বিষয়বস্তুতে চলুন

ডমরু-চরিত/তৃতীয় গল্প/সপ্তম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

মা তুমি কে?

 লম্বোদর জিজ্ঞাসা করিলেন,—“ভূতের খোসা! সে কিরূপ?”

 ডমরুধর উত্তর করিলেন,— ভূতের অস্থি মাংস রক্ত সমুদয় এই ভয়ঙ্কর গাছ চুষিয়া খাইয়াছিল। ছারপোকার খোসা দেখিয়াছ? মটর মুসুরির খোসা দেখিয়াছ? ভূতের খোসাও সেইরূপ। তবে অনেক বড়। যাহা হউক, পরদিন এই দুরন্ত গাছটাকে আমি কাটিয়া ফেলিলাম, তা না হইলে তোমাদিগকে আমি দেখাইতে পারিতাম।

 সে রাত্রে এলোকেশীর সহিত আমার তুমুল ঝগড়া হইল। আমি বলিলাম যে,—“দুর্লভী দুর্লভী করিয়া তুমি পাগল হইয়াছিলে। এমন সুন্দর ভূতটীকে তুমি তাড়াইলে, ভূতঘ্ন পাপে তুমি কলুষিত হইলে, আমার অনেক টাকা তুমি লোকসান করিলে।”

 এইরূপ ঝগড়া হইতেছে, এমন সময় আমি একবার জানালার ধারে গিয়া দাঁড়াইলাম, দেখিলাম যে, দ্বিতীয় আমি যথারীতি বাগানে দাঁড়াইয়া আছি, তাহাকে দেখাইয়া আমি এলোকেশীকে গঞ্জনা দিবার নিমিত্ত বলি— লাম, “তুমি দুর্লভী দুর্লভী বল, দেখ দেখি ঐ নীচেতে কে? তোমারও যে ঘরে গৌতম বাহিরে গৌতম।”

 এই কথা বলিবা মাত্র এলোকেশীর সর্ব্ব শরীর রাগে জ্বলিয়া উঠিল। নিকটে একটা মুড়া ঝাড়ু পড়িয়া ছিল। তাহা লইয়া এলোকেশী আমাকে সবলে প্রহার করিতে লাগিল। আমার সর্ব্বশরীরে যেন বিষের জ্বালা ধরিল। গায়ে খেঙ্গরা কাটি ফুটিয়া যাইতে লাগিল। “আর নয়, আর নয়” বলিয়া আমি যত চীৎকার করি, এলোকেশী ততই আমাকে প্রহার করে। মাথার টাক হইতে পায়ের নখ পর্য্যন্ত প্রহারের চোটে ক্ষত বিক্ষত হইল। কিন্তু এই দুঃখের সময় এক সুখের বিষয় হুইল। জানালা দিয়া একবার নীচের দিকে চাহিয়া দেখিলাম যে, সেই বাগানের আমিও ঝাঁটার আঘাতে ব্যথিত হইয়া গায়ে হাত বুলাইতেছি। তাহার পর দেখি না যে, দু‍ই আমি এক সঙ্গে ঘরের ভিতর রহিয়াছি। তাহার পর দেখি না যে, একটী আমি আরব্য উপন্যাসে দৈত্যের ন্যায় ধোঁয়ার মত হইয়া গেল। তাহার পর সেই ধুমটা সোঁৎ করিয়া আমার নাকের ভিতর প্রবেশ করিল। এতদিন আমি দুইখানা হইয়া ছিলাম। আজ এলোকেশীর ঝাঁটার আঘাতে পুনরায় আমি একথানা হইলাম।

 এলোকেশীর এই অমানুষিক কাজ দেখিয়া আমি ঘোরতর বিস্মিত হইলাম। প্রহারের জ্বালা আমি ভুলিয়া যাইলাম। গলায় কাপড় দিয়া ষোড় হাতে এলোকেশীর পায়ে পড়িয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,—“মা, তুমি কে বল?”