বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/চতুর্থ গল্প/তৃতীয় পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

পিং মহাশয়।

 ময়ূর তৎক্ষণাৎ উপরে উঠিল। অনেক অনেক উপরে উঠিল। রেলগাড়ী বা কি? তড়িদ্‌গতি বা কি? তাহা অপেক্ষা দ্রুতবেগে শূন্য পথে চলিতে লাগিল। চন্দ্রলোক সূর্যালোক ধ্রুবলোক পার হইয়া গেল। কোটি কোটি যোজন পরে শেষে আমি পিঙের আকাশে গিয়া উপস্থিত হইলাম।

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,— “পিং! সে কি?”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“পিং কি? পিং এইরূপ, —


পং

 লম্বোদর বলিলেন,— “তা যেন দেখিলাম। কিন্তু পিং কে?”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,—কি গেরো! পিং কে তা আমি কি করিয়া জানিব? পিং আমার জাতি নয় জ্ঞাতি নয়, যে তাহার পরিচয় আমি তোমাকে দিব। প্রাণ গেলেও আমি মিথ্যা কথা বলিব না। আমার সে স্বভাব নয়।

 ছোট একখণ্ড কালো মেঘের উপর পিং বসিয়াছিলেন। আমি তাঁহার নিকট গমন করিলাম। দেখ লম্বোদর! তোমরা আমাকে কালো কুৎসিৎ কদাকার বলিয়া উপহাস কর। কিন্তু পিং আমার রূপের মর্য্যাদা জানেন। আমাকে দেখিবামাত্র পিং কি বলিলেন শুন।

 পিং বলিলেন, – “আহা, মহাশয়ের কি রূপ! ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, তাহার ভিতর হইতে খড়ি-মাটির আভা বাহির হইতেছে। তাহা দেখিয়া আমার উস্কো খুস্কো পালক আবৃত কাক ভূষণ্ডীকে মনে হইল। বহু কালের প্রাচীন ছেলা পড়া বাঁশের ঝোড়ার ন্যায় মহাশয়ের অস্থি পিঞ্জর দেখা যাইতেছে। দধিপুচ্ছ শৃগালের পর্ব্বত গহ্বরের ন্যায় আপনার দন্তশূন্য মুখগহবর। তাহার দুই ধারে কি দুইটা কাক বসিয়াছিল? ঐ যে ঠোটের দুই কোণে শুভ্রবর্ণের কি রহিয়াছে? আপনার টোল পড়া গাল দুইটা দেখিয়া হনুমানের চড়-প্রহারিত রাবণ-মাতুল কালনেমির গণ্ডদেশ আমার স্মরণ হইল। পঞ্চচুল-পরিবেষ্টিত মস্তকের মধ্যস্থিত বিস্তৃত টাক দেখিয়া আমার মনে হইল, বিধাতা বুঝি পূর্ণচন্দ্রটীকে বসাইয়া তাহার চারিদিকে শুভ্রবর্ণের মেঘ গাঁথিয়া দিয়াছেন। ফল কথা, মহাশয়কে যখন দূরে দেখিলাম, তখন মনে করিলাম যে, ময়ূরে চড়িয়া টাক-চুড়ামণি কেলে–কার্ত্তিক জগৎ আঁধার করিয়া আসিতেছেন।”

 পিঙের সুমিষ্ট স্তবে প্রীতিলাভ করিয়া আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম,—“আমি আকাশে ভ্রমণ করিতে আসিয়াছি। ইহার পর দেখিবার আর কি আছে?”

 পিং উত্তর করিলেন,— সমুদ্রকূলে বালুকা-রেণুর ন্যায় ইহার পর আরও কোটি কোটি ব্রহ্মাণ্ড আছে। কিন্তু ব্রহ্মার কোন অণ্ডই আপনার দেখিবার উপযুক্ত নহে। যাবতীয় ব্রহ্মাণ্ডের ওপারে আপনি গিয়া অশ্বাণ্ড দর্শন করুন।

 আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, – “অশ্বাণ্ড! সে কিরূপ? সে কোথায়?”

 পিং উত্তর করিলেন,—“অল্পদিন হইল ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের নিকট গিয়া যম আবেদন করিলেন যে,—'বঙ্গদেশের বিটলে কপট স্বদেশ-ভক্তগণ শীঘ্রই প্রেতত্ত্ব প্রাপ্ত হইবে। তাহাদের প্রেতকে আমার আলয়ে আমি স্থান দিতে পারিব না। তাহাদের কুহকে পড়িলে আমি উৎসন্ন যাইব। ছেলে- থেকে। বক্তারাও শীঘ্র প্রেত হবে। তাহাদিগকেও আমি স্থান দিব না। আমার ছেলেগুলি তাহা হইলে গোল্লায় যাইবে। স্বদেশী প্রবঞ্চকদিগের প্রেতকেও আমি স্থান দিতে পারিব না। আমার আলয়ে আসিয়া তাহারা হয় তো কোম্পানি খুলিয়া বসিবে। তখন যমনীকে হাতের খাড়ু বেচিয়া শেয়ার কিনিতে হইবে। তাহার পর মহাপ্রভুরা এক কড়া কাণা কড়িও উপুড় হস্ত করিবেন না। ইহাদের জন্য কোন ব্রহ্মাণ্ডে স্থান হইবে না। আপনারা ইহার ব্যবস্থা করুন।' ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া ইন্দ্রের ঘোড়া উচ্চৈঃশ্রবাকে এক ডিম্ব প্রসব করিতে বলিলেন। বিশ্বসংসারের ওপারে এই অণ্ড আছে। ইহাতে বিটলে স্বদেশভক্ত, ছেলে থেকো বক্তা ও স্বদেশী প্রবঞ্চকগণের প্রেত বাস করে। মহাশয় গিয়া অশ্বাণ্ড দর্শন করুন।”

 পিং আরও বলিলেন যে, অশ্বাণ্ডের দ্বারে এক প্রহরী আছে। প্রহরী আমাকে যে কথা জিজ্ঞাসা করিবে ও তাহার উত্তরে কি বলিতে হইবে, পিং আমাকে শিখাইয়া দিলেন।

 পিঙের নিকট হইতে বিদায় হইয়া পুনরায় আমি শূন্যপথে চলিতে লাগিলাম। সমুদ্রকূলে বালুকা-রেণুর ন্যায় কোটী কোটী ব্রহ্মাণ্ড পার হইয়া যাইলাম। অবশেষে বিশ্ব-সংসারের ওপারে দূর হইতে অশ্বাণ্ড দেখিতে পাইলাম। পরে নিকটে গিয়া উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম যে, দ্বারে ভীষণ মূর্ত্তি প্রহরী বসিয়া আছে॥

 চীৎকার করিয়া প্রহরী আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, – “হু কাম দার?” (Who Comes There?) আমি উত্তর করিলাম, - “ফ্রেণ্ড।” (Friend) প্রহরী বলিল,—“পাস্ ফ্রেণ্ড, অল ওয়েল।” (Pass Friend All Well)
অশ্বাণ্ডের প্রহরী।

 এই বলিয়া প্রহরী দ্বার ছাড়িয়া দিল। অশ্বাণ্ডের ভিতর আমি প্রবেশ করিলাম। আমি দেখিলাম যে, ব্রহ্মাণ্ডের ন্যায় অশ্বাণ্ড ক্ষিতি অপ্ তেজ মরুৎ ব্যোম দিয়া গঠিত নহে। ইহা সম্পূর্ণ অন্ধকার দিয়া নির্ম্মিত।

 দূর দূর বহু দূর গিয়া বিটলে স্বদেশভক্তদিগের দেশে গিয়া উপস্থিত হইলাম। এই প্রেতদিগের রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্ত এক প্রহরী নিযুক্ত আছে। প্রহরী তাহাদিগকে বৃহৎ অট্টালিকার ভিতর বন্ধ করিয়া রাখে। আমাকে দেখাইবার নিমিত্ত তাহাদিগকে সে বাহির করিল।


বিটলে স্বদেশভক্তগণ।

 পৃথিবীতে ইহাদের শরীর নুদুর নাদুর থাকে। এখানে ইহাদের এইরূপ মূর্ত্তি হইয়াছে। বঙ্গদেশের ইহারা সর্ব্বনাশ করিয়াছে। শত শত বাঙ্গালী যুবকের অন্নলাভের পথ রোধ করিয়াছে। সাধারণের টাকা আত্মসাৎ করিয়াছে। প্রহরী আমাকে বলিল,—“সত্বর এ স্থান হইতে আপনি প্রস্থান করুন। আপনার যে এমন অপূর্ব্ব রূপ, ইহাদের বাতাস লাগিলে সে সব মাটি হইয়া যাইবে। আপনাকে আরও এক বিষয়ে সাবধান করি। কিছু দূরে আপনি ছেলে-খেকো বক্তাদিগের প্রেতগণকে দেখিতে পাইবেন। তাহাদের বক্তৃতা যেন আপনার কর্ণকুহরে প্রবেশ না করে। গো অশ্ব মেষ মহিষ খর শূকর বিড়াল কুকুর ইন্দুর বাঁদরের মৃত পচিত দেহ-উদ্ভূত চর্ব্বি-সম্ভৃত, অবিকৃত, বিশুদ্ধ, পবিত্র, পুয রূপে বিভূষিত গলিত মড়া গন্ধে আমোদিত, ময়রা মহলে সমাদৃত সর্ব্বত্র প্রচলিত ঘৃত সদৃশ আপনার হৃদয় কোমল। তাহাদের বক্তৃতা-উত্তাপে আপনার হৃদয় গলিয়া যাইবে। তখন আপনি যা নয় তাই করিয়া বসিবেন।”

 সভয়ে এ স্থান হইতে আমি পলায়ন করিলাম। দূরে কোটী কোটী যোজন দূরে, আমি এক ছেলে-খেকো বক্তা দেখিতে পাইলাম। একাকী দাড়াইয়া ইনি বক্তৃতা করিতেছিলেন।


ছেলে-খেকো বক্তা।

 বক্তৃতাবলে ইনি অনেক অপোগণ্ড শিশুর ইহকাল পরকাল ভক্ষণ করিয়াছিলেন। অনেক সংসার ছারেখারে দিয়াছিলেন। কাণে আঙ্গুল দিয়া ইহার নিকট আমি গমন করিলাম। ইহার অপর কেহ শ্রোতা ছিল না কিন্তু এক খণ্ড অন্ধকারের উপর দাঁড়াইয়া রাত্রি দিন ইনি বক্তৃতা করেন। শুনিলাম যে, পাতালে অসুরদিগের কাণে পোকা হইলে, তাহারা ইঁহার বক্তৃতা শ্রবণ করিতে আগমন করে। পাঁচ মিনিট কাল ইঁহার বক্তৃতা তাহাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিলেই কাণের পোকা ধড়-ফড় করিয়া বাহির হইয়া যায়।

 এ স্থান হইতে বিদায় হইয়া আরও কোটী কোটী যোজন দূরে স্বদেশী প্রবঞ্চকদিগের দেশে উপস্থিত হইলাম। অনেকগুলি এই জাতীয় প্রেত দর্শন করিলাম। তাঁহাদের একজন পৃথিবীতে থাকিতে অনেক ব্যবসা করিয়াছিলেন, অনেক কোম্পানি খুলিয়াছিলেন, অনেক লোকের টাকা ফাঁকি দিয়াছিলেন। অবশেষে এক বিমা-আফিস খুলিয়া মুটে মজুরের টাকাও উপরস্থ করিয়াছিলেন। অনেকগুলি হাত ও পা বাহির করিয়া এই মহাপ্রভু এক্ষণে আমাকে ধরিতে আসিলেন।


স্বদেশী কোম্পানীর মহাপ্রভু।
 ইহার বিমা-আফিসে আমি অর্থ প্রদান করি, – সেই ইচ্ছায় তিনি আমাকে ধরিতে আসিয়াছিলেন। কিন্তু এসব কার্য্যে আমিও একজন ঘুণ। আমি ধরা দিলাম না। সত্বর সে স্থান হইতে পলায়ন করিলাম।

 বেলা তখন প্রায় তিনটা বাজিয়াছিল। সন্ধ্যার পূর্ব্বে আমাকে বাসায় পৌছিতে হইবে। তা না হইলে ময়ূর আমাকে সপ্তদ্বীপের ওপারে স্বাদু সমুদ্রে নিক্ষেপ করিবে। সেজন্য পৃথিবীর দিকে ময়ূরকে আমি পরিচালিত করিলাম।