বিষয়বস্তুতে চলুন

টমকাকার কুটীর/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

ইলাইজা যখন টমের বাড়ী থেকে বেরিয়ে প’ড়লো, তখন সে যেমন সহায়হীন, বন্ধুহীন, তেমন অবস্থায় আর সে কখনো পড়েনি। সূর্য্য অস্ত যাবার ঘণ্টা খানেক আগে, সে “ওহিও” নদীর ধারে একটা গ্রামে এসে পৌঁছিল। তখন একেবারে হয়রাণ হ’য়ে পড়েছে। পায়ের তলা কেটে রক্ত প’ড়ছে। দেহের ক্লান্তি কিন্তু তার মনের বলকে কমাতে পারেনি!

 সে প্রথমে ভেবেছিল, নদী পার হ’য়ে পালাবে। কিন্তু তখন সবে বসন্ত ঋতু আরম্ভ হয়েছে। শীতের জমা বরফ গলতে আরম্ভ হ’য়ে নদী একেবারে ভ’রে উঠেছে। আর সেই ঘোলাটে জলের উপর বড় বড় বরফের চাপগুলো ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। পারে যাবার সন্ধানে ইলাইজা নদীর ধারে একটা হোটেলে গেল। সেখানে একটি স্ত্রীলোক রান্না ক’রছিল। ইলাইজা তাকে জিজ্ঞেস্ ক’রলে—“ওপারে যাবার জন্যে কোন খেয়া কি এখানে নেই?”

 স্ত্রীলোকটি বল্লে, “খেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আজ সন্ধ্যার সময় একজনের ওপারে যাবার কথা আছে। সে লোক খুব ভাল। ইচ্ছা ক’রলে তুমি তার সঙ্গেই যেতে পারো।”

 ইলাইজা তখন হ্যারির দিকে তাকিয়ে আদর ক’রে বল্লে—“বাছা আমার! পথের কষ্ট একেবারেই সহ্য করতে পারে না।”

 হোটেলের সেই স্ত্রীলোকটি একটা শোবার ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বল্লে, “ওকে ঐ ঘরে নিয়ে যাও।”

 ইলাইজা ছেলেকে নিয়ে একটা বিছানার উপর শোয়ালে। আর যতক্ষণ সে না ঘুমুল, ততক্ষণ তার হাত খানা নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধ’রে রাখ্‌লে।

 ইলাইজাকে যারা খুঁজ‍্তে বের হ’য়েছিল, তারা এখন কি ক’র‍্ছে, দেখা যাক্। নানা গোলমালে তাড়াতাড়ি বের হ’তে পারেনি ব’লে, তাদের নদীর ধারে পৌঁছতেও দেরী হ’য়েছিল। হ্যারিকে শোয়াবার প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে, ইলাইজা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে, এমন সময় ঘোড়ার পায়ের শব্দে চমকে উঠে, হঠাৎ সে কিছু দূরে মিঃ হ্যালিকে দেখ্‌তে পেলে। অমনি ভয়ে তার আপাদমস্তক কেঁপে উঠলো। সেই ঘর থেকে নদীর ধারে যাবার একটা দরজা ছিল। সে হ্যারিকে বুকে জড়িয়ে, ছুটে নদীর দিকে চল্লো। মিঃ হ্যালি তাকে পরিষ্কার দেখতে পেলেন। অমনি খরগোসের পিছনে যেমন শিকারী কুকুর ছোটে, তেমনি বেগে তাকে তাড়া ক’রলেন। তখন প্রাণের মায়া ছেড়ে, ইলাইজা ভয়ানক চীৎকার ক’রে এক লাফ দিল। সেই এক লাফে সে একখানা ভাসা বরফের উপর পড়লো। অমনি সেই প্রকাণ্ড বরফখানার এক দিক ডুবে গেল এবং অপর একখানা চাপে ঠেকে, কড়্‌ কড়্‌ শব্দ হ’তে লাগলো। কিন্তু ইলাইজা তার উপর এক মুহূর্ত্তও রইল না। সে তখন মরিয়া হ’য়ে উঠেছে! চোখে কিছু দেখ্‌তে পাচ্ছে না, কিছু ভাবতে বা বুঝতে পাচ্ছে না। কেবল চীৎকার ক’রতে ক’রতে বরফের একটা চাপ থেকে আর একটা চাপের উপর লাফাতে লাফাতে চলেছে! শেষে খানিক পরে তার মনে হ’ল, কে যেন তাকে সাহায্য করছে—তাকে হাতে ধ’রে পারে নিয়ে যাচ্ছে! ইলাইজা সে মুখ, সে গলার স্বর চিন্‌তে পারলে। মিঃ সেল্‌বির বাড়ীর কাছেই এই লোকটির একটা কারখানা আছে। ইলাইজা ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বল্লে—“ও মিঃ সীমস্‌, বাঁচান আমার হ্যারিকে! এই ছেলেটিকে—আমার এই একটিমাত্র খোকাকে ওরা কেড়ে নিতে এসেছে! ও মিঃ সীমস্, আপনারও ছেলে আছে, আপনি রক্ষা করুন, আমাদের লুকিয়ে রাখুন!”


বরফের উপর দিয়া ইলাইজার পলায়ন।—১৬ পৃষ্ঠা।
 মিঃ সীমস্ ব’ললেন,—“হাঁ, আমারও ছেলে আছে। আমি তোমার কষ্টের কথা বুঝতে পারছি। তোমার ভয় নেই। ঐ যে প্রকাণ্ড সাদা বাড়ীটা দেখ্‌ছ, ওখানে যাও। ওঁরা নিশ্চয়ই তোমাকে রক্ষা করবেন।”

 ইলাইজা বল্লে—“ভগবান আপনার ভাল করুন।”

 এদিকে মিঃ হ্যালি রাগে ও দুঃখে গর্জ্জাতে গর্জ্জাতে হোটেলে ফিরে এলেন। সেখানে “টম লকার” ও “মার্ক” নামে তাঁর দুটি জানা লোক ছিল। তিন জনে ইলাইজাকে ধরবার পরামর্শ করতে লাগ্‌লেন।