাস করিতাম। তথায় কর্করা নামক এক শিবমন্দিরও অবস্থিত। আমাদিগের বসতিস্থানের নিকটেই একস্থলে বেত্রবতীর জল প্রবাহ পর্বওতের উপর হইতে ২৫ হস্ত নিম্নে সবেগে পতিত হইয়া থাকে। এই জল-প্রপাতে সেখানে বহু জলাশয়ের উৎপত্তি হওয়ায় ঐ স্থানের রমণীয়তা বর্দ্ধিত হইয়াছে। আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, ঐ সকল জলাশয়ে ভাদ্রমাসের কৃষ্ণ পক্ষ ভিন্ন বৎসরের আর কোন সময়েই মৎস্যাদি দৃষ্টিগোচর হয় না। কেবল ঐ এক পক্ষ কালের মধ্যে জলাশয়গুলি একেবারে মৎস্যপূর্ণ হইয়া উঠে, এবং সহস্র সহস্র মৎস্য জলাশয় হইতে উৎপতিত হইয়া তটদেশে গতাসু অবস্থায় পড়িয়া থাকে। মহালয় পার্ব্বণের পর দিবস উহাদিগের তিরোধান হয়, এবং তাহার পর ভাদ্রমাসীয়া পূর্ণিমা পর্য্যন্ত তত্রত্য জলাশয়নিচয় সম্পূর্ণরূপে মৎস্যসমাগম-শূন্য থাকে। আর একটি আশ্চর্য্য ঘটনা আমরা তথায় প্রত্যক্ষ করিয়াছি। পূর্ব্বোক্ত কোঠরা গ্রাম হইতে ২।৩ ক্রোশ দূরে আর একটি পাহাড় আছে। উহা “সিদ্ধনাথ বাবার পাহাড়” নামে পরিচিত। ঐ পর্ব্বতের শীর্ষদেশে একটি ক্ষুদ্র নির্ঝর আছে। উহার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা এক বিঘতের অধিক নহে; অথচ উহার জলের কখনও হ্রাস হয় না। সেই জল অতীব সুমিষ্ট। এইরূপ দুই একটি নিসর্গ-বৈচিত্র্য সেই বনমধ্যে অজ্ঞাতবাস-কালে আমাদিগের মনোরঞ্জন করিত।
কোঠরায় ও তাহার নিকটবর্ত্তী কানন-সমূহে ব্যাঘ্র-ভল্লুকাদির সমৃদ্ধি অল্প ছিল না। তথাপি তাহাদিগের সহবাসে আমরা অনেক দিন এক প্রকার নির্ব্বিঘ্নেই কালযাপন করিতে পারিয়াছিলাম। এক স্থানে অনেক দিন থাকিলে হয় ত বিপদ আমাদের সন্নিহিত হইতে পারে, এই আশঙ্কায় আমরা মধ্যে মধ্যে স্থান-পরিবর্ত্তন করিতাম। কিন্তু জঙ্গলের সকল অংশেই হিংস্র জন্তুর সঞ্চার সমান থাকায় বহুবার আমাদিগকে বৃক্ষের উপর মঞ্চ নির্ম্মাণপূর্ব্বক পর্ণশয্যায় রাত্রিযাপন করিতে হইয়াছিল। কখন কখন আমরা হিংস্র জন্তুর দ্বারা আক্রান্ত হইয়া আত্মরক্ষার জন্য অহোরাত্র বৃক্ষস্থিত মঞ্চোপরি বাস করিতেও বাধ্য হইতাম। এইরূপ কষ্টে প্রায় দুই বৎসর—কি পৌণে দুই বৎসর আমরা কোঠরা ও তৎসন্নিহিত অরণ্যের নানা স্থানে অতিবাহিত করিলাম। এই সময়ের মধ্যে শীতাতপ ও বর্ষার প্রকোপে আমাদিগকে যে দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইয়াছিল, তাহা বাক্যে প্রকাশ করা অসম্ভব।
সবলকায় ব্যক্তিকেও বহুকাল প্রবাসে থাকিয়া যদি আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক বা মানসিক কষ্ট সহ্য করিতে হয় এবং তাহার পানাহার ও বিশ্রামাদির সম্বন্ধে যদি অনিয়ম ঘটে, তাহা হইলে তাহার স্বাস্থ্যহানি অনিবার্য্য হইয়া উঠে। আমি একে অল্পবয়স্ক, তাহাতে আবার বনজঙ্গলে ঘূরিবার অভ্যাস আমার কখন ছিল না; কাজেই এই অরণ্য-বাস-কালে আমার বিলক্ষণ স্বাস্থ্য-ভঙ্গ হইয়াছিল। আমি প্রায়ই রুগ্ন থাকিতাম। মাতৃবিয়োগের এক বৎসর পরে ভাদ্র মাসে সহসা আমার অসুস্থতা এরূপ বৃদ্ধি পাইল যে, আমি একেবারে সংজ্ঞাশূন্য হইলাম। সেই বর্ষাবারিনিষিক্ত অরণ্যমধ্যে পীড়িতের বাসোপযোগী নিবাসস্থানের সদ্ভাব বা ঔষধোপচারাদির কোন সুবিধাই ছিল না। এই কারণে আমার অনুচরবর্গ চিন্তাতুর হইয়া তালবেট কোঠরা গ্রামে চিকিৎসকের সন্ধানে গমন করিল। দুর্ভাগ্যক্রমে ঐ গ্রামে সুচিকিৎসকের একান্ত অভাব ছিল। কিন্তু আমার পরমায়ুর শেষ হয় নাই বলিয়া আমার অনুচরেরা বহু অনুনয় বিনয়ের পর শঙ্কর সিংহ ঠাকুরের হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার করিতে সমর্থ হইল। তিনি স্বীয় মাতুলকে গুপ্তভাবে আমার নিকট প্রেরণ করিলেন। মাতুল মহাশয় আমার নাড়ী পরীক্ষা করিয়া যে ঔষধ প্রদান করিলেন, তাহাতে আমার সংজ্ঞা-লাভ হইল। তাঁহার ঔষধ সেবনে আমি কিছু দিনের মধ্যে আরোগ্যলাভ করিয়া আবার অরণ্যবাসের কষ্টভোগ করিবার জন্য প্রস্তুত হইলাম।
রাণী লক্ষ্মী বাঈয়ের কৈলাস প্রাপ্তি কালে আমার নিকট নগদ ও সোণারূপায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা ছিল। প্রতিমাসে ঠাকুরদিগকে যে টাকা দিতে হইত, তাহাতে অনতিদীর্ঘকাল-মধ্যেই আমার নগদ টাকাকড়ি নিঃশেষ হইয়া গেল। সুতরাং ঠাকুরদিগের মাসিক অর্থ-প্রদানের জন্য স্বর্ণ-রত্নাদির বিক্রয় ভিন্ন আমাদের অন্য উপায় রহিল না। কিন্তু আমার নিকট যে সকল বহুমূল্য পদার্থ ছিল, তাহার বিক্রয়ের জন্য জনপদে গমন করিতে অনুচরদিগের মধ্যে কাহারও সাহসে কুলাইত না। কাজেই আমাদিগকে টাকার পরিবর্ত্তে রত্ন-কাঞ্চনাদি তুলাদণ্ডে ওজন করিয়া দিতে হইত; অথচ তাহাদের মূল্য নির্দ্ধারণ-বিষয়ে আমাদের কোন প্রকার স্বাধীনতা থাকিত না। তাঁহারা অনুগ্রহ করিয়া যে দ্রব্যের যে মূল্য নির্দ্দেশ করিতেন, আমাদিগকে বিনা বাক্যব্যয়ে তাহাই শিরোধার্য্য করিতে হইত। আমাদিগের সঙ্গে যে অর্থাদি ছিল, এই প্রকারে তাহা নিঃশেষ হইল। আমরা এক প্রকার নিষ্কাঞ্চন হইয়াছি, ইহা অবগত হইয়া ঠাকুর মহোদয়েরা আমাদিগকে স্পষ্টাক্ষরে স্থানান্তরে গমন করিতে বলিলেন! আমরাও স্থানত্যাগে বাধ্য হইলাম। আমাদিগের নিকট যে সামান্য দ্রব্যসামগ্রী ছিল, তাহা ঐ গ্রামে বিক্রয় করিয়া আমার অনুচরগণ পাথেয়ের জন্য দুই শত টাকার সংগ্রহ করিল। প্রস্থানকালে আমরা ঠাকুরদিগের নিকট আমাদিগের নয়টি অশ্ব ও চারিটি উষ্ট্র প্রার্থনা করিলাম; কিন্তু তাঁহারা তিনটি মাত্র অশ্ব প্রত্যর্পণপূর্ব্বক অপর বাহনগুলির মৃত্যু-সংবাদ আমাদিগকে জ্ঞাপন করিলেন। আমরা সর্ব্বপ্রকারে দুর্ব্বল ও নিরুপায় ছিলাম; এই কারণে এইরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াও তাঁহাদিগের সহিত কলহ করা আমাদিগের নিকট যুক্তিসঙ্গত বলিয়া বোধ হইল না। তাঁহাদিগের অনুগ্রহপ্রদত্ত তিনটি অশ্ব লইয়া দশ বার জন অনুচরসহ আমি তথা হইতে প্রস্থান করিলাম এবং তিন চারি দিবস ভ্রমণের পর “শিন্দে” (সিন্ধিয়া) সরকারের রাজ্যান্তর্গত “সিপ্রি কোহ্লারস” নামক স্থানে উপস্থিত হইলাম। পথে আর দশ বার জন প্রাচীন অনুচর আসিয়া আমাদিগের সহিত মিলিত হইল। আমরা সংখ্যায় সর্ব্বশুদ্ধ বাইশ জন হইলাম।
দুই বৎসর-কাল এইরূপ অসীম কষ্ট-ভোগ করিয়াও আমাদিগের দুর্দ্দৈবের অবসান হইল না। আমাদিগের সঙ্গে যে ভূরি পরিমাণ ধন-রত্ন ছিল, তাহা নিঃশেষ হওয়ায় অর্থাভাবে আমরা দুর্দ্দশার চরম সীমায় উপনীত হইয়াছিলাম। তথাপি আমাদিগের কর্ম্মভোগের শেষ হয় নাই। দুরদৃষ্ট আমাদিগকে অধিকতর বিড়ম্বিত করিবার জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। আমরা সিপ্রি কোহ্লারস গ্রামে উপস্থিত হইয়া তত্রত্য একটি উদ্যানে অবস্থান করিয়াছিলাম। কি কারণে জানি না, সেখানকার কমাওয়েস্দার বা কর-সংগ্রাহক আমাদিগকে ঝাঁশীর রাণীর অনুচর ও বিদ্রোহিদলের অন্তর্ভুক্ত বলিয়া সন্দেহ করিল। সে আমাদিগকে কৌশলে বন্দী করিবার চেষ্টা করিতেছে দেখিয়া সুচতুর রঘুনাথ সিংহ তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। তিনি তাহাকে আমার প্রকৃত পরিচয় ও দুরবস্থাদির বিষয় জ্ঞাপনপূর্ব্বক বহু কাকুতি সহকারে কিঞ্চিৎ রজতদান করিলে সে তুষ্ট হইয়া আমাদিগকে ছাড়িয়া দিল। আমরা সিপ্রি পরিত্যাগের পর পাটন জিলার অন্তর্গত “ছীপা বড়োদ” নামক গ্রামে উপস্থিত হইলাম।
সিপ্রিতে যে বিপদের সূচনা হইয়াছিল, ছীপা বড়োদে তাহা সম্পূর্ণরূপে আমাদিগের উপর আপতিত হইল। তত্রত্য বণিগ্জাতীয় কমাওয়েস্দার আমাদিগের আগমনবার্ত্তা পাইবা মাত্র আমাদিগের নিকট উপস্থিত হইল এবং ‘তোমরা রাণীর লোক’ বলিয়া আমাদিগকে বন্দী করিয়া গ্রামের মধ্যে লইয়া গেল! তিন দিন পর্য্যন্ত আমরা একটি গড়ের মধ্যে অবরুদ্ধ ছিলাম। চতুর্থ দিবসে কমাওয়েস্দারের দশ জন তুরগী সৈনিক ও পঁচিশ জন পদাতিকের দ্বারা রক্ষিত হইয়া আমরা পাটনের এজেণ্ট সাহেবের নিকট প্রেরিত হইলাম। আমাদিগের সঙ্গে যে তিনটি অশ্ব ও আসবাব পত্র ছিল, কমাওয়েস্দার মহাশয় এই সময়ে তাহার সকলগুলিই আত্মসাৎ করিলেন। রাণী সাহেবার বিশ্বস্ত অনুচরেরা না থাকিলে আমাকে সে সময়ে সেই অল্পবয়সেও পদব্রজে ভ্রমণ করিতে হইত। কিন্তু তাহারা আমাকে পৃষ্ঠে তুলিয়া লওয়ায় আমি সে কষ্ট হইতে অব্যাহতি লাভ করিয়াছিলাম।
বড়োদের তিন চারি মাইল দূরে এক নদীর তীরে সকলে উপস্থিত হইলে আমি শৌচ ও মুখমার্জ্জনাদির জন্য অবতরণ করিলাম। এমন সময় সহসা ঘটনা-চক্রের অভাবনীয় আবর্ত্তনে আমাদের অবস্থান্তর ঘটিল। বিস্ময়চকিত নেত্রে আমরা দেখিলাম, আমাদিগের ভূতপূর্ব্ব সহচর গণপত রাও দুই জন অশ্বারোহী ইংরাজ সৈনিকের সহিত সেই নদী-তীরে আবির্ভূত হইল! সে আমাদিগের সম্মুখীন হইয়াই আমার দিকে অঙ্গুলী-নির্দ্দেশ-পুরঃসর শ্বেতাঙ্গ সৈনিক দিগকে বলিল—‘ইনিই ঝাঁশীর রাণী সাহেবার পুত্র।’ সৈনিকযুগল আমার পরিচয় গ্রহণের পর আমাকে তাহাদিগের হস্তে সমর্পণ করিবার জন্য কমাওয়েস্দারের রক্ষিবর্গকে অনুরোধ করিল। তখন রক্ষীদিগের মধ্যে একজন বড়োদগ্রামে প্রতিগমনপূর্ব্বক কমাওয়েস্দারকে এই ঘটনা জানাইল। তৎশ্রবণে কমাওয়েস্দার স্বয়ং তথায় আসিয়া উপস্থিত হইল এবং ইংরাজ সৈনিকদিগকে দেখিবা মাত্র আমাদিগের সমস্ত আসবাব পত্র সহ অশ্ব তিনটি প্রত্যর্পণ করিল। আমি অনুচরবর্গ সহ ইংরাজদিগের হস্তগত হইলাম।