ডমরু-চরিত/চতুর্থ গল্প/প্রথম পরিচ্ছেদ
চতুর্থ গল্প।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
ডমরুধরের শব সাধনা।
ডমরুধরের পূজার দালান। প্রতিমা প্রস্তুত। পঞ্চমীর দিন। পূর্ব্বের মতই প্রতিমার পার্শ্বে বসিয়া ডমরুধর বন্ধুবর্গের সহিত গল্পগাছা করিতেছেন।
লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,—“তোমার প্রতিমায় এ বৎসর ব্যাঘ্র কেন? কার্ত্তিকের ওরূপ বেশ কেন?”
ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“ও কথা আর কেন বল ভাই! যে বিপদে পড়িয়াছিলাম, তা আমিই জানি।”
সকলে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“কি হইয়াছিল?”
লম্বোদর বলিলেন,—“আবার বুঝি একটা আজগুবি গল্পের সূচনা হইতেছে!”
ডমরুধর বলিলেন,—“তোমাদের শুনিয়া কাজ কি! আমি বলিতে চাই না।”
সকলের কৌতূহল জন্মিল। বলিবার নিমিত্ত সকলে সাধ্য সাধনা করিতে লাগিলেন। অনেক সাধ্য সাধনার পর ডমরুধর বলিতে আরম্ভ করিলেন।
সন্ন্যাসী—হাঙ্গামায় পড়িয়া আমার সূক্ষ্ম শরীর আকাশে ভ্রমণ করিয়াছিল। অবশেষে যমালয়ে গিয়া প্রথমে মান্য তাহার পর অমান্য হইয়াছিল। সে ![]()
কৈলাসবাসিনী গণেশজননী। গল্প পূর্ব্বে আমি বলিয়াছি। সেই অবধি সশরীরে আকাশ ভ্রমণ করিতে আমার বড় সাধ হইয়াছিল।
যতদূর চলে, মায়ের পূজা আমি গঙ্গাজল দিয়া সারি। গঙ্গাজলে মা যত পরিতোষ লাভ করেন, এমন আর কিছুতেই নয়। বিশেষতঃ আমাদের কাটি-গঙ্গার জল। কিন্তু পূজার জন্য প্রজাদের নিকট হইতে আমি ঘৃত, মধু, পাঁঠা প্রভৃতি আদায় করি। তাহা আনিবার নিমিত্ত এই আশ্বিন মাসে আমি সুন্দরবনে আমার আবাদে গিয়াছিলাম।
একদিন বাসায় বসিয়া আছি, এমন সময় দুইজন ফকির পীর গোরাচাঁদের গান করিতে আসিল। গান গাহিয়া বার্ষিক চাহিল। আমার কাছারি হইতে পূজার সময় তাহারা চারি আনা বার্ষিক পায়। এবার সে বার্ষিক আমি বন্ধ করিয়া দিলাম। প্রথম তাহারা অনেক মিনতি করিল। শেষে যখন দেখিল যে, তাহাদের বচনে আমি ভিজিবার ছেলে নই, তখন আমাকে অভিশাপ দিয়া গেল, – “পীর গোরাচাঁদের ব্যাঘ্র তোমাকে গ্রাস করুক।”
শুনিলাম যে, পীর গোরাচাঁদ এক সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন। প্রকাণ্ড এক ব্যাঘ্র চড়িয়া সুন্দরবন-অঞ্চলে তিনি ভ্রমণ করিতেন। তাঁহার অনেক ধন ছিল। যাহাকে তিনি যাহা বলিতেন, তাহাই ফলিত।
আমি মনে মনে ভাবিলাম যে, সিদ্ধ হওয়া ব্যবসাটী তবে মন্দ নহে। আমিও সিদ্ধ হইব। আমি ডমরুধর; আমার অসাধ্য কি আছে?
সিদ্ধ হইবার সহজ উপায় সকলের নিকট জানিয়া লইলাম। তাহারা বলিল, গভীর রাত্রিতে শ্মশানে গিয়া মড়ার পিঠে বসিয়া জপ করিতে হয়। বাঘ ভাল্লুক ভূত প্রেত আসিয়া ভয় প্রদর্শন করে। ভয় করিলেই বিপদ্, না ভয় করিলে দেবী স্বয়ং আসিয়া বর প্রদান করেন। ভূত প্রেতদিগের নিমিত্ত সঙ্গে মদ ও মুড়ি-কড়াইভাজা লইয়া যাইতে হয় ৷
আমি ভাবিলাম, এ তো সহজ কথা। মড়াকে আবার ভয় কি? মড়া আমি শুলিয়া খাইতে পারি! বাঘকেও আমার ভয় নাই। মন্ত্রবলে আমি বাঘের মুখ বন্ধ করিয়া দিতে পারি। ভূতকেও আমার ভয় নাই। মাছ লইয়া ভূতের সঙ্গে একবার কাড়াকাড়ি করিয়াছিলাম। শেষে ভূতের হাতে কামড় মারিয়াছিলাম। আমার দাঁত নাই তাই, দাঁত থাকিলে ভূতের হাতে এখনও ঘা থাকিত। তাহার পর একটা ভূত পুষিয়াছিলাম।এলোকেশী যদি সব পণ্ড না করিত, তাহা হইলে পোষা ভূতটী এখন ও আমার কাছে থাকিত। দুই চারি দিন পরে সে স্থানে একটী লোক মরিয়া গেল। সে মজুরি করিতে আসিয়াছিল। আপনার লোক কেহ ছিল না। তাহার মৃতদেহ লোকে গাঙে ফেলিয়া দিল। কুম্ভীরে খাইতে না খাইতে আমি মড়াটাকে টানিয়া উপরে তুলিলাম। তাহার পর যে স্থানে লোকে মড়া পোড়ায়, সেই স্থানে রাখিয়া আসিলাম। এক বোতল মদ ও কিছু মুড়ি-কড়াইভাজা সংগ্রহ করিলাম।
গভীর রাত্রিতে একাকী শ্মশানে গমন করিলাম। মড়াটীর মুখে মদ ও মুড়ি-কড়াইভাজা দিলাম। কুড় কুড় করিয়া খাইতে লাগিল। তাহাকে উপুড় করিয়া পিঠে বসিয়া আমি কঠোর তপ আরম্ভ করিলাম। তোমাদের ওসব জপের মন্ত্র আমি জানি না। হিড়িং বিড়িং আমি মানি না। কেবল দেবীর পাদপদ্ম আমি ধ্যান করিতে লাগিলাম।
প্রথম আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইল। অবিরত বিদ্যুতের ঝলকে পৃথিবী ঝলসিত হইতে লাগিল, ঘন ঘন বজ্রনিনাদে পৃথিবী কম্পিত হইল। আমি ভীত হইলাম না। চক্ষু বুজিয়া মায়ের পাদপদ্ম ধ্যান করিতে লাগিলাম।
তাহার পর বন্য মহিষ আসিল। আমার সম্মুখে লম্ফ ঝম্ফ করিতে লাগিল। শৃঙ্গাঘাতে পৃথিবী বিদীর্ণ করিল। আমি ভয় করিলাম না। চক্ষু মুদিত করিয়া মায়ের পাদপদ্ম ধ্যান করিতে লাগিলাম।
ব্যাঘ্র আসিল। তাহার গভীর গর্জন বনে প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। আমি চক্ষু চাহিলাম না। এক মনে দেবীর পাদপদ্ম ধ্যান করিতে লাগিলাম ৷
ভূত প্রেত দানা দৈত্য আসিল। আমার সম্মুখে নাচিতে লাগিল। খিল্ খিল্ হাসিতে চারিদিক্ পূর্ণ করিল। আমি ভয় পাইলাম না, চক্ষু চাহিলাম না, বলিলাম,—“ঐ মদ মুড়ি-কড়াইভাজা আছে। খাও, কেবল খাইয়া ঘরে যাও।’ তাহার পর পুনরায় ধ্যানে মগ্ন হইলাম।