টমকাকার কুটীর/ষোড়শ পরিচ্ছেদ
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
জর্জ সেল্বি বাড়ী আস্বার দিন ঠিক ক’রে পূর্ব্বেই মায়ের কাছে চিঠি লিখেছিল। সন্ধ্যার পর মিসেস্ সেল্বি ঘরে ব’সে আছেন, ক্লো খাবার এনে দিয়ে জিজ্ঞাসা ক’র্লে, “মাষ্টার জর্জ চিঠি লিখেছে না? আমার বড়োর কথা কিছু লিখেছে কি?”
“না, কিছুই লেখেনি।”
“আমার বোধ হয়, ছেলেমেয়েদের কথা তার আর মনে নেই!”
এই সময় দরজায় গাড়ীর শব্দ শুনা গেল। মিসেস্ সেল্বি ছুটে বাইরে গেলেন। ক্লো যেতে যেতে হঠাৎ কি ভেবে থমকে দাঁড়ালে! তাকে দেখ্বামাত্র জর্জ তাড়াতাড়ি নেমে এসে আবেগ ভরে ব’ল্তে লাগলো—“আমার সমস্ত সম্পত্তির বদলে যদি টমকাকাকে ফিরিয়ে আনতে পারতাম, তবে তাহা সৌভাগ্য ব’লেই মনে করতাম, কিন্তু তিনি এখন যে লোকে বাস করছেন, সেখান থেকে কাকেও ফিরিয়ে আনা যায় না!”
ক্লো কিছুই ব’ল্লে না। বেচারী আস্তে আস্তে অন্ধকারের মধ্যে লুকাতে চেষ্টা ক’র্লে। মিসেস্ সেল্বি অমনি তার হাত ধ’রে একখানা চেয়ারে নিয়ে বসালেন, এবং নিজেও তার পাশেই ব’স্লেন। ঘরে আলো জ্বলছিল, কিন্তু তবুও যেন সমস্ত ঘরখানি গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা! কারু মুখে একটু সাড়া শব্দও নেই!
কিছুক্ষণ পরে জর্জ টমের শেষ অবস্থার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ ক’রে, অবশেষে উৎসাহের সঙ্গে ব’লে উঠলো—“টমকাকা ভীরু ছিলেন না, মৃত্যুকে তিনি ভয় করেন নি! সে সময় বিশুর পবিত্র আলোকে তাঁর সর্ব্বাঙ্গ উজ্জ্বল হ’য়ে উঠেছিল! ক্ষমার দ্বারা অত্যাচারীর দর্প চূর্ণ ক’রে এবং প্রেমের দ্বারা সকলের হৃদয়কে জয় ক’রে, তিনি হাস্তে হাস্তে স্বর্গে চলে গেছেন!”
টমের বীরত্বের কাহিনী শুনে মিসেস্ সেল্বি মনে মনে গর্ব্ব অনুভব ক’রতে লাগলেন। ক্লো কাকী অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও যেন সান্ত্বনা লাভ ক’রলে!
এই ঘটনার প্রায় এক মাস পরে একদিন জর্জ সমুদায় দাসদাসীগণকে এক জায়গায় জড় হ’তে বলে। তারা একত্র হ’লে, জর্জ কতকগুলি কাগজপত্র হাতে নিয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ব’লতে লাগলো, “আজ তোমাদের একটা সুখের কথা বল্বো। এই যে কাগজপত্র দেখ্চো, এগুলি তোমাদের মুক্তির হুকুম-নামা। মানুষ হ’য়ে জন্মেও এতদিন যে অধিকার পাও নি, আজ তোমাদের সেই অধিকার দিলাম। তোমরা সকলেই স্বাধীন হ’লে। যে জঘন্য ব্যবসায়ে মানুষ পশুর চেয়েও অধম হ’য়ে যায়, আমাদের পরিবারকে আর তাহা কলঙ্কিত ক’র্বে না। এজন্য তোমরা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দাও!”
জর্জের কথা শুনে সকলে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি ক’রতে লাগ্লো। কেউ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস ক’র্তে পার্লে না! যা স্বপ্নেরও অগোচর, তা কি সত্য হ’তে পারে! তাদের মনের ভাব বুঝতে জর্জের বাকী থাকলো না। তাই জর্জ হুকুম-নামার কথা আবার পরিষ্কার ক’রে বুঝিয়ে দিলে।
তখন চারিদিকে এক আশ্চর্য ভাবের তরঙ্গ উঠলো। কেউ কেউ কেঁদে ফেল্লে! কেউ কেউ উল্লাসে নাচতে লাগলো! আবার কেউ কেউ বা বিষণ্ণ ভাবে ব’লে উঠলো, “কি দোষে আমাদের তাড়িয়ে দিতে চান?”
জর্জ বল্লে, “তোমরা ভুল বুঝ না। তোমাদের কাকেও এই জায়গা ছেড়ে যেতে হবে না। আজ থেকে তোমরা যে কাজ কর্বে, তার উপযুক্ত বেতন পাবে। যদি আমি মারা যাই কিংবা দেনায় পড়ি তা হ’লে কেহই আর তোমাদের বিক্রী কর্তে পার্বে না।”
জর্জের মুখের কথা দাসদাসীগণের প্রাণে যেন অমৃত বর্ষণ ক’রতে লাগলো! একটা বুড়ো কাফ্রী কাঁপ্তে কাঁপ্তে উঠে বল্লে, “এস আমরা সেই মুক্তিদাতা ভগবানকে ধন্যবাদ দিই! তাঁহারই কৃপায় আজ আমাদের মনুষ্য জন্ম সফল হলো!”
কৃতজ্ঞতার প্রবল উচ্ছ্বাস কমে এলে, জর্জ বল্লে, “টমকাকার কথা নিশ্চয়ই তোমাদের মনে আছে। কয়েক দিন হ’লো তিনি স্বর্গে চলে গেছেন। তাঁরই কবরের পাশে বসে ঈশ্বরের নামে আমি এই প্রতিজ্ঞা করেছি যে, আর কখনো কৃতদাস রাখ্বো না এবং এই নিষ্ঠুর প্রথা দেশ থেকে দূর ক’রে দিতে সাধ্যমত চেষ্টা ক’র্বো। আজ যে তোমরা স্বাধীন হ’লে, এ শুধু টমকাকারই জন্য—এ কথা কখনো ভুলো না। তোমাদের এই সুখ ও আনন্দের দিনে সকলে তাঁর পবিত্র নামে জয়ধ্বনি ক’রে ধন্য হও। যখনি তাঁর কুটীরখানি দেখ্বে, তখনি ভেবো, ‘টমকাকার জন্যই তোমরা মুক্তি পেয়েছ’ এবং তখনি ঈশ্বরের চরণে প্রণতঃ হ’য়ে তাঁর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা ক’রো।”
জর্জের কথা শেষ হ’লে, চারিদিক আনন্দ-কোলাহলে পূর্ণ হলো! এমন আনন্দ বুঝি বা স্বর্গেও দুর্লভ!