টমকাকার কুটীর/অষ্টম পরিচ্ছেদ
অষ্টম পরিচ্ছেদ
নূতন পরিবারে এসে টমের অন্য কোনই কষ্ট নেই। ইভাকে নিয়ে তার দিনগুলি বেশ সুখেই কাটতে লাগলো, কিন্তু স্ত্রী-পুত্র পরিবারের কথা মনে হ’লে, সে কিছুতেই চোখের জল রাখতে পা’র্ত না। সেই সময় বাইবেল ও ইভাই তার প্রধান সান্ত্বনা!
একদিন আস্তাবলের উপর ছোট একটা ঘরে টম ব’সে আছে। সাম্নে একখানা শ্লেট্। টম অতি কষ্টে এক একটি অক্ষর লিখ্ছে। ইভা তার কাধের উপর ঝুঁকে প’ড়ে তাই দেখ্ছে। হঠাৎ ইভা ব’লে উঠল, “টমকাকা, তুমি ও সব কি আঁক্চো?”
“আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছে চিঠি লিখ্ছি।”
“সত্যি টমকাকা, তোমার চিঠিখানা বেশ হচ্ছে। তারা এ খানা পেয়ে খুব খুসী হবে।”
এমন সময় হঠাৎ সেণ্ট্ ক্লেয়ার সেখানে এলেন। এসেই বল্লেন—“কি টম, এখানে কি হচ্ছে?”
অমনি ইভা ব’লে উঠ্ল—“দেখ বাবা, টমকাকা কেমন চিঠি লিখ্ছে! বেশ সুন্দর হ’য়েছে,—না বাবা?”
সেণ্ট্ ক্লেয়ার দেখে ব’লেন—“টম, তুমি না হয় তোমার চিঠিগুলো আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিও। সেই ভাল হবে।”
ইভা বল্লে—“বাবা, টমকাকা ছেলেমেয়েদের জন্য মাঝে মাঝে কাঁদে। তাদের জন্যে কষ্ট হ’লেই চিঠি লিখতে বসে। আজকের চিঠিটা খুব দরকারী। এই চিঠি পেলেই টমকাকার আগেকার মনিবের স্ত্রী, ওকে খালাস ক’রে নিয়ে যাবার জন্যে টাকা পাঠাবেন।”
সেইদিনই সন্ধ্যার সময় টমের চিঠিখানা ডাকে দেওয়া হ’ল।
দেখ্তে দেখ্তে সেণ্ট্ ক্লেয়ারের বাড়ীতে টমের দুই বছর কেটে গেল। ইভার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে টম ও তার বন্ধুত্বও খুব বেড়ে উঠলো। কিন্তু গত ছয় মাস থেকে ইভার হাত, পা ও সমস্ত শরীর এত সরু হয়ে আস্ছিল, এবং তার গায়ের রং এত ফ্যাকাসে হয়ে পড়ছিল যে, তাই দেখে বুড়ো টম মাঝে মাঝে প্রাণে বড়ই বেদনা পেত। ইভার নিশ্বাস-প্রশ্বাসও ক্রমে ক্ষীণ হ’য়ে পড়্লো। মিস্ ওফেলিয়াও ইভার সেই বিষম শুক্নো কাসি লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি একদিন সেণ্ট্ ক্লেয়ারকে সব কথা খুলে বল্লেন। সেণ্ট্ ক্লেয়ার খুব ব্যস্ত ও অস্থির হ’য়ে পড়্লেন, এবং সব সময়ই ইভার শরীরের উপর চোখ রাখ্তে লাগ্লেন।
ক্রমে ইভার শরীর এত খারাপ হ’য়ে পড়লো যে, ডাক্তার ডেকে রীতিমত চিকিৎসা আরম্ভ কর্তে হ’লো। চিকিৎসায় ইভা একটু চান্কা হ’য়ে উঠ্লো বটে, কিন্তু সেটা নেহাত সাময়িক। মিস্ ওফেলিয়া ও ডাক্তার ক্রমেই ভয় পেতে লাগলেন। তাঁরা যে রোগ সন্দেহ ক’রছিলেন, সত্য সত্যই ইভাকে সেই রোগে ধ’রেছিল!
একদিন টমের কাছে ব’সে বাইবেল পড়্তে পড়্তে ইভা বল্লে—“দেখ টমকাকা, যিশু যে কেন আমাদের জন্যে ম’র্তে চেয়েছিলেন তা আমি বেশ বুঝতে পারি। আমার নিজেরই সে রকম মনে হয়। তুমি আমি যে ষ্টীমারে আস্ছিলাম তাতে এবং আরও অনেক জায়গায় বেচারা ক্রীতদাসদের উপর অত্যাচার দেখে, আমার এত কষ্ট হ’য়েছে যে, তা ব’লতে পারি না! তখন আমার মনে হ’য়েছিল এবং এখনো মনে হয় যে, আমি ম’লে যদি এদের কষ্ট ঘোচে, তা’হলে আমি খুব আনন্দের সঙ্গেই ম’রতে পারি!”
টম ইভার কথা শু’ন একেবারে অবাক হ’য়ে রইলো। তারপর পিতার কথা শুন্তে পেয়ে ইভা যখন চলে গেল, তখন দুঃখে ও আনন্দে টম আর চোখের জল রাখতে পারলে না।
ইভা ছুট্তে ছুট্তে বারান্দায় বাবার কাছে গেল। তিনি একটা পুতুল কিনে এনেছিলেন। সেইটি দেবার জন্যই তাকে ডাক্ছিলেন। ইভার সেই রোগা শরীর দেখে হঠাৎ সেণ্ট্ ক্লেয়ারের প্রাণটা কেঁদে উঠ্লো। তিনি তাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস্ ক’রলেন—“ইভা, মা! তুমি আজকাল একটু ভাল বোধ কচ্ছো কি?” ইভা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বল্লে—“বাবা, আমি অনেক দিন থেকে ভাব্ছি, তোমায় একটা কথা বলবো। আর ত বেশী সময় নেই। শীঘ্রই আমাকে তোমাদের সকলকে ছেড়ে যেতে হবে!”
“ও কি ইভা, ওমন কথা কি ব’লতে আছে? তুমি চলে গেলে আমরা কি নিয়ে থাকবো?”
“না বাবা, তুমি ভুল বুঝো না। আমি মোটেই ভাল হই নি। শীঘ্রই আমায় যেতে হবে! আর আমি যেতেই এখন চাই।”
“কেন মা ইভা, তোমার প্রাণে এত কি কষ্ট?”
“আমাদের এই ক্রীতদাসদের দেখে আমার বড়ই কষ্ট হয়! তুমি মারা গেলে এদের দশা কি হবে? আচ্ছা বাবা, ক্রীতদাসদের সব স্বাধীন ক’রে দেবার কি কোন উপায় নেই? তুমি কি চেষ্টা ক’র্লে এ বিষয়ে সকলকে রাজি করিতে পার না?”
“লক্ষ্মী মা আমার! এ সব বিষয় নিয়ে তুমি মন খারাপ ক’রো না। তুমি যা চাও আমি তাই ক’র্বো!”
“আচ্ছা বাবা, অন্ততঃ টমকে আমার মৃত্যুর পর ছেড়ে দেবে বল?”
“হাঁ মা, তুমি যা ব’লবে তাই ক’র্বো!”
“বাবা, আমার বড় ইচ্ছা করে যে, তুমি আর আমি একসঙ্গে স্বর্গে যাই!—আহা, তা যদি হ’ত! যা হ’ক, পরে তুমি আমার কাছে যাবে তো?”
“নিশ্চয়ই মা! তোমার কাছেই যাবো। তোমায় কি ভুলতে পারি?”