বিষয়বস্তুতে চলুন

টমকাকার কুটীর/ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

টমের বা এখনো শুকায় নি।—চলতে ফিরতে তার খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু লিগ্রি জোর ক’র্‌তে লাগলো যে, তাকে সেই অবস্থাতেই বাগানের কাজে যেতে হবে।

 প্রহারের পর সে এত বেশী দুর্ব্বল হ’য়ে পড়েছিল যে, মাঠে গিয়ে খেটে-খুটে বাড়ী ফিরতে তার প্রাণ যেন বেরিয়ে যেতো। বাইবেল নিয়ে প’ড়্‌তে ব’স্‌লে, মাথা ঘুর্‌তে থাকতো! চোখে ভাল ক’রে কিছুই দেখ্‌তে পেতো না!

 একদিন রাত্রে সকলেই ঘুমুচ্ছে, এমন সময় কেসি এসে জানালা দে মুখ বাড়িয়ে, টমকে বাইরে যেতে ডাকলে। তারপর চুপি চুপি ব’ল্লে—“টম, তুমি কি স্বাধীন হ’তে চাও?”

 “হাঁ, ঈশ্বরের যেদিন ইচ্ছা হবে, সেই দিনই আমি মুক্তি পাবো।”

 “আজই পাবে!—আমার সঙ্গে এস। লিগ্রি এখন তার ঘরের দরজা খুলেই ঘুমুচ্ছে। এই কুড়ুলখানা নেও! আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছি। আমার হাতে তেমন জোর নেই, না হ’লে, আমিই এ কাজ করতে পারতাম!”

 “না, আমাকে লক্ষ পৃথিবীর রাজা ক’রে দিলেও এ কাজ আমার দ্বারা হবে না!”

 টমের ভাব দেখে কেসি আশ্চর্য্য হ’য়ে গেল। সে বল্লে, “লিগ্রির মত পিশাচের হাত থেকে এতগুলি হতভাগ্য ক্রীতদাসকে রক্ষা করা কি উচিত কাজ নয়?”

 টম বল্লে,—“না, খারাপ কাজ থেকে কখনো ভাল ফল পাওয়া যায় না!”

 তখন কেসি বল্লে—“তা হলে আমিই এ কাজ ক’র্‌বো!”

 টমের মুখখানি বেদনায় ভ’রে উঠলো। সে কম্পিত স্বরে বল্লে, —“দেখ কেসি, তুমি মিছামিছি তোমার মনকে ও আত্মাকে পাপে ডুবিও না। যতদিন না ঈশ্বরের অন্য রকম ইচ্ছা হয়, ততদিন আমাদের সকল রকম কষ্ট সহ্য করতেই হবে!”

 কেসি বল্লে—“ঈশ্বরের মুখ চেয়ে অনেক দিন গেছে, আর নয়! এই লোকটা আমাদের কি কষ্টই না দিয়েছে! এখন সুযোগ উপস্থিত। আজ তাকে মেরে আমি প্রতিশোধ নেবই নেবো!”

 কেসিকে উত্তেজিত দেখে, টম একটু ভয় পেলে। তার পর নানা রকমে তাকে বুঝিয়ে বল্লে, “অমন কাজ করো না। ভগবান আমাদের বল দিন, যেন তাঁরই কথামত চ’লতে পারি এবং তাঁরই মত শত্রুকেও ভালবাসতে পারি!

 “কি! ওকে ভালবাসা! রক্ত মাংসের শরীরে সে হবে না!”

 “না কেসি, তুমি ভুল বুঝছো। তিনি যখন আমাদের ভালবাসার শক্তি দেবেন, তখনই সত্যি সত্যি আমাদের জয়লাভ হবে। সে প্রেমের কাছে শত্রু মিত্রে প্রভেদ থাক্‌বে না। এস প্রার্থনা করি, আমাদের সেই সুদিন আসুক!”

 “টম, আমি যে মোটেই প্রার্থনা ক’রতে পারি নে!”

 “আহা! আচ্ছা এস, আমিই তোমার জন্যে প্রার্থনা করছি!” টমের কাতর প্রাণের সরল প্রার্থনা—সে যে কি মধুর, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কেসি চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে রইল। তার দুই চোখ দিয়ে জল প’ড়্‌তে লাগ্‌লো!

 কিছুক্ষণ পরে টম বল্লে, “কেসি, এখান থেকে চলে যেতে পার্‌লে, তোমাকে প্রার্থনা করা শিখাতে পার্‌তাম।”

 “তবে পালাবার সুযোগ ছাড়্‌চো কেন? চলো না, বেরিয়ে পড়ি!”

 “না, এখানকার এইসব হতভাগ্য লোকদের ভাল কর্‌বার ভার ঈশ্বর আমার উপর দিয়াছেন! আমাকে উপলক্ষ ক’রেই ভগবান এদের মুক্তি দেবেন! এজন্য যে কোন অত্যাচার আমি সহ্য করতে পার্‌বো। কিন্তু তোমার কথা আলাদা। এ ভাবে বেশী দিন চ’ল্‌লে তোমার প্রাণ নিয়েই টানাটানি প’ড়্‌বে! সুতরাং তোমার চলে যাওয়াই উচিত।”