বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/তৃতীয় গল্প/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

অজা-যুদ্ধে ঋষিশ্রাদ্ধে বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া।

 আমার এরূপ বিনয়বাক্যে এলোকেশী কিছুমাত্র সন্তুষ্ট হইল না। দ্বিগুণ ভাবে পুনরায় প্রহার আরম্ভ করিল। এই প্রহারে আর একটি আমার উপকার হইল। নন্দীর অভিশাপ মোচন হইয়া গেল। আমার আত্মবিস্মৃতি কিয়ৎপরিমাণে ঘুচিয়া গেল। আমি কে, তখন বুঝিতে পারিলাম। যোড়হাতে তখন আমি মা দুর্গাকে ডাকিতে লাগিলাম,—“মা! আমি অপরাধ করিয়াছি। বিবাহের সাধ আমার মিটিয়া গিয়াছে। আর ঝাঁটা-পেটা সইতে পারি না। আমাকে কৈলাস পর্ব্বতে লইয়া চল। সেস্থানে চিরকাল আমি আইবুড়ো হইয়া থাকিব। চামুণ্ডারূপিণী এলোকেশীর সহিত আর আমি সংসারধর্ম্ম করিতে চাই না।” এখন

 মা কোন উত্তর দিলেন না। আমি শুনিয়াছিলাম যে, শৈশবকালে কৃত্তিকা প্রভৃতি ছয়টী নক্ষত্র আমাকে প্রতিপালন করিয়াছিলেন। এখন আমি তাঁহাদিগকে ডাকিতে লাগিলাম। আমি বলিলাম,—“জননিগণ! যখন নিঃসহায় অবস্থায় শরবনে আমি পড়িয়া ছিলাম, তখন তোমরা আমাকে রক্ষা করিয়াছিলে। ছয়জনের স্তন্যপান করিবার নিমিত্ত ছয়টি মুখ আমি বাহির করিয়াছিলাম। দর্দ্দান্ত এলোকেশীর খেঙরার প্রহার আর আমি সহ্য করিতে পারি না। আমার শরীর জরজর হইয়া গেল। তোমরা আমাকে রক্ষা কর।”

 আশ্চর্য্য কথা বলিব কি ভাই, তৎক্ষণাৎ আকাশবাণী হইল,—“পৃথিবীতে তোমার আরও একশত বৎসর পরমায়ু আছে। বৎস! সুখে এই স্থানে এখন থাক। আরও এক শত বৎসর এলোকেশীকে লইয়া ঘরকন্না কর। তাহার পর কৈলাসে গমন করিও।”

 এলোকেশী এই সময় ক্লান্ত হইয়া পড়িল। আর তাহার হাত চলিল না। সেজন্য সে যাত্রা আমার প্রাণ বাঁচিয়া গেল।

 দেখ লম্বোদর ভায়া! মা দুর্গা কি বলিয়াছিলেন, তাহা তোমার মনে আছে তো? অতি সংক্ষেপে তিনি আমাকে পূজা করিতে বলিয়াছেন। এ বৎসর পূজার কোন উপকরণ আমি ক্রয় করিব না। গণেশের ইন্দুরের কাপড়টুকু পর্য্যন্ত দিব না। সমুদয় গঙ্গাজল দিয়া সারিব। মায়ের আজ্ঞা। তাহা ব্যতীত আমাদের এই ঘোষেদের কাটিগঙ্গার জল অতি পবিত্র। তাহা অপেক্ষা বহুমূল্য পদার্থ পৃথিবীতে আর কি আছে?

 পুরোহিত বলিলেন,—“তোমার পূজা তাহা হইলে এ বৎসর ঋষিশ্রাদ্ধের ন্যায় হইবে।”

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ঋষিশ্রাদ্ধ কিরূপ?”

 পুরোহিত উত্তর করিলেন,—“অজাযুদ্ধে ঋষিশ্রাদ্ধে প্রভাতে মেঘডম্বরে। দম্পত্যোঃ কলহে চৈব বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া॥” দুইটা ছাগলে বিবাদ হইলে যখন তাহারা আরক্ত নয়নে শৃঙ্গ তুলিয়া দণ্ডায়মান হয়, তখন বোধ হয়, এবার বুঝি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড রসাতলে যাইবে। কিন্তু শেষে কেবলমাত্র একটি ঠুস্। ঋষিদিগের শ্রাদ্ধে বিশ জন ব্রাহ্মণে ক্রমাগত কলার খোলা কাটিতে থাকেন। মনে হয়, কত ধুমধাম না হইবে। কিন্তু ঐ খোলা কাটাই সার। এ দুর্গোৎসবেও দেখিতেছি, কেবল প্রতিমা ঢোল ও গঙ্গাজল।”

 ডমরুধর বলিলেন,—“মায়ের আজ্ঞা! ভাল মনে করিয়া দিয়াছেন। আমি আমার আবাদের দুইজন ধাঙ্গড়কে তাহাদের সেই চেপটা মাদল আনিয়া পূজার সময় বাজাইতে বলিয়াছি। তাহাদিগকে কিছু দিতে হইবে না। দুই বেলা দুই মুঠা ভাত দিলেই হইবে। পূজার কয়দিন আমার বাড়ীতে রান্না হইবে না। পূজার কয়দিন লোকের বাড়ী নিমন্ত্রণ খাইয়া আমরা চালাইব। লম্বোদর ভায়া! তুমি সেই কয়দিন আমার ধাঙ্গড় দুইজনকে দুইটি করিয়া ভাত দিও। বুঝিয়াছ তো?”

.  লম্বোদর উত্তর করিলেন,—“বিলক্ষণ বুঝিয়াছি, কিন্তু এ পূজা তোমার না করিলে কি নয়?”

 মুখ কুঞ্চিত করিয়া নাকিসুরে ডমরুধর উত্তর করিলেন,—তুমি তো বলিলে! কিন্তু পূজা যদি না করি, তাহা হইলে লোকের কাছ হইতে প্রণামিটি কি করিয়া আদায় করি? পুরোহিত অতি মৃদু স্বরে বলিতে লাগিলেন,—

“কার্ত্তিকেয়ং নমস্যামি গৌরীপুত্রং স্বতপ্রদম্।
ষড়াননং মহাভাগং দৈত্যদর্পনিষুদনম্॥”