টমকাকার কুটীর/দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
যথাসময়ে নিলামের ডাক আরম্ভ হ’লো। টমকে যে কিন্লে, তার নাম লিগ্রি। রেড নদীর ধারে সে তুলার চাষ করে। সেই নিলামে টমকে ছাড়া সে আরো কয়েকজন দাসদাসী কিনেছিল। তারা সকলে মিলে উঁচু নীচু রাস্তা দিয়ে লিগ্রির গাড়ী ঠেলে নিয়ে চল্লো।
গাড়ী লিগ্রির বাড়ীর দরজায় পৌঁছিবামাত্র তিন চারটা ভয়ানক কুকুর ছুটে এল। কুকুরগুলোকে দেখিয়ে লিগ্রি বল্লে—“দেখ, যদি তোমরা কখনো পালাতে চেষ্টা করো, তা হ’লে তোমাদের কি দশা হবে, বুঝতেই পারচো। এই কুকুরগুলোকে বেশ ক’রে শেখান হ’য়েছে—এরা গন্ধ শুঁকে কাফ্রীদের খুঁজে বের করতে পারে।” এই ব’লে সে “সাম্বো” ও “কুইম্বো” নামে দুজন সর্দ্দার চাকরকে ডেকে, তাদের সঙ্গে টমকে যেতে বল্লে।
টমের জন্যে যে ঘরটা ঠিক হয়েছিল, সেটা যেমন ভিজে ও ময়লা তেমনি ছোট। ঘরটা দেখেই টমের মন একেবারে দমে গেল।
সমস্ত দিন হেঁটে টম খুব শ্রান্ত ও ক্ষুধায় কাতর হ’য়ে প’ড়েছিল। এমন কি, ন’ড়তে চ’ড়তেও তার কষ্টবোধ হচ্ছিল। সন্ধ্যার পরে কুইম্বো এসে এক থ’লে যব দিয়ে বল্লে—“দেখ টম, এই গুলো ভাল ক’রে রেখে দাও। এক সপ্তাহের মধ্যে আর কিছুই পাবে না। এই গুলো যাঁতায় ভেঙ্গে রুটি ক’রে খাবে।”
টমের যাঁতা ছিল না। সুতরাং অনেক রাত পর্যন্ত ব’সে থাকতে হ’লো। টমের পাশের কুঁড়েতেই দুটা স্ত্রীলোক ছিল। সমস্ত দিন মাঠে মাঠে কাজ করে তারাঃ শ্রান্ত হ’য়ে পড়েছিল। টম নিজের যবের সঙ্গে তাদের গুলিও ভেঙ্গে দিল। এই দয়ার জন্যে তারাও আবার টমের রুটি তৈরি ক’রে দিল। খাওয়া শেষ হ’লে, টম আগুনের কাছে ব’সে বাইবেল প’ড়তে লাগলো। তারপর একটা পুরাণ কম্বল গায়ে ঢেকে, বিচুলির উপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। এই ভাবে টমের কয়েক দিন কেটে গেল।
টম কি করে না করে, লিগ্রি তা লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখ্তো। টমকে সে কাজের লোক মনে ক’র্তো বটে; কিন্তু কেন জানি না, তাকে একটুও দেখতে পারত না।
একদিন সকাল বেলা টম মাঠে কাজ ক’রতে ক’রতে পাশেই একটী স্ত্রীলোককে দেখতে পেলে। সে বেচারীর কাজ করতে ভয়ানক কষ্ট হচ্ছিল। যেন আর দাঁড়াতে পারছিল না। অথচ কাজ না করেও উপায় নেই। পরিমাণ মত তুলা সংগ্রহ না হ’লে, লিগ্রি হাড় থেকে মাংস ছিঁড়ে নেবে! তাকে দেখে টমের মন একেবারে ব্যথায় ভ’রে গেল। সে নিজের থলে থেকে খানিকটা তূলা নিয়ে, তার থলের মধ্যে পুরে দিল! অমনি মেয়েটি ব’লে উঠলো, “না না, এ রকম কাজ কখনো ক’রো না। সর্দ্দার দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না।”
সাম্বো কাছেই ছিল এবং সবই দেখেছিল। সে ছুটে এসে টমের মুখে এক ঘুসি এবং সেই স্ত্রীলোকটীকে একটা লাথি মেরে ব’ল্লে, “আমার কাছে চালাকী? আর যদি এ রকম দেখি, তবে মারের চোটে হাড় গুঁড়ো ক’রে দেবো!” টম কোন কথা না ব’লে নীরবে সব সহ্য করলে, কিন্তু বিষম আঘাতে সেই মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে পড়লো!
তখন সাম্বো বল্লে, “ও সব ফাঁকী আমি ঢের জানি—অজ্ঞান হওয়া বের করে দিচ্ছি! এই ব’লে পকেট থেকে একটা বড় সূচ নিয়ে মেয়েটার মাথায় বিঁধিয়ে দিলে। অমনি যন্ত্রণায় ছট্ফট্ ক’রতে ক’রতে সে উঠে বসলো এবং অতি কষ্টে কাজ ক’রতে লাগলো।
সন্ধ্যাবলা দলে দলে ক্রীতদাস তুলার বোঝা মাথায় নিয়ে ক্লান্ত দেহে বাড়ী ফিরলো এবং যেখানে তূলা রাখা হয়, সেই ঘরের সম্মুখে জড় হ’ল। সেখানে লিগ্রি দাঁড়িয়েছিল। দুজন সর্দ্দারের সঙ্গে কি কথা ব’ল্ছিল। সাম্বো বল্লে—“এর মধ্যেই টম সয়তানি সুরু ক’রেছে! কেসির উপর তার ভারি দয়া! নিজের তূলা দিয়ে সে আজ কেসির থলে ভ’রে দেছে।”
লিগ্রি ব’ল্লে,—“সত্যি না কি? তা হ’লে টমকে দিয়েই আজ কেসিকে চাবুক দেওয়াতে হবে! তাতে টমেরও বেশ শিক্ষা হবে।”
ক্রমে একে একে সকলেই তুলা ওজন করাতে লাগলো। টমের বোঝা ওজনে ঠিকই হ’ল। টম তখন কেসির বোঝা কম বেশী কি হয়, দেখ বার জন্যে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। তার বোঝাও ওজনে ঠিক হ’ল; কিন্তু লিগ্রি ব’লে উঠলো,—“কি আবার কম!—বেটি কুঁড়ের সর্দ্দার!” তারপর টমকে ডেকে ব’ল্লে,—“টম, এদিকে এস; এই চাবুকটা নিয়ে কেসির পিঠে যা কতক লাগিয়ে দেও।”
টম খুব বিনয়ের সঙ্গে বল্লে—“মশায়, আমাকে ক্ষমা করুন। আমার দ্বারা এ অন্যায় কাজ কিছুতেই হবে না!”
টমের কথা শুনে লিগ্রি রেগে একেবারে আগুন হ’য়ে উঠলো!
“কি পাজি, তোর এতদূর সাহস? আমার হুকুম তুই অমান্য ক’রছিস্? আমার হুকুমের উপর আবার ন্যায় অন্যায় বিচার! বেটা, তোর শরীর, মন, আত্মা কি এখন আমার নয়?” এই ব’লে সে টমকে খুব জোরে একটা লাথি মারলে।
টম বল্লে—“না, আমার আত্মা কখনো আপনার অধীন নয়! যিনি এর ভার নিতে পারেন, সেই ভগবানই ইহার একমাত্র প্রভু!”
লিগ্রি বল্লে,—“আচ্ছা, তবে দেখ! সাম্বো, কুইম্বো এদিকে আয়! বেটাকে এমন ক’রে চাবুক লাগা যেন এক মাসের মধ্যে উঠে ব’স্তে না পারে।”
রাত অনেক হ’য়েছে। টম ঘরের মেঝেতে প’ড়ে ব্যথায় চীৎকার ক’রছে। তার সমস্ত গা কেটে রক্ত প’ড়্ছে! এমন সময় কার যেন পায়ের শব্দ শুনা গেল। কেসি ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে এসে, টমকে জল দিল ও তার মাথাটি মাটি থেকে তুলে নিল। টম তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বল্লে,—“দেখ, তুমি যদি দয়া ক’রে বাইবেলখানা নিয়ে একটু প’ড়ে শুনাও, তা হ’লে আমি খুব খুসি হই।” কেসি প’ড়তে লাগ্লো, “পিতা, এদের ক্ষমা করো, এরা যে কি করচে তা জানে না!”
টমের চক্ষু জলে ভ’রে উঠলো। কেসিও না কেঁদে থাকতে পার্লে না। কাঁদতে কাঁদতে সে তার দুঃখের কাহিনী ব’লতে লাগলো।
কেসির কথা শুনে টম বল্লে—“দেখ, যিনি তোমার এই ভাঙা প্রাণে সান্ত্বনা দিতে পারেন, তাঁরই কাছে প্রার্থনা করো। প্রার্থনা ছাড়া আমাদের আর কোন সম্বলই নেই!”
“তাঁর কাছে! কার কাছে? তিনি কোথায় থাকেন?” “তিনিই সেই প্রভু, যার কথা এই মাত্র তুমি প’ড়ে শুনালে!” কেসি কি যেন ভাবতে লাগলো। একটু পরে বল্লে, “এ কথা আর একদিন হবে। তুমি বেশী কথা বলো না। পার ত একটু ঘুমুতে চেষ্টা করো।” এই ব’লে টমকে আর এক গ্লাস জল দিয়ে, সে চলে গেল।
সেরাত্রে লিগ্রিরও ভাল ঘুম হলো না। সে মদে চুর্ চূর্ হ’য়ে শুধু টমের কথাই ভাবতে লাগলো।—“কি, সামান্য একটা নিগ্রো, সে কি না আমার হুকুম অমান্য করে! এত বড় স্পর্দ্ধা! যে রকমে হক, বেটাকে জব্দ ক’রে তবে ছাড়্বো!”
ভোর হ’তে না হ’তে লিগ্রি টমের ঘরে গেল। টম তখনো মাটিতে প’ড়েছিল। লিগ্রি তাকে দুই তিনটা লাথী মেরে ব’ল্লে,—“ওঠ না পাজি! এখন কেমন লাগে! যদি বাঁচতে চাস, এখনই হাঁটু গেড়ে ব’সে আমার কাছে ক্ষমা চা!—কি, এখনো ক্ষমা চাইলি নে?” এই ব’লে টমকে খুব জোরে কয়েক ঘা চাবুক মারলে!
টম বল্লে—“মশায়, আমি ক্ষমা চাইতে পারবো না। আমি যা অন্যায় মনে করি, তা কিরূপে করবো?”
“বটে, এখনো এত তেজ! এর পরে তোর যে কি দশা হবে, তা তুই জানিস্ না। আচ্ছা, একটা গাছের সঙ্গে তোকে বেঁধে যদি চাদ্দিকে আগুন ধরিয়ে দিই, তা হ’লে তুই কি করিস্?—যাক্, এখনো বল্চি ক্ষমা চা; না হ’লে, ঠিক ঐ রকম শাস্তিই তোর কপালে আছে!”
টম ব’ল্লে, “আমার সাহায্যের অভাব হবে না!”
“কে তোকে বাঁচাবে?”
“ঈশ্বর—তিনি সর্ব্বশক্তিমান্!”
“তবে মর্ বেটা”—এই ব’লে লিগ্রি টমকে আবার ঘুসি মার্লে। তারপর বল্লে, “আমার এখন কাজ আছে; পরে আবার আস্বো। তোকে আমি ভুল্ছি নে। তোর গা থেকে চামড়া খুলে নিয়ে তবে ছাড়্বো—এ কথা যেন মনে থাকে!” এই ব’লে লিগ্রি চ’লে গেল।