বিষয়বস্তুতে চলুন

টমকাকার কুটীর/চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

যে রাত্রে টম ও কেসিতে এই সব কথাবার্তা হয়, তার পরদিন সকালেই জানা গেল যে, কেসি ও এমিলিন্ নামে আর একটা মেয়ে, সকলের চোখে ধূলো দিয়ে, কোথায় পালিয়ে গেছে। অমনি চারিদিকে লোক ছুটাছুটি—ধর্-পাকড়, চ’লতে লাগলো, কিন্তু এমন কি, শিকারী কুকুরগুলোও তাদের খুঁজে বের কর্তে পারে না। লিগ্রি ত রেগে একেবারে অগ্নিশর্ম্মা! সে কুইম্বোকে ডেকে বল্লে, “যাও, টমকে এখানে নিয়ে এস। ঐ বেটাই এর মূলে আছে। হয় আমি ওর কাছ থেকে সব খবর বের ক’রবো, না হয়, ওর গায়ের চামড়া খুলে নেবো!”

 টম সব কথাই জানতো। কি রকম ক’রে তারা পালায়, কোথায় লুকিয়ে আছে, সবই তার জানা ছিল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা ক’র্‌লে, দরকার’ হয় ত ঈশ্বরের নাম নিয়ে সে প্রাণ দিবে, তবু সেই বেচারীদের কোন কথা প্রকাশ ক’র্‌বে না।

 কুইম্বো ব’ল্লে, “টম, এইবার তুমি বাগে আস্‌বে!”—এই ব’লে তাকে টান্‌তে টান্‌তে নিয়ে চ’ল্লো।

 টম কাছে এলে লিগ্রি তার কোটের গলা ধ’রে বল্লে, “টম, আমি ঠিক জানি, কেসিদের পালাবার মূলে তুমি আছ! যদি ভালয় ভালয় সব কথা প্রকাশ করো, তবে তুমি রক্ষা পাবে। তা না হ’লে আমি প্রতিজ্ঞা কর্‌ছি যে, তোমাকে আস্ত রাখ্‌বো না!”

 টম বল্লে—“আপনাকে বলবার মত আমার কিছুই নেই।—আমি মর্‌বার জন্যে প্রস্তুত আছি!”

 এই কথা শুনে লিগ্রি বল্লে,—“হয়, তুমি সব কথা ব’ল্‌বে, না হ’লে, সত্যিই তোমাকে মেরে ফেল্‌বো। এক এক ফোটা ক’রে তোমার গায়ের সমস্ত রক্ত বের করবো!”

 তখন টম লিগ্রির মুখের দিকে তাকিয়ে ব’ল্লে—“মশায়, যদি আমার বুড়ো শরীরের রক্ত এক এক ফোটা ক’রে নিলে, আপনার আত্মার মঙ্গল হয়, তা হ’লে আমি আনন্দের সহিত তা’ দান ক’র্‌বো। প্রভু যিশুও আমাদের জন্যে তাঁর দেহের রক্ত দান ক’রেছিলেন! কিন্তু আমি মিনতি ক’র্‌ছি যে, আপনার আত্মাকে এ রকমে পাপে লিপ্ত ক’র্‌বেন না।
লিগ্রি পশুর ন্যায় উত্তেজিত হইয়া টমকে প্রহার করিতেছে।—৫৯ পৃষ্ঠা।
কেন না, তাতে আমার চেয়ে আপনারই বেশী ক্ষতি। আপনি যতদূর পারেন আমাকে কষ্ট দিন, সে কষ্ট শীঘ্রই দূর হবে! কিন্তু আপনি যদি এর জন্যে অনুতপ্ত না হন, তা’ হ’লে আপনার কষ্ট কিছুতেই দূর হবে না!”

 লিগ্রি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল; তার পর পশুর ন্যায় উত্তেজিত হ’য়ে, মারতে মারতে টমকে মাটিতে ফেলে দিল।

 সাম্বো কাছেই ছিল, সে ব’ল্লে— “কর্ত্তা, এ বেটা প্রায় মরে গিয়েছে!”

 লিগ্রি রাগে কাঁপতে কাঁপতে ব’ল্লে,—“যতক্ষণ পর্য্যন্ত না ও সব কথা স্বীকার করে, ততক্ষণ ওকে ছাড়া হবে না! লাগাও বেত, ওর হাড়্‌-গোড়্‌ একেবারে পিষে ফেলো!”

 এইবার টম চোখ খুলে লিগ্রির দিকে তাকালে! “হায় হতভাগ্য! তোমার যত দূর কর্‌বার, তা তুমি করেছ, এখন আর কি ক’রবে? আমি তোমাকে অন্তরের সহিত ক্ষমা ক’রছি!” এই বলেই সে অজ্ঞান হ’য়ে পড়্‌লো।

 এখনও টম মরে নাই। টমের শেষ কথাগুলি দুজন সর্দ্দারের মনে বড় লেগেছিল। লিগ্রি চলে গেলে, তারা টমকে নীচে নিয়ে গেল। অনেক সেবা শুশ্রূষার পর টমের একটু চেতনা হলে, কুইম্বো ব’ল্লে—“টম, আমরা তোমার উপর বড়ই অত্যাচার ক’রেছি—ক্ষমা করো!”

 টম জড়িতস্বরে উত্তর দিল,—“আমি অন্তরের সহিত তোমাদের ক্ষমা ক’র্‌ছি!”

 তখন সাম্বো জিজ্ঞেস্ ক’র্‌লে,—“টম, আমাকে বল দেখি, কে সেই যিশু, যিনি তোমার ব্যথিত প্রাণে এমন ক’রে শান্তি দেন?”

 যিশুর কথায় টমের অসাড় প্রাণে যেন নূতন বল এল! টম লাঠি ভর ক’রে উঠে দাঁড়িয়ে, সংক্ষেপে যিশুর কাহিনী তাদের শুনালে।

 সাম্বোর কঠিন প্রাণ একেবারে গ’লে গেল!—“হায়! আমরা একথা আগে কেন শুনি নি?”

 টম বল্লে—“আহা বেচারা! আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ক’র্‌ছি, তিনি এই দুটি আত্মা আমাকে দান করুন!” এই বলেই টম আবার একটু অজ্ঞানের মত হ’য়ে পড়্‌লো।