বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/চতুর্থ গল্প/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

জিলেট জিলেকি সিলেমেল্।

  নিম্নদিকে নামিতে নামিতে আমি ভাবিতে লাগিলাম, আমিও দুই তিন- বার স্বদেশভক্ত হইয়া সভা করিয়াছিলাম, বক্তৃতা করিয়াছিলাম, স্বদেশের হিতের নিমিত্ত চাঁদা সংগ্রহ করিয়াছিলাম, তাহার পর চাঁদার টাকাগুলি নিজে হাম করিয়াছিলাম। সন্ন্যাসী-বিভ্রাটের পর আমিও এক স্বদেশী কোম্পানী খুলিয়া অনেক রাঁড়ী বালতি গরীব কেরাণীর মস্তকে হস্ত বুলাইয়াছিলাম। তবে প্রেত হইয়া আমাকেও কি ঐ অশ্বাণ্ডে গমন করিতে হইবে? কিন্তু তাহার পর আমার স্মরণ হইল যে, যম অবগত আছেন, আমি মুরগী খাই না, একাদশীর দিন পুঁইশাক ভক্ষণ করি না। সুতরাং সেই পুণ্যবলে অনায়াসে আমি সত্য-লোক ব্রহ্ম-লোক যেখানে ইচ্ছা সেইখানে গিয়া বাস করিতে পারিব। যদি ধর্ম্ম শিখিতে চায় তো টিকিদারেরা আমার কাছে আসুক।

 হু হু শব্দে ময়ূর পৃথিবীর দিকে ধাবিত হইল। অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড অসংখ্য গ্রহ নক্ষত্র পার হইয়া আমি ক্রমাগত নিম্নে নামিতে লাগিলাম। অবশেষে সূর্য্যমণ্ডল পার হইলাম। সে স্থান হইতে পৃথিবী দেখিলাম,— অতি ক্ষুদ্র এক নক্ষত্রের ন্যায় ঝিকমিক করিতেছে। ময়ূরের দুই পার্শ্বে আমার দুইটী পা ঝুলিতেছিল। হঠাৎ কোথা হইতে কি একটা আসিয়া আমার বাম পায়ে কামড় মারিল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ ছাড়িয়া দিল। চকিত হইয়া আমি সেই দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলাম। দেখিলাম যে, অতি বিরক্তিসূচক মুখ ভঙ্গিমা করিয়া চাকার ন্যায় কি একটা গড়াইয়া গেল।


চাকার মত ওটা কি?

 আমি ভাবিতে লাগিলাম চাকার ন্যায় ওটা কি? আমার পায়ে কামড় মারিল কেন? অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া শেষে বুঝিতে পারিলাম। আমার রূপে জগৎ আলো করিয়া শূন্যপথে আমি আসিতেছিলাম। চাকার ন্যায় ওটা রাহু। আমাকে পূর্ণিমার চন্দ্র মনে করিয়া সে গ্রহণ লাগাইতে আসিয়াছিল। পূর্ণিমার পর প্রতিপদে চন্দ্রগ্রহণ হয়। কিন্তু আমার রূপে মুগ্ধ হইয়া সে লোভ সম্বরণ করিতে পারে নাই। তার পর আমি যে পূর্ণচন্দ্র তার আর প্রতিপদ হয় না।যাহা হউক, হতজ্ঞান হইয়া সে আগে থাকিতে আমাকে গিলিতে আসিয়াছিল। ভাগ্যে আমার গায়ে মাংস নাই, কেবল হাড়, তাই সে কামড় বসাইতে পারিল না। মুখ সিঁটকে চলিয়া গেল। রাহুর দুই চারিটা দাঁত ভাঙ্গিয়া গেল কি না তা বলিতে পারি না। আমার শরীর যদি সুস্বাদু হইত, তাহা হইলে আমার গ্রহণটী সর্ব্বগ্রাস হইত। সাপ যেরূপ আস্তে আস্তে ভেককে ভক্ষণ করে, রাহুও সেইরূপ ক্রমে ক্রমে আমাকে পেটস্থ করিত। চন্দ্র-সূর্য্যের ন্যায় আমার আর মুক্তি হইত না। চিরকাল আমাকে রাহুর—সর্ব্বনাশ! রাহুর পেট নাই। আমাকে সর্ব্বগ্রাস করিয়া সে গালের ভিতর এক কশে রাখিত কি কোথায় রাখিত, জানি না। কিন্তু লম্বোদর! তোমরা আর আমাকে দেখিতে পাইতে না।

 লম্বোদর বলিলেন,—“ঈশ, তাই তো।”

 সকলে বলিলেন—“ঈশ, তাই তো।”

 ময়ূর এই ঘটনার পর নক্ষত্রবেগে পৃথিবীর দিকে ধাবিত হইল। সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় আমি সমুদ্রের উপর আসিয়া উপস্থিত হইলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই সুন্দরবনের উপর আসিলাম। ময়ূর আমার বাসার দিকে ধাবিত হইল। তখনও ভূমি হইতে প্রায় এক ক্রোশ উচ্চে শূন্যপথে ময়ূর উড়িতেছিল। আমি ভাবিলাম এ স্থান হইতে, আমার বাসা প্রায় আর দুই ক্রোশ আছে, বাসার ঠিক উপরে যাইলেই সেই দ্বিতীয় মন্ত্রটি পড়িব। তখন ময়ূর আমাকে ধীরে ধীরে আমার বাসায় নামাইয়া দিবে।

 কিন্তু সে দ্বিতীয় মন্ত্রটী কি? সর্ব্বনাশ! আমি সে মন্ত্রটী ভুলিয়া গিয়াছি। মন্ত্রটী মনে করিতে না পারিলে ময়ূর আমাকে সাত সমুদ্র তের নদী পারে লইয়া লোকালোক পর্ব্বতের ওপারে অন্ধকার গহ্বরে ফেলিয়া স্বস্থানে চলিয়া যাইবে। তাহা ভাবিয়া প্রাণ আমার আকুল হইল। মন্ত্রটী কি? গুম্বজ? না, তা নয়! জলটুঙ্গী? না, তা নয়, ঝাপড়দা-মাকড়দা? না তাও নয়। তবে কি? এ কথা নয় সে কথা, সে কথা নয় এ কথা— ক্রমাগত ভাবিয়া মন্ত্রটী স্মরণ করিতে চেষ্টা করিলাম। কিন্তু তাহার একটা বর্ণও আমার মনে উদয় হইল না। এমন কি, হতভম্ব হইয়া আমি দুর্গা নামটা পর্যন্ত মনে করিতে পারিলাম না। আমি ভাবিলাম যে, যাঃ ডমরুধর! এইবার তোমার সব লীলা খেলা ফুরাইল। যাহা হউক, অনেক চিন্তা করিয়া অবশেষে আমার মনে হইল যে, মন্ত্রটীতে জ আছে, ল আছে আর ক আছে। তাহার পর সেই অক্ষর কয়টা যোড়তার করিয়া স্থির করিলাম যে, মন্ত্রটী বোধ হয় এইরূপ হইবে,—

জিলেট জিলেকি সিনেমেল কিলেকিট কিলেকিশ।

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন, – কি?”

 ডমরুধর পুনরায় বলিলেন,—জিলেট জিলেকি সিনেমেল কিলেকিট কিলেকিশ ৷

 লম্বোদর বলিলেন, “এতও তুমি জান! এ কোন্ ভাষা?”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন, – 'তা জানি না, ভাই, এ ভিন্ন আমার আর কিছু তখন মনে হইল না।' মন্ত্রটী এইরূপে ঠিক করিয়া আমি ভাবিলাম, একবার পরীক্ষা করিয়া দেখি; উচ্চৈঃস্বরে আমি বলিলাম, –

জিলেট জিলেকি সিলেমেল কিলেকিট কিলেকিশ।

সেই কিচি-মিচ শব্দ শুনিয়া ময়ূর ভাবিল, – “কৈলাস পর্ব্বতে ভূত প্রেত দানা দৈত্যের সহিত আমার বাস। অনেক তন্ত্র মন্ত্র শুনিয়াছি। এরূপ বিদঘুটে কখন শুনি নাই। এ লোকটার ভাব গতিক ভাল নহে। বাসায় লইয়া গিয়া আমাকে হয় তো এইরূপ ভীষণ পালকহৰ্ষণ মন্ত্রবলে খাঁচায় পুরিয়া বন্ধ করিয়া রাখিবে। আগে থাকিতে সাবধান হওয়া ভাল।' এইরূপ ভাবিয়া গাঝাড়া দিয়া ময়ূর আমাকে শূন্য দেশে ফেলিয়া দিল। তাহার পর শোঁ শোঁ করিয়া কৈলাস পর্বতের দিকে উড়িয়া গেল। আমি তখন ভূমি হইতে প্রায় এক ক্রোশ উচ্চে। আজ কাল উড়োকল হইতে মানুষ যেমন পড়ে আমিও সেইরূপ হু হু শব্দে শিশার ন্যায় নীচে পড়িতে লাগিলাম। হু হু, হু হু, হুহু, কাণে আমার বাতাস লাগিতে লাগিল। আমি ভাবিলাম যে, এইবার আমার দফা রফা হইল। হুহু হুহু শব্দে পড়িতে লাগিলাম, অবশেষে থপ করিয়া কাদার ন্যায় কি একটা কোমল বস্তুর উপর পড়িলাম।

 কোমল বস্তুর উপর পড়িলাম, সে জন্য আমার অস্থি মাংস চূর্ণ হইয়া গেল না, সে জন্য আমার প্রাণ বিনষ্ট হইল না। যখন আমার হৃদয়ের ধড় ফড়ানি কিছু স্থির হইল, তখন আমি এদিক ওদিক চাহিয়া দেখিলাম, তাহাতে আমার চক্ষু স্থির হইল। আমি দেখিলাম যে, পর্বতপ্রমাণ প্রকাণ্ড এক ব্যাঘ্রের মুখগহ্বরে আমি পতিত হইয়াছি। ব্যাঘ্রটী বৃদ্ধ হইয়াছিল। সেজন্য তাহার দন্ত ছিল না। দাঁত থাকিলে শূল সদৃশ দন্তে বিদ্ধ হইয়া তৎক্ষণাৎ আমার মৃত্যু হইত। আমার সকল কথা মনে হইল। পীর গোরাচাঁদের ফকিরদিগের অভিশাপে আমি পড়িয়াছি। এ সেই পীর গোরাচাঁদের ব্যাঘ্র। যে বাঘ চড়িয়া তিনি দেশ ভ্রমণ করিতেন। তোমার যে-সে ব্যাঘ্র নহে। এ রয়েল টাইগারের বাবা! এ মহারাজ ব্যাঘ্র।

 লোকে বলে যে, ঘুমন্ত সিংহ হাঁ করিয়া থাকিলে, তাহার মুখে মৃগ প্রবেশ করে না। সে ঠিক কথা নহে। রাজসাপ নামে এক প্রকার সর্প আছে। সে সাপ হাঁ করিয়া থাকিলে তাহার মুখে অন্যান্য সাপ প্রবেশ করে। এ বৃদ্ধ ব্যাঘ্র তাহাই করে। আকাশ পাতাল জুড়িয়া হাঁ করিয়া থাকে। আর ইহার মুখে মৃগ প্রবেশ করে। আমি বসিয়া থাকিতে থাকিতে একটা বন্য মহিষ, চারিটা হরিণ ও দুইটা বরাহ ইহার মুখের ভিতর প্রবেশ করিল। তখন ব্যাঘ্র একবারে কোঁৎ করিয়া আমাদের সকলকে গিলিয়া ফেলিল।

 ব্যাঘ্রের পেটের ভিতর ঘোর অন্ধকার। আমি বিরস বদনে তাহার এক কোণে গিয়া বসিলাম। বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম— 'এখন করি কি? আর রক্ষা নাই। এখনি হজম হইয়া যাইব। আমার চিহ্নমাত্র থাকিবে না। দুই চারিদিন পরে এক ছটাক মল হইয়া বাহির হইব।'

 নিতান্ত সঙ্কটে পড়িলে মানুষের অনেক বুদ্ধি যোগায়। একবার কোন ডাক্তারের নিকট শুনিয়াছিলাম যে, জীবের উদর হইতে এক প্রকার অম্লরস বাহির হয়; তাহাতেই খাদ্য গলিয়া পরিপাক পায়। তোমরা জান যে, আমার অম্বলের রোগ আছে, আর সেজন্য আমি সর্ব্বদা কাঁচা সোডা ব্যবহার করি। ভাগ্যক্রমে আমার পকেটে কাগজে মোড়া খানিকটা কাচা সোডা ছিল, সেই সোডা উত্তমরূপে আমি গায়ে মাথিয়া বসিয়া রহিলাম। ব্যাঘ্রের পেট হইতে অম্লরস বাহির হইয়া মহিষ হরিণ শূকর সব গলিয়া পরিপাক হইয়া গেল, কিন্তু সোডার প্রভাবে আমার শরীর গলিয়া গেল না, আপাততঃ আমার প্রাণ বাঁচিয়া গেল।

 তা যেন হইল। কিন্তু সে আর কয়দিন? ব্যাঘ্রের উদর হইতে বাহিরনা হইতে পারিলে মৃত্যু নিশ্চয়, আজ হউক, কাল হউক, মৃত্যু নিশ্চয়। কিন্তু কি করিয়া বাহির হইব? মা দুর্গার নাম এখন আমার মনে হইল। একান্ত মনে তাঁহাকে ডাকিতে লাগিলাম। পীর গোরাচাঁদকে অনেক সিন্নি মানিলাম। মা ভগবতীর ও পীর সাহেবের আমার প্রতি কৃপা হইল। বাঘ্রে পেটের ভিতর এক কোণে বসিয়া গালে হাত দিয়া ভাবিতেছি, এমন সময় হঠাৎ কে যেন আমাকে বলিয়া দিল,– তোমার পকেটে কাগজ ও পেনসিল রহিয়াছে, আবাদের কর্মচারীকে পত্র লেখ না কেন?

 আমার তখন ভরসা হইল। পকেট হইতে কাগজ পেনসিল বাহির করিয়া আমি আমার কর্মচারীকে এইরূপ এক চিঠি লিখিলাম, “পীর গোরাচাঁদের কোপে আমি পড়িয়াছি। তাঁহার ব্যাঘ্র আমায় গ্রাস করিয়াছে। সেই ব্যাঘ্রের উদরে আমি আছি। যদি কোনরূপে আমাকে উদ্ধার করিতে পার, তাহার চেষ্টা কর।”

 আমার কর্মচারী বুদ্ধিমান্ লোক। বুদ্ধিমান্ লোক। আমার চিঠি পাইবামাত্র সে দুই জোয়ারের পথে যে স্থানে ডাক্তারখানা আছে সে স্থানে চলিয়া গেল। ডাক্তারের সহিত পরামর্শ করিয়া, যাহাতে বমন হয়, এরূপ ঔষধ এক সের ক্রয় করিল। ইংরেজিতে ইহাকে টারটার এমিটিক বলে। আবাদে ফিরিয়া সেই ঔষধ কাপড়ে রাখিয়া এক ছাগলের গলায় বাঁধিয়া দিল। তাহার পর যে স্থানে পীর গোরাচাঁদের ব্যাঘ্র বাস করে, সেই স্থানে ছাগল ছাড়িয়া দিল। বলা বাহুল্য যে, ভ্যা ভ্যা করিতে করিতে ছাগল আপনা আপনি ব্যাঘ্রের উদরে প্রবেশ করিল।