টল্স্টয়ের গল্প/আগুনের ফুল্কি
আগুনের ফুল্কি
আইভান একজন কৃষক। সে ছিল বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে। বয়সের কালে গ্রামে সকলের চেয়ে ভাল কাজ করিতে পারিত। তার তিন ছেলে; সকলেই কাজের যোগ্য। বড় ছেলের বিবাহ হইয়াছে, মেজো ছেলেরও বিবাহ হইবার সময় হইয়াছে, আর ছোট ছেলে ঘোড়া রাখিতে আর চাষ করিতে আরম্ভ করিয়াছে। আইভানের স্ত্রী খুব পাকা গিন্নী, পুত্রবধূও খুব পরিশ্রমী, শান্ত-শিষ্ট। সব রকমেই আইভান খুব সুখে ছিল।
তাদের কেবল একটি অকর্ম্মণ্য লোককে খাওয়াইতে হইত, সে হচ্ছে আইভানের বৃদ্ধ পিতা, সে হাঁপানি রোগে সাত বছর ক্রমাগত ভুগিয়া ভুগিয়া শয্যাগত। যা কিছু দরকার আইভানের সবই ছিল—গরু, ভেড়া, ঘোড়া। বেটা ছেলেরা জমি চাষ করিত, আর মেয়েরা ঘরের দরকারের সব কাপড়-চোপড় তৈয়ারী করিত। যে ফসল তাদের এক বছরে জন্মাইত তাতে দুই বৎসর চলিয়া যাইত, তা ছাড়া বাকি ফসল বিক্রী করিয়া টেক্স, খাজনা প্রভৃতি শোধ করিত, আর আর আবশ্যকীয় দ্রব্য সে কিনিত। আইভান বেশ সুখেই ছিল, কিন্তু গর্ভীর পুত্র লিম্পিঙের সঙ্গে ঝগড়া থাকায় তার সুখের মধ্যেও একটা অসুখের সৃষ্টি হইয়াছিল।
যতদিন বৃদ্ধ গর্ভী জীবিত ছিল এবং আইভানের পিতা সংসারের কাজকর্ম্ম করিতে পারিত, ততদিন এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বেশ সদ্ভাব ছিল। হয়ত এক বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা একখানা চালুনি কিংবা একটা গাম্লা অন্য বাড়ী থেকে যখন দরকার তখনই পাইত; হঠাৎ গরুর গাড়ীর ঢাকা ভাঙ্গিয়া গেলে যার থাকিত সে-ই অন্যকে পাঠাইয়া দিত। জমিতে গরু ঢুকিলে তাড়াইয়া দিত, আর মাঝে মাঝে বলিত—“গরু ছেড়ে দিও না, আমাদের গম র’য়েছে।” গোলাবাড়ী তালা বন্ধ করিয়া রাখা, একজনের জিনিষ অন্যকে দেখিতে না দেওয়া, লুকাইয়া রাখা অথবা অসাক্ষাতে নিন্দা করা প্রভৃতি তখন একেবারেই ছিল না।
কিন্তু ছেলেরা যখন সংসারের কর্ত্তা হইল তখন সব বদ্লাইয়া গেল, সামান্য ব্যাপার লইয়াই প্রথমে ঝগড়া বাধিল।
আইভানের পুত্রবধূর একটা মুরগী ছিল, সে রোজ ডিম পাড়িত। একদিন মুরগীটা ছেলেদের তাড়া খাইয়া অন্য এক জায়গায় ডিম পাড়িল। কিন্তু আইভানের পুত্রবধূ ভাবিল, ‘এখন আর সময় নেই, পরে গিয়ে নিয়ে আস্ব এখন।’ সন্ধ্যার সময় আনিতে গিয়া আর ডিম পাইল না। শাশুড়ী, দেওর প্রভৃতি বাড়ীর সকলকেই জিজ্ঞাসা করিল, কেহই নেয় নাই। শুনিল যে প্রতিবেশীর জায়গায় ডিম পাড়িয়াছে। কারণ মুরগীটা সেখান থেকে বেড়া ডিঙ্গাইয়া পলাইয়া আসিয়াছে।
সেখানে সে গেল। লিম্পিঙের মা বাহির হইয়া আসিল, জিজ্ঞাসা করিল—“কি চাই, বৌ?”
—“এই যে আজকে সকালবেলা আমার মুরগীটা এখানে পালিয়ে এসেছিল; এখানে কি ডিম পাড়ে নি?”
“—কি জানি, কিছুই দেখি নি। আমাদের নিজেদের মুরগীরই ডিম হচ্ছে, পরের ডিম নেবার দরকার আমাদের নেই। আমরা পরের ডিম খুঁজে বেড়াইনে।”
আইভানের পুত্রবধূ একটু চটিল, খুব কড়া কড়া কথা বলিল। এমনি ভাবে দুইজনে খুব ঝগড়া বাধিয়া গেল। আইভানের স্ত্রী সে সময়ে জল আনিতে যাইতেছিল, সেও ঝগড়ায় যোগ দিল। লিম্পিঙের স্ত্রীও সবেগে ঘর হইতে বাহির হইয়া জানা-অজানা অনেক কথাই বলিল। সকলে একত্র হইয়া শেষে চীৎকার আর কেবল গালাগালি আরম্ভ করিয়া দিল। কেবল “তুই চোর”, “তুই পাজির বেহদ্দ”, “তুই বেয়াক্কেল, শ্বশুরকে খেতে না দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলছিস”, “সেদিন আমাদের চালুনিটা নিয়ে একটা ছেঁদা ক’রে দিয়েছিস্”, “আমাদের জোয়াল নিয়ে এখনও চাষ কর্ছিস্”—ইত্যাদি নানারকম গালি-বর্ষণ উভয় পক্ষেই হইতে লাগিল।
জোয়াল ধরিয়া শেষে টানাটানি আরম্ভ হইল, কাপড়-চোপড় ছিঁড়িয়া গেল। একজন খানিকটা জল আর আর সকলের গায়ে ঢালিয়া দিল। রীতিমত মারামারি আরম্ভ হইল।
লিম্পিঙ মাঠ থেকে ফিরিয়া আসিয়া স্ত্রীর সঙ্গে যোগ দিল। আইভান এবং তার ছেলেও আসিয়া মারামারিতে যোগ দিল। আইভানের গায়ে খুব জোর ছিল। সে সকলকে ছিট্কাইয়া ফেলিয়া লিম্পিঙের দাড়ি ধরিয়া টানিতে টানিতে এক গোছা ছিঁড়িয়াই ফেলিল। চারিদিক্ হইতে লোক আসিয়া জড় হইল এবং অতি কষ্টে তাহাদিগকে ছাড়াইয়া দিল।
লিম্পিঙ দাড়ির গোছাটা কাগজে খুব ভাল করিয়া মুড়িয়া কাছারিতে আইভানের বিরুদ্ধে নালিশ করিতে গেল; সে বলিল—“আইভানের ছিঁড়ে ফেল্বার জন্যে ত আর আমার দাড়ি গজায় নি।”
আইভানের স্ত্রী পাড়াপড়শীদের কাছে জাঁক করিয়া বলিতে লাগিল—“ওরা সকলেই আইভানকে তাড়িয়ে সাইবেরিয়ায় পাঠাতে চেয়েছিল ব’লেই ত এই ঝগড়া।
আইভানের বৃদ্ধ পিতা তাদের ঝগড়া থামাইবার জন্য চেষ্টা করিল। কেহই কিন্তু বৃদ্ধের বচন শুনিল না। সে বলিল—“এই একটা তুচ্ছ জিনিষ নিয়ে ঝগড়া ক’রে তোমরা কি আহাম্মুকের মত কাজ কর্ছ। ভেবে দেখ একটা ডিম নিয়ে এই ঝগড়া আরম্ভ করলে। ছেলেমেয়েরাও হয়ত ডিমটা নিয়ে খেতে পারে, এতে কি আসে যায়? একটা ডিমের দামই বা কি? ভগবান্ সকলকেই ত যথেষ্ট দিয়েছেন। মনে কর তোমার প্রতিবেশী তোমাদের একটা কড়া কথা ব’লেছে, কি ক’রে ভাল কথা বল্তে হয় তা দেখাও। যদি এ নিয়ে মারামারি হয়ে থাকে ত এরকম আরও হবে। আমরা সকলেই অপরাধী। যাতে আর এরকম না হয় তাই কর। যদি এ নিয়ে তোমরা একটা রাগ পুষ্তে থাক তা’ হ’লে আরও খারাপ হবে।”
কিন্তু তার কথা পুত্রেরা শুনিল না। তারা মনে করিল বুড়োর এ সব আবোল-তাবোল বকুনি। আইভান কিছুতেই তার প্রতিবেশীর নিকট মাথা হেঁট করিল না।
সে বলিল—“আমি তার দাড়ি ছিঁড়ি নি, সে নিজেই ছিঁড়েছে। তার ছেলে আমার জামাটা একেবারে ছিড়ে ফেলেছে, এই দেখ-না।”
আইভান মামলা করিতে গেল। জেলার কাছারিতে বিচার চলিতে লাগিল। একদিন লিম্পিঙের গাড়ীর খিল চুরি হইল। বাড়ীর মেয়েরা আইভানের ছেলেকেই চোর বলিয়া সাব্যস্ত করিল। তারা বলিল—“আমাদের জান্লার পাশ দিয়ে সেদিন ওকে বাড়ীর দিকে যেতে দেখেছিলুম, একজন লোকও ব’লেছে যে, সে খিলটা জমিদারকে দিতে দেখেছে।”
মামলা চলিতে লাগিল। এদিকে এমন একটি দিন যায় না, যে দিন ঐ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে মারামারি বা ঝগড়া না হয়। এই সব দেখিয়া শুনিয়া তাদের ছেলেমেয়েরাও ঝগড়া করিতে লাগিল।
আইভান লিম্পিঙের ভিতরে ঝগড়া এতই বাড়িয়া গেল যে, একজন আর একজনের যে কোন ভাল জিনিষ দেখিতে পাইত, তা মারামারি কাড়াকাড়ি করিয়া লইয়া যাইত। তাদের ছেলেমেয়েরা তাই করিতে আরম্ভ করিল। উভয়ের পক্ষেই সেখানে বাস করা অত্যন্ত কষ্টকর হইয়া উঠিল। রোজ রোজ নূতন নূতন মামলা চলিতে লাগিল। বিচারকেরাও অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া উঠিলেন। একবার আইভানের জরিমানা হইল, কিংবা জেল হইল, আর একবার লিম্পিঙেরও জরিমানা কিংবা জেল হইল। কুকুরের ঝগড়া যেমন যতই বেশী সময় থাকে ততই তারা ভয়ঙ্কর হইয়া উঠে এবং একটা আর একটাকে একেবারে মারিয়া ফেলিতে চায়, তেমনি এই কৃষকেরাও যত মামলা চালাইতে লাগিল, ততই একজনের উপর আর একজনের রাগ বাড়িতে লাগিল।
ছয় বৎসর ধরিয়া ক্রমাগত মোকদ্দমা চলিল। আইভানের বৃদ্ধ বাপ বার বার বলিতে লাগিল— “বাছা তোমরা কি কর্ছ? এসব বন্ধ কর; রাগারাগি ছেড়ে দাও, আবার কাজকর্ম্ম করতে আরম্ভ কর, তোমাদের ভাল হবে।”
তার কথা কেহই শুনিল না। সপ্তম বৎসরে এক বাড়ীতে একটা বিবাহে আইভানের পুত্ত্রবধূ লিম্পিঙকে ঘোড়া চুরিতে ধরা পড়িয়াছে বলিয়া নিতান্ত অপমানিত করিল। লিম্পিঙের এত রাগ হইল যে, সে আর সামলাইতে পারিল না। সে এমন এক ঘা তাকে বসাইয়া দিল যে, সাতদিন সে বিছানা ছাড়িয়া উঠিতে পারিল না, বিশেষতঃ তখন সে গর্ভবতী।
আইভানের কিন্তু ভারি আনন্দ হইল। ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে সে নালিশ করিতে গেল। মনে মনে বলিল—‘হয়েছে, এবার হয় জেলে যাবে, নয় সাইবেরিয়ায় যেতে হবে।’ কিন্তু আইভান যা ভাবিল তা হইল না। ম্যাজিষ্ট্রেট মামলা ডিস্মিস্ করিলেন। আইভানের পুত্ত্রবধূর শরীরে বেদম প্রহারের চিহ্ন তিনি দেখিতে পাইলেন না। আইভান চুপ করিয়া রহিল না, সে অন্য চেষ্টা করিতে লাগিল। পেশ্কারকে ঘুস দিল এবং পরবর্ত্তী বিচারালয়ে লিম্পিঙের বিশ বেতের আদেশ বাহির করিল। পেশ্কার রায় পড়িয়া শুনাইল।
আইভানও শুনিল এবং লিম্পিঙ এই রায় শুনিয়া কি করে দেখিবার জন্য তার দিকে চাহিল। লিম্পিঙের মুখ একেবারে সাদা হইয়া গেল, সে গট্গট্ করিয়া কাছারি হইতে চলিয়া আসিতে লাগিল। আইভান পিছনে পিছনে যাইতেছিল এবং লিম্পিঙকে বলিতে শুনিল—“আচ্ছা, আমাকে চাবুক খাওয়াবে, পিঠ অবিশ্যি জ্বল্বে, কিন্তু ওর এমন কিছু জ্বল্বে এখন, যা এর চেয়েও অনেক খারাপ।”
ইহা শুনিয়াই আইভান আবার কাছারিতে ছুটিয়া আসিল এবং বিচারকদের বলিল—“হুজুর, লিম্পিঙ আমার ঘরে আগুন লাগাতে চায়। অনেকের সাম্নে এ কথা ব’লেছে, সাক্ষী আছে।”
লিম্পিঙকে ডাকাইয়া আনিয়া জজ জিজ্ঞাসা করিলেন—“তুমি কি সত্যিই এ সব কথা ব’লেছ?”
—“আমি কোন কথাই বলি নি; আপনার ত ক্ষমতা আছে, ইচ্ছে হয় চাবুক মারুন। ন্যায় পথে র’য়েছি বলেই আমি এক্লাই শাস্তি পা’ব, আর ওরা যা ইচ্ছে তাই কর্বে।”
লিম্পিঙ আরও বলিতে যাইতেছিল কিন্তু পারিল না; তার ঠোঁট মুখ কাঁপিতে লাগিল। সে দেওয়ালের দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইল। কাছারির লোকেরা তার চাহনি ও মুখভঙ্গী দেখিয়া ভয় পাইল; ভাবিল, “এ নিজের অনিষ্ট কিংবা আইভানের অনিষ্ট কর্বে।”
জজ ধীরভাবে বলিলেন—“লিম্পিঙ শোন। একজন গর্ভবতী স্ত্রীলোককে ও রকম ক’রে মেরে তুমি ভাল কাজ ক’রেছ? ভাগ্যিস্ কোন বিপদ্ হয় নি; কিন্তু ভেবে দেখ কি হ’তে পার্ত। কেমন, এটা কি ভাল হ’য়েছে? তোমার বরং ওর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল; ক্ষমা চাইলে ও তোমায় ক্ষমা কর্বে। আমরাও রায় বদ্লে দেবো এখন।”
পেশ্কার বলিয়া উঠিল—“রায় বদ্লানো আইন অনুসারে অসম্ভব। বিচারে যা সাব্যস্ত হয়েছে তাই হ’বে।”
জজ বলিলেন—“তুমি চুপ কর। ভগবান্কে মেনে চলা হচ্ছে সব চাইতে বড় আইন, তিনি চান শান্তি।”
তিনি মিট্মাট্ করিবার জন্য অনেক চেষ্টা করিলেন, কিন্তু লিম্পিঙ তাঁর কথা গ্রাহ্য করিল না।
সে বলিল—“সাম্নের বছরে আমার বয়স হবে পঞ্চাশ। ছেলেরও বিয়ে হবে। জীবনে কোন দিন চাবুক খাই নি। আইভান চাবুক খাওয়ালে। আমি যা’ব ওর কাছে ক্ষমা চাইতে?—কিছুতেই না। অনেক স’য়েছি। আমাকে যাতে ওর মনে থাকে তা আমি কর্ব!”
লিম্পিঙের স্বর কাঁপিয়া উঠিল, সে আর বলিতে পারিল না, জোরে বাহির হইয়া গেল।
কাছারি হইতে গ্রাম সাত মাইল দূরে। বাড়ী পৌঁছিতেই আইভানের খুব দেরী হইল। ঘোড়ার সাজ খুলিয়া দিয়া, রাত্রের জন্য বাঁধিয়া রাখিয়া ঘরে ঢুকিল। দেখিল কেহ নাই। স্ত্রীলোকেরা গরু-বাছুর আনিতে গিয়াছে, আর ছেলেরা কেহই মাঠে থেকে তখনও ফিরিয়া আসে নাই। আইভান বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল—কি ভাবে লিম্পিঙ মামলার রায় শুনিয়াছিল, তার মুখ একেবারে চূণ হইয়া গেল, তার পরে দেওয়ালের দিকে ফিরিল ইত্যাদি সব কথাই আইভানের একটা একটা করিয়া মনে পড়িতে লাগিল। তার মন খুব ভারী হইল। ওরকম শাস্তি তার নিজের হইলে সে কী রকম রোধ করিত, তাই খানিকক্ষণ ভাবিয়া ভাবিয়া লিম্পিঙের উপর তার খুব দয়া হইল। এমন সময়ে তার বৃদ্ধ বাপকে কয়েকবার কাশিতে শুনিল। বৃদ্ধ অতি কষ্টে নামিয়া আসিয়া একটা টেবিলে ঠেস্ দিয়া বসিল। ঐ পরিশ্রমেই তাকে অনেকক্ষণ কাশিতে হইল, তার পর গলা পরিষ্কার করিয়া জিজ্ঞাসা করিল—“আচ্ছা, ওর শাস্তি হ’য়েছে কি?”
আইভান বলিল—“আজ্ঞে হাঁ। বিশ ঘা চাবুক।”
বৃদ্ধ মাথা নাড়াইতে নাড়াইতে বলিল—“বড্ড খারাপ কাজ। তুমি অন্যায় কর্ছ, আইভান। তার চাইতে তোমার পক্ষেই বেশী খারাপ। আচ্ছা বেশ, তাকে তো চাবুক মারা হবেই, কিন্তু তোমার তা’তে কোন মঙ্গল হবে কি?”
আইভান বলিল―“এমন কাজ সে আর কখনও করবে না।”
—“সে কি কর্বে না? তোমার চাইতে কি খারাপ কাজ সে করেছে?”
আইভান উত্তর দিল—“একবার ভেবেই দেখুন না, সে আমার কি অনিষ্ট ক’রেছে। আমার বৌকে ও প্রায় মেরেই ফেলেছিল, এখন আমাদের সব পুড়িয়ে মার্তে চাইছে। তাকে এই জন্যেই বুঝি ধন্যবাদ দেবো?”
বৃদ্ধ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল—“আইভান, তুমি পৃথিবীতে সব দেখতে পাচ্ছ, তুমি সবল; আর আমি এই কয় বছর শয্যাগত র’য়েছি। তুমি মনে কর যে, তুমিই সব দেখ, আর আমি কিছুই দেখ্তে পাচ্ছিনে। কিন্তু তুমিই কিছু দেখ্তে পাচ্ছ না, হিংসাতে তুমি অন্ধ হ’য়ে র’য়েছ। বাবা! তুমি চোখের সামনে কেবল অন্যের পাপই দেখ্তে পাচ্ছ, তোমার নিজের চোখ পেছনে রয়েছে। লিম্পিঙের উপর বড্ড অন্যায় করা হ’য়েছে। যদি সে-ই কেবল অন্যায় ক’রে থাকে আর তুমি না ক’রে থাক, তা হ’লে আর ঝগড়া হবে কেন? এক হাতে তালি বাজে কি? একজনের দ্বারা ঝগড়া হয় না। তার অন্যায় তুমি দেখ, নিজের অন্যায় মোটেই দেখ না।
“যদি সে খারাপ হ’য়ে থাকে, তুমি ভাল হ’য়ে থাক, তা হ’লে ঝগড়া একদম হ’তই না। তার দাড়ি কে ছিঁড়েছিল? কে তার খড় নষ্ট ক’রেছিল? কে তাকে কাছারিতে নিয়েছিল? তবুও তুমি তাকেই দোষ দেবে! তুমি নিজেই খারাপ, সেইটেই হচ্ছে অন্যায়। আমি বাবা, এরকম ক’রে জীবন কাটাই নি। এরকম কর্তে আমি তোমায় শেখাই নি! ওর বাবা আর আমি কি রকম ভাবে থাক্তুম! পাড়ার প্রতিবেশী যে রকম মিলে মিশে থাকে তেমনই থাক্তুম। তার কোন জিনিষের অভাব হ’লেই বাড়ীর মেয়েরা একজন আমাকে বল্ত, আমি আমার গোলা দেখিয়ে দিয়ে বল্তুম, ‘যা দরকার নিয়ে যাও।’ হয়ত তাদের ঘোড়া কিংবা গরু মাঠে নিয়ে যাওয়ার লোক না থাক্লে আমিই বল্তুম, ‘আইভান, যাও, ওর ঘোড়া নিয়ে মাঠে যাও।’ আবার আমারও যদি কিছু অভাব হ’ত অমনি তা’র কাছে ছুটে যেতুম। সেও অমনি বলত, ‘নিয়ে যাও।’ এমনিভাবে আমরা বসবাস ক’রেছি। আমরা সুখেই ছিলুম। কিন্তু এখন?
“সেদিন সেই সৈন্যটি যুদ্ধ সম্বন্ধে আমাদের বল্ছিল; কিন্তু তোমাদের ভিতরে তা’র চাইতেও একটা খারাপ যুদ্ধ চলছে। এই কি বেঁচে থাকা? এ যে পাপ! তুমি মানুষ, তুমিই এখন ঘরের কর্ত্তা! তোমাকেই জবাব দিতে হবে। বলত বাড়ীর স্ত্রীলোক ও ছেলে-মেয়েদের তুমি কি শিক্ষা দিচ্ছ? কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করতে আর কাম্ড়াতে! সেদিন তোমার মেয়েটা পাড়াপড়শীর একজনকে খুব গালাগালি দিচ্ছিল, তার মা শুনে হাস্ছিল। এ কি উচিত? তোমাকেই জবাব দিতে হবে। ভাব দেখি একবার, তোমার আত্মা সম্বন্ধে। যা হওয়া উচিত তাই কি হয়েছে? তুমি আমায় বল্লে একটা কথা, আমি দুকথা শুনিয়ে দিলুম, এই ত হচ্ছে; কিন্তু এই কি ঠিক হচ্ছে মনে কর! না, বাবা, ঠিক নয়। যীশু এই পৃথিবীতে এসে এরকম শিক্ষা দেন নি; তিনি এর একদম উল্টো শিক্ষা দিয়েছিলেন,—যদি কেউ তোমাকে গাল দেয়, চুপ ক’রে থাক্বে; সে দোষী হবে তা’র নিজের বিবেকের কাছে। যদি কেউ তোমার এক গালে চড় মারে, তুমি আর এক গাল পেতে দেবে; তা’র বিবেক তাকে তিরস্কার কর্বে; সে নরম হবে, তোমার কথা শুন্বে। অহঙ্কারে ফুলে উঠ্বে না; এই ত যীশু আমাদের শিখিয়েছেন। কেমন, যা বল্লুম ঠিক নয়? কথা কও-না কেন?”
আইভান চুপ করিয়া রহিল।
বৃদ্ধ খানিকক্ষণ কাশিয়া গলা ছাড়াইয়া আবার বলিতে আরম্ভ করিল—“তুমি কি মনে কর যীশু আমাদের শিখিয়েছেন সব ভুল! তাঁর সব শিক্ষাই আমাদের মঙ্গলের জন্য। তোমার আত্মার কথা, পরিণামের কথাও যদি না ভাব, তা’ হ’লে—দেখ না তোমার সংসারেরই বা কি অবস্থা হ’য়েছে? মামলা আরম্ভ হওয়ার পর থেকেই তোমার অবস্থা কি রকম হ’য়েছে? এই মামলা চালাতে কত খরচা হ’য়েছে তাই একবার কেন হিসেব ক’রে দেখ না? তোমার ছেলেরা বেশ উপযুক্ত হ’য়েছে, তুমি খুব ভাল অবস্থায় থাক্তে পারতে; কিন্তু তোমার টাকা-কড়ি সব ফুরিয়ে আস্ছে। কেন?—তোমার বোকামির জন্যে, তোমার অহঙ্কারের জন্যে। তোমার উচিত নিজে গিয়ে ছেলেদের নিয়ে জমি চাষ করা ও শস্য জন্মানো। কিন্তু ঘাড়ে ভূত চেপেছে, সে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে জজের কাছে, উকীলের কাছে। ঠিক সময়ে চাষ করাও হয় না, জমিতেও ফসল জন্মায় না। এ বছর ফসল হ’ল না কেন বল দেখি? ঠিক সময়ে জমি বোনা হ’য়েছিল কি? তোমার কি লাভ হ’য়েছে? তোমার নিজের ঘাড়ে একটা অনাবশ্যক বোঝা চাপিয়ে রেখেছ? এ বড্ড ভুল হচ্ছে বাবা! নিজের কাজটা একবার দেখ। মাঠে এবং বাড়ীতে ছেলেদের নিয়ে কাজকর্ম্ম কর। যদি কেউ তোমার উপর অসন্তুষ্ট হয়, তাকে ক্ষমা কর। ভগবান্ সেইটেই ইচ্ছে করেন যদি তাই পার দেখ্বে জীবনটা সরল সহজ হবে, মনটাও সব সময় হাল্কা থাক্বে!”
বৃদ্ধ বলিতে লাগিল—“বাবা আইভান, তোমার এই বুড়ো বাপের কথাটা শোন। যাও ঘোড়া চেপে এখনই আদালতে গিয়ে মামলা নিষ্পত্তি ক’রে ফেল; ভোরবেলা ভগবানের নাম নিয়ে লিম্পিঙের কাছে যাও, গিয়ে মিটমাট কর। তা’কে কাল বাড়ীতে নিমন্ত্রণ ক’রে এনে খাওয়াও। দুইজনেই মিলে মিশে এ বদ্খেয়াল দূর কর। ভবিষ্যতে যেন আর এরকম না হয়? ঘরের স্ত্রীলোক ও ছেলেদেরও এই রকম কর্তে বল।”
আইভান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়িল, ভাবিল, যা বল্ছে তা ঠিক। তার মনও একটু হাল্কা হইল। সে কেবল বুঝিতে পারিল না, কি করিয়া নিষ্পত্তি করিতে আরম্ভ করিবে।
বৃদ্ধ আবার বলিতে আরম্ভ করিল—যেন আইভানের মনের কথা সবই সে বুঝিতে পারিল! বৃদ্ধ বলিল—“যাও আইভান, দেরী ক’রো না। জ্বলে ওঠবার পূর্ব্বে সব আগুন নিবিয়ে ফেলা ভাল; তা’ না হ’লে শেষে বড্ড দেরী হ’য়ে যাবে, সব পুড়্বে।”
এমন সময়ে বাড়ীর স্ত্রীলোকেরা গজ্ গজ্ করিতে করিতে ভিতরে ঢুকিল। বৃদ্ধের আর বলা হইল না। লিম্পিঙের চাবুক হবে এবং সে আইভানের বাড়ী পোড়াইয়া দিতে ছুটিয়াছে—এসব কথা তারা পূর্ব্বেই শুনিতে পাইয়াছে। কথাগুলি তারা অতিরঞ্জিত করিয়া তুলিল। লিম্পিঙের ছেলের বৌ একটা নূতন সংবাদ রটাইতে লাগিল—ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব বিচার সব উল্টাইয়া দিবেন, স্কুল-মাষ্টার আইভানের বিরুদ্ধে সম্রাটের কাছে দরখাস্ত লিখিতেছেন; এবার আইভানের সব সম্পত্তির অর্দ্ধেক তারাই পাইবে, ইত্যাদি নানা রকম করিয়া বলিতে লাগিল।
আইভানের মত বদলাইয়া গেল। লিম্পিঙের সঙ্গে আবার ভাব করার ইচ্ছা সে ত্যাগ করিল।
স্ত্রীলোকদের কথাবার্ত্তা শুনিবার জন্য অপেক্ষা না করিয়া আইভান গোলাবাড়ীতে চলিয়া গেল। তার ছেলেরা মাঠ হইতে ফিরিয়া আসিল। ক্ষেতের কাজ সম্বন্ধে তাদের সে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করিল; তারপর গরুগুলিকে খড় কাটিয়া দিল। তখন খাবার সময় হইয়াছে। সে মনে করিল খাইয়াই শুইয়া পড়িবে; কাজে কাজেই তখন ঘরের ভিতরে ঢুকিল। লিম্পিঙের কথা কিংবা তার বাপ যেসব কথা বলিয়াছে সব সে তখন ভুলিয়া গেল। কিন্তু তখনই সে শুনিতে পাইল যে, তাহার প্রতিবেশী খুব কর্কশভাবে যেন তাকে গালি দিতেছে। লিম্পিঙকে বলিতে শুনিল, “ও খুন হবারই যোগ্য।” শুনিয়াই আইভান জ্বলিয়া উঠিল এবং তার সমস্ত বিদ্বেষ আবার জাগিয়া উঠিল। দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া লিম্পিঙের গাল শুনিল এবং যেমনি সে থামিল আইভান ঘরে ঢুকিল।
ভিতরে একটা আলো ছিল। তার পুত্ত্রবধূ সূতা কাটিতেছিল, আর তার স্ত্রী খাবার তৈয়ার করিতেছিল। বড় ছেলে জুতা তৈয়ার করিতেছিল, মেজটি আলোর কাছে বই লইয়া বসিয়াছিল। ঘরে সবই সুশৃঙ্খল, সকলেই বেশ শান্তিতে আছে, কিন্তু কেবল অশান্ত সেই বদমায়েস লিম্পিঙ।
আইভানের মুখটা খুব কষ্ট আর বিরক্তি মাখানো। ঢুকিয়াই বেঞ্চির উপর হইতে বিড়ালটা ছুঁড়িয়া ফেলিল, হাত-কচ্লানি জলের গামলাটা বেজায়গায় রাখিয়াছে বলিয়া স্ত্রীলোকদের গালাগালি দিল। তারপর হতাশ হইয়া পড়িল, ঘোড়ার গলার হল্কাটা ভ্রূ কুঁচকাইয়া দেখিতে লাগিল। কাছারিতে সে যে ভয় তাকে দেখাইয়াছে এবং তখনই কর্কশভাবে একজনকে বলিয়াছে, “সে খুন হবারই যোগ্য”—ইহাই তখন আইভানের কানে বারে বারে বাজিতে লাগিল।
তার স্ত্রী ছোট ছেলেকে খাবার দিল। সে খাওয়া-দাওয়া সারিয়া কোটটাকে গায়ে দিয়া ঘোড়ার জন্য কিছু রুটি লইয়া বাহিরে চলিয়া গেল। বড় ছেলে তার সঙ্গে যাইবে বলিয়া উঠিতেছিল, কিন্তু আইভান নিজেই বাহির হইয়া বারান্দায় গেল। বাহিরে ভয়ানক অন্ধকার, মেঘের উপর মেঘ, শন্ শন্ হাওয়া। ছেলে ঘোড়া লইয়া বাহিরে গেল কিনা দেখিবার জন্য দাঁড়াইয়া রহিল; কিন্তু লিম্পিঙের কথা কিছুতেই ভুলিতে পারিল না। লিম্পিঙ কি বলিয়াছিল তাই তার মনে পড়িল।
আইভান ভাবিল, ‘ও ত মরীয়া হ’য়েছে। রোদ্দুরে সব শুকিয়ে খাক হ’য়ে রয়েছে, তার উপর আবার খুব জোর হাওয়া। হয়ত চুপি চুপি এসে ঘরে কোনখানে আগুন লাগিয়ে দিয়ে বেমালুম পালিয়ে যাবে; যদি সে সময় একবার ধর্তে পারা যায় তবে আর পালাবে কোথা?’ ভাবিতে ভাবিতে সে চলিতে লাগিল। মনে করিল একবার সবদিক ঘুরিয়া দেখিবে। আস্তে আস্তে ফটক দিয়া বাহির হইয়া বেড়ার মোড়ে গিয়া দাঁড়াইল, দেখিল ঠিক বিপরীত দিকে কোণে একটা কি হঠাৎ নড়িয়া উঠিল, যেন কোন একটা লোক হঠাৎ আসিয়াই চলিয়া গেল। আইভান আসিল, সেই দিকে চাহিয়া কান পাতিয়া রহিল। সব চুপ্চাপ্ কেবল গাছের পাতা আর চালের খড়ের শব্দ হইতেছিল। প্রথমত ভয়ানক অন্ধকার, শেষে দেখিতে দেখিতে দূরের কোণগুলিও দেখা যাইতে লাগিল। সে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিল, কাহাকেও দেখিতে পাইল না।
আইভান ভাবিল, ‘বোধ হয় ভুল হ’য়েছে, যাক্ তবু একবার ঘুরে দেখ্ব।’ সে অতি চুপি চুপি পা টিপিয়া টিপিয়া চলিতে লাগিল, নিজের পায়ের শব্দ নিজেই শুনিতে পাইল না। যেমনি সে দূরে চলিয়া গিয়াছে অমনি দেখিতে পাইল যে, দূরে এক কোণে দপ্ করিয়া আগুন জ্বলিয়া উঠিল, আবার নিবিয়া গেল। আইভানের বুকের ভিতরটা কাঁপিয়া উঠিল। সে থামিল। থামিতে না-থামিতেই আবার আগুন জ্বলিয়া উঠিল। সে পরিষ্কার দেখিতে পাইল, একজন মানুষ, মাথায় একটা টুপি দিয়া এক মুঠো খড় জ্বালিয়া হাতে লইয়া হামাগুড়ি দিয়া যাইতেছে। আইভান ভাবিল, ‘এবারে যাবে কোথা? আর পালাতে পাচ্ছো না, এবার ঠিক ধর্ব।’ তার যতদূর শক্তি জোরে ছুটিয়া চলিল।
আইভান সামান্য একটু দূরে আছে, এমন সময়ে দেখিল আর এক জায়গায় আগুন—খুব জোর আগুন। ঘরের ছাদ প্রায় ধর-ধর হইয়াছে। সে সেই আগুনের আলোকে স্পষ্ট লিম্পিঙকে দেখিতে পাইল।
বাজপাখী যেমন শিকারের উপর ছোঁ মারে, ঠিক তেমনি আইভান লিম্পিঙের উপরে ঝাঁপাইয়া পড়িল, লিম্পিঙ তার পায়ের শব্দ শুনিতে পাইয়াছিল, এবং একবার ফিরিয়া দেখিয়া শশকের মত ঝাঁ করিয়া গোলাবাড়ী হইতে বাহির হইয়া গেল। আইভানও তার পিছনে ছুটিতে ছুটিতে চীৎকার করিয়া বলিল—“এবার আর পালাতে পার্বি না।”
যেমনি ধর-ধর হইয়াছে অমনি লিম্পিঙ এক পাশে ফিরিল, কিন্তু আইভান তার কোট্ ধরিল, কোট্টা একেবারে ছিঁড়িয়া গেল, আইভান পড়িয়া গেল; তারপর “রক্ষা কর, ধর ধর এই যে চোর, ডাকাত,” বলিয়া চেঁচাইতে লাগিল, আবার উঠিয়া ছুটিল। ইতিমধ্যে লিম্পিঙ নিজের বাড়ীর ফটকে গিয়া পৌঁছিল। আইভান তাকে গিয়া ধরিবে ঠিক এমন সময়েই তার রগে এমন একটা আঘাত লাগিল যে, তার কানে তালা ধরিয়া গেল। লিম্পিঙের ফটকের পাশে একটা কাঠ পড়িয়াছিল, তা দিয়া সে আইভানের মাথায় অতি জোরে মারিয়াছিল।
আইভান চক্ষে ধোঁয়া দেখিতে লাগিল, অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া গেল। একটু জ্ঞান লাভ করিয়া দেখিল যে, লিম্পিঙ সেখানে নাই, দিনের মত ফর্সা, পেছনে তার বাড়ীর দিকে চলন্ত ইঞ্জিনের মত শব্দ হইতেছে। ফিরিয়া দেখিল কেবল আগুন, হাওয়ায় চারিদিকে কেবল ধোঁয়া আর ছাই ছড়াইয়া পড়িতেছে।
হাঁটু চাপড়াইতে চাপড়াইতে আইভান চেঁচাইয়া উঠিল—“একি, একি, জ্বলন্ত খড়ের আঁটিটা টেনে মাড়িয়ে দিলেই ত পার্তুম তখন। একি! একি ভয়ানক!” চেঁচাইতে চেষ্টা করিল, কিন্তু তার আর গলা ছিল না—দম ছিল না। ছুটিয়া যাইতে চেষ্টা করিল, কিন্তু পা দুইটা যেন একেবারে অবশ,—আর চলিতে চাহে না। আস্তে আস্তে টলিতে টলিতে সে চলিল, আবার তার নিঃশ্বাস বন্ধ হইয়া আসিল। একটু স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া নিঃশ্বাস টানিয়া আবার চলিতে লাগিল। তার পৌঁছিবার পূর্ব্বেই সমস্ত ঘরে আগুন ধরিয়া গেল। চালে চালে আগুন হাওয়ায় নাচিতে নাচিতে চলিতে লাগিল। আর উঠানে যাওয়া যায় না। বহুলোক জড় হইয়াছে, কিন্তু কিছুই করিবার উপায় রহিল না। প্রতিবেশীরা সকলেই তাদের নিজেদের ঘরের জিনিষ-পত্র, গরু-বাছুর বাহির করিতে লাগিল। আইভানের বাড়ীর আগুন হাওয়ায় গিয়া লিম্পিঙের বাড়ীতেও লাগিল। আগুন ক্রমশঃ বাড়িয়াই চলিল, কাছাকাছি সকল বাড়ীতেই লাগিয়া গেল। অর্দ্ধেক গ্রাম পুড়িয়া ছারখার হইয়া গেল।
আইভানের বৃদ্ধ পিতাকে সকলে অতি কষ্টে বাহির করিল; বাড়ীর আর আর সকলে কোনমতে বাহির হইল বটে, কিন্তু কোন জিনিষ-পত্র রক্ষা করিতে পারিল না। গরু, বাছুর, গরুর গাড়ী, লাঙ্গল, মুরগী, স্ত্রীলোকদের কাপড় বোঝাই-করা বাক্স প্রভৃতি—সব পুড়িয়া ছাই হইয়া গেল। লিম্পিঙেরও গরু-বাছুর আর সামান্য কিছু জিনিষ-পত্র বাহির হইল।
সমস্ত রাত্রি আগুন জ্বলিল। আইভান বাড়ীর সাম্নে দাঁড়াইয়া কেবল বলিতে লাগিল—“একি হ’ল? কেবল পা দিয়ে মাড়িয়ে নিবিয়ে দিলেই হ’ত গো।” ঘরের ছাদ পড়িয়া গেল, একটা পোড়া কড়ি টানিয়া আনিতে সে চেষ্টা করিল। স্ত্রীলোকেরা সকলেই তাকে বারণ করিল। কিন্তু কিছুতেই সে থামিল না। চারিদিকে আগুন―তার মধ্যে ঢুকিয়া সে আবার টানিতে লাগিল। তার বড় ছেলে ছুটিয়া গিয়া তাকে অতি কষ্টে টানিয়া আনিল। আইভানের চুল ও কাপড় পুড়িয়া গেল, কিন্তু সে কিছুই টের পাইল না, তার কিছুই হুঁস্ ছিল না। বাহিরে যেমন একটা বিরাট আগুন, তার বুকের ভিতরেও তেমনই আর একটা আগুন জ্বলিতেছিল। সে কেবল বলিতেছিল—“একি একি! হায় হায়! তখন নিবিয়ে দিলেই হ’ত।”
ভোরবেলা গ্রামের মোড়লের ছেলে আসিয়া বলিল—“আইভান, তোমার বাপ মারা যাচ্ছে! তোমাকে নিয়ে যাবার জন্যে আমাকে পাঠিয়েছে।”
বাপের কথা আইভান একদম ভুলিয়া গিয়াছিল; সে কিছু বুঝিতে না পারিয়া বলিল—“কিসের বাপ, কার জন্যে পাঠিয়েছে?”
—“তোমার জন্য পাঠিয়েছে—শেষ দেখা করবার জন্যে। আমাদের বাড়ীতেই মারা যাচ্ছে। শীগ্গির চ’লে এসো।”
সে আইভানের হাত ধরিয়া টানিতে লাগিল, আইভান তার সঙ্গে গেল!
আইভানের পিতাকে যখন বাহির করা হয় তখন কতকগুলি জ্বলন্ত খড়ও তার গায়ে পড়িয়াছিল, তাই তাকে গ্রামের অনেক দূরে মোড়লের বাড়ীতে রাখা হইয়াছিল।
আইভান ঘরে ঢুকিল। বৃদ্ধ একটা বেঞ্চির উপরে শুইয়া দরজার দিকে চাহিয়া আছে, তার হাতে একটা বাতি। সেখানে কেবল সেই মোড়লের স্ত্রী বসিয়াছিল; সে গিয়া বৃদ্ধকে বলিল—“তোমার ছেলে এসেছে।”
বৃদ্ধ একটু নড়িয়া তাকে আরও নিকটে আসিতে বলিল। সে কাছে গিয়া দাঁড়াইল।
বৃদ্ধ বলিল—“তোমায় আমি কি ব’লেছিলুম, আইভান, কে এই পাড়াটা পুড়িয়ে দিলে?”
আইভান বলিল—“ওই ত ক’রেছে! আমি সে সময়ে ওকে ধ’রে ফেলেছিলুম; চালের ভেতরে নুড়ো জ্বেলে দিতে দেখ্লুম; তবে এটা ঠিক যে, নুড়োটা টেনে এনে মাড়িয়ে নিবিয়ে দিলে কিছুই হ’ত না।”
বৃদ্ধ বলিল—“আইভান, আমি ত এই মারা যাচ্ছি। আবার তোমারও একদিন সময় হ’য়ে আস্বে। আচ্ছা, বল ত বাবা পাপটা কার?”
আইভান বাপের মুখের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল, একটি কথাও বলিতে পারিল না।
বৃদ্ধ আবার বলিল—“ভগবান্কে সাক্ষী ক’রে বল ত কার পাপ এটা? তোমায় কি ব’লেছিলুম?”
আইভানের তখন একটু জ্ঞান হইল, সবই বুঝিতে পারিল। খুব জোরে একটা নিঃশ্বাস ছাড়িয়া সে বলিল—“আমার পাপ, বাবা! আমায় ক্ষমা কর, আমি তোমার কাছে অপরাধী—ভগবানের কাছে অপরাধী—ক্ষমা কর, আমায় ক্ষমা কর।”
“ভগবানের জয়—তাঁরই জয়; তাঁকে অশেষ ধন্যবাদ দাও,” বলিয়া বৃদ্ধ ছেলের দিকে চাহিয়া রহিল, একটু পরেই ডাকিল “আইভান, আইভান!”
—“কি বাবা?”
—“এখন তুমি কি কর্বে?
আইভান কাঁদিতে লাগিল, বলিল—“জানিনে বাবা, এখন থেকে কি রকম ক’রে আমরা থাক্ব।”
বৃদ্ধ একটু চোখ বুজিল; তার ঠোঁটটি একটু নড়িয়া উঠিল। তারপর আবার চোখ খুলিয়া বলিল—“তুমি পার্বে। যদি ভগবানের ইচ্ছামত চল, যদি তাঁকে মান, তা হ’লে পারবে।” তারপর একটু থামিয়া হাসিয়া বলিল—“আইভান, কে আগুন লাগিয়েছে বলো না। অন্যের অপরাধ ক্ষমা কর, অন্যের পাপ গোপন কর, ভগবান্ তোমার অপরাধ ক্ষমা কর্বেন।”
বৃদ্ধ দুই হাতে বাতিটা বুকের উপর চাপিয়া ধরিল; একবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়িয়া পা টান করিল, একটু পরেই দেখা গেল সে আর নাই।
লিম্পিঙের বিরুদ্ধে আইভান কিছুই আর বলিল না। কি করিয়া আগুন লাগিল কেহই জানিতে পারিল না।
লিম্পিঙের ওপর তার সমস্ত রাগ, অসন্তোষ, সকল বিদ্বেষ দূর হইয়া গেল। আইভান যে একথা কাকেও বলিল না ইহাতে লিম্পিঙ একেবারে আশ্চর্য্য হইয়া গেল। তাদের ঝগড়া বন্ধ হইয়া গেল। আবার বাড়ী তৈয়ার করিবার সময় দুই প্রতিবেশী এক বাড়ীতে রহিল। বাড়ী তৈয়ার হইয়া গেলে আবার সেই পূর্ব্বের মতই বসবাস করিতে লাগিল।
তার পিতার আদেশ—ভগবান্কে মানা, আর জ্বলিয়া উঠিবার পূর্ব্বেই আগুনের ফুল্কি নিভাইয়া দেওয়া—আইভানের সর্ব্বদাই মনে পড়িত। যদি কেহ তার অনিষ্টও করিত, সে আর তার প্রতিশোধ লইত না; যদি কেহ গালি দিত, সে চেষ্টা করিত তাকে ভাল কথায় শিক্ষা দিতে। এমনি ভাবেই সে সকল কাজেই ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দিতে লাগিল। পূর্ব্বের চেয়ে ভাল ভাবে তার দিন কাটিতে লাগিল