ডমরু-চরিত/তৃতীয় গল্প/পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
ছোট খাটো ভাল মানুষ ভূত।
ভেটকি মাছটা হাতে লইয়া আমি পথ চলিতে লাগিলাম। সকলেই জানে যে মাছ দেখিলে ভূতের লোভ হয়। দুই ক্রোশ পথ গিয়াছি, রাত্রি প্রায় এক প্রহর হইয়াছে। এমন সময় একটা ভূত আমার সঙ্গ লইল। “দেনা, দেনা,” “মাছ দেনা” বলিয়া আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিতে লাগিল। বলা বাহুল্য যে, আমার বিলক্ষণ ভয় হইল। কিন্তু ভূতকে মাছ দিলে আর রক্ষা নাই। তৎক্ষণাৎ সে মানুষের প্রাণবধ করে। সেজন্য তাহার কথা আমি শুনিলাম না, তাহাকে আমি মাছ দিলাম না। কিছুদূর গিয়াছি, এমন সময় আর একটা ভূত আসিয়া জুটিল। একটা আমার ডান দিকে আর একটা আমার বাম দিকে, আমার দুই পাশে দুইটা ভূত, হাত পাতিয়া “দেনা, দেনা” বলিতে বলিতে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলিল। কিন্তু কিছুতেই তাহাদিগকে আমি মাছ দিলাম না। অবশেষে তাহারা আর লোভ সামলাইতে পারিল না। মাছের মাথার দিক্— কান্কোতে হাত দিয়া আমি ধরিয়াছিলাম, মাছের অপর দিক্ তাহারা খপ করিয়া ধরিয়া ফেলিল। অপর দিক্ ধরিয়া তাহারা মাছটা আমার হাত হইতে কাড়িয়া লইতে চেষ্টা করিল। আমি মাছের কানকো ধরিয়া, তাহারা মাছের লেজার দিক্ ধরিয়া; সেই মাঠের মাঝখানে ঘোরতর টানাটানি হইতে লাগিল। কিন্তু আমি একা, ভূত হইল দুইজন। দুইজনের সঙ্গে আমি কতক্ষণ টানাটানি করিতে পারি? ক্রমে আমি শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। তখন নিরুপায় হইয়া একটা ভূতের হাতে আমি কামড় মারিলাম। বলিব কি হে, ভূতের হাতের কথা। ঠিক যেন কাঠের উপর কামড় মারিলাম। তাহার পর দুর্গন্ধ! সেইরূপ ভয়ানক দুর্গন্ধ মানুষের নাকে কখন প্রবেশ করে নাই।
আমার দাঁত নাই সত্য, কিন্তু সেই ফোকলা মুখের এক কামড়েই ভূত দুইটী পলায়ন করিল। তখন আমার মুখে দুর্গন্ধ! দুর্গন্ধে আমি ক্রমাগত উদ্গার করিতে লাগিলাম। সেইখানে বসিয়া ন্যাকার ন্যাকার ন্যাকার। মনে হইল, পেটের নাড়ী ভূড়ি বুঝি বাহির হইয়া গেল। নিশ্চয় বুঝিলাম যে, এইবার আমার আসন্নকাল উপস্থিত হইয়াছে। আমি সেই স্থানে চক্ষু বুজিয়া শুইয়া পড়িলাম ও নন্দীর অভিশাপের কথা ভাবিতে লাগিলাম। কিছুক্ষণ পরে কে যেন আমার মাথায় ও মুখে জল দিতেছে এইরূপ বোধ হইল। তাহাতে শরীর কিঞ্চিৎ সুস্থ হইল। চক্ষু চাহিয়া দেখিলাম,—কি আশ্চর্য্য, এ আবার কি? দেখিলাম যে, ছোট খাটো একটি নূতন ভূত আসিয়া আমার সেবা শুশ্রূষা করিতেছে।আমি উঠিয়া বসিলাম। তৎক্ষণাৎ ভূতটী কিছুদূরে পলায়ন করিল। আমার মাছটী সে চুরি করে নাই। মাছটা সেই স্থানে পড়িয়া ছিল। মাছটা লইয়া ধীরে ধীরে আমি আমাদের গ্রাম অভিমুখে আসিতে লাগিলাম ৷
নূতন ভূতটী দূরে দূরে আমার সঙ্গে সঙ্গে আসিতে লাগিল। সে আমার নিকট হইতে মাছ চাহিল না। কোন কথাই বলিল না। দেখিলাম সে অতি ভাল মানুষ ভূত। আরও দেখিলাম সে অতি ভীত স্বভাবের ভূত। একবার আমি কাসিলাম, আর অমনি সে ভয়ে দূরে পলায়ন করিল। একবার আমি হাঁচিলাম, অমনি সে পলায়ন করিল। একবার একখানি গ্রামে কুকুর ডাকিয়া উঠিল, অমনি সে গ্রাম হইতে অনেক দূরে গিয়া দাড়াইল। কিন্তু সে একবারে আমাকে ছাড়িয়া গেল না। ভয় পাইয়া একবার পলায়ন করে, তাহার পর পুনরায় আসিয়া উপস্থিত হয়। এরূপ ভীরু স্বভাবের ভূত কখন দেখি নাই। তখন আমি বুঝিলাম, মহাদেব যে আমাকে একটী ছোট খাটো ভাল মানুষ ভূত দিবেন বলিয়াছিলেন, এটী সেই ভূত।
![]()
ভাল মানুষ ভূত। অবশেষে আমি তাহাকে বলিলাম,—“দেখ ভাল মানুষ ভূত! তুমি আমার উপকার করিয়াছ, তুমি আমার প্রাণ রক্ষা করিয়াছ। আমার সহিত তুমি চল, দুইখানা ভাজা মাছ তোমাকে আমি প্রদান করিব।”
ঘরে গিয়া এলোকেশীকে আমি মাছটা দিলাম। রান্নাঘরে এলোকেশী মাছ ভাজিতে লাগিল। কতকগুলি মাছ যেই ভাজা হইয়াছে, আর রান্নাঘরের ঘুলঘুলি দিয়া ভূতটা হাত বাড়াইল। তাহার হাতে চারিখানা মাছ দিলাম, আর তাহাকে আমি বলিলাম, “পুনরায় কাল এস, তোমাকে ভাল মাছ দিব।”
পরদিন বৈকাল বেলা খুদিরাম মণ্ডলের পুষ্করিণীতে চুপি চুপি হাতসূতা ফেলিয়া একটা রুই মাছ ধরিলাম। সন্ধ্যার সময় মাছটা আনিয়া এলোকেশীকে দিলাম। বলা বাহুল্য যে, আমি নিজের পুকুরের মাছ খরচ করি না, তাহা আমি বিক্রয় করি। সন্ধ্যার পর এলোকেশী যখন মাছ ভাজিতেছিল, তখন আমি রান্নাঘরে গমন করিলাম। আমার সাড়া পাইয়া ভূতটী ঘুলঘুলি দিয়া হাত বাড়াইল। তাহার হাতে আমি মাছ দিলাম। এইরূপ প্রতিদিন তাহার পুকুর হইতে গোপনে মাছ ধরিয়া ভূতটীকে আমি খাইতে দিতে লাগিলাম।