টমকাকার কুটীর/পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
ভোরের বেলা চারিদিক শীতের কুয়াসায় ঢেকেছে, দেখ্তে দেখ্তে সে কুয়াসা পরিষ্কার হ’য়ে যাবে! কিন্তু টমকাকার কুটীরখানি যে শোকের কুয়াসায় ঢেকেছে, কে জানে তাহার শেষ কোথায়! ক্লো কাকী সারারাত কেঁদেছে! বেচারীর চোখের জল কিছুতেই বাধা মান্ছে না।
টম তার পাশে ব’সে, হাতের উপর মাথা রেখে, কোলের উপর বাইবেল খানা নিয়ে পড়ছিল। তখন সবেমাত্র ভোর হ’য়েছে। ছেলে মেয়েরা তখনও বিছানায় প’ড়ে ঘুমুচ্ছে। হঠাৎ টম আসন ছেড়ে উঠলো এবং ধীরে ধীরে ঘুমানো ছেলে মেয়েদের বিছানার কাছে গেল। তারপর ব’লে উঠলো, “এই শেষ দেখা!” অমনি ক্লো কাকী আবার হাউ হাউ ক’রে কেঁদে ফেল্লে।
অনেকক্ষণ পরে সকালের জল খাওয়া শেষ হ’লে, টম ছোট খুকিকে কোলের উপর তুলে আদর ক’রতে লাগলো। সে দিব্যি আরামে টমের নাকে মুখে আঁচড় কামড় দিচ্ছে, এমন সময় ছেলেদের একজন ব’লে উঠ্লো, “গিন্নী মা আস্ছেন!”
পর মুহূর্ত্তেই মিসেস্ সেল্বি ঘরে ঢুকলেন। দুঃখে ও ভাবনায় তাঁর মুখ একেবারে ফ্যাকাসে হ’য়ে গেছে! তিনি ব’লতে লাগ্লেন, “টম্, আমি—!” আর ব’ল্তে পারলেন না। হঠাৎ থেমে গিয়ে একটা চেয়ারে বসে কেঁদে ফেললেন। ক্লো কাকী ব’লে উঠ্লো—“ওকি মা, ছিঃ, কেঁদ না।” কিন্তু এই কথা ব’ল্তে ব’ল্তে সেও আর থাকতে পারলে না,—কেঁদে ফেল্লে! কতকক্ষণ ধ’রে সবাই মিলে কাঁদ্তে লাগলো।
অবশেষে মিসেস্ সেল্বি ব’লেন, “টম, আমি টাকার যোগাড় হবামাত্র তোমায় ফিরিয়ে আনবো। যতদিন না তা’ পারি, ততদিন ঈশ্বরের উপর নির্ভর ক’রে কোনরূপে থেকো!”
এমন সময় হঠাৎ এক লাথীতে দরজা খুলে, মিঃ হ্যালি ঘরের মধ্যে ঢুকলেন। তাঁর মেজাজটা তখন বেজায় খারাপ ছিল।
টম তার নূতন মনিবের সঙ্গে যাবার জন্য ধীরে ধীরে উঠে দাড়ালো। ক্লো কাকী খুকিকে কোলে নিয়ে গাড়ী পর্য্যন্ত গেল। অন্যান্য ছেলে মেয়েরাও তার পিছন পিছন চ’ল্লো।
মিঃ হ্যালি টাকে গাড়ীর ভিতর যেতে ব’ল্লেন। টম ভিতরে গেলে, তিনি এক জোড়া বেড়ি নিয়ে টমের পায়ে লাগিয়ে দিলেন। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না ক’রে টম বল্লে, “এ সময় মাষ্টার জর্জের সঙ্গে দেখা হ’ল না, এ দুঃখ আমার চিরকাল থাক্বে! তোমরা তাকে আমার ভালবাসা জানিও।” এই মাষ্টার জর্জ মিঃ সেল্বির একমাত্র ছেলে।
মিঃ হ্যালি খুব জোরে গাড়ী হাঁকিয়ে দিলেন। টম শেষ পর্য্যন্ত এক দৃষ্টিতে বাড়ীর পানে তাকিয়ে রইল। সে দৃষ্টি কি করুণ—কি উদাস—কি ব্যথাভরা! দেখতে দেখতে গাড়ী অদৃশ্য হ’য়ে গেল।
প্রায় এক মাইল যাবার পর, মিঃ হ্যালি এক কামারের দোকানের সাম্নে গাড়ী থামালেন, এবং এক জোড়া হাত-কড়া নিয়ে দোকানের ভিতর ঢুকলেন। তারপর টমের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে, তিনি কামারকে ব’ল্লেন, “এই কড়া দুটো ওর হাতের পক্ষে নেহাৎ ছোট। ঐ হাতে যাতে লাগে, সেই রকম ঠিক ক’রে দেও।”
টম নিতান্ত বিষণ্ণমনে গাড়ীতে বসেছিল। হঠাৎ পিছনে ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনে সে চমকে উঠলো। দেখতে দেখতে জর্জ এসে, গাড়ীতে লাফিয়ে উঠে, দুহাতে টমের গলা জড়িয়ে ধরলে এবং রাগে ও দুঃখে উত্তেজিত হ’য়ে ব’ল্লে, “এ ভয়ানক অন্যায়! আমি যদি বড় হ’তাম, তা হ’লে এরূপ ব্যবহারের প্রতিশোধ না দিয়ে ছাড়তাম না!”
টম করুণস্বরে ব’ল্লে, “জর্জ, তুমি এসেছ, আমার খুব ভাল লাগছে। তোমায় না দেখে যেতে হবে মনে ক’রে, আমার বড়ই কষ্ট হচ্ছিল।”
“দেখ টমকাকা, আমি তোমার জন্য আমার ডলারটা নিয়ে এসেছি।”
টম নিতান্ত বিচলিত হ’য়ে বল্লে, “আমি কিছুতে ওটা নিতে পারি না!”
জর্জ কিন্তু ডলারটা টমের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে ব’ল্লে, “তোমায় নিতেই হবে। এখন বেশ ক’রে জামার বোতামগুলো এঁটে দাও। যতবার ওটা তুমি দেখ্বে, ততবারই আমার কথা তোমার মনে প’ড়বে। মনে রেখো যে, একদিন না একদিন আমি নিশ্চয়ই তোমায় ফিরিয়ে আনতে যাব!”
টম বল্লে, “বেশ! এখন আমার অনুরোধ, তোমায় খুব ভাল ছেলে হ’তে হবে। সব সময় মার কাছে কাছে থেকো। বুঝলে জর্জ, ভগবান অনেক জিনিষই দুইবার দেন, কিন্তু মাকে একবার হারালে আর পাওয়া যায় না। তাই বলছি যে, সব সময় মাকে খুসী ক’রবে। লক্ষ্মী ছেলে আমার!”
জর্জ গম্ভীর ভাবে উত্তর দিল, “হাঁ টমকাকা, আমি খুব চেষ্টা কর্বো!”
এমন সময় মিঃ হ্যালি হাতকড়া নিয়ে ফিরে এলেন।
তখন জর্জ বল্লে, “টমকাকা, তবে বিদায়! কারো কাছে আমাদের গোপন কথা প্রকাশ ক’রো না।”
টম চোখের জল মুছতে মুছতে বল্লে, “বিদায় জর্জ, ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। কেনটাকি সহরে তোমার মত ছেলে আর পাওয়া শক্ত।” পরিপূর্ণ হৃদয় নিয়ে টম অতি ধীরে ধীরে এই কথা কটি বল্লে। ততক্ষণে জর্জের কোমল মুখখানি অদৃশ্য প্রায় হ’য়ে গিয়েছে। যতক্ষণ তাকে একটুকুও দেখা গেল, যতক্ষণ তার ঘোড়ার খুরের একটু শব্দও শুনতে পাওয়া গেল, ততক্ষণ টম সেই দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল! পর বিষাদের একখানা কাল মেঘে তার সমস্ত আশা ভরসা, সুখ শান্তি ঢাকা প’ড়্লো! কিন্তু টমের বুকের উপর একটি স্থান যেন জুড়িয়ে যাচ্ছিল! জর্জের অমূল্য দান—সেই ডলারটি সেখানে ঝুলছিল!