টল্স্টয়ের গল্প/মাটির নেশা
মাটির নেশা
—১—
দুই বোন। বড় বোনের কোনও এক সওদাগরের সঙ্গে বিবাহ হইয়াছে, সে সহরে বাস করে। আর ছোট বোনের বিবাহ হইয়াছে একজন সামান্য কৃষকের সঙ্গে, সে বাস করে পল্লীগ্রামে।
একবার বড় বোন ছোট বোনের বাড়ীতে আসিল। একত্রে চা খাইতে খাইতে দুই বোনের অনেক কথাবার্ত্তা হইল। বড় বোন সহরে বাস করে বলিয়া অহঙ্কার করিয়া বলিল—‘যাই বল সহরে ঢের সুবিধে, সেখানে খুব সুখে, খুব আরামে বাস করা চলে, ভাল ভাল কাপড়-চোপড় পরতে পারা যায়। আমার ছেলে-মেয়েরা খুব সুন্দর সুন্দর পোষাক পরে, ভাল ভাল খাবার খায়। সেখানে থিয়েটার আছে, আমিও গিয়ে থাকি; আরও নানারকমের দেখ্বার, ভোগ কর্বার জিনিষ র’য়েছে।”
ছোট বোন ব্যবসাদারের কাজের অনেক নিন্দা করিল এবং কৃষকের জীবন ও কাজই খুব ভাল মনে করিয়া বলিল—“আমার জীবনটা তোমার মত কর্তে আমার মোটেই ইচ্ছা হয় না। আমরা নিতান্ত সাধারণ ভাবে দিন কাটাচ্ছি বটে, কিন্তু আমাদের কোন ভাবনা-চিন্তা নেই। তুমি আমাদের চেয়ে ভাল ভাবে থাক বটে, প্রয়োজনের চেয়ে ঢের বেশী আয়ও কর বটে, কিন্তু তোমাদের সব লোক্সান হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। পয়সা আজ আছে, কাল নাও থাক্তে পারে। জান ত লোকে বলে—‘লাভ আর লোক্সান দুই-ই সঙ্গে সঙ্গে যায়।’ এ ত প্রায়ই দেখ্তে পাওয়া যায় যে, যাদের আজকে ঢের টাকা-পয়সা, কাল তা’রা এক মুঠো অন্নের জন্য ভিক্ষা ক’রে বেড়াচ্ছে। আমরা তার চেয়ে নির্ব্বিঘ্নে আছি। যদিও কৃষকের জীবনে খুব টাকা-পয়সা হয় না, তবুও সে বেঁচে থাকে বহুদিন। আমরা কখনও বড়লোক হ’ব না বটে, কিন্তু খাওয়াদাওয়ার যথেষ্ট থাক্বে।”
বড় বোন নাক সিট্কাইয়া বলিয়া উঠিল—“যথেষ্ট? হ্যাঁ, যথেষ্ট বটে, যদি গরু-বাছুরের সঙ্গে ডাবায় খাও তা’ হ’লে যথেষ্ট বৈকি! তোমরা সভ্যতা এবং ভদ্রতার কি জান? এখন যেমন তোমরা গরু-বাছুরের সঙ্গে রয়েছ, মরবেও ঠিক এমনি ভাবে কতকগুলো গোবরের গাদার ওপরে, আর তোমাদের ছেলে-মেয়েগুলোরও সেই দশাই হবে।”
ছোট বোন বলিল―“বেশ ত, তাতে আর কি এসে যাচ্ছে? আমাদের কাজটা অবিশ্যি কুলিমজুরের; কিন্তু এর মার নেই। কারুর কাছে আমাদের মাথা নোয়াতে হয় না। তোমরা সহরে থাক, সেখানে কিন্তু নানান রকমের প্রলোভন রয়েছে; আজকে হয়ত দু’পয়সা আছে—কালকে হয়ত ঘাড়ে ভূত চাপ্বে, তোমার স্বামীর লোভ হবে, হয়ত জুয়া খেল্তে যাবে, না হয় মদ ধর্বে। স্ত্রীলোকেরাও লোভে পড়্তে পারে, আর তা হ’লেই ত সর্ব্বনাশ! কেমন এরকম কি প্রায়ই হয় না?”
বাড়ীর কর্ত্তা প্যাহোম খাটের উপর শুইয়াছিল। এই সব কথা সে শুনিতে পাইল। সে ভাবিল, ‘এ খুবই সত্যি, ছেলেবেলা থেকে আমরা জমি চাষ কর্ছি, আমরা চাষা; কিন্তু আমাদের মাথায় কখনও বদ্খেয়াল ঢোকে না; কেবল এইটুকুই কষ্ট যে, আমাদের যথেষ্ট জমি নেই, যদি খুব বেশী থাক্ত তা হ’লে কাউকে গ্রাহ্য কর্তুম না।’
দুই বোনের চা খাওয়া শেষ হইল। কাপড়-চোপড় সম্বন্ধে তারা খানিকক্ষণ গল্প-গুজব করিল; তারপর চায়ের সব সরঞ্জাম তুলিয়া রাখিয়া শুইতে গেল।
—২—
সেই পাড়াগাঁয়ের খুব কাছেই একজন খুব ধনী স্ত্রীলোক বাস করিতেন, তাঁর প্রায় তিনশত একর জমি ছিল। তিনি সেখানকার কৃষকদের সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করিতেন, কিন্তু শেষে তিনি এমন একজন কর্ম্মচারী নিযুক্ত করিলেন যে, সে চাষাদের সামান্য কিছু দোষ দেখিতে পাইলেই কেবল জরিমানা করিত। সে যুদ্ধ-বিভাগে থাকিয়া থাকিয়া বৃদ্ধ হইয়াছে, তাই তার মেজাজ ভারি কড়া। প্যাহোম খুব সাবধান থাকিবার চেষ্টা করিত, তবুও মাঝে মাঝে দুই একটা গরু তার বাগানে ঢুকিত, বাছুরগুলিও প্রায়ই ছুটিয়া যাইত; কাজেই প্যাহোমকে প্রায় সর্ব্বদাই জরিমানা যোগাইতে হইত।
জরিমানা দিয়া দিয়া প্যাহোমের মেজাজটা কি রকম খারাপ হইয়া পড়িল। স্ত্রীর সঙ্গেও সে খুব খারাপ ব্যবহার করিত। গ্রীষ্মকাল তার এই রকম করিয়াই কাটিল। সে ভাবিল শীতকালে যদিও খোরাকী জোগাইতে কষ্ট হইবে তবুও গরুবাছুরগুলি গোয়ালেই থাকিবে—বেশী ভাবিতে হইবে না।
শীতকালে শোনা গেল যে, সেই ভদ্র-মহিলা তাঁর সমস্ত জমি বিক্রয় করিবেন; সেখানকার রাস্তার উপরই যে হোটেলওয়ালা আছে সে সেই জমিদারী কিনিবে—এই গুজব রটিল। চাষাদের মনে একটা ভয়ানক ভয় হইল। তারা ভাবিল, ‘যদি হোটেলওয়ালা লোকটাই জমি কেনে তা’ হ’লে বড্ড খারাপ হবে। এ জমি ছাড়া আমাদের আর কোন উপায়ও নেই, কাজেই জরিমানা ক’রে ক’রে আমাদের অস্থির ক’রে তুল্বে।’
পাড়ার সকল কৃষকই সেই মহিলার কাছে গেল, শেষে ইহাই স্থির হইল যে, যার যেমন সাধ্য সে তেমন একটা অংশ কিনিবে।
প্যাহোম শুনিতে পাইল যে, তার একজন প্রতিবেশী পঞ্চাশ একর জমি কিনিবে, অর্দ্ধেক দাম তখনই দিবে, বাকী অর্দ্ধেক এক বৎসর পরে দিবে। প্যাহোমেরও জমি কিনিতে ইচ্ছা হইল। সে ভাবিল, ‘জমিটা সবই বিক্রী হচ্ছে, আর আমি এর কিছু পাবনা, এ কি রকম?’
সে স্ত্রীকে গিয়া বলিল—“সকলেই জমি কিন্ছে, আমরাও কুড়িপঁচিশ একর কিন্ব। নইলে টিকে থাকাই যে দায়! সেই গোমস্তাটা জরিমানা ক’রে ক’রে আমাদের মেরে ফেল্বে।”
কি করিয়া জমি কেনা যাইবে তাই দু’জনে ভাবিতে লাগিল। তাদের মোটে একশত টাকা ছিল। একটা ঘোড়া তারা বিক্রয় করিল, এক ছেলেকে মজুরী করিতে পাঠাইয়া তার বেতন অগ্রিম লইল, তার শালার নিকট বাকী টাকা ধার করিল। এই রকম করিয়া জমির দামের অর্দ্ধেক টাকা জোগাড় করিল।
প্যাহোম সেই স্ত্রীলোকটির কাছে চল্লিশ একর জমি কিনিবার বন্দোবস্ত করিতে গেল। কথাবার্ত্তা সব ঠিক হইয়া গেল, তারা সহরে গিয়া দলিল রেজিষ্টারি করিয়া আনিল। প্যাহোম অর্দ্ধেক দাম দিল, বাকী টাকা দুই বৎসরের মধ্যে দিবে এইরূপ চুক্তি থাকিল।
প্যাহোম এখন নিজেই জমিদার। বীজ ধার করিয়া সে নূতন জমিতে বুনিয়া দিল। সে বৎসর খুব ভাল ফসল হইল এবং এক বৎসরের মধ্যেই সে সব দেনা পরিশোধ করিল। এখন আর সে কারও ধার ধারে না; নিজের জমি চাষ করে, নিজের গাছ ইচ্ছামত কাটে, গরু-ঘোড়াগুলি নিজের জমিতেই চরিয়া বেড়ায়। সে যখন মাঠে চাষ করিতে যাইত, মাঝে মাঝে ক্ষেতভরা ফসলের দিকে তাকাইয়া দেখিত, আর তার মন আনন্দে ভরপুর হইয়া উঠিত। তার মনে হইত সে রকম ফুল, ফল, লতা-পাতা বুঝি আর কোথাও—কোনওখানেই নাই। পূর্ব্বে যখন সে মাঠের পাশ দিয়া যাইত, তার ক্ষেত তখন সম্পূর্ণ অন্য রকমের ক্ষেত বলিয়া মনে হইত, এত সুন্দর দেখাইত না; কিন্তু এখন তার কাছে সেটা একেবারে আলাদা জিনিষ বলিয়া মনে হইত।
—৩—
প্যাহোমের মন খুব খুশী। সে আছেও খুব ভাল; কিন্তু বাড়ীর পাশের কৃষকদের গরু-ঘোড়া আসিয়া তার ক্ষেতের ফসল নষ্ট করিয়া ফেলিত। প্যাহোম খুব কাকুতি-মিনতি করিয়া তাদের বারণ করিল; কিন্তু তারা শুনিল না। মাঝে মাঝে আবার তারা গরু-ঘোড়া ক্ষেতের মধ্যে ছাড়িয়া দিয়া যাইত। বহুদিন সে গরু-ঘোড়া তাড়াইল, কারও কোন অনিষ্ট করিল না; কিন্তু পরে তার সহ্য হইল না। ধৈর্য্য হারাইয়া সে জেলার কাছারিতে গিয়া নালিশ করিল। সে জানিত ও বুঝিত যে, তার প্রতিবেশীদের অনেকেরই জমি নাই, তারা ইচ্ছা করিয়াই যে সকল সময় তার অনিষ্ট করে তাও নহে, কিন্তু অন্য উপায় আর কিছু ছিল না। সে ভাবিল, ‘না, কিছু না বললে আর চলে না। আমার যা কিছু আছে সবই ওরা এমনি ক’রে নষ্ট করে দেবে। ওদের একটু শিক্ষা দিতে হবে।’
সে নালিশ করিতে আরম্ভ করিল। দুই-তিন জনের জরিমানা হইল। তারা প্যাহোমের উপর খুব চটিয়া রহিল, আর তার পর হইতে ইচ্ছা করিয়াই গরু-ঘোড়া তার ক্ষেতে ছাড়িয়া দিতে আরম্ভ করিল। একজন তার বাগানে রাত্রিতে ঢুকিয়া পাঁচটি লাইম্গাছ কাটিয়া ফেলিল। একদিন তার নজরে পড়িল—গাছের গুঁড়িগুলি পড়িয়া রহিয়াছে। এবার সে বিষম চটিয়া গেল; ভাবিল, ‘এখান থেকে একটা, সেখান থেকে একটা—এ রকম ক’রেও যদি কাট্ত তা হ’লেও ত যথেষ্ট ক্ষতি হ’ত না; তা না ক’রে এক জায়গা থেকেই সবগুলো কেটে ফেলেছে। যদি লোকটাকে একবার বের করতে পার্তুম ত দেখে নিতুম।’
অপরাধীকে বাহির করিবার জন্য সে খুব মাথা ঘামাইতে লাগিল। ভাবিতে ভাবিতে সে স্থির করিল, স্থির করিল, ‘এ নিশ্চয়ই সাইমন! সে ছাড়া আর কেউ এ কাজ করতে পারে না।’
সে সাইমনের বাড়ীতে গেল, সেখানে কিছুই দেখিতে পাইল না। দুইজনে খুব চটাচটি হইল। প্যাহোমের খুব বিশ্বাস হইল যে, সাইমনই গাছ কাটিয়াছে, কাজেই সে নালিশ করিল। সাইমনের উপর শমন জারি হইল। দুই দুই বার বিচার হইল, কিন্তু প্রমাণের অভাবে সে খালাস পাইল। প্যাহোমের মনে ভারি কষ্ট হইল। বিচারকদের উপর তার রাগ হইল।
সে বলিল—“আপনারাই চোরকে আস্কারা দেন। যদি আপনারা ভাল লোক হ’তেন, তা হ’লে এই চোরকে শাস্তি না দিয়া কখনও ছেড়ে দিতেন না।”
বিচারক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্যাহোম ঝগড়া করিল। তার বাড়ীতে আগুন লাগাইবে বলিয়া অনেকে তাকে ভয় দেখাইতেও লাগিল। কাজেই সকলের চেয়ে জমি বেশী থাকিলেও তার সেখানে থাকা খুব শক্ত হইয়া উঠিল, সে অনেকেরই বিষ নজরে পড়িল।
এমন সময়ে চারিদিকে গুজব রটিল যে, অনেকেই সেই পল্লী ছাড়িয়া অন্য এক জায়গায় চলিয়া যাইতেছে—সেখানে জমাজমির খুব সুবিধা।
প্যাহোম ভাবিল, ‘আমার সেখানে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। যদি অনেকেই চ’লে যায় তা’ হ’লে আমি আরও বেশী জমি পাব। ওদের জমি নিয়ে জমিদারী আরও বাড়াব; তখন বেশ শান্তিতে থাক্ব।’
প্যাহোম বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছে এমন সময় একজন কৃষকের সহিত তার দেখা হইল। তার বাড়ীতে খাওয়া-দাওয়া করিয়া কৃষকটি রাত্রিতে সেখানেই রহিল।
দুইজনে অনেক কথা হইল।
সেই কৃষক বলিল—“আমি ভল্গা নদীর ওপার থেকে এসেছি, সেখানে বহুলোক গিয়ে বসবাস কর্ছে। যে যাচ্ছে সে-ই পঁচিশ একর জমি পাচ্ছে। সেখানে খুব ফসল হয়, রাই এত জন্মে যে, কাস্তের পাঁচটা পোঁচেই এক একটা আঁটি হয়। একজন চাষা একেবারে শুধুহাতে সেখানে গিয়েছিল, এখন সে নিজেই ছয়টা ঘোড়া আর দুইটা গরু কিনেছে।”
সেখানে যাইতে প্যাহোমের বড়ই ইচ্ছা হইল। সে ভাবিল, ‘যদি অন্য জায়গায় গেলে বেশ সুখে থাক্তে পারি, দু’পয়সা হয়, তবে এ-রকম একটা জায়গায় থেকে কষ্ট পাচ্ছি কেন? বাড়ী ঘর, জমি—সব বিক্রী করে সেখানে গিয়ে নতুন জমি কিনে ঘর-দোর তৈরী ক’রে বাস কর্ব। এখানে মানুষের বসতি বড্ড বেশী হ’য়ে গেছে, সব সময়েই এখানে অসুবিধা। কিন্তু আগে সেখানে গিয়ে সব দেখে আস্তে হবে।
গ্রীষ্মকাল আসিল। প্যাহোম সেখানে যাইবার জন্য যাত্রা করিল; ষ্টিমারে করিয়া ভল্গা নদী পার হইয়া প্রায় তিনশত মাইল চলিয়া গেল। সেখানে গিয়া দেখিল সত্য সত্যই সকলেরই প্রচুর পরিমাণে জমি আছে। টাকা থাকিলে আরও কিনিতে পারা যায়, দামও খুব সস্তা।
সকল দেখিয়া-শুনিয়া শরৎকালে সে বাড়ী ফিরিল; গরু ঘোড়া, বাড়ী—সব বিক্রী করিল, এবং বসন্তকালে পরিবার লইয়া সেখানে যাত্রা করিল।
—৪—
সেখানে গিয়া প্যাহোম জমি পাইল, আরও কিছু কিনিল। সে দেখিল যে জমিতে বাস্তবিকই খুব ফসল হয়। তার সংসারের অবস্থা পূর্ব্বের চেয়ে দশগুণ ভাল হইল।
প্রথম প্রথম সে খুব সন্তুষ্টই রহিল! কিন্তু মানুষের ইচ্ছা ক্রমশঃ বাড়িয়াই যায়। কিছুদিন পরে সে মনে করিল যে, সে জমিও যথেষ্ট নয়। তার আরও জমি বাড়াইতে ইচ্ছা হইল। সব মাঠে আবার গম জন্মিত না। দুই বৎসর ক্রমাগত ফসল হইলে, কয়েক বৎসর না গেলে আর সে মাঠে কিছু জন্মিত না। কাজেই আবার নূতন জমি খুঁজিতে হইল। প্যাহোম কাছে জমি পাইল না—দূরে পাইল বটে, কিন্তু তাতে তার মন উঠিল না। সে অত্যন্ত অসুবিধা বোধ করিতে লাগিল।
তিন বৎসর কাটিয়া গেল। খুব ভাল জমি পাইবার জন্য সকলের মধ্যে কাড়াকাড়ি লাগিয়া গেল; খুব চতুর না হইলে ও সময়মত চেষ্টা না করিলে তা পাওয়াও শক্ত হইয়া উঠিল।
তৃতীয় বৎসরে এক জমি লইয়া গোল বাধিল। এমন কি তা লইয়া মামলাও হইল। প্যাহোমের সমস্ত পরিশ্রম পণ্ড হইল। সে ভাবিল, ‘এ জমি যদি আমার হ’ত তা হ’লে স্বাধীনভাবে থাকতেও পারতুম—আর ঝগড়াও হ’ত না।’
পনের শত টাকা দিয়া একটা জায়গা কিনিবার জন্য এক মহাজনের সঙ্গে তার কথা হইতেছে এমন সময়ে একজন বিদেশী ব্যবসাদার তার বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইল। সে খুব ক্লান্ত। প্যাহোমের সঙ্গে বসিয়া সে চা খাইল। সেই ব্যবসাদার কথায় কথায় বলিল—“আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে খুব সস্তায় ভাল ভাল জমি পাওয়া যায়। আমি ত মোটে হাজার টাকা দিয়ে তের হাজার একর জমি কিনেছি।”
প্যাহোম জিজ্ঞাসা করিল—“এত সস্তায় কি ক’রে কিনলে?”
—“বিশেষ কিছুই নয়। সেখানকার কর্ত্তাদের কিছু জিনিষ-পত্তর দিয়ে খুশী কর্তে পারলেই হ’ল। আমি ত মদ দিয়ে তাদের হাত ক’রেছিলুম। খুবই সুবিধে, যত চাও ততই পাবে। এ এক রকম বিনি পয়সায় পাওয়া।
—“আমি তা হ’লে সেখানেই যাব। যে টাকা দিয়ে এখানে জমি কিন্ব সে টাকায় সেখানে এর দশগুণ জমি পাব।”
—৫—
তার স্ত্রীকে বাড়ীতে রাখিয়া একজন লোক সঙ্গে লইয়া প্যাহোম যাত্রা করিল। পথে একটা সহরে গিয়া প্রথম দিন রহিল; সেখানে এক বাক্স চা, কিছু মদ ও কতকগুলি ভাল ভাল উপহার দিবার মত জিনিষ কিনিল। প্রায় তিন শত মাইল চলিয়া গিয়া সাত দিনের দিন সে সেখানে পৌঁছিল। সেখানে গিয়া সে সত্য সত্যই দেখিল চারিদিকে ভারি সুন্দর সুন্দর ক্ষেত। লোকগুলিও সেখানে আছে মহাসুখ-শান্তিতে। কারও কোন ভাবনা নাই—উদ্বেগ নাই। গরু, ঘোড়া সব স্বচ্ছন্দে মাঠে চরিয়া বেড়াইতেছে। সকলেরই শরীর বলিষ্ঠ, সকলেই খুব খুশী। তারা লেখাপড়ার ধার ধারে না বটে, কিন্তু তাদের স্বভাব খুব ভাল।
প্যাহোম তাদের মদ, চা ইত্যাদি উপহার দিল। উপহার পাইয়া তারা খুব খুশী হইল। তারা নিজেদের মধ্যে অনেক কথাবার্ত্তা কহিয়া শেষে প্যাহোমকে বলিল—“তুমি আমাদের এখানে এসেছ, আমরাও তোমার ওপর খুব খুশী হ’য়েছি। তুমি আমাদের যে উপহার দিয়েছ আমরাও তার প্রতিদান দিতে চাই। আমাদের যা আছে তার কোন্টা তুমি চাও বল!”
প্যাহোম বলিল—“আমি যদি আপনাদের এখানকার কিছু জমি পাই, তা হ’লে আমার বড় উপকার হয়। আমাদের ওখানে জমি বেশী নেই, লোক খুব বেশী। আপনাদের খুব ভাল ভাল যথেষ্ট জমি আছে, এরকম জমি আমি আর কোথাও দেখি নি।”
তারা নিজেদের মধ্যে অনেকক্ষণ কথাবার্ত্তা বলিল। মাঝে মাঝে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিতে লাগিল। প্যাহোম তাদের কোন কথাই বুঝিতে পারিল না। একজন দোভাষী মাঝখানে থাকিয়া তাকে সব বুঝাইয়া দিতেছিল। তারা চুপ করিয়া প্যাহোমের দিকে চাহিয়া রহিল।
—“তুমি যে উপহার দিয়েছ তার জন্যে ওঁরা তোমাকে জমি দিতে প্রস্তুত আছেন। তোমার যত জমি চাই ততই পাবে। কোন্ জমি নেবে কেবল হাত দিয়ে তা একবার দেখিয়ে দেবে।”
দোভাষীর কথা শেষ হইতে সেই লোকদের মধ্যে কথা আরম্ভ হইল। দেখিতে দেখিতে ঝগড়াও বাধিয়া গেল। কেহ কেহ বলিল—“সর্দারকে জিজ্ঞেস না ক’রে কথা দেওয়া খুব অন্যায় হ’য়েছে।”
প্যাহোম দোভাষীকে ঝগড়ার কারণ জিজ্ঞাসা করিল। দোভাষী তাকে সব বুঝাইয়া বলিল। লোকে ইহাদের বস্কির্ বলিত।
—৬—
বস্কির্দের মধ্যে ঝগড়া হইতেছে এমন সময় একজন লোক শেয়ালের লোমের টুপি পরিয়া সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল। সকলেই উঠিয়া দাড়াইল এবং চুপ করিল। দোভাষী বলিল―“ইনিই হচ্ছেন আমাদের সর্দ্দার।”
প্যাহোম তৎক্ষণাৎ পাঁচ পাউণ্ড চা ও একটা পোষাক আনিয়া সর্দ্দারকে দিল। সর্দ্দার সেগুলি গ্রহণ করিয়া নিজের আসনে বসিলেন। বস্কির্রা তাঁকে অনেক কিছু বলিল, সর্দ্দার সব কথা মন দিয়া শুনিলেন। তারপর সকলকে চুপ করিতে বলিয়া প্যাহোমকে বলিলেন—“বেশ তা-ই হোক, আমাদের ত যথেষ্ট জমি আছে, তোমার যেটা ইচ্ছা নিতে পার।”
প্যাহোম ভাবিল, ‘কি করে নেব? পাকা লেখাপড়া ক’রে নেওয়া চাই, নইলে এরা আজকে আমায় দিচ্ছে, কালকে আবার কেড়েও নিতে পারে।”
সে প্রকাশ্যে বলিল—“আপনার দয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমি সামান্য কিছু জমি চাই, কিন্তু যেটা নেবো, সেটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত ক’রে নিতে হবে। জমিটা কি মেপে নেওয়া যায় না? জন্ম ও মৃত্যু ত ভগবানের হাত। আপনারা খুব সাধুলোক, কিন্তু আপনাদের ছেলেরা সেটা আবার কেড়েও নিতে পারে।”
সর্দ্দার বলিলেন—“হাঁ, তুমি ঠিকই ব’লেছ। আর এ খুব সহজেই হ’তে পার্বে—আমি সহরে গিয়ে দলিল রেজেষ্ট্রি ক’রে দেবো।”
প্যাহোম জিজ্ঞাসা করিল—“দাম কত হবে?”
—“আমাদের চিরকালই একদাম, একদিনে হাজার টাকা।”
প্যাহোম বুঝিতে পারিল না; বলিল—“একদিন? সে কি রকম? তাতে কত একর হবে?”
—“আমরা দিন হিসাবে বিক্রী করি, পরিমাণ কত হবে বল্তে পারিনে। একদিনের ভেতরে পায়ে চ’লে তুমি যত দূর গিয়ে ঘুরে আস্তে পার্বে ততখানি জমি তোমার হবে। দাম হাজার টাকা।”
প্যাহোম আশ্চর্য্য হইয়া গেল; বলিল—“একদিনে ত অনেকটা জায়গা ঘুরে আস্তে পারা যায়।”
সর্দ্দার হাসিয়া বলিলেন—“বেশ ত সবই তোমার হবে। কিন্তু একটা কথা, যদি একদিনের ভেতরে যেখানে থেকে রওনা হবে ঠিক সেখানে ফিরে আস্তে না পার তা হ’লে তোমার টাকা মারা যাবে।”
—“আমি যে পথে চ’লে যাব তার চিহ্ন রাখব কি ক’রে?”
—“কেন? যে কোন জায়গায় ইচ্ছে তুমি গিয়ে দাঁড়াবে, সেখান থেকে একখানি কোদালি নিয়ে রওনা হবে। যেখানে যেখানে চিহ্ন রাখা দরকার মনে কর্বে সেখানে সেখানে চিহ্ন দেবে। যেখানেই মোড় ফির্বে সেখানেই একটা গর্ত খুঁড়বে এবং কতকগুলি ঘাসের চাপড়া গাদা ক’রে রাখ্বে; এম্নি করে যতদূর ঘুরে আস্বে ততটা জায়গা তোমার হবে, কিন্তু মনে রেখো যেখান থেকে তুমি বেরুবে, সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে আবার ঠিক সেখানে এসে তোমার পৌঁছনো চাই।”
প্যাহোমের ভারি আনন্দ হইল। পরদিন খুব ভোরে বাহির হওয়াই সে স্থির করিল। আর দুই একটা কথা হইতে না হইতেই চারিদিক্ অন্ধকার হইয়া আসিল। প্যাহোমকে শুইবার জন্য পাখীর পালকের খুব নরম বিছানা দেওয়া হইল। বস্কির্রাও সব চলিয়া গেল।
—৭—
প্যাহোম পালকের বিছানায় শুইল বটে, কিন্তু তার ঘুম হইল না। শুইয়া শুইয়া ভাবিতে লাগিল, অনেকদূর অবধি চিহ্ন দিয়ে ঘুরে আস্ব। একদিনে খুব সহজেই পঁয়ত্রিশ মাইল চক্কর দিতে পার্ব দিনগুলোও খুব লম্বা। ওঃ! কত জমিই না হবে! খারাপ জমিগুলো সব বেচে দিয়ে ভালগুলো নিজে রাখব। গরু আর ঘোড়া কতকগুলো কিন্তে হবে, আর বহু লোকও খাটাতে হবে। দেড়শ’ একর চাষ করে ভাল ভাল ফসল জন্মাব, বাকীগুলোয় গরুঘোড়া চরবে।”
প্যাহোম সমস্ত রাত্রি জাগিয়া কাটাইল, কেবল ভোর হইবার পূর্ব্বে তার একটু তন্দ্রার মত হইল। তন্দ্রার ঘোরে সে একটি স্বপ্ন দেখিল,—সে যেন একটা তাঁবুতে শুইয়া আছে। এমন সময়ে বাহিরে একটা মানুষের উচ্চ হাসির শব্দ শুনিয়া সে যেন তাকে দেখিতে গেল। গিয়া দেখিল যে, বস্কির্দের সর্দ্দার হাসিয়া লুটোপুটি খাইতেছেন।
প্যাহোম জিজ্ঞাসা করিল—“সর্দ্দার, আপনি এত হাস্ছেন কেন?” কিন্তু একটু পরেই দেখিল যে, সে সর্দ্দার নয়; যে সদাগরের সঙ্গে সেখানে আসিবার পূর্ব্বে তার দেখা হইয়াছিল, সে যেন সেই সওদাগর। যেমনি তাকে জিজ্ঞাসা করিল—“তুমি কি এতদিন এখানেই ছিলে?” অমনি দেখিল যে, এ সে সওদাগর নয়; তার নিজের দেশের বাড়ীতে বসিয়া যে বিদেশী কৃষকের সঙ্গে প্রথমে দেখা হইয়াছিল, এ সেই কৃষক। তারপর সে দেখিল, এ সে কৃষকও নয়, যেন একটা প্রেতমূর্ত্তি; আর তার সামনে খালি গায়ে খালি পায়ে একটা মানুষ পড়িয়া আছে। ভাল করিয়া দেখিয়া বুঝিতে পারিল যে, একটা মরা মানুষ—আর সেটা যেন তার নিজেরই মৃতদেহ। তার ভীষণ ভয় হইল।
স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। সে ভাবিল, স্বপ্নে মানুষ কি না দেখে!
তখন প্রায় ভোর হইয়াছে! সে ভাবিল, ‘আমাদের বেরুবার সময় হ’য়েছে, সকলকে জাগানো দরকার।’
সে উঠিয়া তার চাকরকে উঠাইল, এবং বহ্মির্দেরও ডাকিয়া তুলিল। তারা উঠিল, চা খাইয়া শরীর গরম করিল। তখন প্যাহোম বলিল—“সময় হ’য়েছে, যদি যেতেই হয় তবে চলুন এখনই যাই।”
—৮—
বস্কির্রা রওনা হইল। কেহ বা ঘোড়ায় চড়িল, কেহ বা গরুর গাড়ীতে উঠিল। প্যাহোম তার চাকরকে লইয়া গাড়ীতে উঠিল। যখন তারা মাঠে নির্দ্দিষ্ট স্থানে গিয়া পৌঁছিল, তখন পূবদিক লাল হইয়া উঠিয়াছে। ছোট একটা পাহাড়ের উপরে সকলে জড় হইল। সর্দ্দারও সেখানে আসিলেন এবং হাত দিয়া চারিদিকে দেখাইয়া বলিলেন—“যতদূর তোমার চোখ যায় ততদূর কেবল আমাদেরই জায়গা। তোমার ইচ্ছামত এর যে কোনও অংশ তুমি নিতে পার।”
প্যাহোম দেখিল চারিদিকে কেবল সবুজ মাঠ। তার চোখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
সর্দ্দার তাঁর টুপিটা খুলিয়া মাটিতে রাখিয়া বলিলেন—“এখান থেকে রওনা হবে, আবার এখানেই ফিরে আস্বে। যতদূর ঘুরে আস্তে পার্বে ততটা জায়গা তোমারই হবে।”
প্যাহোম টাকা বাহির করিয়া সর্দ্দারের টুপিতে রাখিল; তারপর কোটটা খুলিয়া ফেলিল, কোমরে একটা বেল্ট শক্ত করিয়া আঁটিয়া বাঁধিল, একটা ব্যাগে করিয়া কিছু রুটি আর একটা বোতলে জল লইল। তারপর চাকরের হাত থেকে কোদালিখানা লইয়া সে রওনা হইবার জন্য প্রস্তুত হইল। চারিদিকেই কেবল সবুজ―কেবল সবুজ, কোন্ দিকে যাইবে কিছুই স্থির করিতে পারিল না। শেষে স্থির করিল—‘যাক, যেদিকে সূর্য্যিটা টক্টকে লাল হ’য়ে উঠ্ছে, সেদিকেই যাব।’
পূবদিকে মুখ করিয়া ভাবিল—‘না আর সময় নষ্ট কর্ব না, ঠাণ্ডায় ঠাণ্ডায় যতটা এগিয়ে যেতে পারি ততই ভাল।”
পাহাড় হইতে নামিয়া প্যাহোম চলিতে লাগিল; খুব জোরে চলিল না, আর খুব আস্তে আস্তেও নয়। হাজার গজ গিয়া সে একটি গর্ত্ত খুঁড়িল, দূর থেকে দেখা যেতে পারে এমন ভাবে কতকগুলি ঘাসের চাপড়া উঁচু করিয়া রাখিল; তারপর খুব জোরেই চলিতে লাগিল, কিছুদূর গিয়া আর একটা গর্ত্ত খুঁড়িল।
প্যাহোম একবার পিছন দিকে তাকাইল। সেই ছোট্ট-পাহাড়, আর লোকজন সবই সূর্য্যের আলোকে বেশ পরিষ্কার দেখা যাইতে লাগিল। সে অনুমান করিল যে, তিন মাইল আসিয়াছে।
তখন রৌদ্রের তেজ ক্রমশঃ বাড়িতে লাগিল। প্যাহোম জামা খুলিয়া কাঁধে রাখিল। রৌদ্র আরও বাড়িল। তখন খাবার সময় হইয়াছে ভাবিয়া সে কিছু খাইল। সে ভাবিল, ‘মোড় ফেরবার এখন ঢের সময় র’য়েছে, জুতা খুলে চল্লে অনেকটা যেতে পারবো।’
জুতা খুলিয়া চলিতে চলিতে সে ভাবিল, ‘আর তিন মাইল গিয়ে বাঁ-দিকে ফিরব। এমন সুন্দর জায়গা ছেড়ে যাওয়া যায় না, যতই এগুচ্ছি ততই আরো ভালো জমি পড়্ছে।’
সে আরও খানিকক্ষণ সোজা চলিল। ফিরিয়া চাহিল, পাহাড়টা আর ভাল করিয়া দেখা যায় না। পাহাড়ের লোকগুলি কালো কালো পিঁপড়ার মত দেখাইতেছিল। সে ভাবিল, ‘এদিকে খুব দূরে চলে এসেছি, এখন ফির্ব। বড় ঘাম হচ্ছে, ভয়ানক তেষ্টাও পেয়েছে।’
থামিয়া সে একটা গর্ত্ত খুঁড়িল, কতকগুলি ঘাসের চাপড়া স্তূপ করিয়া রাখিল; বোতলের ছিপি খুলিয়া খানিকটা জল খাইল, তারপর বাঁ-দিকে ফিরিয়া খুব জোরে চলিতে লাগিল। সেখানে ঘাসগুলিও খুব উঁচু, রৌদ্রও ভয়ানক কড়া।
প্যাহোম অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িল। সূর্য্যের দিকে চাহিয়া দেখিল বেলা দুই প্রহর; ভাবিল, ‘এখন বিশ্রাম করা দরকার।’
সে বসিয়া পড়িল, কিছু রুটি আর জল খাইল, কিন্তু শুইল না—পাছে ঘুমাইয়া পড়ে। খাইয়া শরীরে একটু জোর পাইল। আবার সে চলিতে আরম্ভ করিল। এবার একেবারে অসহ্য গরম, তবুও সে চলিতে লাগিল; ভাবিল, ‘একদিন কষ্ট করে চিরদিন সুখে কাট্বে।’
সে বাঁ-দিকে বহুক্ষণ চলিল; একটা গর্ত্ত খুঁড়িয়া আবার বাঁদিকে ফিরিল। পাহাড় আর দেখা যায় না। রৌজের তেজে দূরের সব ধোঁয়াটে ধোঁয়াটে দেখাইতে লাগিল। সে ভাবিল, ‘এ দু’দিকে বড় বেশী চলে এসেছি, এখন একেবারে সোজা পাহাড়ের দিকে চ’লে যা’ব।’
পশ্চিম দিকে চাহিয়া সে দেখিল সূর্য্য অর্দ্ধেক পথ নামিয়া পড়িয়াছে। সে খুব দ্রুত চলিতে লাগিল। তখন দুই মাইলও সে আসিতে পারে নাই। তাকে আরও দশ মাইল আসিতে হইবে। সে ভাবিল, ‘এখন একেবারে সোজাই চল্ব। আরও বেশী দূরে যেতে পারতুম! থাক্ যথেষ্ট আমি পেয়েছি!’
আর একটা গর্ত্ত খুঁড়িয়া প্যাহোম বরাবর পাহাড় লক্ষ্য করিয়া চলিতে লাগিল।
—৯—
প্যাহোমের চলিতে অত্যন্ত কষ্ট হইতে লাগিল। ভয়ানক গরম, সে অত্যন্ত কাবু হইয়া পড়িল। তার পা কাটিয়া চিরিয়া গিয়াছে, আর চলিতে পারে না। বিশ্রাম করিতে তার অত্যন্ত ইচ্ছা হইল, কিন্তু সূর্য্যাস্তের পূর্ব্বে পৌঁছানো চাই-ই। সূর্য্য কারও জন্য অপেক্ষা করে না, সে আস্তে আস্তে ডুবিয়া যাইতেছিল।
সে ভাবিল, ‘হায়, হায়! খুব বেশী দূরে ঘুরতে গিয়ে কি বিষম ভুল করলুম। যদি ঠিক সময়ে যেতে না পারি, কি হবে?’
একবার পাহাড়ের দিকে চাহিয়া সূর্য্যের দিকে চাহিল; তখনও সে অনেক দূরে। সূর্য্য একেবারে নামিয়া পড়িয়াছে।
প্যাহোম ক্রমাগত চলিতে লাগিল। তার ভয়ানক কষ্ট হইতেছিল, তবুও প্রাণপণে চলিতে লাগিল। তখনও সে অনেক দূরে। টুপি, কোট, জুতা, জলের বোতল সব ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিয়া সে ছুটিতে লাগিল; কেবল কোদালিখানা সঙ্গে রাখিল, আর তার উপর মাঝে মাঝে ভর দিয়া চলিতে লাগিল।
হতাশ হওয়ায় সে আরও দুর্ব্বল হইয়া পড়িল, কিন্তু আবার ছুটিতে লাগিল। ঘামে সমস্ত কাপড় গায়ের সঙ্গে আঁটিয়া গেল, গলা শুকাইয়া কাঠ হইল, কামারের হাপরের মত তার নিঃশ্বাস পড়িতে লাগিল, আর হাতুড়ীর মত তার বুকের ভিতর কুটিতে লাগিল, পা-ও অবশ হইয়া আসিল। তার মরণের ভয় হইল।
কিন্তু ভয় সত্ত্বেও সে থামিল না। ভাবিল, ‘এতটা পথ চ’লে এসে যদি এখানে থামি, তা হ’লে তারা আমাকে নিতান্ত বোকা বল্বে।’ সে আবার দৌড়াইতে আরম্ভ করিল। এবার পাহাড়ের অনেকটা কাছাকাছি আসিল। তখন শুনিতে পাইল যে, বস্কির্রা চীৎকার করিয়া তাকে উৎসাহ দিতেছে। তার মনে একটা নূতন বল আসিল, আবার প্রাণপণ করিয়া ছুটিতে আরম্ভ করিল।
সূর্য্য একেবারে নামিয়া পড়িয়াছে, রক্তের মত লাল, জ্বল্জ্বল্ করিতেছে। প্যাহোমও তার নির্দ্দিষ্ট স্থানের একেবারে কাছে আসিয়াছে। পাহাড়ের উপরের লোকদের বেশ দেখিতে পাওয়া যাইতেছে। সে সেই টুপিও দেখিতে পাইল। সে সর্দ্দারও সেখানে বসিয়া আছেন। স্বপ্নে সে তাঁকে যে রকম দেখিয়াছিল ঠিক সেই রকম দেখিল। স্বপ্ন তার মনে পড়িল; ভাবিল, ‘জমি যথেষ্ট হ’য়েছে বটে, কিন্তু ভোগ কর্বার জন্যে ভগবান্ আমাকে বাঁচিয়ে রাখ্বেন কি? উঃ! আমার প্রাণ যে যায়! মারা গেলুম, আমি কখনও ওখানে পৌঁছতে পার্ব না!’
প্যাহোম চাহিয়া দেখিল যে, সূর্য্য পৃথিবীর গায়ে আসিয়া ঠেকিয়াছে, অর্দ্ধেকটা ডুবিয়া গিয়াছে। প্রাণপণ শক্তিতে সে আর একবার দৌড়িল, মাথাটা সাম্নের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িল, পা যেন ঠিক মাথার সঙ্গে সঙ্গে আর যাইতে পারিতেছে না। সে যেমনি পাহাড়ের গোড়ায় আসিল, দেখিল—হঠাৎ সব অন্ধকার; চাহিয়া দেখিল সূর্য্য অস্ত গিয়াছে। তার সমস্ত পরিশ্রম ব্যর্থ হইয়াছে মনে করিয়া সে একটা ভয়ানক চীৎকার করিয়া উঠিল। কিন্তু বস্কির্রা তাহাকে শীঘ্র শীঘ্র যাইবার জন্য চীৎকার করিয়া বলিতেছে শুনিয়া সে বুঝিতে পারিল যে তখনও পাহাড়ের উপর হইতে সূর্য্য দেখা যাইতেছে। আর একবার দম লইয়া সে পাহাড়ে উঠিতে লাগিল। পাহাড়ে উঠিয়া টুপি আর টাকাও দেখিতে পাইল। টুপির সামনেই বস্কির্দের সর্দ্দার বসিয়া আছেন—আর হাসিয়া লুটোপুটি খাইতেছেন। স্বপ্নের কথা আবার প্যাহোমের মনে পড়িল, সে চেঁচাইয়া উঠিল। পা তার একেবারে অবশ,—সে লম্বা হইয়া পড়িয়া হাত বাড়াইয়া টুপি স্পর্শ করিল। সর্দ্দার চেঁচাইয়া বলিয়া উঠিলেন—“সাবাস্! সাবাস্! ঢের জমি পেয়েছ।”
প্যাহোমের চাকর ছুটিয়া আসিল এবং তাকে তুলিতে গেল, কিন্তু আর তুলিতে পারিল না। প্যাহোমের মুখ দিয়া তখন গল্গল্ করিয়া রক্ত পড়িতেছে, সে মরিয়া গিয়াছে।
বস্কির্রা সকলেই জিভ্ কাটিল।
প্যাহোমের চাকর কোদালি দিয়া ছয় ফুট লম্বা একটি কবর খুঁড়িয়া তাতে প্যাহোমকে সমাহিত করিল।
প্যাহোমের শুধু এইটুকু জমিরই দরকার ছিল।