বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/তৃতীয় গল্প/প্রথম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

তৃতীয় গল্প।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

নন্দীর ক্রোধ।

 ডমরুধরের পূজার দালান। প্রতিমা প্রস্তুত হইয়াছে। প্রতিমার সম্মুখে ডমরুধর, তাঁহার পুরোহিত ও বন্ধুবান্ধব বসিয়াছেন।

 ডমরুধর বলিলেন,—কলিকাতায় একবার এক খোলার ঘরের আগড়ের উপর একখানি কাগজ দেখিলাম। তাহাতে লেখা ছিল—ভাগ্য গণনা /• এক আনা।

 গণৎকারের নিকট আমি গমন করিলাম। অনেক কচলা-কচলি করিয়া শেষে এক পয়সায় রফা হইল। দৈবজ্ঞ হাত দেখিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময় আমার একবার হাঁই উঠিল। তোমরা আমার হাঁই অনেকবার দেখিয়াছ।

 প্রথম হইতেই আমার রূপ দেখিয়া গণৎকার মোহিত হইয়াছিলেন। তাঁহার পর তাঁহার সহিত যখন দর কসাকসি করি, তখন তাঁহার মন আরও প্রফুল্ল হইয়াছিল। এখন আমার হাঁই দেখিয়া তিনি একেবারে আনন্দে অভিভূত হইয়া পড়িলেন।

 অধিক আর গণিতে গাঁথিতে হইল না। হাতটী ধরিয়াই তিনি বলিলেন,—“মহাশয় মনুষ্য নহেন। মহাশয় কার্ত্তিকেয়, যাঁহাকে ষড়ানন বলে, মা দুর্গার কনিষ্ঠ পুত্র। অবতার হইয়া পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।”  আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—আমার প্রতি কি কোনরূপ অভিশাপ হইয়াছিল?

 দৈবজ্ঞ উত্তর করিলেন,—“না, তাহা নহে। বিবাহ করিবার নিমিত্ত একদিন আপনি মায়ের নিকট আবদার করিয়াছিলেন। ভগবতী বলিলেন,—বাছা, এ দেবলোকে তোমাকে কেহ কন্যা প্রদান করিবে না। যদি বিবাহ করিতে সাধ হইয়া থাকে, তাহা হইলে পৃথিবীতে গিয়া অবতীর্ণ হও।”

 দৈবজ্ঞ আরও বলিলেন,—“পৃথিবীতে আপনি আসিয়াছেন, কিন্তু একটু সাবধানে থাকিবেন। মা দশভুজা আপনাকে ভালবাসেন, সেজন্য আপনার প্রতি নন্দীর একটু ঈর্ষা আছে। ছল পাইলে সে আপনাকে দুঃখ দিবে।”

 দেখ লম্বোদর, ঐ যে ময়ূরের উপরে যিনি বসিয়া আছেন, উনি আর কেহ নহেন, উনি আমি স্বয়ং। অবতার হইলে দেবতাগণ আত্ম বিস্মৃত হইয়া থাকেন, আমিও সেই জন্য আত্ম বিস্মৃত হইয়া আছি। আর তোমরাও আমার মাহাত্ম্য বুঝিতে পারিতেছ না।

 লম্বোদর বলিলেন,—“হাঁ কার্ত্তিকের মত তোমার রূপ বটে।”

 ডমরুধর বলিলেন,—ঠাট্টা কর, আর যাই কর। গণৎকর যাহা বলিয়াছে, তাহা ঠিক। নন্দীর কোপে পড়িয়া কয়মাস যে আমি ঘোরতর কষ্ট পাইয়াছিলাম, তাহা তো আর মিথ্যা নহে?

 লম্বোদর বলিলেন,—“আবার বুঝি একটা আজগুবি গল্প হইবে?”

 ডমরুধর রাগিয়া বলিলেন,—“তোমার যদি শুনতে ইচ্ছা না থাকে, তাহা হইলে কাণে আঙ্গুল দিয়া থাক।”

 তাহার পর পাঁচজনের অনুরোধে ডমরুধর এইরূপে গল্পটা বলিতে লাগিলেন,—

 গত বৎসর নবমী পূজার দিন। রাত্রি শেষ হইয়াছে। বাহির—বাড়ীতে কিরূপ একটা খুটখাট শব্দ হইতে লাগিল। দু পয়সা আমার সঙ্গতি আছে। কাজেই আমাকে সর্ব্বদা সতর্ক ও শঙ্কিত থাকিতে হয়। আমি ধীরে ধীরে বাহিরে আসিয়া দেখি যে, দালানের প্রতিমার সম্মুখে একটা বিকটাকার মর্দ্দ পূজার সমুদয় দ্রব্যাদি লইয়া গাঁঠরি বাঁধিতেছে। পূজার সমুদয় উপকরণ যাহা তখন দালানে ছিল, মায় বেশ্যাবাড়ীর মৃত্তিকাটুকু পর্য্যন্ত, সমস্ত দ্রব্য সে বাঁধিয়া লইতেছে। তাহার নিকটে একটা ত্রিশূল পড়িয়া ছিল। বুচকি বাঁধিয়া ত্রিশূলের আগায় আটকাইয়া সে কাঁধে তুলিবার উপক্রম করিল।

 রাগে আমার সর্ব্বশরীর জ্বলিয়া উঠিল। পূর্ব্বেই বলিয়াছি যে, অবতার হইলে দেবতাদের আত্মবিস্মৃতি হয়। আমি যে ভগবতীর পুত্র কার্ত্তিক, রাগের ধমকে সে কথা একেবারে ভুলিয়া যাইলাম। সেই লোকটাকে গালি দিয়া আমি বলিলাম,—“বদমায়েস চোর। পূজার দ্রব্য চুরি করিতেছিস্।”

 সে লোকটা একবার আমার মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল। পোঁটলার একদিক্ ধরিয়া আমি টানিতে লাগিলাম। ঈষৎ হাসিয়া পোঁটলার অপর দিক্ ধরিয়া সে টানিতে লাগিল। আমি তাহাকে বলিলাম,—“পোঁটলা ছাড়িয়া দে।” সে উত্তর করিল,—“দিয়া নিলে কি হয় তা জান? কালীঘাটের কুকুর হয়।“আমি বলিলাম,—“কবে তোকে এ সব জিনিস আমি দিয়াছি?”

 দুইজনে বিষম টানাটানি চলিতে লাগিল। কিন্তু তাহার বল অধিক, তাহার সহিত আমি পারিলাম না। অবশেষে হতাশ হইয়া তাহার হাতে এক কামড় মারিলাম।

 সে লোকটা বলিল,—ছি! তোমার এখনও দুষ্টমি যায় নাই। দেবতারা পৃথিবীতে আসিয়া পুনরায় ফিরিয়া যাইতে ইচ্ছা করেন না। ইন্দ্র শূকর হইয়া ছানা পোনা লইয়া সুখে কালযাপন করিতেছিলেন। অনেক সাধ্য সাধনা করিয়া পুনরায় তাঁহাকে স্বর্গে লইয়া যাইতে হইয়াছিল। রামচন্দ্রকে অনেক কৌশল করিয়া বৈকুণ্ঠে লইয়া যাইতে হইয়া— ছিল। শ্রীকৃষ্ণের পুত্র-পৌত্রদিগের পদভরে মেদিনী টলটলায়মানা হইয়াছিল। আমার বাবাঠাকুরও অতি কষ্টে কোঁচিনীদিগের ক্ষেত্রে জল সেচন করিয়াছিলেন। সেজন্য কোঁচিনী ছুঁড়িরা টিটকারি দিয়া বলিয়াছিল,—

‘দুই শরা জল ছেঁচিয়া কোমরে দিলে হাত।
এমনি করিয়া খাবে তুমি কোঁচিনী পাড়ার ভাত॥’

 কৈলাসে মা আমার কাঁদিয়া কাটিয়া কুরুক্ষেত্র করিয়াছিলেন। অনেক কষ্টে বাবাকে আমরা পুনরায় স্বস্থানে লইয়া গিয়াছিলাম। দাদা ঠাকুর, তোমাকেও একটু কষ্ট দিতে হইবে, তবে তোমার বিবাহের সাধ মিটিবে। সেজন্য আমি তোমাকে অভিশাপ দিতেছি,—ছয় মাস কাল তুমি সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হইয়া থাকিবে। ছয় মাস কাল তুমি নানা বিপদে পতিত হইবে। তুমি যেমন ফোক্‌লা মুখে আমার হাতে কামড় মারিলে, সেইরূপ আর একজনের হাতে কামড় মারিয়া তোমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হইবে।