টমকাকার কুটীর/পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
এই ঘটনার দুদিন পরে লিগ্রির বাড়ীর সামনে একখানা গাড়ী এসে থাম্লো। গাড়ীর মধ্যে একটী যুবক ব’সেছিল। লিগ্রিকে দেখ্তে পেয়ে যুবক আস্তে আস্তে নেমে এলো। এই যুবকই আমাদের পরিচিত জর্জ সেল্বি। জর্জের বাবা মারা গেছেন। জর্জ মিস্ ওফেলিয়ার চিঠি পেয়ে টমের খোঁজ ক’রতে এসেছে।
লিগ্রি কাছে এলে জর্জ ব’ল্লে—“আমি জানতে পেরেছি, আপনি টম নামে একটী কৃতদাস কিনেছেন। আমি তারই জন্যে এসেছি। যদি তাকে বিক্রী করেন, আমি যথাসম্ভব বেশী দাম দিতে রাজী আছি।” লিগ্রি ভ্রূ কুঞ্চিত ক’র্লে! কিছুক্ষণ পরে ব’ল্লে—“হাঁ, আমি সেই বদ্মায়েস কুকুরটাকে কিনেছি বটে! আমি এ পর্য্যন্ত যত কাফ্রীকে শাস্তি দিয়েছি, তার মত শাস্তি আর কেউ পায়নি! সে সাধ ক’রে মরণকে ডেকেছে! জানি নে, সে এখনো তার অপরাধ স্বীকার করবে কি না!”
জর্জ জিজ্ঞাসা কল্লে—“সে কোথায় আছে?”
যে লোকটি জর্জের গাড়ীর ঘোড়া ধ’রেছিল, সে বল্লে, “টম ঐ ঘরে আছে।” এই কথা বলাতে, লিগ্রি তাকে একটা লাথি মারলে। কিন্তু জর্জ সে দিকে মন না দিয়ে, তাড়াতাড়ি টমের কাছে গেল। সেখানে গিয়ে জর্জের বীরহৃদয় বেদনায় একেবারে ভ’রে উঠ্লো! ভাবের আবেগে সে টমকে জড়িয়ে ধ’রে ব’লতে লাগলো,—“টমকাকা, সত্যি সত্যিই তোমার এই দশা হয়েছে! একবার চেয়ে দেখ, তোমার স্নেহের জর্জ এসেছে!”
টম চোখ খুলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে ব’লতে লাগলো—“মাষ্টার জর্জ! সত্যিই তুমি মাষ্টার জর্জ? আঃ—! ভগবানকে ধন্যবাদ! আমি এই মাত্র প্রার্থনা ক’র্ছিলাম, যেন তোমরা আমাকে ভুলে না যাও! আমি মনে বড় শান্তি পেলাম! এখন সুখে ম’র্তে পারবো! করুণাময় ঈশ্বর! তোমার জয় হ’ক্!”
“না টমকাকা, আমি তোমায় ম’তে দেব না! তোমায় কিনে নিয়ে যাব ব’লে আমি এসেছি।”
“মাষ্টার জর্জ, আর সে সময় নেই! যিশু আমাকে কিনে ফেলেছেন—এখনই তিনি আমাকে বাড়ী নিয়ে যাবেন! আমার যে দশা দেখ্লে, তা যেন ভুলেও তোমার ক্লো কাকীকে ব’লো না! ব’লো—তারা যেন পরে আমার কাছে আসে! ছেলেমেয়ে ও বাড়ীর অন্য সকলকে আমার ভালবাসা জানিও।”
এই ব’লে টম চোখ বন্ধ ক’র্লে। তার নিশ্বাস খুব ঘন ঘন বইতে লাগ্লো। কিছুক্ষণ পরে সে ব’লে উঠলো—“কে আমাকে যিশুর ভালবাসা থেকে বঞ্চিত ক’রবে?”—এই তার শেষ কথা! টমের অমর আত্মা স্বর্গে চ’লে গেল। ধূলা-মাটীর দেহ ধূলায় লুটাতে লাগ্লো!
জর্জ টমের মৃতদেহের পাশে অনেকক্ষণ ব’সে রইল। তার দুটি চক্ষু দিয়ে ধারা বইতেছিল! আহা! এই স্থানটি কত পবিত্র। অবশেষে সে লিগ্রির কাছে গিয়ে বল্লো, “আপনি যতদূর পেরেছেন ভদ্রতার পরিচয় দিয়েছেন! এখন কত টাকা হ’লে মৃতদেহটা বিক্রী ক’রবেন, জান্তে পারি কি?—আমি গোর দিয়ে যেতে চাই!”
লিগ্রি ব’ল্লে—“আমি কাফ্রীর মৃতদেহ বিক্রী করি না!”
কতকগুলি কাফ্রীছেলে সেখানে দাঁড়িয়েছিল। জর্জ তাদের ডেকে বল্লে—“এই মৃতদেহটি আমার গাড়ীতে তুলে দেও! আর একখানা কোদাল এনে দাও।”
অমনি একজন দৌড়ে কোদাল আন্তে গেল। আর সকলে জর্জের সঙ্গে ধরাধরি ক’রে টমের মৃতদেহ গাড়ীতে উঠিয়ে দিল। জর্জ তাদের সকলকেই বখ্সিস্ দিয়ে খুসি ক’র্লে।
ব্যাপার দেখে লিগ্রি ত অবাক! কিছুক্ষণ পরে সে বিদ্রূপের স্বরে বল্লে,—“সামান্য একটা কাফ্রীর জন্য এতটা বাড়াবাড়ি কেন? এ লোকদেখানো ভালবাসার কোনই দাম নেই!”
জর্জের আর সহ্য হ’লো না! “কাপুরুষ, তুমি এ ভালবাসার কি বুঝ্বে?” এই ব’লে লিগ্রির মুখে ও মাথায় ঘুমির পরে ঘুসি দিয়ে জর্জ তার মনের ঝাল মিটালে! নরাধমের এমন সাহস হ’লো না যে, একটী কথা বলে!
লিগ্রির বাড়ীর সামনেই একটা ফুলের বাগান ছিল। তারই এক পাশে টমের কবর প্রস্তুত হ’ল। সেই কবরে টমের পবিত্র দেহ রাশি রাশি ফুলের মধ্যে ফুলের মতই শোভা ধারণ ক’র্লে!
তার পর জর্জ টমের কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে ব’সে প্রার্থনা ক’র্লে, “হে ভগবান! তুমি সাক্ষী, আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে, ‘এই পৈশাচিক দাসত্ব প্রথা’ রহিত ক’র্তে, একজন মানুষের পক্ষে যতদূর সম্ভব, ততদূর চেষ্টার আমি ত্রুটী ক’রবো না! এই কাজেই জীবন উৎসর্গ ক’র্লাম। প্রভু, তুমি আমার সহায় হও! আমাকে বল দেও!”