টল্স্টয়ের গল্প/সুরাটের কাফিখানা
সুরাটের কাফিখানা
সুরাট নগরে একটা কাফিখানা ছিল। জগতের সকল স্থান হইতেই সেখানে অতিথি আসিত এবং অনেকে একত্র হইয়া অনেক বিষয় আলোচনা করিত।
একদিন একজন পারস্যদেশীয় খুব বিদ্বান্ মোল্লা সেই কাফিখানায় উপস্থিত হইলেন। তিনি ধর্ম্মতত্ত্ব সম্বন্ধে অনেক বই পড়িয়া সারা জীবন কাটাইয়াছেন। ভগবান্ সম্বন্ধে এত পড়িয়াছেন—চিন্তা করিয়াছেন ও এত লিখিয়াছেন যে, শেষে তাঁর, বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পাইয়া গেল। মাথা এমন খারাপ হইল যে, ক্রমে ঈশ্বর আছেন কিনা—এরূপ ভাবনা তাঁর মাথায় আসিতে লাগিল। পারস্যের রাজা ইহা শুনিতে পাইয়া দেশ হইতে তাঁকে তাড়াইয়া দিলেন।
চিরকাল ঈশ্বর-সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া এই হতভাগ্য মোল্লা তত্ত্বকথা এত জটিল করিয়া নিজেকে একেবারে হতবুদ্ধি করিয়াছেন। তিনি বুঝিতেন না যে, বিচার-বুদ্ধি তিনি একেবারে হারাইয়া ফেলিয়াছেন। ভগবান্ বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড জুড়িয়া আছেন, এ কথায় তাঁর ধোঁকা ঠেকিতে লাগিল।
তাঁর একজন ক্রীতদাস ছিল। সে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত। পারস্যের এই পণ্ডিত কাফিখানার ভিতর আসিলেন। তাঁর এক ভৃত্য দরজার কাছে রোদে একটা পাথরের উপর বসিয়াছিল। তাকে ঘিরিয়া মাছি ভন্ভন্ করিতেছিল—আর সে সেইগুলি তাড়াইতেছিল। সেই কাফিখানাতেই তামাক খাইবার ঘরে বসিয়া সেই পণ্ডিত আফিং চাহিলেন। আফিং খাইয়া যখন তাঁর মাথার ভিতর বেশ ঝিম্ঝিম্ করিতে লাগিল তখন তিনি তাঁর সেই চাকরটাকে ডাকিয়া বলিলেন—“ওরে বেটা মুখ্যু, তুই আমায় বল ত ভগবান্ আছেন, না নেই?”
“নিশ্চয়ই তিনি আছেন” বলিয়া সেই ক্রীতদাস তার কোমরবন্ধ হইতে তখনি ছোট্ট একটি কাঠের পুতুল বাহির করিল।
সে বলিল—“এই ঈশ্বর—যিনি আমাকে জন্মকাল থেকে রক্ষা ক’রে আস্ছেন। যে গাছের কাঠ দিয়ে এই ঈশ্বর তৈরি হন, সেই গাছকেও আমাদের দেশের সকলে পূজা ক’রে থাকে।”
পণ্ডিত ও ক্রীতদাসের এই কথাবার্ত্তা কাফিখানার সমস্ত অতিথি মন দিয়া শুনিতেছিলেন। পণ্ডিতের প্রশ্নে ও তাঁর ভৃত্যের উত্তরে তাঁরা অবাক্ হইলেন। সমাগত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন ব্রাহ্মণ। তিনি ক্রীতদাসের দিকে ফিরিয়া বলিলেন—“হতভাগ্য মূর্খ, এ কি কখনও সম্ভব যে ভগবানকে কেউ ব’য়ে আন্তে পারে? ভগবান্ একজন এবং তিনি এই সমস্ত জগতের চাইতেও বড়; কারণ এ জগৎ ত তাঁরই সৃষ্টি। সবার চেয়ে তাঁর শক্তি বেশী। তাঁরই জন্যে গঙ্গাতীরে কত শত মন্দির তৈরি হয়েছে; সেখানে তাঁর যথার্থ পূজারী ব্রাহ্মণেরা তাঁর পূজা ক’রে থাকেন। তাঁরাই শুধু ব্রহ্মকে জানেন, তাঁরা ভিন্ন আর কেউ জানে না। সেই এক অদ্বিতীয় ব্রহ্ম—প্রকৃত ভগবান্ এই ব্রাহ্মণদের রক্ষা করেছেন ব’লে যুগে যুগে, অসংখ্য বিপ্লবের মধ্যেও তাঁরা নিজের প্রাধান্য অটল রাখ্তে পেরেছেন।
ব্রাহ্মণ এইরূপ বলিলেন। তিনি মনে করিলেন যে, সেখানকার প্রত্যেকেই তাঁর কথা বিশ্বাস করিয়াছে; কিন্তু সেখানে একজন ইহুদী দালাল ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণকে বলিলেন—“না, প্রকৃত ভগবানের মন্দির ভারতবর্ষে নহে, কিংবা তিনি ব্রাহ্মণ জাতিকে রক্ষাও করেন না। প্রকৃত ভগবান্ ব্রাহ্মণদের ভগবান্ ন’ন, তিনি হচ্ছেন আব্রাহাম, আইজাক ও জেকবের ঈশ্বর। তিনি তাঁর বাছাই-করা প্রিয় ইজরাইলদের ছাড়া আর কাউকে রক্ষা করেন না। জগতের সৃষ্টি অবধি কেবল আমাদের জাতই তাঁর প্রিয় হয়েছে। আমরা এখন পৃথিবীর এখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়েছি বটে, কিন্তু তা’ তিনি করেছেন শুধু আমাদের পরখ কর্বার জন্যে। নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাক্লেও তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, একদিন সকলকে জেরুজালেমে জড় কর্বেন। পুরাতন পৃথিবীর আশ্চ্যর্য জিনিষ জেরুজালেমের মন্দির আবার আলো ক’রে জগতের সকল জাতির উপর শাসন কর্বার জন্যেই তিনি ইজরাইলের প্রতিষ্ঠা করেছেন।”
ইহুদী এইরূপ অনেক কথা বলিতে বলিতে চোখের জল ফেলিতে লাগিলেন। তিনি আরও বলিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু একজন ইটালির পুরোহিত সেখানে ছিলেন। তিনি তাঁকে বাধা দিয়া বলিলেন— “আপনি যা বলেছেন তা’ একেবারেই মিথ্যা। আপনি ভগবানের উপর একটা অবিচার আরোপ কর্ছেন! অন্যান্য সব জাতকে বাদ দিয়ে তিনি আপনাদের জাতটাকেই বেশী ভালবাসেন না। যদিও এটা সত্যি যে, তিনি পূর্ব্বে ইজরাইলদের ভালবাসতেন, তারা এক হাজার নয়শত বৎসর পূর্ব্বে তাঁর ক্রোধের কারণ হয়েছে, তার জন্যেই ইহুদী জাত অধঃপাতে গেছে, ভগবান্ তাদের এখানে সেখানে ছড়িয়ে রেখেছেন। তাদের ধর্ম্ম কেহ গ্রহণ করে না, সেটা প্রায় উঠেই গেছে। ভগবান্ কোন জাতিকে বেশী ভালবাসেন না, কিন্তু যারা তাঁর আশ্রয়ে থাক্তে চায় তাদের তিনি রোমের ক্যাথলিক গির্জ্জায় যেতে বলেন। তার বাইরে গেলে—সে গির্জ্জা ছেড়ে অন্য কোন খানে গেলে—মুক্তি লাভ হবে না।”
ইটালির ধর্ম্মযাজকটি এইরূপ বলিলেন। কিন্তু সেখানে একজন প্রোটেস্ট্যাণ্ট পাদ্রীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি সেই ক্যাথলিক ধর্ম্মযাজকের দিকে চাহিয়া তাঁকে উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন—“তুমি কি ক’রে বল্তে পার যে, কেবল তোমাদের ধর্ম্মে যারা রয়েছে শুধু তাদেরই মুক্তি হবে, আর কারুর মুক্তি হবে না? সত্যি সত্যিই যারা বাইবেলে যীশুখৃষ্টের নিজের উপদেশ মত ভগবানের উপাসনা করে তারা তাঁর আশ্রয় পাবে।”
সুরাটের টেক্স আফিসের একজন তুর্কী কর্ম্মচারী কাফিখানায় বসিয়া চুরুট খাইতেছিল। সে ঐ দুই খৃষ্টান পাদ্রীর চেয়েও নিজের ধর্ম্মের মহিমা জাহির করিবার জন্য বলিল—“রোমীয় ধর্ম্মে তোমাদের বিশ্বাসের মূল্য নেই। বারশত বৎসর পূর্ব্বে সত্যধর্ম্ম এটাকে ছোট ক’রে ফেলেছিল। সে ধর্ম্ম হচ্ছে মহম্মদের ধর্ম্ম। তোমরা নিশ্চয় লক্ষ্য ক’রে থাক্বে যে, খাঁটি মুসলমানধর্ম্ম ইউরোপ, এশিয়া, এমন কি সুসভ্য চীনদেশে পর্য্যন্ত কি রকম ছড়িয়ে পড়েছে। তোমরা নিজেরাই বল্ছ যে, ভগবান্ ইহুদীদের অগ্রাহ্য করেছেন এবং এর প্রমাণ-স্বরূপ তোমরাই বল্লে যে, ওদের ভগবান খাটো ক’রে রেখেছেন, তাই ওদের ধর্ম্ম ছড়িয়ে পড়্ছে না! তা হ’লেই মুসলমান-ধর্ম্ম যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম্ম এইটে স্বীকার কর, কারণ এটা দেশে দেশে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়্ছে! ভগবানের শেষ অবতার মহম্মদকে যারা ভজনা না কর্বে, তাঁর ধর্ম্ম যারা গ্রহণ না কর্বে, তারা মুক্তি পাবে না; কিন্তু এই মহম্মদের শিষ্যদের ভিতরে যারা ওমরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে তারাই শুধু মুক্তি পাবে, আলিকে যারা অনুসরণ কর্বে তারা মুক্তি পাবে না, আলি ধর্ম্মে আস্থাহীন।”
পারস্যের সেই মোল্লা আলির দলভুক্ত। তিনি ইহার উত্তর দিতে ইচ্ছা করিলেন, কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সেখানে উপস্থিত নানান্ ধর্ম্ম ও সম্প্রদায়ের লোকদের ভিতরে এক মহাতর্ক বাধিয়া গেল। সকলেই নিজ নিজ ধর্ম্ম সম্বন্ধে অনেক কথা বলিল, কি করিয়া ভগবানের পূজা করিতে হয়, সে সম্বন্ধে অনেক যুক্তি দেখাইল। তাদের প্রত্যেকেই জাহির করিল যে, শুধু তারই দেশে সকলে ভগবান্কে জানে ও সেখানেই শুধু তাঁর প্রকৃত পূজা হয়।
সকলেই যুক্তি খাটাইল, চীৎকার করিল; একজন চীনবাসী চীনের দার্শনিক মহাপণ্ডিত কন্ফিউসিয়াসের শিষ্য তর্কে যোগ না দিয়া কাফিখানার এককোণে বসিয়া চা পান করিতেছিলেন এবং সকলের যুক্তিতর্ক শুনিতেছিলেন, শুধু তিনি নিজে কোনও কথা বলিলেন না!
তুর্কী তাঁকে দেখিতে পাইয়া বলিল—“আমি যা বল্ছি তাতে আপনি মত দিতে পারেন। আপনি চুপ ক’রে ব’সে আছেন; কিন্তু আমি বুঝ্তে পার্ছি যে, যদি আপনি কিছু বলেন, তা’ হ’লে আমার মতটাই আপনি স্বীকার কর্বেন। আপনাদের দেশ থেকে যে সকল ব্যবসাদার আমার কাছে সাহায্যের জন্যে আসে, তারা ব’লে থাকে যে, যদিও চীনে নানান্ ধর্ম্মের চলন আছে, তবুও চীনদেশের লোকেরা এটাকেই সবচেয়ে বড় ব’লে মনে করে এবং ইচ্ছা ক’রে নিয়ে থাকে। তা’ হ’লে আপনি আমার মতে সায় দিন এবং প্রকৃত ভগবান্ ও তাঁর অবতার সম্বন্ধে আপনার মত আমাকে বলুন।”
সেখানে যারা দাঁড়াইয়াছিল সকলেই সেই চীনবাসীর দিকে ফিরিয়া বলিল—“হ্যাঁ, হ্যাঁ, এ সম্বন্ধে আপনি কি মনে করেন বলুন, আমরা শুনি।”
দার্শনিক কন্ফিউসিয়াসের শিষ্য সেই চীনবাসী চক্ষু বুজিয়া কিছুক্ষণ ভাবিলেন; তারপর চোখ খুলিয়া ঢিলে আস্তিনের ভিতর হইতে হাত বাহির করিয়া, দুই হাত জোড় করিয়া বুকের উপর রাখিলেন ও নরম গলায় বলিতে লাগিলেন—“মহাশয়গণ, ধর্ম্ম বিষয়ে যে একের সঙ্গে অন্যের মিল হয় না, তার প্রধান কারণ হচ্ছে অন্তঃসারশূন্য একটা অহঙ্কার। যদি আপনারা শোনেন, তা’ হ’লে উদাহরণ রূপে একটা গল্প আপনাদের বল্ব, তাতেই আপনারা খুব ভাল ক’রে এটা বুঝ্তে পারবেন।
“আমি চীনদেশ থেকে এখানে ইংলণ্ডের একটা জাহাজে চ’ড়ে এসেছিলুম। সে জাহাজখানা সমস্ত পৃথিবী ঘুরে এসেছে। সুমাত্রা দ্বীপের পূর্ব্ব উপকূলে পানীয় জলের জন্য আমরা নাম্লুম। তখন বেলা দুপুর। আমাদের অনেকে সেখানে নেমে সমুদ্রতীরের নারকেল গাছের ছায়াতে বসেছিল। কাছেই একটা গ্রাম ছিল। আমাদের দলে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় লোক ছিল।
“আমরা সেখানে ব’সে আছি, এমন সময় একজন অন্ধ আমাদের কাছে এলো। তারপরে আমরা জান্তে পার্লুম যে, সুর্য্যটা কি তাই জান্বার জন্যে সে অনেকক্ষণ ধরে এক ভাবে সূর্য্যের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাক্ত।
“এটা বের কর্বার জন্যে সে বহুদিন সূর্য্যের দিকে চেয়ে দেখেছে, কিন্তু তাতে এই ফল হ’ল যে, অত্যন্ত প্রখর আলোয় তার চোখ খারাপ হ’ল, আর সে একেবারে অন্ধ হ’য়ে গেল।
“তারপর সে ভাব্লে—‘সূর্য্যের আলো তরল জিনিষ নয়, কারণ যদি এটা তরল জিনিষ হ’ত, তা’ হ’লে একটা পাত্র থেকে আর একটা পাত্রে ঢালা যেতে পারত, ও হাওয়ায় জলের মত নড়্ত। এটা আগুনও নয়, কারণ আগুন হ’লে জলে নিবে যেত। এটা আত্মাও নয়, কারণ দেখ্তে পাওয়া যাচ্ছে, কোন বস্তুই তা নয়; সুতরাং এটা—এটা কিছুই নয়।’
“এই হ’ল তার যুক্তি; ক্রমে অনবরত সূর্য্যের দিকে চেয়ে চেয়ে এবং এই নিয়ে চিন্তা ক’রে ক’রে তার যুক্তি ও দৃষ্টি দুইই লোপ পেলে। তারপর সে যখন একেবারে অন্ধ হ’ল তখন তার খুব বিশ্বাস হ’ল যে সূর্য্য নেই।
“এই অন্ধ লোকটির সঙ্গে একজন চাকর এসেছিল। সে ঐ অন্ধলোকটিকে একটা নারিকেল গাছের ছায়ায় বসিয়ে রেখে, মাটি থেকে একটা নারিকেল কুড়িয়ে নিয়ে, তা থেকে রাত্তিরের জন্যে আলো তৈরি করতে আরম্ভ কর্লে। নারিকেলের ছোবড়া থেকে একটা পল্তে তৈরি করলে, শেষে শাঁসটা পিষে খানিকটা তেল বের ক’রে পল্তেটা তাতে ভেজালে।
“চাকরটি যখন ব’সে ব’সে এই কাজটি করছিল অন্ধ লোকটি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে তাকে বললে—‘আচ্ছা, আমি যে বল্ছিলুম সূয্যি নেই সেটা কি ঠিক নয়? দেখতে পাচ্ছ না কি রকম অন্ধকার? তবু লোকে বলে যে সূয্যি আছে! আচ্ছা, সূয্যি যদি থাকেই, তা’ হ’লে সেটা কি?”
“চাকর বল্লে—‘সূয্যি কি তা’ আমি জানিনে, ওতে আমার কোনও দরকার নেই। তবে আলো কি তা’ আমি জানি। এই ত একটা আলো তৈরি ক’রেছি, এই দিয়েই আপনার কাজ করি, অন্ধকারে কোনও কিছু খুঁজে বের করতে হ’লে এর সাহায্যে বের ক’রে এনে আপনাকে দেই।’ একজন খঞ্জ লাঠি নিয়ে নিকটে বসে ছিল; সে এই কথা শুনে হাস্তে হাস্তে বললে—‘স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে তুমি চিরকালই অন্ধ। সূয্যি কি তাও তুমি জান না। শোন তবে,—সুয্যি হচ্ছে একটা অগ্নিপিণ্ড বা অগ্নি-গোলক। রোজ ভোরে সমুদ্দর থেকে সেটা ওঠে, আর রোজই সন্ধ্যার সময় আমাদের এই দ্বীপের পশ্চিম দিকের পর্ব্বত-গহ্বরে ডুবে যায়। আমরা সকলেই দেখেছি, তোমারও যদি চোখ থাক্ত তুমিও তা’ হ’লে দেখ্তে পেতে।’
“একজন জেলে মন দিয়ে এই সব কথাবার্ত্তা শুন্ছিল, সে বল্লে—‘নিশ্চয় তুমি কখনও নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যাও নি,—দেশের বাইরে গিয়ে কিছুই দেখ নি! তুমি যদি খোঁড়া না হ’তে আর আমার মত জেলে-ডিঙ্গীতে ক’রে বেরুতে, তা’ হ’লে তুমি দেখতে পেতে যে, আমাদের দেশের পর্ব্বতগুলির ভেতরেই সূয্যি অস্ত যায় না। যেমন রোজ ভোরে সমুদ্র থেকে ওঠে, তেমনই আবার রোজ সন্ধ্যার সময় সমুদ্রে ডুবে যায়! এ ঘটনা খাঁটি সত্য,আমি রোজই নিজের চোখে দেখি!’
“তখন আমাদের জাহাজের একজন ইংরাজ নাবিক বল্লে, ‘সূর্য্যের গতিবিধি সম্বন্ধে আমাদের ইংলণ্ডের লোক যত জানে এত আর কেউ জানে না। সকল ইংরাজই জানে যে, সূর্য্য কোনখানে উদয়ও হয় না, বা কোনখানে অস্তও যায় না। এটা পৃথিবীর চারধারে অনবরত ঘুরছে। আমরা পৃথিবীর চারধার পরিভ্রমণ ক’রে দেখেছি যে, সূর্য্য নেই এমন জায়গা পৃথিবীতে নেই। যেখানেই গেছি ভোরে সূর্য্যর আলো দেখেছি, আর রাত্তিরে অন্ধকার, যেমন আমাদের এখানে, ঠিক তেমনিই।’ তারপর একটা লাঠি দিয়ে মাটির উপর কতকগুলো বৃত্ত এঁকে কি ক’রে সূর্য্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে এবং সূর্য্য আকাশেই বা কি ক’রে চলে তা বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করলে, কিন্তু খুব ভাল ক’রে বুঝিয়ে দিতে পার্লে না। শেষে জাহাজ পরিচালককে দেখিয়ে দিয়ে সে বললে—‘এ সম্বন্ধে ইনি আমার চেয়ে অনেক বেশী জানেন। ইনিই এটা খুব ভাল ক’রে বুঝিয়ে দিতে পারবেন।’
“জাহাজ-চালক খুব বুদ্ধিমান্ লোক ছিলেন। তিনি চুপ ক’রে মন দিয়ে সব কথা শুন্ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করবার পূর্ব্বে তিনি কোন কথাই বলেন নি। সকলেই তাঁর দিকে ফির্ল। তিনি তারপর বল্লেন—‘আপনারা প্রত্যেকেই ভুলপথে চলেছেন এবং নিজেদের ফাঁকি দিচ্ছেন। সূর্য্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না, পৃথিবীটাই সূর্য্যের চারদিকে ঘোরে, চব্বিশ ঘণ্টায় একবার সূর্য্যকে প্রদক্ষিণ করে; এ কেবল জাপান, ফিলিপাইন আর এই সুমাত্রা দ্বীপেই নয়, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা এবং আরও অনেক দেশে সূর্য্য আলো দিয়ে থাকে। একটা পাহাড়, একটা দ্বীপ, একটা সমুদ্রে কিংবা শুধু একটা পৃথিবীতেই আলো সে দেয় না, আমাদের এই পৃথিবীর মত আরও অনেক গ্রহও সূর্য্যের আলো পেয়ে থাকে। যদি আপনারা পায়ের নীচের মাটির দিকে না চেয়ে আকাশের দিকে একবার তাকান, তা’ হ’লে সকলেই এটা বুঝ্তে পার্বেন, আর কখনও আপনাদের মনে হবে না যে, কেবল আপনাদের জন্যেই অথবা আপনাদের দেশেই সূর্য্য উঠে।
“সেই জ্ঞানী জাহাজ-চালক ত এইরূপ বল্লেন; তিনি পৃথিবীর চারদিকে অনেক দেশে গিয়েছেন এবং অনেক সময় আকাশের দিকে চেয়ে কত কি চিন্তা করেছেন।”
কন্ফিউসিয়াসের শিষ্য সেই চীনদেশীয় ভদ্রলোক তারপর বলিতে লাগিলেন—“ধর্ম্ম সম্বন্ধেও ঠিক এই কথাই খাটে। অহঙ্কারই মানুষের ভিতর ভুল ও কলহের সৃষ্টি করে। সূয্যি যেমন সব জায়গায় আলো দেয়, ভগবান্ও তেমনি সব জায়গায়ই রয়েছেন। প্রত্যেকেই মনে করে ভগবান্ তার নিজের, অন্তত তার নিজের দেশের। যে ভগবান্কে এই পৃথিবীও ধারণ করতে পারে না,—যিনি অনন্ত, অসীম, তাঁকে প্রত্যেক জাতিই নিজেব মন্দিরের ভিতর বদ্ধ রাখ্তে চায়।
“সকল মানবকে এক বিশ্বাস ও এক ধর্ম্মে বদ্ধ করবার জন্যে স্বয়ং ভগবান্ যে মন্দির তৈরি ক’রেছেন, তার সঙ্গে অন্য কোন মন্দিরের তুলনা হয় কি?”
“ভগবানের এই মন্দির হচ্ছে এই জগৎটা। এই মন্দিরের আদর্শ নিয়েই মানুষ মন্দির তৈরি করেছে। প্রত্যেক মন্দিরেই ছাদ আছে, আলোক আছে, ছবি কিংবা কারুকার্য্য আছে, অনুশাসন-লিপি আছে, শাস্ত্র আছে, বলি, বেদী ও পূজারী আছে। কিন্তু কোন মন্দিরের আকাশের মত ছাদ, সূর্য্য, চন্দ্র এবং নক্ষত্রের মত দীপমালা আছে কি? অথবা এই জীবিত, স্নেহ-মমতা-পূর্ণ পরদুঃখকাতর মানুষের সঙ্গে কোন প্রতিমূর্ত্তির তুলনা হয় কি? ভগবান্ মানুষের সুখের জন্য তাঁর শুভ আশীর্ব্বাদ চারধারে ছড়িয়ে রেখেছেন; তাঁর চেয়ে সরল সহজ ভগবানের দয়ার কথা আর কোথায় লেখা আছে? মানুষের বুকের ভেতর যা লেখা র’য়েছে তার চেয়ে সুস্পষ্ট ধর্ম্মশাস্ত্র আর কোথায়? মানুষ প্রেমের মূর্ত্তি নিয়ে একে অন্যের জন্য যে নিজের সুখ বিসর্জ্জন করে, তার মত মূর্ত্তি আর কোথায়? সজ্জনের অন্তঃকরণের-সঙ্গে কোন বেদীর তুলনা হয় কি? সাধুর মনেই তিনি বলি গ্রহণ করেন।
“ঈশ্বরসম্বন্ধে মানুষের ধারণা যত উঁচু হবে সে ততই বেশি জান্তে পার্বে; আর তাঁকে যত বেশি জান্তে পার্বে, ততই তাঁর দয়া, স্নেহ ও মানুষের প্রতি ভালবাসা অনুকরণ ক’রে সে তাঁর কাছাকাছি হবে।”