টমকাকার কুটীর/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
প্রায় সমুদ্রের মতই চওড়া “মিসিসিপি” নদীর উপর অস্তগামী সূর্য্যের লাল আভা পড়েছে। পাড়ের বেতগাছগুলি বাতাসে কাঁপছে। সেই সকল বেতগাছ ও বড় বড় সাইপ্রেস্ গাছগুলি সোনালি আভায় চক্ চক্ ক’রছে। এমন সময় একখানি ষ্টীমার নদী দিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। এই ষ্টীমারেই আমাদের টম আছে। লোকের ভিড়ের মধ্যে টমকে খুঁজে বের করা সহজ নয়। উপর তলায় এক গাদা তুলোর পাশে ব’সে, টম আপন মনে বাইবেল পাঠ করছে। এমনি সে রোজই পড়ে।
ষ্টীমারে অন্যান্য আরোহীদের মধ্যে অল্পবয়স্ক একটি ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি বেশ ধনী। তাঁর নাম “সেণ্ট্ ক্লেয়ার।” ভদ্রলোকটির সঙ্গে তাঁর পাঁচ ছয় বছরের একটি মেয়ে ও আর একজন মহিলা ছিলেন। টম প্রায়ই এই ছোট মেয়েটিকে দেখতে পেত। ক্রমে তাদের দুজনের মধ্যে বেশ ভাব হ’য়ে গেল।
টম একদিন তাকে জিজ্ঞেস্ ক’রলে, “তোমার নাম কি, মা?”
মেয়েটি বল্লে,—“আমার নাম ‘ইভানজেলিন্ সেণ্ট্ ক্লেয়ার।’ তবে মা বাবা আমায় ‘ইভা’ ব’লে ডাকেন। এখন তোমার নাম কি আমায় বল?”
“আমার নাম টম। কেনটাকি সহরে যেখানে আমি থাকতাম, সব ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা আমায় টমকাকা ব’লে ডাকতো।”
“তা’ হলে আমিও তোমায় টমকাকা ব’লে ডাকবো। তোমাকে আমার বেশ ভাল লাগে!”
কাট সংগ্রহের জন্য ষ্টীমার একটা ছোট ঘাটে এসে লেগেছে। ইভা এতক্ষণ টমের কাছেই ছিল, হঠাৎ তার বাবার গলা শুনতে পেয়ে, তাঁর কাছে ছুটে গেল এবং রেলিংএর ধারে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ষ্টীমার ছাড়া দেখতে লাগলো। এমন সময়, হঠাৎ কি যেন একটা ধাক্কা লেগে, ষ্টীমার যেই একটু কেঁপে উঠেছে, অমনি, ভাব্লেও গা কাঁপে, ইভা তাল সাম্লাতে না পেরে, একেবারে উল্টে জলের মধ্যে পড়ে গেল! সেণ্ট্ ক্লেয়ার পাগলের মত হ’য়ে গেলেন! জাহাজে মহা হাহাকার প’ড়ে গেল! ইভা ত ডুবেছিই, তার বাবাকেও ধরে রাখা দায় হ’ল! টম তখন নিচের তলায় ছিল। সে ইভাকে পড়তে দেখেই, তার পিছন পিছন ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাকে কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে ষ্টীমারের কাছে এল। মৃত্যুর গ্রাস থেকে মেয়েকে ফিরিয়ে পেয়ে, সেণ্ট্ ক্লেয়ারের আনন্দ দেখে কে? ইভাকে বুকে জড়িয়ে তিনি সজল নেত্রে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে লাগলেন।
টমের এই মহৎ কাজে সকলেই আশ্চর্য্য হ’লো। শত মুখে তখন টমের প্রশংসা! অবশেষে সেণ্ট্ ক্লেয়ার টমকে আলিঙ্গন ক’রে হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানালেন।
পরদিন ষ্টীমারখানা নিউ অর্লেন্সের কাছে উপস্থিত হ’লো। টম দেখলে, ষ্টীমারের এক পাশে ইভা, তার বাবা ও মিঃ হ্যালি কি যেন পরামর্শ কচ্ছেন। পরামর্শ আর কিছু নয়, মিঃ হ্যালি টমকে বিক্রী ক’বার জন্য তার গুণের বিস্তর প্রশংসা কচ্ছিলেন। ইভার বাবা তাই শুনছিলেন।
মিঃ হ্যালি বল্লেন—“এই টম তার পূর্ব্ব মনিবের কাজ কার্বার সব একাই দেখ্তো। এর জন্য আমি ১৩০০ ডলার চাই!”
ইভা চুপি চুপি তার বাবাকে বল্লে, “যা টাকা লাগে, লাগুক। তুমি টমকে কেন! আমি ওকে সুখী দেখ্তে চাই।”
এক তাড়া নোট বে’র ক’রতে করতে ইভার বাবা বললেন—“কারণটা খুবই নূতন রকম ব’ল্তে হবে!” তারপর মিঃ হ্যালির হাতে নোটগুলো দিয়ে বললেন, “ভাল ক’রে গুণে দেখুন।”
আনন্দে মিঃ হ্যালির মুখে হাসি ফুটে উঠলো। তিনি নোট গুণে নিয়ে ব’ল্লেন, “ঠিক আছে।”
তার পর সেণ্ট্ ক্লেয়ার ইভাকে নিয়ে ষ্টীমারের অন্য ধারে—টমের কাছে এসে দাঁড়ালেন এবং টমের চিবুক ধ’রে আদর ক’রে ব’লেন, “টম চেয়ে দেখদেখি, তোমার নূতন মনিবকে কেমন লাগে!”
টম তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলে, “কর্ত্তা, ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন!”
অগষ্টিন্ সেণ্ট্ ক্লেয়ারের স্ত্রী অতিশয় রুগ্ন ছিলেন। তাঁর একমাত্র মেয়ে ইভার শরীরও তত ভাল ছিল না। ইভার স্বাস্থ্যের জন্যই তিনি তাকে নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন, এবং তার সেবা-শুশ্রূষার জন্য আপনার খুড়তুতো বোন মিস্ অফেলিয়াকেও সঙ্গে নিয়েছিলেন। এই ষ্টীমারেই এখন তাঁরা বাড়ী ফিরছেন।
ষ্টীমারখানা ক্রমে নিউ অর্লেন্সের ঘাটে পৌঁছল। উঠা-নামার গোলমাল একটু কমিলে, সেণ্ট্ ক্লেয়ার গাড়ীতে উঠলেন।
ইভা জিজ্ঞাসা ক’রলে, “টম কোথায়?”
তার বাবা ব’লেন—“সে বাইরে বসেছে। আমি আগেই তাকে তোমার মার কাছে নিয়ে যাব। টমের গুণের কথা শুনলে তিনি নিশ্চয় খুসী হ’বেন।
গাড়ীখানা প্রকাণ্ড একটা ফটক পার হ’য়ে, সেকেলে ধরণের এক মস্ত বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালো। ইভা তাড়াতাড়ি নেমে, আনন্দে অধীর হ’য়ে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকলো। সেখানে খাটের উপর একজন মহিলা শুয়েছিলেন। তিনি ধীরে ধীরে অল্প একটু উঠে ব’লেন। ইভা “মা মা” ব’লে তাঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
তার পর ইভা সবেমাত্র টমের কথা ব’ল্তে যাচ্ছে, এমন সময় সেণ্ট্ ক্লেয়ার সেই ঘরে এলেন এবং নানা কথাবার্তার পর টমকে ডেকে পাঠালেন। টম নিকটে এলে, সেণ্ট্ ক্লেয়ার তাঁর স্ত্রীকে ব’ল্লেন, “দেখ মেরী, তোমার জন্য কেমন ভাল একজন কোচম্যান এনেছি।”
মেরী টমকে বেশ ক’রে দেখে বলেন, “আশা করি এ ভাল হবে!”
“এ যে ভাল হবে, তাতে আর সন্দেহ কি? আজ যে ইভাকে ফিরিয়ে পেলে, সে কেবল এই টমেরই গুণে!” এই ব’লে সেণ্ট্ ক্লেয়ার ![]()
ইভা টমের গলায় গোলাপ ফুলের মালা পরাইয়া দিল।—৩৩ পৃষ্ঠা। ইভার হঠাৎ জলে প’ড়ে যাওয়া, এবং ভগবানের কৃপায় টমের সাহায্যে রক্ষা পাওয়ার কথা বর্ণনা করলেন। তারপর দরজার বাইরে এসে, তিনি বাড়ীর পুরান দাসদাসীদের ডাক্লেন। তারা নিকটে এলে, সকলের কুশল জিজ্ঞাসা ক’রে ও সস্নেহ ব্যবহারে সকলকে আপ্যায়িত ক’রে আপনার মহৎ হৃদয়ের পরিচয় দিলেন।
ইহার কিছুদিন পরে, একদিন সকলে উপরের বারান্দায় ব’সে আছেন, এমন সময় উঠানে একটা অট্টহাস্য প’ড়ে গেল। সেণ্ট্ ক্লেয়ার পরদা সরিয়ে সেই দিকে তাকালেন। অমনি তিনিও হাস্তে লাগ্লেন। মিস্ ওফেলিয়া বারান্দার রেলিংএর ধারে এসে জিজ্ঞাসা ক’র্লেন, “কি হ’য়েছে?”
উঠানের এক জায়গায় ঘাসের উপর টম ব’সে আছে। ইভা এক ছড়া গোলাপ ফুলের মালা নিয়ে হাস্তে হাস্তে তার গলায় জড়িয়ে দিলে। তার পর টমের হাঁটুর উপর ব’সে, হাস্তে হাস্তে ব’ল্লে, “টমকাকা, তোমাকে কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে!”
তার এই ছোট্ট মনিবটির খেলা টমের বেশ ভাল লাগছিল। সেও ইভার সঙ্গে প্রাণ ভ’রে হেসে উঠলো!
এ খেলা শেষ হ’লে, ইভা টমকে নিয়ে আর একদিকে গেল। তাকে টমের হাত ধ’রে নাচতে নাচতে যেতে দেখে, সেণ্ট্ ক্লেয়ার বল্লেন—“ছেলে পিলে না পেলে গরীব দুঃখীরা কি নিয়ে থাক্তো! ইভার চোখে টম একজন অসাধারণ লোক। টমের গল্পে সে মোহিত। টমের গান ও স্তবগুলি ইভার কাছে অপেরার গানের চেয়েও মিষ্টি। ইভার বিশ্বাস, কাফ্রীদের মধ্যে টমের মত এমন লোক আর কখনো জন্মেনি!”
পরের রবিবার সকালে মেরী ও মিস্ ওফেলিয়া গির্জ্জায় যাবার জন্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। মেরী জিজ্ঞাসা করলেন, “ইভা কোথায়?”
মিস্ ওফেলিয়া উত্তর দিলেন—“সে ম্যামীকে (ম্যামী একজন কৃতদাসী, ইভার বিশেষ প্রিয়) কি যেন বলবার জন্যে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে।”
এই সময় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ইভা ও ম্যামী দুইজনে খুব কথাবার্ত্তা হ’চ্ছিল। ইভা ব’ল্লে— “ম্যামী, আমি বুঝতে পারছি, তোমার মাথা খুব ব্যথা করছে।”
“হাঁ, আজকাল আমার এ রকম প্রায়ই হ’য়ে থাকে।”
“তুমি যে বেড়াতে যাচ্ছ এটা বেশ ভালই। আমার এই ওষুধের কোঁটাটি সঙ্গে নিয়ে যাও।”
“কি, ওই পাথরবসান সোণার কৌটাটি! ওটা আমার কখনই নেওয়া উচিত নয়।
“কেন! উচিত নয় কেন? তোমার ওটা দরকার—আমার তো আর দরকার নেই!”
ম্যামী ব’ল্লে—“শোন, আমাদের পাগলীর কথাটা একবার শোন!”
হঠাৎ ইভা সেই কৌটাটি ম্যামীর কাপড়ের মধ্যে গুঁজে দিয়ে, এক দৌড়ে মায়ের কাছে চ’লে গেল। তার মা জিজ্ঞাসা ক’রলেন—“এতক্ষণ কি ক’র্ছিলে?”
“ম্যামীকে আমার ওষুধের কৌটাটি দিয়ে এলাম। সে সেটা গির্জ্জায় নিয়ে যাবে।”
“কি!—যাও, এখনই সেটা ফিরিয়ে নিয়ে এস!”
সেণ্ট্ ক্লেয়ার বল্লেন— “মেরী, ইভাকে কিছু ব’লো না। ওকে ওর ইচ্ছামত কাজ ক’রতে দাও।—ইভা, তুমি কি গির্জ্জায় যেতে চাও? চল না, বাড়ীতে ব’সে আমরা দুজনে খেলা করিগে!”
“না বাবা, আমি গির্জ্জাতেই যাবো। ঈশ্বর চান যে, আমরা সকলে তাঁর উপাসনার জন্যে গির্জ্জায় যাই।”
“আচ্ছা মা, তাই যাও, আমার জন্যে প্রার্থনা করো।”
“তা বাবা আমি সব সময়ই ক’রে থাকি।” এই ব’লে সে গাড়ীতে মা’র পাশে গিয়ে ব’স্লো।