টমকাকার কুটীর/চতুর্থ পরিচ্ছেদ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
সুন্দর একটি বৈঠকখানায় দিব্যি আলো জ্বলছে। সেই আলোতে মেঝের কার্পেট প্রভৃতি ধব্ ধব্ ক’র্ছে। মিঃ বার্ড আজ বাড়ী এসেছেন। তিনি ব্যবস্থাপক সভার একজন সভ্য। যাঁরা দেশের আইন-কানুন তৈরি করেন তাঁদেরই একজন।
মিসেস্ বার্ড বল্লেন—“আজ রাত্রে তুমি হঠাৎ বাড়ী আসাতে, আমরা যে কতটা আশ্চর্য্য ও খুসী হয়েছি, তা তুমি মোটেই বুঝতে পারবে না।”
“এ কয়দিনের খাটুনিতে হাড় পিষে গেছে। তাই তোমার তৈরি সুন্দর চা একটু খেতে এলাম!”
চা খাওয়া শেষ হ’লে, মিসেস্ বার্ড জিজ্ঞেস্ কল্লেন, “তোমাদের সভার কি ঠিক হ’লো?–যে সব কাফ্রী পালিয়ে আসে, তাদের কেউ দুটো খেতে দিতেও পারবে না, এই বদ আইন সত্যি সত্যি পাশ হ’লো না কি? ”
“হাঁ, একটা আইন এই হ’য়েছে যে, যারা কেণ্টাকি থেকে পালিয়ে এখানে আসবে, কেউ তাদের পালাবার সাহায্য ক’রতে পাবে না।”
“আইনটা কি ঠিক হলো? এক রাত্রের জন্য বেচারাদের একটু জায়গা দিতে, দুটি খেতে দিতে, বা একখানা পুরান কাপড় পরতে দিতে, বোধ হয় নিষেধ নেই?”
“নিশ্চয়ই আছে। তুমি জান, এ রকম ক’রলে অপরাধের সাহায্য করা হয়।”
“আচ্ছা জন্ (মিঃ বার্ডের ডাকনাম “জন্”), তুমি কি মনে কর, এরূপ আইন করা খৃষ্টানদের উপযুক্ত কাজ হ’য়েছে? এটা একটা জঘন্য আইন। আমি সুবিধা পেলেই, এর বিরুদ্ধে কাজ ক’র্বো।”
“কিন্তু দেখ, এটার উপর সাধারণের অনেক ভালমন্দ নির্ভর ক’র্ছে। আমাদের নিজেদের মনোভাব যাই হোক না কেন, সব দূর ক’র্তে হবে।”
“আমি তোমাদের রাজনীতির ধার ধারি না। আমি বুঝি, আমার ধর্ম্মশাস্ত্রটুকু। তাতে পরিষ্কার ব’ল্ছে, যে ক্ষুধার্ত্তকে খাবার দেওয়া, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেওয়া, এবং নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দেওয়া আমাদের বিশেষ কর্তব্য।” “কিন্তু যখন তাতে জনসাধারণের একটা মস্ত অমঙ্গল—”
“ঈশ্বরের ইচ্ছামত চ’ল্লে জনসাধারণের কখনো অমঙ্গল হ’তে পারে না। আমি এটা বেশ জানি। ঈশ্বরের নির্দেশমত কাজ করাই সব সময় উচিত।”
ঠিক এই সময় বাড়ীর বুড়ো চাকর কাড্জো দরজা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে, মিসেস্ বার্ডকে একবার রান্নাঘরে যেতে ডাক্লে। মিঃ বার্ডও তর্কের হাত থেকে উদ্ধার পেয়ে, ইজি চেয়ারে বসে খবরের কাগজ প’ড়তে আরম্ভ ক’র্লেন।
একটু পরেই দরজায় মিসেস্ বার্ডের স্বর শোনা গেল। তিনি ডেকে বল্লেন, “জন্, জন্, শীঘ্র একবার এদিকে এসো।” মিঃ বার্ড কাগজখানি রেখে রান্নাঘরে গেলেন। সেখানকার সব ব্যাপার দেখে, তিনি একেবারে চম্কে উঠ্লেন। তিনি দেখ্লেন, দুখানা চেয়ারের উপর মড়ার মত অসাড় একটি মেয়ে প’ড়ে রয়েছে! তার কাপড় চোপড় একেবারে ছিঁড়ে গেছে। পায়ের একখানা জুতা নেই, মোজাও নেই। পায়ের তলা কেটে দর্দর্ ক’রে রক্ত প’ড়ছে! মিসেস্ বার্ড জন কয়েক কাফ্রি চাকর নিয়ে, তার সেবা শুশ্রূষা ক’র্ছেন। আর বুড়ো কাড্জো একটি ছেলের ভিজে জুতা মোজা খুলে দিয়ে, তার পা ঘ’সে ঘ’সে গরম ক’র্ছে!.
কিছু পরে মেয়েটি তার কালো বড় বড় চোখ দুটি খুললে। মিসেস্ বার্ড বল্লেন, “আহা বেচারী—!” মেয়েটি চারিদিকে তাকিয়ে পাগলের মত ব’লে উঠ্লো—“মা, আমাদের বাঁচান। আমার খোকাকে কেউ যেন কেড়ে না নেয়!”
মিসেস্ বার্ড বল্লেন—“কেউ তোমার কোন অনিষ্ট করবে না, ভয় নেই!”
দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদ কাঁদ স্বরে মেয়েটি বল্লে—“ভগবান আপনার মঙ্গল করুন্!”
ছেলেটি তখন মার কোলে যেতে অস্থির হ’য়ে উঠ্ছিল। তাদের জন্য আগুনের ধারে একটা বিছানা ক’রে দেওয়া হ’ল। দেখতে দেখতে ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে, ইলাইজা ঘুমিয়ে প’ড়্লো।
মিঃ ও মিসেস্ বার্ড আবার বৈঠকখানায় গিয়ে ব’স্লেন। মিসেস বার্ড ছুঁচ-সূতা নিয়ে সেলাইএ মন দিলেন। মিঃ বার্ড কাগজখানি তুলে নিয়ে পড়ার ভাণ ক’র্তে লাগলেন।
কতক্ষণ পরে মিঃ বার্ড ব’লে উঠ্লেন, “আমি ভাবছি, মেয়েটি কে? আচ্ছা, তোমার কাপড় চোপড় কি ওর গায়ে লাগে না?”
ঈষৎ হাসিয়া মিসেস্ বার্ড উত্তর দিলেন—“আচ্ছা, সে দেখবো!”
এমন সময় একটা চাকরাণী মুখ বাড়িয়ে ব’লে যে, মেয়েটি জেগেছে, এবং মাকে একবার দেখ্তে চাচ্ছে।
মিঃ ও মিসেস্ বার্ড দুজনেই রান্নাঘরে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বড় ছেলে দুটিও সেখানে গিয়ে হাজির হ’লো। মেয়েটি তখন উনানের কাছে একটা উঁচু জায়গায় বসেছিল। মিসেস্ বার্ড ব’ল্লেন—“তুমি কি আমায় ডেকেছ? এখানে আমাদের সবাইকেই তুমি বন্ধু মনে ক’র্তে পার। তুমি কোথা থেকে এসেছ, আমায় বল দেখি?”
ইলাইজা উত্তর দিল, “কেনটাকি থেকে।”
মিঃ বার্ড জিজ্ঞাসা ক’রলেন, “কখন্?”
“আজ রাত্রেই। আমি বরফের উপর দিয়ে নদী পার হ’য়েছি। ভগবানই আজ আমায় বাঁচিয়েছেন!”
মিঃ বার্ড আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি একজন ক্রীতদাসী ছিলে?”
“হাঁ মশাই, আমি সেখানকার একজন লোকের ক্রীতদাসী ছিলাম। আহা! তিনি বড় ভাল মনিব!”
“তবে অমন ভাল জায়গা তুমি ছেড়ে এলে কেন?”
ইলাইজা তখন মিসেস্ বার্ডের মুখের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত ক’রে ব’ল্লে—“মা, আপনার কি কখনো কোন ছেলে মারা গেছে?”
সবে মাত্র মাস খানেক পূর্ব্বে মিসেস্ বার্ডের একটি ছেলে মারা গেছে। তার কথা মনে ক’রে তিনি হঠাৎ কেঁদে ফেল্লেন। ব’ল্লেন, “হাঁ, অল্প কয়েকদিন হ’লো, আমি একটিকে হারিয়েছি! কিন্তু তুমি একথা কেন জিজ্ঞাসা ক’র্ছো?”
“তা হ’লে আপনি আমার কষ্ট বুঝতে পারবেন। আমি পর পর দুটিকে হারিয়েছি। এইটি মাত্র বাকি। কিন্তু মা, একেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেবার ষড়যন্ত্র হ’য়েছিল! যখন জানতে পার্লাম, একে তারা বিক্রী করেছে, এবং লেখা পড়াও সব ঠিক হ’য়ে গেছে, তখন না পালিয়ে আর উপায় কি? যে লোকটি আমার হ্যারিকে কিনেছে, সে আমার পিছনে পিছনে তাড়া ক’রে এসেছিল। আমি বরফের উপর লাফিয়ে পড়ে রক্ষে পাই। তারপর লাফাতে লাফাতে কি ক’রে যে নদী পার হ’য়ে এসেছি, তা ব’লতে পারি না!”
মিসেস্ বার্ড রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। মিঃ বার্ডেরও মুখ দেখে বেশ বোধ হ’ল যে, চোখের জল ঢাক্তে তিনি বৃথা চেষ্টা ক’র্ছেন।
মিসেস্ বার্ড শেষটা জিজ্ঞাসা ক’র্লেন, “তুমি এখন কোথায় যাবে। ভাব্ছ?”
“কেনাডা দেশটা কোথায়, তা জানতে পারলে সেই খানেই যাব।”
মিসেস্ বার্ড ও তাঁর স্বামী বৈঠকখানায় ফিরে গেলেন। মিঃ বার্ড বিজ্ বিজ্ ক’রে ব’ক্তে ব’ক্তে ঘরের মধ্যে দ্রুত পায়চারী করতে লাগ্লেন। অবশেষে তিনি ব’ল্লেন, “দেখ, মেয়েটিকে আজ রাত্রেই চলে যেতে হবে। ওকে ধ’র্তে যারা বেরিয়েছে, তারা কাল ভোরেই এখানে এসে পৌঁছবে।”
“আজ রাত্রেই! তা কি ক’রে হয়? এখন ওরা যাবে কোথায়?”
বুট জুতা পায় দিতে দিতে, মিঃ বার্ড উত্তর দিলেন—“কোথায় যাবে তা আমার বেশই জানা আছে। ‘জন্ ভ্যান ট্ৰমপী’ নামে আমার এক পুরান মক্কেল কেনটাকি থেকে উঠে এসেছে। সে তার ক্রীতদাসদের ছেড়ে দিয়ে, এখান থেকে সাত মাইল দূরে একটা জায়গা কিনে বাস ক’র্ছে। সে জায়গাটা সহজে কেউ বের করতে পারবে না। সেই খানেই মেয়েটি বেশ নিরাপদে থাক্বে। তবে আমি ছাড়া আজ রাতে আর কেউ ওকে সেখানে নিয়ে যেতে পার্বে না।”
“দেখ জন্, তোমার বিচারবুদ্ধি থেকে দয়ামায়াটাই কিছু বেশী!”
“মেরী, দেখ ওই দেরাজটায় আমাদের হেন্রীর সেই সব কাপড় চোপড় রয়েছে!—” এই ব’লেই মিঃ বার্ড তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে চলে গেলেন।
মিসেস্ বার্ড পাশের ঘরে ঢুকে একটা দেরাজ খুললেন। তার মধ্যে হেন্রীর কাপড় চোপড় দেখে, তিনি কিছুতেই চোখের জল থামাতে পারলেন না! হাতের উপর মাথা রেখে তিনি অনেকক্ষণ ধ’রে কাঁদ্লেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে, ইলাইজা ও তার খোকার জন্য কতকগুলো দরকারী কাপড় বের ক’র্লেন।
কিছুক্ষণ পরে মিঃ বার্ড ফিরে এলে, ইলাইজাকে জাগান হ’লো। মিঃ বার্ড তাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ীতে উঠ্লেন। ইলাইজা মুখ বাড়িয়ে কি যেন ব’ল্তে গেল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হ’ল না। সে একবার মাত্র আকাশের দিকে তাকিয়ে, ধীরে ধীরে গাড়ীতে উঠে বস্লো। গাড়ী জোরে চ’ল্তে লাগলো।
নদীর ধার থেকে উঠে, কাদামাখা গাড়ীখানা যখন প্রকাণ্ড একটা বাড়ীর দরজায় এসে দাঁড়ালো তখন রাত অনেক। বাড়ীর লোকদের ডেকে তুল্তেও অনেকটা সময় কেটে গেল। অবশেষে লম্বা চওড়া প্রকাণ্ড একজন লোক এসে দরজা খুলে দিলে। এই সেই জন্ ভ্যান্ ট্রমপী। জন্ একটা বাতি ধ’রে আগন্তুকদিগের দিকে মিট্ মিট্ ক’রে তাকাচ্ছিল। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা কিছুই সে বুঝতে পারেনি।
মিঃ বার্ড তাকে জিজ্ঞাসা ক’র্লেন, “তুমি কি দাসব্যবসায়ীদের হাত থেকে, একটি মেয়ে ও তার ছোট ছেলেকে রক্ষা ক’রবে?”
জন্ উত্তর দিল, “হাঁ, এই ত আমার কাজ! আমি বিশেষ চেষ্টা ক’র্বো।”
তখন মিঃ বার্ডের কথায়, ঘুমানো খোকাকে বুকে নিয়ে, ইলাইজা ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগিয়ে এল। জন্ একটা শোবার ঘর দেখিয়ে, তাকে ভিতরে যেতে ইঙ্গিত ক’রলে এবং সাহস দিয়ে ব’ল্লে, “তোমার কোন ভয় নেই। আমার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাক্তে কেউ তোমাদের ধ’রে নিয়ে যেতে পারবে না। তুমি স্বচ্ছন্দে খোকাকে নিয়ে ঘুমোও।” তারপর সে ঘরের দরজা বন্ধ ক’রে দিয়ে, মিঃ বার্ডকে ব’ল্লে, “আপনিও আজ রাতটা এখানেই থেকে যান।”
মিঃ বার্ড জন্কে ধন্যবাদ দিয়ে, সেখানে রাত্রিবাস যে কোন মতেই সম্ভব নয়, তাহা জানালেন এবং দশ ডলারের একখানা নোট বের ক’রে তার হাতে দিয়ে ব’ললেন, “এখানা ওই মেয়েটিরই জন্য।”
জন্ সহাস্যবদনে নোটখানা পকেটে রাখ্লে। তারপর মিঃ বার্ডকে বিদায় দিয়ে, সদর-দরজা বন্ধ ক’রে দিলে।