টমকাকার কুটীর/দশম পরিচ্ছেদ
দশম পরিচ্ছেদ
চিকিৎসায় যে একটু বল পেয়ে, ইভা চান্কা হ’য়ে উঠেছিল, দেখ্তে দেখ্তে তার সে অবস্থা বদ্লে গেল। তাকে বারান্দা পর্যন্ত আস্তেও আর বড় একটা দেখা যেত না। ইভা অধিকাংশ সময়ই ঘরের মধ্যে জানালার ধারে, একটা ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে শুয়ে থাক্তো। একদিন সেখানে শুয়ে শুয়ে সে তার মাকে বল্লে, “মা, আমার কতকগুলি চুল কেটে রাখ্লে হয়!”
তার মা জিজ্ঞেস্ ক’রলেন—“কেন মা?”
“আমায় যারা ভালবাসে, তাদের সকলকে আমি দুই একগাছি ক’রে চুল দিতে চাই! তুমি একবার পিসীমাকে বলো না মা, আমার কতকগুলি চুল কেটে নিতে!”
এমন সময় সেণ্ট্ ক্লেয়ার ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস্ ক’রলেন—“কি কথা হচ্ছে?”
“বাবা, আমি সবাইকে দুই এক গাছি ক’রে চুল দিয়ে যেতে চাই!”
তখন মিস্ ওফেলিয়া ইভার কয়েক গাছি চুল কেটে তার কোলের উপর রাখ্লেন। ইভা মনে মনে খুসি হ’য়ে, ইসারা ক’রে তার বাবাকে ডাক্লে। তিনি কাছে এসে বস্লেন। ইভা বল্লে—“বাবা, আমার সব চাকর চাকরাণীদের একবার দেখ্তে ইচ্ছা কর্ছে।”
মিস্ ওফেলিয়া তখনই একজন লোক পাঠিয়ে সকলকে সেখানে ডাকিয়ে আন্লেন। ইভা তাদের দিকে চেয়ে ব’লতে আরম্ভ ক’র্লে—“দেখ, আমি তোমাদের সকলকে খুব ভালবাসি; তাই এখানে ডাকিয়ে এনেছি। তোমরা সব মনে রেখো, স্বর্গ ব’লে একটা খুব ভাল জায়গা আছে! সেখানে যিশু থাকেন! আমি সেখানেই যাচ্ছি। তোমরাও সবাই সেখানে যেতে পারো। তোমাদের জন্যে আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা ক’রেছি। আর আমি জানি, যিশুও তোমাদের খুব ভাল বাসেন। তোমরা রোজ প্রার্থনা ক’রবে। আমি তোমাদের সকলকেই স্বর্গে দেখতে চাই!”
টম, ম্যামী ও আরো কয়েকজনে চোখের জল মুছতে মুছতে ব’লে উঠলো—“ভগবান তাই করুন!” আর সকলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
ইভা আবার বল্লে—“আমি জানি, তোমরা সকলেই আমায় খুব ভালবাস। তোমাদের সকলকে আমি আমার এক এক গাছি চুল দিয়ে যাবো। যখনই সেটা দেখবে, তখনই মনে ক’রো যে, আমি তোমাদের খুব ভাল বাস্তাম; এবং তোমাদের সকলকে একত্র দেখ্বার জন্যে আমি স্বর্গে অপেক্ষা করছি!”
চোখের জলে ভাস্তে ভাস্তে সকলে ইভার হাত থেকে এক এক গাছি চুল নিল! সেটাকে অমূল্য ধন ভেবে, টম তাহা বুকের মধ্যে চেপে রাখ্লে! আহা! এই চুল গাছিই তার ইভার ভালবাসার শেষ চিহ্ন!
এই ঘটনার পর থেকেই ইভার অসুখ তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠ্লো। একদিন সারারাত মিস্ ওফেলিয়া তার পাশে ব’সে আছেন, হঠাৎ বারটার সময়, ইভার শেষ অবস্থার লক্ষণ বুঝতে পার্লেন। অমনি তাড়াতাড়ি টমকে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে, তিনি সেণ্ট্ ক্লেয়ারকে ডেকে আন্লেন। মুহূর্ত্ত মধ্যেই সেণ্ট্ ক্লেয়ার ইভার ঘরে উপস্থিত হ’লেন। দেখে মনে হ’লো, ইভা যেন ঘুমুচ্ছে! একটু পরে টম ডাক্তার নিয়ে এল। গোলমালে মেরীরও ঘুম ভেঙ্গেছিল। ডাক্তার ও তিনি এক সঙ্গে ঘরে প্রবেশ ক’রলেন। সেণ্ট্ ক্লেয়ার ভাঙ্গা গলায় ব’লে উঠলেন—“চুপ! আস্তে—ইভা চলেছে!”
তারপর তিনি ইভার কাছে গিয়ে ব’ল্লেন “ইভা, মা আমার! আমার চিন্তে পার্ছ, মা?”
অনেক কষ্টে ইভা বল্লে—“বাবা!” তারপরেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বল্লে—“আঃ কি স্নেহ, কি আনন্দ, কি শান্তি!” ব’লেই শেষ নিশ্বাস ফেলে, ইভা মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে অমৃতের রাজ্যে চ’লে গেল! স্বর্গে আজ আনন্দের উৎসব! পৃথিবী ম্রিয়মাণ!
বাগানে শেওলা ঢাকা চমৎকার একখানা পাথরের আসন ছিল। ইভা টমের সঙ্গে সেখানে ব’সে এতদিন কত খেলা ক’রেছে, কত গল্প শুনেছে, কত বই পড়েছে। আজ সেই আসনের পাশেই ইভাকে কবর দেওয়া হ’ল!
ইভাকে হারিয়ে সেণ্ট্ ক্লেয়ার প্রথমটা সবই শূন্য দেখতে লাগ্লেন। ক্রমে তাঁর মনে সান্ত্বনা এল! যিনি ব্যথা দেন, সান্ত্বনাও যে তাঁরই অপার্থিব দান!