বিষয়বস্তুতে চলুন

টমকাকার কুটীর/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

টমকাকার কুটীর

প্রথম পরিচ্ছেদ

মাঘ মাস, কন্‌কনে ঠাণ্ডা। একদিন বিকাল বেলা কেন্‌টাকি সহরের এক বাড়ীতে দুজন ভদ্রলোক ব’সে ছিলেন। তাঁদের এক জন খুব বেঁটে, তাঁর নাম মিঃ হ্যালি। হ্যালির চেহারাটা বড়ই রুক্ষ্ম। তাঁহার সঙ্গী অন্য ভদ্রলোকটির নাম মিঃ সেল্‌বি। সেল্‌বির চেহারা বেশ ভদ্রলোকেরই মত।

 মিঃ সেল্‌বি ব’ল্‌লেন—“তবে এই কথাই ঠিক হলো। টম যে রকম পাকা লোক, তার এ দাম সামান্যই ব’ল্‌তে হবে।”

 মিঃ হ্যালি। “আচ্ছা, টমের সঙ্গে ফাউ দিতে পারেন, এমন একটা ছেলে বা মেয়ে কি আপনার নেই?”

 “না, তেমন কাকেও দেখছি না।”

 ঠিক এই সময় সেই ঘরের দরজাটা আস্তে আস্তে খুলে গেল, আর চার পাঁচ বছরের একটি ছোট ছেলে ভিতরে ঢুকলো। তার নাম জিম্ ক্রো—ডাকনাম হ্যারি। তাকে আস্‌তে দেখে মিঃ সেল্‌বি এক থোলো কিসমিস ছুড়ে দিয়ে বল্লেন—“জিম্, ঐগুলো কুড়িয়ে খাও।”

 জিম্ তাড়াতাড়ি সেগুলি কুড়িয়ে নিল। সব খাওয়া হয়ে গেলে, মিঃ সেল্‌বি তাকে আবার বল্লেন—“জিম, তুমি কেমন নাচতে পার, এই ভদ্রলোকটিকে একবার দেখাও দেখি!”

 জিম্ অমনি একটা গান গাইতে গাইতে, হাত-পা দুলিয়ে নাচতে লাগলো। নাচ গান শেষ হ’লে, মিঃ হ্যালি বল্লেন, “মিঃ সেল্‌বি, এই ছেলেটাকে টমের সঙ্গে দিন। তা হ’লেই আমি সব ঠিক ক’রে ফেলি।”

 এইরূপ কথা হচ্ছে, এমন সময় একটি স্ত্রীলোক সেই ঘরে এসে ঢুক্‌লো। সে জিমের মা। তাকে দেখে মিঃ সেল্‌বি বল্লেন—“কি ইলাইজা, কি চাও?” ইলাইজা ব’লে—“আমি হ্যারিকে খুঁজতে এসেছি।”

 “আচ্ছা, ওকে নিয়ে যাও।”

 তারা চলে গেলে, মিঃ হ্যালি বল্লেন—“এই ত আর একজন। একে বিক্রী করুন না।—এর জন্যে কত চান, বলুন?”

 “না মিঃ হ্যালি, একে বিক্রী করা হবে না।”

 “আচ্ছা, তা’ না হোক, ছেলেটাকে তো পাব?”

 “সে কথা আমি পরে ভেবে দেখ্‌বো। আপনি সন্ধ্যার পর আমার সঙ্গে দেখা ক’র‍্‌বেন।”

 মিঃ হ্যালি তখন নমস্কার ক’রে চ’লে গেলেন।

 ইলাইজা যখন জিম্‌কে নিয়ে ঘর থেকে বের হ’য়ে আসে, তখন মিঃ সেল্‌বির ও হ্যালির কথাবার্ত্তা কিছু কিছু শুন‍্তে পেয়েছিল। সে ভাবতে লাগ‍্লো, ঐ লোকটি কে? কা’কে বিক্রী করবার কথা হচ্ছিল? তবে কি এবার আমারই কপাল পুড়‍্লো! ও কি আমার জিম্‌কে কিন‍্তে চায়? এই কথা সে যতই ভাবে, ততই বেচারীর বুক ধড়্‌ফড়্‌ করে! আর চোখ দিয়ে ততই জল ঝ’রতে থাকে!

 তাকে দেখে মিসেস্ সেল্‌বি জিজ্ঞেস্ ক’রলেন—“কি ইলাইজা, তোর আজ কি হ’য়েছে? তোকে আজ এমন কাঁদ-কাঁদ দেখাচ্চে কেন?”

 ইলাইজা বল্লে—“আচ্ছা মা, আপনার কি মনে হয় যে, কর্ত্তা আমার হ্যারিকে বিক্রী ক’রে ফেল্‌বেন?”

 “হ্যারিকে বিক্রী ক’রে ফেল্‌বেন! দূর বোকা মেয়ে! তুই একেবারে ক্ষেপে গেছিস্! কর্ত্তা কখনো এমন কাজ কর্ব্বেন না!”

 মিসেস্ সেল্‌বির কথায় ইলাইজার মনে সাহস এল বটে, কিন্তু তার ভয় একেবারে ঘুচ‍্লো না। যা হ’ক, সে কাজ কর্ম্মে মন দিতে চেষ্টা ক’র্‌লে।

 ইলাইজা খুব ছেলেবেলা থেকেই মিসেস্ সেল্‌বির কাছে আছে। তিনি তাকে আদর যত্নে মানুষ ক’রে এখন তার বিয়ে দিয়েছেন। ইলাইজার স্বামীর নাম জর্জ। জর্জ পাশের গ্রামে এক পাটের কলে কাজ করে। তার প্রভুর নাম হ্যারিস। এই হ্যারিসের অত্যাচারে তার দাসদাসীগণ একেবারে জ্বালাতন হ’য়ে উঠেছিল। জর্জ যে অত ভাল লোক, প্রভুর অন্যায় অত্যাচার তার পক্ষেও অসহ্য বোধ হ’তে লাগলো।

 সেই দিন সন্ধ্যাবেলা মিসেস্ সেল্‌বি বেড়াতে বের হ’য়েছেন। ইলাইজা একলা অন্যমনস্ক ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময়, হঠাৎ কে যেন তার কাঁধের উপর হাত দিলে। ইলাইজা চমকে উঠে পিছন ফিরে বলে—“কে? জর্জ! এস, গিন্নী মা বেড়াতে গিয়েছেন। তুমি আমার ঘরে ব’স্‌বে এস।” এই ব’লে, সে জর্জকে তার ঝক্‌ঝকে পরিষ্কার ছোট ঘরখানির মধ্যে নিয়ে গেল। এই খানে প্রায়ই সে ব’সে ব’সে সেলাই করে। সেখানে গিয়ে ব’ল‍্লে — “তোমায় দেখে আমি যে কত খুসি হয়েছি, তা আর কি বলবো! কিন্তু তোমাকে ত সুখী বোধ হচ্ছে না! তোমার কি হয়েছে? ঐ দেখ দেখি, হ্যারি কেমন বড় হয়েছে!—কেমন সুন্দর, না?”

 জর্জ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বল্লে— “এর চেয়ে হ্যারি যদি মোটেই না জন্মাত!”

 এই কথা শুনে, ভয়ে দুঃখে ইলাইজা একেবারে কেঁদে ফেল্লে। জর্জ বল্লে—“সত্যি ইলাইজা, এ সমস্তই বড় দুঃখের বিষয়। আমার মত হতভাগা গরীব ক্রীতদাসের বেঁচে থাকার চেয়ে, মরে যাওয়াই ভাল। হায়, হায়, আমি যদি মরে যেতে পার্ত্তাম!”

 “ছিঃ জর্জ, অমন কথা ব’লো না। তোমার প্রভু অত্যন্ত খারাপ লোক তা জানি, কিন্তু কি ক’র‍্বে! স্থির হয়ে সব সহ্য ক’রো।”

 “আমি অনেক কাল থেকেই স্থির হয়ে সব সহ্য ক’রে আস্‌ছি। কিন্তু রক্ত মাংসের শরীরে আর সহ্য ক’র‍্তে পারা যায় না। হায়, কে এই লোকটাকে আমার প্রভু ক’রে সৃষ্টি ক’রেছিল, সেইটা আমার বড় জান্‌তে ইচ্ছা করে!”

 “তুমি কি ক’র্ত্তে চাও? ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রেখে যা ভাল, যা ঠিক, তাই ক’রে যাও, তিনিই তোমাকে রক্ষা ক’রবেন।”

 “কষ্টে কষ্টে আমার মন একেবারে দমে গেছে। আমি আর ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রাখতে পারছি না!—হতভাগা বলে কি না, নীনাকে বিয়ে ক’র্‌তে হবে! তা না হ’লে, আমাকে আর এদেশে রাখ্‌বে না, নদীর ওপারের ঐ মুল্লুকে বিক্রী ক’রে ফেল‍্বে!”

 “সে কি, পুরোহিতেরা যে রীতিমত আমার সঙ্গে তোমার বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন!”

 “ইলাইজা, তুমি কি জান না যে, ক্রীতদাসের বিয়ের কোনই মূল্য নাই?—সে কথা যাক্, এখন সব কষ্ট সহ্য ক’রে আমাকে বিদায় দেও। আমি এখন যাচ্ছি।”

 “যাচ্ছ! কোথায় যাচ্ছ?”

 “কেনাডায় যাচ্ছি। সেখানে যদি একবার যেতে পারি, তা হ’লে আমি তোমাকে ও হ্যারিকে—দুজনকেই কিনে নিয়ে যাবো। আট দশ দিনের মধ্যেই আমি পালাবো। ইলাইজা, তুমি আমার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা ক’রো।”

 “জর্জ, তুমি নিজে প্রার্থনা ক’রে—তাঁর উপর বিশ্বাস রেখে যেও!”

 তখন জর্জ ইলাইজার হাত ধরে আদর ক’রে বল্লে, “এখন তা হ’লে বিদায়!” তারপর দুজনে কাঁদতে লাগলো! শেষে স্বামী-স্ত্রী দুজনে দুজনার কাছ থেকে বিদায় নিল। জর্জ হ্যারিকে চুমো দিয়ে চলে গেল!