টমকাকার কুটীর/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
টমকাকার ঘরখানি কাঠের তৈরি। গোলাপ গাছ ও নানা রকম লতা পাতায় সেই ঘরটি একেবারে ঢাকা। সামনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ফুটফুটে ছোট একটি বাগান।
টমের প্রভুর বাড়ীতে সন্ধ্যাবেলার খাওয়া দাওয়া শেষ হ’য়ে গিয়েছে। ক্লো কাকী (টমকাকার স্ত্রী) সে বাড়ীর রাঁধুনীদের গিন্নী। তার এখন ছুটি হয়েছে, তাই সে এখন তার “বুড়ো”কে খাবার দিতে এসেছে। ক্লো কাকী টমকাকাকে “বুড়ো” ব’লে ডাকে! ঘরের এক কোণে একটা বেঞ্চির উপর বসে, দুটি ছোট ছোট ছেলে মেয়ে একটি খুব ছোট খোকাকে আদর ক’র্ছে। ছেলে মেয়ের চুলগুলি কাল পশমের মত কোঁকড়ান ও চক্চকে। আগুন পোহাবার জায়গায়, একটা টেবিলের পাশে টমকাকা ব’সে আছে। টম মিঃ সেল্বির প্রধান ভৃত্য। টমকাকা যেমন লম্বা চওড়া, তার গায়েও তেমনি জোর। শরীরটি তার কুচ্কুচে কালো। তার গম্ভীর চেহারা দেখে বেশ বুঝা-যায় যে, সে বুদ্ধিমান, বিনয়ী ও শান্ত।
আজ টমকাকার বাড়ীতে প্রভু যিশু খৃষ্টের উপাসনা হবে। দেখ্তে দেখ্তে সমস্ত ঘরটা লোকে ভ’রে গেল। তার মধ্যে আশী বছরের বুড়ো বুড়ী থেকে চৌদ্দ পনর বছরের ছেলে মেয়ে পর্য্যন্ত ছিল। আশ পাশের সমস্ত গ্রামের লোকেরা টমকে ধর্ম্মবিষয়ে প্রধান পুরোহিতের মতই মনে ক’র্তো, আর সকলেই তাকে খুব ভক্তির চোখে দেখ্তো। টমের প্রাণ-গলান গানে ও সরল প্রার্থনায় সকলেই মোহিত হ’য়ে যায়।
টমকাকার বাড়ীতে যখন সকলে উপসনায় মগ্ন, সেই সময় তার প্রভুর গৃহে একটা টেবিলের দুই পাশে মিঃ সেল্বি ও মিঃ হ্যালি ব’সে ছিলেন। মিঃ সেল্বি খুব মন দিয়ে কতকগুলা হিসাব পত্রের কাগজ দেখ্ছিলেন।
মিঃ হ্যালি বল্লেন, “সব ঠিক আছে, এখন এই গুলোতে সই দিলেই, কেনা বেচা সব ঠিক হয়ে যায়।”
কাগজ পত্রে সই দেওয়া হ’লে পর, মিঃ হ্যালি এক খানা নোট বের ক’রে মিঃ সেল্বিকে দিলেন। সেল্বি বল্লেন—“যাক্, সব ঢুকে গেল!”
রাত্রে মি: ও মিসেস্ সেল্বি নিজেদের ঘরে শুতে গেছেন। মিঃ সেল্বি একটা ইজি চেয়ারে শুয়ে আছেন। মিসেস্ সেল্বি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস্ কল্লেন, “আচ্ছা আর্থার, (সে্ল্বির ডাকনাম “আর্থার”) ঐ যে চাষার মত লোকটা তোমার সঙ্গে খাবার ঘরে ব’সেছিল, ও কে?”
“ওঁর নাম মিঃ হ্যালি।”
“ইলাইজা আমার কাছে কাঁদ্তে কাঁদ্তে এসে বল্লে, তুমি না কি ঐ লোকটার সঙ্গে তার ছেলেকে বিক্রী কর্বার কথা ব’ল্ছিলে?”
“হাঁ এমিলি, (মিসেস্ সেল্বির ডাকনাম “এমিলি”) কতকগুলো চাকর আমাকে বিক্রী ক’র্তেই হবে। এমন কি, আমি টমকেও বিক্রী ক’র্তে রাজি হয়েছি!”
“কি! আমাদের টমকে? সে যে ছেলেবেলা থেকে তোমার কাছে বিশ্বস্ত ভাবে কাজ করেছে, এই কি তার পুরস্কার! আর্থার, তুমি না তাকে স্বাধীন ক’রে দিতে চেয়েছিলে?”
“এমিলি, তুমি ত সবই জান। নিতান্ত বিপদে পড়েই আমাকে এ কাজ ক’র্তে হচ্ছে। শুধু টমকে কেন, হ্যারিকেও বিক্রী ক’র্তে হ’য়েছে। বিক্রী না ক’রে আমার আর উপায় নেই। হয় ওদের দুজনকে ছাড়তে হয়, না হ’লে সবাইকে ছাড়তে হয়! আমার যেখানে যা ছিল, কুড়িয়ে এক জায়গায় ক’রেছি, লোকের কাছে ধার ক’রেছি—ভিক্ষে করা ছাড়া আর সবই ক’রেছি, তবুও আমার কিছুতেই কুলাইতেছে না। ওদের দুজনকে বিক্রী ক’র্লে অনেকটা বিপদ কেটে যায়, তাই বাধ্য হয়ে আমাকে এ কাজ ক’র্তে হয়েছে।”
মিসেস্ সেল্বি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে, অবাক হ’য়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। শেষে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বল্লেন—“দাসব্যবসায়ের অভিসম্পাত এতদিনে ফল্তে আরম্ভ হয়েছে! এমন মহাপাপ আর নেই! ভগবান সেই পাপের এই শান্তি দিচ্ছেন!”
তাঁদের এই সব কথাবার্ত্তা যে আর একজন শুন্ছিল, মিঃ বা মিসেস্ সেল্বি কেউই তা বুঝতে পারেন নি। ইলাইজা দরজার ফাঁকে কান দিয়ে সব কথা শুনেছিল। কথাবার্ত্তা শেষ হ’লে, সে আস্তে আস্তে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। এক টুকরা কাগজ নিয়ে তাড়াতাড়ি লিখলে—
“গিন্নী মা, আপনি আমার উপর রাগ ক’র্বেন না। আমি আমার ছেলেকে বাঁচাবার জন্য চ’লে যাচ্ছি। আপনার দয়ার কথা আমি জীবনে ভুল্ব না! ঈশ্বর যেন আপনার মঙ্গল করেন।”
ঘুমন্ত হ্যারিকে জাগাতে প্রথমটা ইলাইজার খুব কষ্ট হয়েছিল; যা হোক সে জেগে উঠলে, ইলাইজা বল্লে, “চুপ হ্যারি—চুপ! কথা বলিস্ না; তা হ’লেই ওরা শুনতে পাবে। একটা দুষ্টু লোক তোকে নিতে এসেছে। কিন্তু তোর মা থাকতে সে নিতে পার্ব্বে না! আয়!”
এই ব’লে হ্যারিকে কোলে নিয়ে, সে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, এবং একটু পরেই টমকাকার কুটীরের কাছে এসে, জানালার সাশীর উপর ঘা দিল।
টম তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল। বাতির আলো মা ও ছেলের মুখের উপর গিয়ে পড়্ল। সময় নষ্ট না ক’রে, ইলাইজা চুপি চুপি ব’ল্তে লাগল, “আমি হ্যারিকে নিয়ে পালাচ্ছি। কর্ত্তা আমার হ্যারিকে ও তোমাকে দুজনকেই বিক্রী ক’রে ফেলেছেন। কর্ত্তা খুব দায়ে ঠেকেই না কি এ কাজ ক’র্তে বাধ্য হয়েছেন। যে লোকটা কিনেছে, সে কাল সকালেই তোমাকে নিতে আস্বে!”
ইলাইজার কথা শুনে ক্লো কাকী চোখ মুছতে মুছতে বল্লে—“ওগো ও বুড়ো, তুমিও কেন পালাও না? এখনো ত সময় আছে। যাও, ইলাইজার সঙ্গেই পালাও। আমি তোমার জিনিস পত্র গুছিয়ে দিচ্ছি!”
টম ধীরে ধীরে মাথা তুলে বল্লে—“না, না, আমি কিছুতেই যাবো না। ইলাইজা যাক্, ওর যাওয়াই উচিত। আমাকে বিক্রী না ক’রলে যদি প্রভুকে বিপদে প’ড়তে হয়, তা হ’লে আমাকে বিক্রী করাই উচিত হয়েছে। মুনিবকে তুমি দোষ দিও না। তিনি তোমাকে আর ঐ ওদের সকলকে বেশ যত্নে রাখ্বেন।” এই ব’লে টম বিছানার দিকে চেয়ে চোখের জল মুছ্লো! সেই বিছানার উপর তার ছেলে মেয়েদের মুখগুলি শুধু দেখা যাচ্ছিল!
তখন ইলাইজা বল্লে, “আমার একটা কথা শোন। আজ বিকেলে আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি ৮।১০ দিনের মধ্যেই পালাবেন। দেখা হ’লে তুমি তাঁকে বলো যে, আমিও পালাচ্ছি। কেনাডায় যেতে চেষ্টা ক’রবো।” তার পর কাঁদ্তে কাঁদ্তে ইলাইজা সেখান থেকে বেরিয়ে প’ড়্লো।
সে রাত্রে মিঃ ও মিসেস্ সেল্বির কাহারও ভাল ঘুম হয় নি। পর দিন তাঁরা বেলা পর্য্যন্ত ঘুমিয়ে ছিলেন। ঘুম থেকে উঠে মিসেস্ সেল্বি বল্লেন—“ইলাইজা এখনো কেন আস্ছে না, তা আমি মোটেই বুঝতে পাচ্ছি না!” ঠিক সেই সময়ে অ্যাণ্ডি নামে একটা চাকর সেখানে উপস্থিত হ’ল। মিসেস্ সেল্বি বল্লেন, “অ্যাণ্ডি, ইলাইজার ঘরে গিয়ে বলে এস যে, আমি এ পর্যন্ত তাকে তিন বার ডেকে পাঠিয়েছি!”
অ্যাণ্ডি যখন ফিরে এল, তখন তার চোখ দুটো যেন বেরিয়ে আস্ছে! সে কপালের উপর চোখ টেনে বল্লে, “সে ঘরে কেউ নেই! ইলাইজার বাক্স একেবারে হাট-খোলা! আর জিনিস পত্র চাদ্দিকে ছড়ান রয়েছে!”
অ্যাণ্ডির কথা শুনে আসল ব্যাপার বুঝতে কাহারো বাকী থাক্ল না। সেই সময় হঠাৎ মিঃ হ্যালি এসে বসার ঘরে ঢুকলেন, এবং লোক জনের কাছে সকল কথা শুনে, চোখ টেনে মাথার উপর তুল্লেন!
মিঃ সেল্বি তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বল্লেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। হ্যারিকে যাতে ফিরে পান, তার জন্য আমি সাধ্যমত চেষ্টা ক’রবো।”
টমের দুর্ভাগ্যের কথা শুনে তার সঙ্গীরা এত দূর দুঃখিত ও বিরক্ত হ’ল যে, তা ব’লে শেষ করা যায় না। যেখানে সেখানে—যার তার মুখে খালি টমের কথা! “স্যাম” নামে মিঃ সেল্বির এক কৃতদাস ছিল, সে ঘোড়ার কাজ ক’র্তো। টমের দুঃখে সেও খুব দুঃখিত হ’য়েছিল, কিন্তু ইলাইজার পালাবার কথা শুনে সে না হেসে থাক্তে পারলে না। সে সেই কথা নিয়ে আমোদ-আহ্লাদ ক’র্ছে, এমন সময় অ্যাণ্ডি এসে বল্লে, “স্যাম, প্রভুর হুকুম, এখনই ঘোড়া সাজিয়ে নিয়ে চলো। ইলাইজাকে খুঁজতে মিঃ হ্যালি এখুনি বের হবেন।” তার পর স্যামের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বল্লে, “গিন্নীমা একটু রয়ে ব’সে যেতে ব’লেছেন। বুঝলে ত?”
দুষ্টুমীর ফন্দী স্যামকে শিখাতে হয় না। সে নানা ওজর আপত্তি দেখিয়ে,অনেকটা সময় কাটিয়ে দিলে। তার পর মিঃ হ্যালির জন্য সব চেয়ে ওঁচা বদ্ ঘোড়া বেছে বের কল্লে। শুধু তাই নয়, সেই পাগলা ঘোড়ার জিনের নিচে, এমন ভাবে একটা কাঁটাফল রেখে দিলে যে, পিঠে চ’ড়তে না চ’ড়তে, সে যেন সার্কাসের ঘোড়ার মত লাফাতে থাকে। কাজেও তাই হ’লো। মিঃ হ্যালি যেই সে ঘোড়ায় চড়েছেন, অমনি তাঁকে খুব জোরে আছাড় দিয়ে, ঘোড়া এক ছুটে কোথায় যে পালিয়ে গেল, তার খোঁজ পাওয়া ভার! স্যামও সেই সুযোগে দে দৌড়!
সে বেলা আর ইলাইজার খোঁজে যাওয়া হ’ল না। মিঃ হ্যালি সেল্বির বাড়ীতেই খাওয়া দাওয়া কল্লেন।