ডমরু-চরিত/চতুর্থ গল্প/সপ্তম পরিচ্ছেদ
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
এলোকেশীর মুড়ো খেঙরা।
দেখিতে দেখিতে একজন বলিয়া বসিল, – “এলোকেশী ঠাকুরাণীকে সংবাদ দাও। তিনি আসিয়া কর্ত্তাটাকে একবার দেখুন।”
তখন আমার হৃৎকম্প হইল। একে তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী। তাহার উপর উগ্রচণ্ডা—সর্ব্বদাই রণমূর্তি। আবার তাহার উপর আমি এই কন্দর্প পুরুষ। সর্ব্বদাই এলোকেশীর সন্দেহ। এ অবস্থায় আমাকে দেখিলে এলোকেশী যে আমার কি হাল করিবেন, তাই ভাবিয়া আমি আকুল হইলাম।
সেই হতভাগা ছোড়া কেষ্টা, বলিতে না-বলিতে আমার বাড়ীতে গিয়া সংবাদ দিল। এলোকেশীর গায়ের রং আমা অপেক্ষা কাল। রাগে এখন তাঁহার মুখটা অনেক দিনের ভূষোপড়া ধানসিদ্ধ হাঁড়ির ন্যায় হইল। ভীম যেরূপ ঘণ্টাওয়ালা লোহার গদা লইয়া দ্বৈপায়ন হ্রদের ধারে দুর্যোধনের সহিত যুদ্ধ করিতে পিয়াছিলেন, এলোকেশী ও সেইরূপ মুড়ো খেঙরা লইয়া দুর্লভীর ঘরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
এলোকেশীকে দেখিয়া লোকে পথ ছাড়িয়া দিল। দ্বারের শিকল খুলিয়া তিনি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন। তাহার পর—বলিব কি ভাই, আর দুঃখের কথা। “পোড়ার মুখো বুড়ো ডেকরা! রঃ! আজি তোর ভুত ছাড়াইব”—এই কথা বলিয়া আমার মাথার টাক হইতে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত সেই মুড়ো খেঙরা দিয়া ঝাড়াইতে লাগিলেন। এলোকেশীর নব্য বয়স; ধাঙ্গড়ের কিল বা কি! এলোকেশীর এক এক ঘা খেঙরা ভীমের গদার ন্যায় আমার গায়ে পড়িতে লাগিল। আমি যত বলি- আর নয়! আর নয়! যথেষ্ট হইয়াছে,—ততই খেঙরার প্রহারে আমার পিঠ ফাটিয়া যাইতে লাগিল। মাথার টাকে ও পিঠে সেই মুড়ো খেঙরার অনেক কাঠি ফুটিয়া গেল।
কেষ্টাকে মন্দ বলি, কিন্তু এই দুঃসময়ে সে আমার বন্ধু হইল। আমার নাকাল দেখিয়া আমোদে আটখানা হইয়া সে ও তাহার সঙ্গিগণ হাততালি দিয়া নাচিতে নাচিতে বলিতে লাগিল, -
'টাক—চাঁদ, টাক-বাহাদুর, টাক টাক টাকেশ্বর, ডুক ভুরু ডুক।'
তখন এলোকেশী আমাকে ছাড়িয়া— “তবে রে আটকুঁড়ীর বেটারা!” বলিয়া তাহাদের মারিতে দৌড়িলেন। আমি অব্যাহতি পাইলাম, কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে নয়। দুর্লভী তখন আপনার খেঙরা লইয়া আমাকে বলিল, – “তুই যেমন, ঠাকুর তোর তেমনি খ'র করিয়াছেন। আমার মন ভুলাইতে রাঙা ঘাগরা পরিয়া সাজ গোজ করিয়া আসা হইয়াছে; এখন আমি একবার ঝাড়াই।” এই কথা বলিয়া সেও ঘা কত আমার পিঠে বসাইয়া দিল।
কত কিল কত খেঙরা আর সহ্য করিব! আমার পিঠ তো আর পাথরের নয়! আমি সে স্থান হইতে পলায়ন করিলাম। দুর্লভীর ঘর হইতে যখন বাহির হই, তখন এলোকেশী বলিলেন, – “এখনও হইয়াছে কি! চল্ ঘরে চল্! আজ তোর আমি হাড়ির হাল করিব। খেঙরার চোটে তোর ভূত ছাড়াইব।”
সেই ভয়ে আমি বাড়ী যাইলাম না। আমার খিড়কির বাগানে এক গাছ ঠেশ দিয়া বিরস বদনে বসিয়া রহিলাম। বসিয়া বসিয়া মা ভগবতীকে ডাকিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম, – “মা! আমি তোমার ভক্ত, দুর্গোৎসব আসিতেছে, মা! আমি তোমার পূজা করিব। তুমি দেখিয়াছ, আমার দালানে তোমার প্রতিমা গড়া হইতেছে। তবে কেন মা আমার উপর রাগ করিয়াছ?” সন্ধ্যা হইল ক্রমে রাত্রি হইল। বাড়ী যাইতে আমার সাহস হইল না, গাছে ঠেশ দিয়া বসিয়া রহিলাম। মাঝে মাঝে একটু একটু তন্দ্রা আসে, কিন্তু তৎক্ষণাৎ ভাঙ্গিয়া যায়। স্বপ্ন দেখি যে, এলোকেশী বুঝি শূর্পনখার বেশ ধরিয়া আমার নাক কাটিতে আসিতেছেন। অথবা তাড়কা রাক্ষসী হইয়া আমাকে চর্ব্বণ করিতেছেন। প্রহারে শরীর জর জর হইয়াছিল। শেষ রাত্রিতে আর বসিয়া থাকিতে পারিলাম না। ভিজা মাটির উপরেই শুইয়া পড়িলাম। একটু নিদ্রা আসিয়াছে, এমন সময় কে যেন আমাকে ডাকিল,—“ডমরুধর! বাছা ডমরুধর!”