বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/তৃতীয় গল্প/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

এলোকেশীর রূপমাধুরী।

 একদিন এলোকেশী সহসা আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, —“মাছ ভাজিবার সময়, প্রতিদিন তুমি রান্না ঘরে এস কেন? দিনের বেলা না আনিয়া প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় পুকুর হইতে তুমি মাছ লইয়া এস কেন? ঘুলঘুলির নিকট গিয়া কাহার সহিত তুমি চুপি চুপি কথাবার্তা কর? দুর্লভীকে মাছ দাও বুঝি?”

 দুর্লভী বাগ্দিনীকে তোমরা সকলেই জান। হাসিতে হাসিতে একদিন তাহাকে দুই একটা তামাসা করিয়াছিলাম। আমি এমন কার্ত্তিক পুরুষ! সেজন্য আমার স্ত্রীর মনে সর্ব্বদা সন্দেহ।

 আমি বলিলাম,—“এলোকেশি! ও দুর্লভী নয়। আবাদ হইতে এবার আমি একটা ভূত আনিয়াছি। আমি মনে করিয়াছি যে, ভূতটী ভালরূপ পোষ মানিলে উহাকে কলিকাতায় লইয়া যাইব। যাহারা ঘোড়ার নাচ করে, তাহাদিগের নিকট ভূতটীকে বিক্রয় করিব। অনেক টাকা পাইব। কিন্তু এ ভূতটী বড় ভীরু ভূত। তুমি ঘুলঘুলির নিকট যাইও না। তোমার চেহারা দেখিলে সে ভয়ে পলাইবে।” গত বৎসর সন্ন্যাসীসঙ্কটের গল্প বলিবার সময় আমি এলোকেশীর রূপের পরিচয় দিয়াছিলাম। আমার অভ্যাস হইয়া গিয়াছে তাই, তা না হইলে এলোকেশীকে দেখিলে ভীমসেনও বোধ হয় আতঙ্কে পলায়ন করেন।

 এলোকেশীর মুখ হাঁড়ী হইল। মাছ ভাজিতে লাগিল, আর গজর গজর করিয়া বলিতে লাগিল,—“আমার রূপ দেখিলে ভূত ভয়ে পলাইবে! আমার রূপ দেখিলে ভূত পলাইবে! বটে!”

 পরদিন সন্ধ্যার সময় নবাই ঘোষের পুষ্করিণী হইতে বড় একটা মির— গেল মাছ ধরিয়া আমি এলোকেশীকে দিলাম। এলোকেশী সেই মাছ যখন ভাজিতেছিল, সেই সময় যথারীতি আমি রান্নাঘরে গমন করিলাম। ভূতটী যথারীতি ঘুলঘুলিপথে হাত বাড়াইল। মাছ লইয়া যেমন তাহাকে আমি দিতেছি, এমন সময় আমার পশ্চাতে গিয়া এলোকেশী বলিয়া উঠিল,—“দুর্লভি! হারামজাদি! তোর আস্পর্দ্ধা তো কম নয়!”

 ভূতটী একবার মাত্র এলোকেশীর মুখপানে চাহিয়া দেখিল। এলোকেশীর সেই অদ্ভুত মুখশ্রী দেখিয়া আতঙ্কে রুদ্ধ শ্বাসে সে স্থান হইতে সে পলায়ন করিল।

 ‘করিলে কি! করিলে কি!' এই কথা বলিতে বলিতে তৎক্ষণাৎ আমি ঘর হইতে বাহির হইয়া পড়িলাম, তৎক্ষণাৎ বাটীর ভিতর হইতে বাহির হইলাম, তৎক্ষণাৎ বাগানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। মনে করিলাম, বুঝাইয়া সুঝাইয়া ভূতটীকে ফিরাইয়া আনিব। বাগানে গিয়া দেখিলাম যে, ভূতটী অতি দ্রুতবেগে আমার বাগানের ঈশান কোণের দিকে দৌড়িয়া যাইতেছে। সেই স্থানে খেজুর গাছের ন্যায় এক অপূর্ব্ব গাছ ছিল। সে গাছটীতে আমি রস কাটিতে দিতাম না, সে গাছটীকে স্বতন্ত্র ভাবে আমি ঘিরিয়া রাখিতাম। প্রাণভয়ে ভূতটী সেই গাছটার উপর গিয়া উঠিল। আমি ভাবিলাম,—যাঃ! এইবার ভূতটীর প্রাণ বিনষ্ট হইল। এমন আমার সখের ভূত, এইবার মারা গেল। মহাদেব হয়তো আমার উপর রাগ করিবেন।

 বিস্ময়ে পুরোহিত জিজ্ঞাসা করিলেন,— “ভূতের প্রাণ বিনষ্ট হইবে? খেজুর গাছের উপর উঠিয়া ভূত মারা পড়িবে। ভূত কি কখন মারা যায়?”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন, “পুরোহিত মহাশয়! আপনি সাদাসিদে লোক, আপনি এ সব কথা বুঝিতে পারিবেন না। এ সামান্য খেজুর গাছ নহে। একবার একজন ধাঙ্গড়ের সঙ্গে আমি সুন্দরবনের ভিতর বেড়াইতে ছিলাম। এক স্থানে এক গাছের নিম্নে স্তূপীকৃত হাড় পড়িয়াছিল। প্রথম মনে করিলাম, মানুষের অস্থি, ব্যাঘ্রগণ বোধ হয় মানুষ ধরিয়া এই স্থানে আনিয়া ভক্ষণ করে। কিন্তু তাহার পর আরও নিরীক্ষণ করিয়া বুঝিতে পারিলাম যে, সে সব বানরের হাড়। গাছটী, দেখিলাম যে, হেঁতালও নহে, খেজুরও নহে। খেজুরের ন্যায় এক প্রকার বৃক্ষ। কিন্তু খেজুর গাছের পাতাগুলি যেমন উচ্চ হইয়া থাকে, ইহার পাতা সেরূপ ছিল না, ইহার যাবতীয় কাঁচা পাতা নিম্নমুগ্ধ হইয়া গাছের গায়ে লাগিয়াছিল। গাছের মাথায় কাঁদি কাঁদি সোণার বর্ণের অতি চমৎকার ফল ফলিয়াছিল। সেই ফল পাড়িতে ধাঙ্গড়কে আমি গাছের উপর উঠিতে বলিলাম। ধাঙ্গড় গাছে উঠিল। পাতার ভিতর দিয়া যেই গাছের মাথার নিকট উঠিয়াছে, আর পাতাগুলি তৎক্ষণাৎ সোজা হইয়া তাহাকে ঢাকিয়া ফেলিল। সেই সময় ধাঙ্গড়ও ‘প্রাণ গেল, প্রাণ গেল’ বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। তাহার পর ধাঙ্গড়ের চর্ম্মাবৃত ভগ্ন হাড়গুলি নীচে পড়িতে লাগিল। তাহার পাতাগুলি পুনরায় নিম্ন মুখ হইয়া গাছের গায়ে আসিয়া লাগিল। এই ভয়ানক ব্যাপার দেখিয়া স্তম্ভিত হইয়া আমি দাঁড়াইয়া রহিলাম। তাহার পর নিকটে গিয়া দেখিলাম যে, এই ভয়াবহ বৃক্ষ ধাঙ্গড়ের রক্ত মাংস মায় হাড়ের রস পর্য্যন্ত চুষিয়া খাইয়াছে।”

 চতুর্ভুজ বলিলেন,—পুস্তকে পড়িয়াছি যে, কয়েক প্রকার উদ্ভিদ আছে, তাহারা পোকা মাকড় ধরিয়া ভক্ষণ করে। কিন্তু জীব জন্তু ধরিয়া যায়, বানর ধরিয়া খায়, মানুষ ধরিয়া খায়, এরূপ বৃক্ষের কথা কখন শুনি নাই।

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,—“আমি তাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছি। তলায় অনেকগুলি সে গাছের বীজ পড়িয়াছিল। আমি গুটিকতক বীজ আনিয়া আমার বাগানের এক কোণে পুতিয়াছিলাম। তাহা হইতে একটী গাছ হইয়াছিল। সে গাছ আমি সর্ব্বদা ঘিরিয়া রাখিতাম। কাহাকেও তাহার নিকটে যাইতে দিতাম না। ভূত যখন সেই গাছের উপর গিয়া উঠিল, তখন আমি তাহার প্রাণের আশা ছাড়িয়া দিলাম।”

 ক্রমে যাহা ভয় করিয়াছিলাম, তাহাই ঘটিল। সেই ভূত গাছের মাথার নিকট গিয়া উঠিল, আর সেই সময় পাতাগুলি সোজা উচ্চ হইয়া দাঁড়াইল, ভূতের সর্ব্ব শরীর ঢাকিয়া ফেলিল, ভূতের কৃষ্ণবর্ণ রক্ত গাছের গা দিয়া দরদর ধারায় বহিয়া পড়িল। অবশেষে ভূতের খোসাটী নিম্নে পতিত হইল।